সব প্রভাবশালী শক্তিকে পরাজিত করে আব্দুল এল-সায়েদের সিনেট বিজয়
লেখক:


আব্দুল এল-সায়েদ | ছবি : সংগৃহীত
আমেরিকান জনগণ আবারও প্রমাণ করেছেন, গণতন্ত্রে রাজনৈতিক ক্ষমতার চূড়ান্ত উৎস জনগণ। কোটিপতি, ধনী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী কিংবা স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতিও নন, বরং ভোটাররাই গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি। ২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর মিশিগানের মার্কিন সিনেট নির্বাচনে আব্দুল এল-সায়েদের বিজয় এই নীতিরই এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত। তীব্র ব্যক্তিগত আক্রমণ, ধর্মীয় ও বর্ণগত বিদ্বেষ, বিপুল অর্থনৈতিক চাপ এবং নানা রাজনৈতিক চক্রান্ত মোকাবিলা করেও এল-সায়েদ বহুল আলোচিত এই নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রধান সংবাদমাধ্যম তাঁর বিজয়ের পূর্বাভাস দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে তিনি মার্কিন সিনেটে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম ব্যক্তি হিসেবে ইতিহাস গড়তে যাচ্ছেন।
এই ফলাফল কেবল একজন ব্যক্তির নির্বাচনী সাফল্য নয়; বরং আমেরিকান গণতন্ত্রে অর্থের প্রভাব, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠিত শক্তি এবং বিভাজনমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সাধারণ মানুষের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া এবং ধনী দাতা ও প্রভাবশালী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর অসম প্রভাববলয়কে চ্যালেঞ্জ করার প্রতিশ্রুতি নিয়েই এল-সায়েদ নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছিলেন। তিনি রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার অঙ্গীকার করেছিলেন।
একজন চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য খাতের সাবেক নেতা হিসেবে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে অসাধারণ অভিজ্ঞতা নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেন এল-সায়েদ। সাধারণ আমেরিকান পরিবারগুলোর দৈনন্দিন সমস্যা অনুধাবন এবং সেগুলোর বাস্তবসম্মত সমাধান তুলে ধরার দক্ষতা তাঁকে প্রতিদ্বন্দ্বীদের থেকে আলাদা করেছে। ব্যক্তিগত আক্রমণ ও বিতর্কের মধ্যে প্রচারণাকে সীমাবদ্ধ না রেখে তিনি কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন। এর মধ্যে ছিল মানুষের হাতে অর্থ ফিরিয়ে দেওয়া, রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব কমানো এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
তিনি বারবার বলেছেন, আমেরিকা সবার জন্যই যথেষ্ট বড় একটি দেশ। একজন মানুষ কীভাবে প্রার্থনা করেন কিংবা আদৌ প্রার্থনা করেন কি না, সেটি কোনো বিবেচ্য বিষয় হতে পারে না। তাঁর বক্তব্য ছিল, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির জন্য সাধারণ মানুষ দায়ী নন। বরং রাষ্ট্রপতির ভুল নীতির কারণেই গড় আমেরিকানদের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার মূল বার্তায় সাধারণ ভোটারদের দৈনন্দিন উদ্বেগের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। শুধু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা, ওষুধ সংগ্রহ, গাড়িতে জ্বালানি ভরা কিংবা সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর জন্য মানুষকে কেন হিমশিম খেতে হবে? তাঁর মতে, এগুলো মানুষের মৌলিক চাহিদা। যুক্তরাষ্ট্রের মতো সমৃদ্ধ একটি দেশের পক্ষে এসব পণ্য ও সেবা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা অবশ্যই সম্ভব।
ইসরাইলকে যুক্তরাষ্ট্রের শর্তহীন সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিরোধিতাও এল-সায়েদের রাজনৈতিক অবস্থানের অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল। তাঁর যুক্তি, গাজায় ফিলিস্তিনিদের চরম দুর্ভোগের জন্য দায়ী সামরিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা না দিয়ে মার্কিন করদাতাদের অর্থ নিজেদের দেশের জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে ব্যয় করা উচিত। গাজায় গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধে জড়িত ইসরাইলকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ারও তিনি বিরোধিতা করেছেন। তাঁর এই অবস্থান রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত হলেও তিনি মনে করেন, জনগণের করের অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, সে বিষয়ে জবাবদিহি চাওয়ার অধিকার ভোটারদের রয়েছে।
