সৌদি যুবরাজ ও সিরিয়ার প্রেসিডেন্টের উপস্থিতিতে একাধিক চুক্তি স্বাক্ষর, ৪০৩ মিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ সহায়তা
লেখক:
সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারআ এবং সৌদি আরবের যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান আল সৌদ | ছবি : সংগৃহীত
সৌদি আরব ও সিরিয়ার মধ্যে প্রতিরক্ষা, শিল্প, কৃষি, পরিবেশ, জ্বালানি, স্বাস্থ্য, আবাসন ও অবকাঠামোসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে সহযোগিতা বাড়াতে একাধিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
বুধবার (৪ নভেম্বর) সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আল-ইয়ামামা প্রাসাদে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এসব চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারআ এবং সৌদি আরবের যুবরাজ ও প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ বিন সালমান আল সৌদ।
সৌদি প্রেস এজেন্সি (এসপিএ) ও সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সানা জানায়, সৌদি বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ আল সৌদের আমন্ত্রণে প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারআ সরকারি সফরে সৌদি আরব যান। রিয়াদে পৌঁছানোর পর যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান তাঁকে স্বাগত জানান। পরে দুই দেশের শীর্ষ নেতাদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণের উপায় নিয়ে আলোচনা হয়।
প্রতিরক্ষা ও শিল্প খাতে গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি
সফরকালে দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা সহযোগিতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। সিরিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী মুরহাফ আবু কাসরা এই চুক্তিকে সফরের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তবে চুক্তির বিস্তারিত শর্তাবলি প্রকাশ করা হয়নি।
এ ছাড়া শিল্প খাতে সহযোগিতা বাড়াতে সৌদি আরবের শিল্প ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয় এবং সিরিয়ার শিল্প ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য ও ভোক্তা সুরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে।
দুই দেশের মধ্যে শিল্প উৎপাদন, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং শিল্প খাতের উন্নয়নে পারস্পরিক সহযোগিতার ক্ষেত্র সম্প্রসারণে এই সমঝোতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কৃষি ও পরিবেশ সুরক্ষায় সমঝোতা
কৃষি উন্নয়ন ও পরিবেশ সুরক্ষায়ও পৃথক দুটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়েছে। সৌদি আরবের পরিবেশ, পানি ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সিরিয়ার স্থানীয় প্রশাসন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় এবং কৃষি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে এসব সমঝোতা হয়।
এর মাধ্যমে কৃষি খাতে অভিজ্ঞতা ও প্রযুক্তি বিনিময়, উৎপাদন বৃদ্ধি এবং পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দুই দেশের সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সিরিয়ার পুনর্গঠনে ৪০৩ মিলিয়ন ডলারের বেশি ঋণ সহায়তা
চুক্তিগুলোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে সিরিয়ার পুনর্গঠনে সৌদি আরবের উন্নয়ন সহায়তা। সৌদি উন্নয়ন তহবিলের সঙ্গে সিরিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয়ের ছয়টি সহজ শর্তের উন্নয়ন ঋণচুক্তি হয়েছে। এসব চুক্তির মোট অর্থের পরিমাণ ৪০ কোটি ৩৬ লাখ ডলার।
চুক্তি অনুযায়ী, সিরিয়ার ক্ষতিগ্রস্ত হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র পুনর্নির্মাণ, আধুনিকায়ন ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহে ১০ কোটি ডলার দেওয়া হবে। আবাসন খাতের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে ৬ কোটি ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ১০ হাজার ক্ষতিগ্রস্ত আবাসিক ইউনিট পুনর্বাসনের পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া বিভিন্ন এলাকায় বেসামরিক প্রতিরক্ষা কেন্দ্র নির্মাণ, সংস্কার ও আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহে ১০ কোটি ৫০ লাখ ডলার দেওয়া হবে। এর আওতায় ১৩টি নতুন কেন্দ্র নির্মাণ এবং ১২টি বিদ্যমান কেন্দ্র পুনর্বাসনের পরিকল্পনা রয়েছে।
দেশটির বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নয়নে আলেপ্পোর তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন ইউনিট পুনর্বাসনে ৯ কোটি ডলার বরাদ্দ করা হয়েছে। এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ উপকৃত হতে পারেন।
অন্যদিকে দামেস্ক ও ইদলিবসহ বিভিন্ন এলাকায় পানির মিটারিং ব্যবস্থা আধুনিকায়ন এবং প্রায় তিন লাখ স্মার্ট পানির মিটার সরবরাহ ও স্থাপনে ৩ কোটি ডলার ব্যয় করা হবে। এতে প্রায় ১৫ লাখ মানুষ উপকৃত হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।
এ ছাড়া সিরিয়ার অর্থ মন্ত্রণালয়ের ডিজিটাল রূপান্তর ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ১ কোটি ৮৬ লাখ ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে সরকারি আর্থিক সেবা আরও আধুনিক, কার্যকর ও স্বচ্ছ করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা ও নৌ চলাচল নিয়ে আলোচনা
চুক্তি স্বাক্ষরের পাশাপাশি দুই দেশের নেতারা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি নিয়েও বিস্তারিত মতবিনিময় করেন। বিশেষ করে সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক নৌ চলাচল, জ্বালানি সরবরাহ এবং বিশ্ব অর্থনীতির ওপর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে দুই দেশের অবস্থান ও দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে বলে উল্লেখ করেন নেতারা। আঞ্চলিক উত্তেজনা প্রশমন, সংকট নিয়ন্ত্রণ এবং বিরোধ নিষ্পত্তিতে সংলাপ ও কূটনীতিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তাঁরা।
একই সঙ্গে লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দেব প্রণালি ও হরমুজ প্রণালিতে সামুদ্রিক নৌ চলাচল এবং জলপথের নিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে—এমন সব কর্মকাণ্ড অবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানান দুই নেতা।
এক মাসেরও কম সময়ে দ্বিতীয়বার সৌদি সফর
উল্লেখ্য, চলতি বছরের ৬ অক্টোবরও সৌদি আরব সফর করেছিলেন সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারআ। সে সময় যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে বৈঠকে সিরিয়ার পুনর্গঠন, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং দুই দেশের সম্পর্ক উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব পায়।
২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর সিরিয়ার নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে সৌদি আরবের সম্পর্ক ক্রমেই ঘনিষ্ঠ হচ্ছে। যুদ্ধবিধ্বস্ত সিরিয়ার অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, অবকাঠামো পুনর্নির্মাণ এবং জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানগুলো সচল করতে সৌদি আরবের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
৪ নভেম্বরের সফরে একাধিক চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের সম্পর্ক রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রতিরক্ষা, অর্থনীতি ও উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন পর্যায়ে প্রবেশের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
সূত্র: আল জাজিরা ও আনাদোলু এজেন্সি।