ব্যক্তিগত আক্রমণ ও ধর্মীয় বিদ্বেষ
এই নির্বাচনী প্রচারণার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি ছিল রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এল-সায়েদের বিরুদ্ধে চালানো আক্রমণের তীব্রতা। নীতিগত পার্থক্য নিয়ে আলোচনা বা সমালোচনার পরিবর্তে ট্রাম্প বারবার তাঁর মুসলিম পরিচয়, নাম ও পারিবারিক পটভূমিকে লক্ষ্যবস্তু করেছেন।
ট্রাম্প এল-সায়েদকে আক্রমণ করতে ‘উগ্র জিহাদপন্থি’, ‘জিহাদপন্থি’ এবং ‘মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য’—এ ধরনের শব্দ ও বাক্যাংশ ব্যবহার করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসীদের সমর্থন করার’ অভিযোগও তুলেছেন। এমনকি তাঁকে ‘যেখান থেকে এসেছেন, সেখানে ফিরে যেতে’ বলেছেন, যদিও এল-সায়েদের জন্ম মিশিগানেই। অন্য একটি অনুষ্ঠানে ট্রাম্প ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁকে ‘মোহাম্মদ’ বলে সম্বোধন করেন এবং বলেন, ‘আমি রাষ্ট্রপতি। আমি তাঁকে যা খুশি তাই বলে ডাকতে পারি।’
ট্রাম্প আরও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, এল-সায়েদ সিনেটে নির্বাচিত হলে তিনি নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠবেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, এল-সায়েদই হবেন একমাত্র সিনেটর, যাঁকে মেটাল ডিটেক্টরের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করতে হবে। এর জবাবে এল-সায়েদও যথাযথ ও তীক্ষ্ণ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প যদি সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের যন্ত্রে পরীক্ষা দিতে রাজি হন, তাহলে তিনিও মেটাল ডিটেক্টরের মধ্য দিয়ে যেতে প্রস্তুত।
ট্রাম্প এল-সায়েদকে শরিয়াহ আইন চালুর চেষ্টার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেছেন। এ প্রসঙ্গে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার কথাও তুলে ধরেছেন। এমনকি ইহুদি ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটাররা তাঁকে সমর্থন করলে তা তাঁদের বোকামি হবে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এ ধরনের বক্তব্য আমেরিকার নির্বাচনী রাজনীতিতে ইসলামবিদ্বেষ, বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং ধর্মীয় বিদ্বেষের ব্যবহার নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক ও বৈধ অংশ। প্রার্থীদের নিজেদের নীতি, বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের সমালোচনা গ্রহণ করার মানসিকতা থাকতে হবে। কিন্তু কোনো বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ ছাড়াই একজন সহনাগরিককে সন্ত্রাসী কিংবা বিদেশি হিসেবে চিত্রিত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এটি কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির সমালোচনা নয়।
কোনো প্রার্থীর ধর্মীয় বিশ্বাস কিংবা জাতিগত পরিচয়কে রাষ্ট্রদ্রোহ বা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। এই প্রচারণায় ধর্মীয় পরিচয়কে নির্বাচনের অন্যতম প্রধান ইস্যুতে পরিণত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। অথচ নির্বাচনটি মূলত জননীতি ও মিশিগানের ভবিষ্যৎ নিয়ে হওয়ার কথা ছিল। এ অবস্থায় আমেরিকান ভোটারদের প্রতিক্রিয়া গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার দাবি রাখে।
করপোরেট অর্থের প্রভাবের বিরুদ্ধে নির্বাচনী লড়াই
ডেমোক্রেটিক দলের প্রাথমিক মনোনয়ন নির্বাচনে এল-সায়েদের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বিপুল অর্থনৈতিক শক্তি। আমেরিকান ইসরাইল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (এআইপ্যাক) তাদের রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটি ‘ইউনাইটেড ডেমোক্রেসি প্রজেক্ট’-এর মাধ্যমে এল-সায়েদের প্রাথমিক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হ্যালি স্টিভেন্সকে সমর্থন এবং এল-সায়েদের বিরোধিতায় প্রায় ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করেছিল। জানা গেছে, একক নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কোনো সংস্থার পক্ষ থেকে এটি ছিল অন্যতম বৃহৎ আর্থিক বিনিয়োগ।
এত বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও এল-সায়েদ ডেমোক্রেটিক দলের মনোনয়ন লাভ করেন। নির্বাচনে বহিরাগত অর্থের প্রভাবের কঠোর সমালোচনা করে তিনি যুক্তি দেন, রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের কাছে ধনী ব্যক্তি, করপোরেট প্রতিষ্ঠান কিংবা শক্তিশালী লবিং সংস্থার চেয়ে নিজ নিজ এলাকার ভোটারদের স্বার্থই বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
আর্থিক বৈষম্যের মাত্রাটি ছিল বিস্ময়কর। প্রাথমিক নির্বাচনী প্রচারণার সময় এল-সায়েদ নিজেকে প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় প্রায় ১১ গুণ কম অর্থ ব্যয়ের অবস্থানে বলে উল্লেখ করেছিলেন। এত বড় আর্থিক প্রতিকূলতা অতিক্রম করে তাঁর সাফল্য প্রমাণ করে, তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের ঐক্য এবং জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা ও রাজনৈতিক জবাবদিহির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রচারণার যথেষ্ট শক্তি রয়েছে।
তবে তাঁর এই বিজয়কে কোনো বিশেষ ধর্মীয় বা জাতিগত জনগোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন কিংবা বিরোধিতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। কোনো বিদেশি সরকারের নীতির সমালোচনা করা কিংবা সামরিক সহায়তার বিরোধিতা করা একটি বৈধ রাজনৈতিক অবস্থান। এখানে মূল গণতান্ত্রিক প্রশ্ন হলো, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সাধারণ ভোটারদের স্বার্থে কাজ করবেন, নাকি প্রভাবশালী আর্থিক গোষ্ঠীর ইচ্ছায় পরিচালিত হবেন।
মুসলিম ও সংখ্যালঘু ভোটারদের জন্য বৃহত্তর বার্তা
এল-সায়েদের বিজয় যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির বৃহত্তর ধারারই একটি অংশ। মুসলিম আমেরিকানরা ক্রমেই নির্বাচনী রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছেন, বিভিন্ন সরকারি পদে প্রার্থী হচ্ছেন এবং তাঁদের উদ্বেগ ও দাবিগুলোকে জাতীয় রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।
এই নির্বাচন আরও একবার প্রমাণ করেছে, প্রার্থীদের ধর্মীয় পরিচয় কিংবা জাতিগত পটভূমির ভিত্তিতে বিচার করা উচিত নয়। একজন প্রতিনিধিকে তাঁর যোগ্যতা, সততা, নীতিগত অবস্থান এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখার সক্ষমতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করার অধিকার ভোটারদের রয়েছে।
কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমর (মিনেসোটা) ও রাশিদা তালাইব (মিশিগান) উভয়েই তীব্র বর্ণবাদী ও ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এবং অপপ্রচারের মুখোমুখি হয়েছেন। তা সত্ত্বেও তাঁরা দুজনই আগের তুলনায় বেশি ভোট পেয়ে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন।
এ থেকে ধারণা করা যায়, নির্বাচনী হাতিয়ার হিসেবে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য ব্যবহারের প্রচেষ্টা অনেক ক্ষেত্রে উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে। ধর্মীয় বিদ্বেষকে নির্বাচনী বিতর্কের কেন্দ্রে স্থান দেওয়ার পরিবর্তে এল-সায়েদ বারবার এমন সব বিষয়ে ফিরে গেছেন, যা ধর্ম, বর্ণ ও জাতিগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সব মানুষকে প্রভাবিত করে। এসব বিষয়ের মধ্যে রয়েছে পারিবারিক ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব।
অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে তিনি রাষ্ট্রপতি ও তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের বারবার উসকানির মুখেও কোনো ক্ষতিকর কিংবা বিভ্রান্তিকর ব্যক্তিগত আক্রমণের জবাব দেননি। বরং নিজের নির্বাচনী কর্মসূচি ও জনগণের জীবনমান উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
ওয়াশিংটনের পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রভাব শুধু মিশিগানেই সীমাবদ্ধ নয়। নির্বাচনের প্রাথমিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ অর্জন করেছে। ভোট গণনা ও চূড়ান্ত ফলাফল প্রত্যয়ন শেষে বিষয়টি নিশ্চিত হলে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের প্রশাসনের ওপর কংগ্রেসের শক্তিশালী নজরদারি প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে।
বিভক্ত সরকার কিংবা এমন পরিস্থিতি, যেখানে রাষ্ট্রপতির দল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণে নেই, আইন প্রণয়ন, সরকারি ব্যয়, পররাষ্ট্রনীতি এবং নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহির ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তগুলো যখন তীব্র রাজনৈতিক বা সাংবিধানিক আপত্তির মুখে পড়ে, তখন কংগ্রেসের নজরদারি ও তদারকি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ইসরাইলকে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার বিষয়েও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে। ৩ নভেম্বর ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ২০২৬ সালের পর যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে দেওয়া বার্ষিক প্রায় ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সহায়তা বন্ধ করবে। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী অস্ত্র বিক্রি ও অন্যান্য সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
ট্রাম্প ইসরাইলকে স্বাবলম্বী দেশ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, বার্ষিক আর্থিক সহায়তা ছাড়াও দেশটি চলার মতো যথেষ্ট সমৃদ্ধ। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে বিদ্যমান সহায়তা চুক্তির মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই এই সহায়তা বন্ধ করার বাস্তব ও আইনি প্রক্রিয়া কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
গাজায় যুদ্ধ এবং মার্কিন করদাতাদের অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমবর্ধমান বিতর্কের প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের এই ঘোষণা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
জনগণের ক্ষমতাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের উৎস
আব্দুল এল-সায়েদের বিজয় বিশ্বের সব গণতান্ত্রিক দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। অর্থ দিয়ে বিজ্ঞাপন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ কেনা সম্ভব; কিন্তু শুধু অর্থ দিয়ে জনগণের আস্থা অর্জন করা যায় না। রাষ্ট্রপতির সমর্থন, রাজনৈতিক ভয়ভীতি কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণও নির্বাচনী বিজয়ের নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
মিশিগানের ভোটাররা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, ধর্মীয়, বর্ণগত কিংবা জাতিগত বিভাজনের চেষ্টার চেয়ে তাঁদের কাছে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এল-সায়েদের সাফল্য আরও দেখিয়েছে, একজন প্রার্থী সুস্পষ্ট কর্মসূচি তুলে ধরে, ধারাবাহিক অবস্থান বজায় রেখে এবং বিস্তৃত তৃণমূল আন্দোলন গড়ে তুলে শক্তিশালী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকেও চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেন।
তাঁর বিজয়ের অর্থ এই নয় যে আমেরিকান গণতন্ত্রের সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। ধনী দাতাদের প্রভাব, রাজনৈতিক লবিং, বর্ণবৈষম্য এবং ধর্মীয় বিদ্বেষ ভবিষ্যতেও জনপরিসরে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে। একটি নির্বাচনে জয়লাভ করলেই প্রচারণায় দেওয়া সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয় না। এখন এল-সায়েদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, নিজের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে রূপ দেওয়া এবং সাধারণ মানুষের জীবনে দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন আনা।
তা সত্ত্বেও তাঁর এই অর্জন ঐতিহাসিক। এটি প্রমাণ করে, সাধারণ মানুষের শক্তি যখন অভিন্ন চিন্তা, স্বার্থ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন আপাতদৃষ্টিতে অতিক্রম করা অসম্ভব রাজনৈতিক ও আর্থিক বাধাও পেরিয়ে যাওয়া সম্ভব।
সবশেষে বলা যায়, গণতন্ত্র জনগণেরই সম্পদ। কোনো রাষ্ট্রপতি, কোটিপতি, প্রভাবশালী লবিগোষ্ঠী কিংবা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তি কখনোই সচেতন ভোটারদের সম্মিলিত কণ্ঠস্বরের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না।
লেখক: ইমেরিটাস প্রফেসর ড. শাহজাহান খান, OAM অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সাদার্ন কুইন্সল্যান্ডের ইমেরিটাস অধ্যাপক, বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের প্রবাসী ফেলো এবং ঢাকার এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের সাবেক উপাচার্য।
আমেরিকান জনগণ আবারও প্রমাণ করেছেন, গণতন্ত্রে রাজনৈতিক ক্ষমতার চূড়ান্ত উৎস জনগণ। কোটিপতি, ধনী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠী কিংবা স্বয়ং যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতিও নন, বরং ভোটাররাই গণতন্ত্রের প্রকৃত শক্তি। ২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর মিশিগানের মার্কিন সিনেট নির্বাচনে আব্দুল এল-সায়েদের বিজয় এই নীতিরই এক অসাধারণ দৃষ্টান্ত। তীব্র ব্যক্তিগত আক্রমণ, ধর্মীয় ও বর্ণগত বিদ্বেষ, বিপুল অর্থনৈতিক চাপ এবং নানা রাজনৈতিক চক্রান্ত মোকাবিলা করেও এল-সায়েদ বহুল আলোচিত এই নির্বাচনে রিপাবলিকান প্রার্থী মাইক রজার্সকে পরাজিত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান প্রধান সংবাদমাধ্যম তাঁর বিজয়ের পূর্বাভাস দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে তিনি মার্কিন সিনেটে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম ব্যক্তি হিসেবে ইতিহাস গড়তে যাচ্ছেন।
এই ফলাফল কেবল একজন ব্যক্তির নির্বাচনী সাফল্য নয়; বরং আমেরিকান গণতন্ত্রে অর্থের প্রভাব, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠিত শক্তি এবং বিভাজনমূলক বক্তব্যের বিরুদ্ধে একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সাধারণ মানুষের হাতে ক্ষমতা ফিরিয়ে দেওয়া এবং ধনী দাতা ও প্রভাবশালী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর অসম প্রভাববলয়কে চ্যালেঞ্জ করার প্রতিশ্রুতি নিয়েই এল-সায়েদ নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছিলেন। তিনি রাজনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার অঙ্গীকার করেছিলেন।
একজন চিকিৎসক ও জনস্বাস্থ্য খাতের সাবেক নেতা হিসেবে স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে অসাধারণ অভিজ্ঞতা নিয়ে নির্বাচনী প্রচারণায় অংশ নেন এল-সায়েদ। সাধারণ আমেরিকান পরিবারগুলোর দৈনন্দিন সমস্যা অনুধাবন এবং সেগুলোর বাস্তবসম্মত সমাধান তুলে ধরার দক্ষতা তাঁকে প্রতিদ্বন্দ্বীদের থেকে আলাদা করেছে। ব্যক্তিগত আক্রমণ ও বিতর্কের মধ্যে প্রচারণাকে সীমাবদ্ধ না রেখে তিনি কয়েকটি মৌলিক বিষয়ে গুরুত্ব দিয়েছেন। এর মধ্যে ছিল মানুষের হাতে অর্থ ফিরিয়ে দেওয়া, রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব কমানো এবং সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা।
তিনি বারবার বলেছেন, আমেরিকা সবার জন্যই যথেষ্ট বড় একটি দেশ। একজন মানুষ কীভাবে প্রার্থনা করেন কিংবা আদৌ প্রার্থনা করেন কি না, সেটি কোনো বিবেচ্য বিষয় হতে পারে না। তাঁর বক্তব্য ছিল, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির জন্য সাধারণ মানুষ দায়ী নন। বরং রাষ্ট্রপতির ভুল নীতির কারণেই গড় আমেরিকানদের জীবনযাত্রা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।
তাঁর নির্বাচনী প্রচারণার মূল বার্তায় সাধারণ ভোটারদের দৈনন্দিন উদ্বেগের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। শুধু নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কেনা, ওষুধ সংগ্রহ, গাড়িতে জ্বালানি ভরা কিংবা সন্তানদের স্কুলে পাঠানোর জন্য মানুষকে কেন হিমশিম খেতে হবে? তাঁর মতে, এগুলো মানুষের মৌলিক চাহিদা। যুক্তরাষ্ট্রের মতো সমৃদ্ধ একটি দেশের পক্ষে এসব পণ্য ও সেবা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে রাখা অবশ্যই সম্ভব।
ইসরাইলকে যুক্তরাষ্ট্রের শর্তহীন সামরিক সহায়তা দেওয়ার বিরোধিতাও এল-সায়েদের রাজনৈতিক অবস্থানের অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল। তাঁর যুক্তি, গাজায় ফিলিস্তিনিদের চরম দুর্ভোগের জন্য দায়ী সামরিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা না দিয়ে মার্কিন করদাতাদের অর্থ নিজেদের দেশের জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে ব্যয় করা উচিত। গাজায় গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধে জড়িত ইসরাইলকে আর্থিক সহায়তা দেওয়ারও তিনি বিরোধিতা করেছেন। তাঁর এই অবস্থান রাজনৈতিকভাবে বিতর্কিত হলেও তিনি মনে করেন, জনগণের করের অর্থ কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, সে বিষয়ে জবাবদিহি চাওয়ার অধিকার ভোটারদের রয়েছে।
ব্যক্তিগত আক্রমণ ও ধর্মীয় বিদ্বেষ
এই নির্বাচনী প্রচারণার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিকগুলোর একটি ছিল রাষ্ট্রপতি ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে এল-সায়েদের বিরুদ্ধে চালানো আক্রমণের তীব্রতা। নীতিগত পার্থক্য নিয়ে আলোচনা বা সমালোচনার পরিবর্তে ট্রাম্প বারবার তাঁর মুসলিম পরিচয়, নাম ও পারিবারিক পটভূমিকে লক্ষ্যবস্তু করেছেন।
ট্রাম্প এল-সায়েদকে আক্রমণ করতে ‘উগ্র জিহাদপন্থি’, ‘জিহাদপন্থি’ এবং ‘মুসলিম ব্রাদারহুডের সদস্য’—এ ধরনের শব্দ ও বাক্যাংশ ব্যবহার করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে ‘সন্ত্রাসীদের সমর্থন করার’ অভিযোগও তুলেছেন। এমনকি তাঁকে ‘যেখান থেকে এসেছেন, সেখানে ফিরে যেতে’ বলেছেন, যদিও এল-সায়েদের জন্ম মিশিগানেই। অন্য একটি অনুষ্ঠানে ট্রাম্প ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁকে ‘মোহাম্মদ’ বলে সম্বোধন করেন এবং বলেন, ‘আমি রাষ্ট্রপতি। আমি তাঁকে যা খুশি তাই বলে ডাকতে পারি।’
ট্রাম্প আরও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, এল-সায়েদ সিনেটে নির্বাচিত হলে তিনি নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে উঠবেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, এল-সায়েদই হবেন একমাত্র সিনেটর, যাঁকে মেটাল ডিটেক্টরের মধ্য দিয়ে প্রবেশ করতে হবে। এর জবাবে এল-সায়েদও যথাযথ ও তীক্ষ্ণ মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ট্রাম্প যদি সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের যন্ত্রে পরীক্ষা দিতে রাজি হন, তাহলে তিনিও মেটাল ডিটেক্টরের মধ্য দিয়ে যেতে প্রস্তুত।
ট্রাম্প এল-সায়েদকে শরিয়াহ আইন চালুর চেষ্টার সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেছেন। এ প্রসঙ্গে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলার কথাও তুলে ধরেছেন। এমনকি ইহুদি ও কৃষ্ণাঙ্গ ভোটাররা তাঁকে সমর্থন করলে তা তাঁদের বোকামি হবে বলেও ইঙ্গিত দিয়েছেন।
এ ধরনের বক্তব্য আমেরিকার নির্বাচনী রাজনীতিতে ইসলামবিদ্বেষ, বর্ণবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এবং ধর্মীয় বিদ্বেষের ব্যবহার নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতন্ত্রের স্বাভাবিক ও বৈধ অংশ। প্রার্থীদের নিজেদের নীতি, বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের সমালোচনা গ্রহণ করার মানসিকতা থাকতে হবে। কিন্তু কোনো বস্তুনিষ্ঠ প্রমাণ ছাড়াই একজন সহনাগরিককে সন্ত্রাসী কিংবা বিদেশি হিসেবে চিত্রিত করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। এটি কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচির সমালোচনা নয়।
কোনো প্রার্থীর ধর্মীয় বিশ্বাস কিংবা জাতিগত পরিচয়কে রাষ্ট্রদ্রোহ বা জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। এই প্রচারণায় ধর্মীয় পরিচয়কে নির্বাচনের অন্যতম প্রধান ইস্যুতে পরিণত করার চেষ্টা করা হয়েছিল। অথচ নির্বাচনটি মূলত জননীতি ও মিশিগানের ভবিষ্যৎ নিয়ে হওয়ার কথা ছিল। এ অবস্থায় আমেরিকান ভোটারদের প্রতিক্রিয়া গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার দাবি রাখে।
করপোরেট অর্থের প্রভাবের বিরুদ্ধে নির্বাচনী লড়াই
ডেমোক্রেটিক দলের প্রাথমিক মনোনয়ন নির্বাচনে এল-সায়েদের সামনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বিপুল অর্থনৈতিক শক্তি। আমেরিকান ইসরাইল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (এআইপ্যাক) তাদের রাজনৈতিক অ্যাকশন কমিটি ‘ইউনাইটেড ডেমোক্রেসি প্রজেক্ট’-এর মাধ্যমে এল-সায়েদের প্রাথমিক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হ্যালি স্টিভেন্সকে সমর্থন এবং এল-সায়েদের বিরোধিতায় প্রায় ৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করেছিল। জানা গেছে, একক নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কোনো সংস্থার পক্ষ থেকে এটি ছিল অন্যতম বৃহৎ আর্থিক বিনিয়োগ।
এত বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও এল-সায়েদ ডেমোক্রেটিক দলের মনোনয়ন লাভ করেন। নির্বাচনে বহিরাগত অর্থের প্রভাবের কঠোর সমালোচনা করে তিনি যুক্তি দেন, রাজনৈতিক প্রতিনিধিদের কাছে ধনী ব্যক্তি, করপোরেট প্রতিষ্ঠান কিংবা শক্তিশালী লবিং সংস্থার চেয়ে নিজ নিজ এলাকার ভোটারদের স্বার্থই বেশি গুরুত্ব পাওয়া উচিত।
আর্থিক বৈষম্যের মাত্রাটি ছিল বিস্ময়কর। প্রাথমিক নির্বাচনী প্রচারণার সময় এল-সায়েদ নিজেকে প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় প্রায় ১১ গুণ কম অর্থ ব্যয়ের অবস্থানে বলে উল্লেখ করেছিলেন। এত বড় আর্থিক প্রতিকূলতা অতিক্রম করে তাঁর সাফল্য প্রমাণ করে, তৃণমূল পর্যায়ের মানুষের ঐক্য এবং জীবনযাত্রার ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা ও রাজনৈতিক জবাবদিহির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রচারণার যথেষ্ট শক্তি রয়েছে।
তবে তাঁর এই বিজয়কে কোনো বিশেষ ধর্মীয় বা জাতিগত জনগোষ্ঠীর প্রতি সমর্থন কিংবা বিরোধিতা হিসেবে ব্যাখ্যা করা উচিত নয়। কোনো বিদেশি সরকারের নীতির সমালোচনা করা কিংবা সামরিক সহায়তার বিরোধিতা করা একটি বৈধ রাজনৈতিক অবস্থান। এখানে মূল গণতান্ত্রিক প্রশ্ন হলো, নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সাধারণ ভোটারদের স্বার্থে কাজ করবেন, নাকি প্রভাবশালী আর্থিক গোষ্ঠীর ইচ্ছায় পরিচালিত হবেন।
মুসলিম ও সংখ্যালঘু ভোটারদের জন্য বৃহত্তর বার্তা
এল-সায়েদের বিজয় যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম ও সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধির বৃহত্তর ধারারই একটি অংশ। মুসলিম আমেরিকানরা ক্রমেই নির্বাচনী রাজনীতিতে সক্রিয় হচ্ছেন, বিভিন্ন সরকারি পদে প্রার্থী হচ্ছেন এবং তাঁদের উদ্বেগ ও দাবিগুলোকে জাতীয় রাজনৈতিক আলোচনায় গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছেন।
এই নির্বাচন আরও একবার প্রমাণ করেছে, প্রার্থীদের ধর্মীয় পরিচয় কিংবা জাতিগত পটভূমির ভিত্তিতে বিচার করা উচিত নয়। একজন প্রতিনিধিকে তাঁর যোগ্যতা, সততা, নীতিগত অবস্থান এবং মানুষের জীবনমান উন্নয়নে ভূমিকা রাখার সক্ষমতার ভিত্তিতে মূল্যায়ন করার অধিকার ভোটারদের রয়েছে।
কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমর (মিনেসোটা) ও রাশিদা তালাইব (মিশিগান) উভয়েই তীব্র বর্ণবাদী ও ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক বক্তব্য এবং অপপ্রচারের মুখোমুখি হয়েছেন। তা সত্ত্বেও তাঁরা দুজনই আগের তুলনায় বেশি ভোট পেয়ে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন।
এ থেকে ধারণা করা যায়, নির্বাচনী হাতিয়ার হিসেবে ইসলামবিদ্বেষী বক্তব্য ব্যবহারের প্রচেষ্টা অনেক ক্ষেত্রে উল্টো ফল বয়ে আনতে পারে। ধর্মীয় বিদ্বেষকে নির্বাচনী বিতর্কের কেন্দ্রে স্থান দেওয়ার পরিবর্তে এল-সায়েদ বারবার এমন সব বিষয়ে ফিরে গেছেন, যা ধর্ম, বর্ণ ও জাতিগত পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে সব মানুষকে প্রভাবিত করে। এসব বিষয়ের মধ্যে রয়েছে পারিবারিক ব্যয়, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং রাজনীতিতে অর্থের প্রভাব।
অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে তিনি রাষ্ট্রপতি ও তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীদের বারবার উসকানির মুখেও কোনো ক্ষতিকর কিংবা বিভ্রান্তিকর ব্যক্তিগত আক্রমণের জবাব দেননি। বরং নিজের নির্বাচনী কর্মসূচি ও জনগণের জীবনমান উন্নয়নের প্রতিশ্রুতির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন।
ওয়াশিংটনের পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক পরিস্থিতি
২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রভাব শুধু মিশিগানেই সীমাবদ্ধ নয়। নির্বাচনের প্রাথমিক পূর্বাভাস অনুযায়ী, ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদ ও সিনেট—কংগ্রেসের উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ অর্জন করেছে। ভোট গণনা ও চূড়ান্ত ফলাফল প্রত্যয়ন শেষে বিষয়টি নিশ্চিত হলে ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রপতি ট্রাম্পের প্রশাসনের ওপর কংগ্রেসের শক্তিশালী নজরদারি প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হবে।
বিভক্ত সরকার কিংবা এমন পরিস্থিতি, যেখানে রাষ্ট্রপতির দল কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণে নেই, আইন প্রণয়ন, সরকারি ব্যয়, পররাষ্ট্রনীতি এবং নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহির ওপর গভীর প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে রাষ্ট্রপতির সিদ্ধান্তগুলো যখন তীব্র রাজনৈতিক বা সাংবিধানিক আপত্তির মুখে পড়ে, তখন কংগ্রেসের নজরদারি ও তদারকি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।
ইসরাইলকে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার বিষয়েও একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটেছে। ৩ নভেম্বর ট্রাম্প ঘোষণা করেন, ২০২৬ সালের পর যুক্তরাষ্ট্র ইসরাইলকে দেওয়া বার্ষিক প্রায় ৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সহায়তা বন্ধ করবে। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী অস্ত্র বিক্রি ও অন্যান্য সহায়তা অব্যাহত থাকবে।
ট্রাম্প ইসরাইলকে স্বাবলম্বী দেশ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, বার্ষিক আর্থিক সহায়তা ছাড়াও দেশটি চলার মতো যথেষ্ট সমৃদ্ধ। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের মধ্যে বিদ্যমান সহায়তা চুক্তির মেয়াদ ২০২৮ সাল পর্যন্ত রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই এই সহায়তা বন্ধ করার বাস্তব ও আইনি প্রক্রিয়া কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
গাজায় যুদ্ধ এবং মার্কিন করদাতাদের অর্থ কীভাবে ব্যয় করা হচ্ছে, তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে ক্রমবর্ধমান বিতর্কের প্রেক্ষাপটে ট্রাম্পের এই ঘোষণা বিশেষ তাৎপর্য বহন করে।
জনগণের ক্ষমতাই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের উৎস
আব্দুল এল-সায়েদের বিজয় বিশ্বের সব গণতান্ত্রিক দেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা বহন করে। অর্থ দিয়ে বিজ্ঞাপন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ক্ষমতাধর প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ কেনা সম্ভব; কিন্তু শুধু অর্থ দিয়ে জনগণের আস্থা অর্জন করা যায় না। রাষ্ট্রপতির সমর্থন, রাজনৈতিক ভয়ভীতি কিংবা ব্যক্তিগত আক্রমণও নির্বাচনী বিজয়ের নিশ্চয়তা দিতে পারে না।
মিশিগানের ভোটাররা স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, ধর্মীয়, বর্ণগত কিংবা জাতিগত বিভাজনের চেষ্টার চেয়ে তাঁদের কাছে অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, স্বাস্থ্যসেবার সুযোগ এবং রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এল-সায়েদের সাফল্য আরও দেখিয়েছে, একজন প্রার্থী সুস্পষ্ট কর্মসূচি তুলে ধরে, ধারাবাহিক অবস্থান বজায় রেখে এবং বিস্তৃত তৃণমূল আন্দোলন গড়ে তুলে শক্তিশালী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকেও চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেন।
তাঁর বিজয়ের অর্থ এই নয় যে আমেরিকান গণতন্ত্রের সব সমস্যার সমাধান হয়ে গেছে। ধনী দাতাদের প্রভাব, রাজনৈতিক লবিং, বর্ণবৈষম্য এবং ধর্মীয় বিদ্বেষ ভবিষ্যতেও জনপরিসরে আলোচনার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে থাকবে। একটি নির্বাচনে জয়লাভ করলেই প্রচারণায় দেওয়া সব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হয় না। এখন এল-সায়েদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো, নিজের প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবে রূপ দেওয়া এবং সাধারণ মানুষের জীবনে দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন আনা।
তা সত্ত্বেও তাঁর এই অর্জন ঐতিহাসিক। এটি প্রমাণ করে, সাধারণ মানুষের শক্তি যখন অভিন্ন চিন্তা, স্বার্থ ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন আপাতদৃষ্টিতে অতিক্রম করা অসম্ভব রাজনৈতিক ও আর্থিক বাধাও পেরিয়ে যাওয়া সম্ভব।
সবশেষে বলা যায়, গণতন্ত্র জনগণেরই সম্পদ। কোনো রাষ্ট্রপতি, কোটিপতি, প্রভাবশালী লবিগোষ্ঠী কিংবা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক শক্তি কখনোই সচেতন ভোটারদের সম্মিলিত কণ্ঠস্বরের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না।
লেখক: ইমেরিটাস প্রফেসর ড. শাহজাহান খান, OAM অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সাদার্ন কুইন্সল্যান্ডের ইমেরিটাস অধ্যাপক, বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের প্রবাসী ফেলো এবং ঢাকার এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের সাবেক উপাচার্য।

