তাসখন্দ থেকে বিশ্বমঞ্চে : ইসলামী জ্ঞানচর্চা ও বিজ্ঞানের এক ঐতিহাসিক উদযাপন
লেখক:
তাসখন্দে "ইসলামী সভ্যতা : শান্তি, সহনশীলতা এবং আলোকবর্তিকার পথ" শীর্ষক আন্তর্জাতিক সম্মেলন | ছবি : ওআইসি
দ্বন্দ্বে জর্জরিত, যুদ্ধবিদ্ধস্ত এবং ব্যাপক ধ্বংসলীলার এই পৃথিবীতে শান্তি ও সহনশীলতার যেকোনো আলোচনাই যেন একঝলক তাজা ও স্বস্তিদায়ক বাতাস বয়ে নিয়ে আসে। এটি যেন আশা ও সম্ভাবনার এক মরূদ্যান, যা আমাদের জীবনের উদ্দেশ্যের কথা মনে করিয়ে দেয় এবং এমন কিছু আখ্যান তৈরি করে যা বর্তমান সময়ে খুব কমই শুনতে পাওয়া যায়।
যুক্তি ও বিবেকের এমনই এক কণ্ঠস্বর প্রতিধ্বনিত হয়েছে উজবেকিস্তানের ঐতিহাসিক ভূখণ্ড থেকে। পারস্য, তুর্কি ও ইসলামী সংস্কৃতির এক চমৎকার মিশ্রণে গড়ে ওঠা এই অঞ্চলটিকে মানব সভ্যতার দোলনা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। উজবেকিস্তান তার প্রাচীন পাণ্ডুলিপি এবং পণ্ডিতদের গৌরবময় অর্জনের বিশাল ভাণ্ডার সংরক্ষণ ও প্রচারে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে। তাসখন্দে "সেন্টার ফর ইসলামিক সিভিলাইজেশন" (ইসলামী সভ্যতা কেন্দ্র) প্রতিষ্ঠা এর সাম্প্রতিকতম একটি অন্যতম বড় উদ্যোগ।
আজ যখন বিশ্বের একটি বড় অংশ ভূ-রাজনৈতিক লড়াই ও দ্বন্দ্বে লিপ্ত, ঠিক তখনই তাসখন্দে "ইসলামী সভ্যতা : শান্তি, সহনশীলতা এবং আলোকবর্তিকার পথ" শীর্ষক একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হলো।
উজবেকিস্তানের তিনটি শহর—তাসখন্দ, সমরখন্দ এবং তিরমিজে গত ৭-১১ জুলাই প্রথম আন্তর্জাতিক ‘ইসলামিক সিভিলাইজেশন’ ফোরাম অনুষ্ঠিত হয়। উজবেকিস্তানের 'সেন্টার অফ ইসলামিক সিভিলাইজেশন'-এর সমন্বয়ে এবং ধর্মীয় বিষয়সংক্রান্ত কমিটি, ইমাম মাতুরিদি, ইমাম বুখারি ও ইমাম তিরমিজি আন্তর্জাতিক গবেষণা কেন্দ্র, উজবেকিস্তান মুসলিম বোর্ড এবং উজবেকিস্তান আন্তর্জাতিক ইসলামী একাডেমির যৌথ সহযোগিতায় এই ফোরামের আয়োজন করা হয়।
উগ্রবাদ, ইসলামোফোবিয়া (ইসলামবিদ্বেষ), জেনোফোবিয়া (বিদেশী বা ভিন্ন সংস্কৃতিভীতি) এবং ইসলামী ঐতিহ্য সম্পর্কে বিকৃত ধারণার বিরুদ্ধে লড়াইয়ে শান্তি, সহনশীলতা, শিক্ষা, আন্তঃধর্মীয় সংলাপ এবং বৈজ্ঞানিক গবেষণার গুরুত্বের ওপর ফোরামের সকল প্রতিনিধি একমত পোষণ করেন। সেই সাথে, ইসলামী তথা বিশ্ব সভ্যতার বিকাশে উজবেকিস্তান এবং বৃহত্তর ট্রান্সঅক্সিয়ানা (মাওয়ারাননাহার) অঞ্চলের ঐতিহাসিক অবদানের কথা সম্মেলনে বিশেষভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
ইসলামী বিশ্ব শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ICESCO) এবং উজবেকিস্তানের 'সেন্টার অফ ইসলামিক সিভিলাইজেশন'-এর যৌথ উদ্যোগে এই অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হয়।
এই আয়োজনে বিশ্বের ৪০টি দেশ থেকে ৩০০ জনেরও বেশি বক্তাসহ রাজনৈতিক, ধর্মীয় ও একাডেমিক পর্যায়ের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ একত্রিত হয়েছিলেন। অনুষ্ঠানসূচির মধ্যে ছিল বিভিন্ন সম্মেলন অধিবেশন, সহযোগিতা চুক্তি সই, বইয়ের মোড়ক উন্মোচন, জাদুঘর ও ঐতিহাসিক স্থান পরিদর্শন এবং সাংস্কৃতিক ও কূটনৈতিক মেলবন্ধন।
উজবেকিস্তানের প্রেসিডেন্ট শওকত মির্জিওয়েভ-এর স্বাগত বক্তব্যটি তাঁর উপদেষ্টা খায়রিদ্দিন সুলতানোভ পাঠ করেন। সেই বক্তব্যে প্রেসিডেন্ট উচ্চপর্যায়ের এই আন্তর্জাতিক অংশগ্রহণকে স্বাগত জানান এবং উল্লেখ করেন যে, এটি "ইসলামী সভ্যতা এবং এর আধ্যাত্মিক, বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান আগ্রহেরই প্রতিফলন।"
প্রেসিডেন্ট বলেন, "বিশ্ব আজ এক গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা ইসলামের সেই মূল্যবোধগুলোকে সমুন্নত রাখার গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে দেয়—যা মানুষের মর্যাদা, জ্ঞান অন্বেষণ এবং সৃজনশীলতার ওপর জোর দেয়।"
ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি শহরে বিস্তৃত এই সম্মেলনগুলোতে সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানের ইতিহাসের ওপর আলোকপাত করা হয়। বিশেষ করে মাওয়ারাননাহার (যা ঐতিহাসিকভাবে ট্রান্সঅক্সিয়ানা নামেও পরিচিত) এবং বৃহত্তর মধ্য এশিয়া অঞ্চল থেকে বিকশিত হওয়া জ্ঞানচর্চাকে এখানে বিশেষভাবে তুলে ধরা হয়। বহু শতাব্দী ধরে এই অঞ্চলটি ধর্মীয় বিজ্ঞান ও দর্শন, প্রাচীন পাণ্ডুলিপি ঐতিহ্য পর্যালোচনা, প্রত্নতত্ত্ব, জাদুঘর বিজ্ঞান, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, ডিজিটাল রূপান্তর, সাংস্কৃতিক কূটনীতি, এবং গবেষণা ও প্রকাশনার উন্নয়নসহ সমস্ত ক্ষেত্রে সমসাময়িক অবদানের মাধ্যমে ইসলামের প্রসারে এক অমলিন ছাপ রেখে গেছে।
অর্গানাইজেশন অব ইসলামিক কো-অপারেশন (OIC) এই ইভেন্টে পূর্ণ সমর্থন জানায়। এর সহযোগী সংস্থা যেমন IRCICA এবং ICESCO-এর শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এই সম্মেলনে প্রতিনিধিত্ব করেন।
ওআইসি-এর মহাসচিবের পক্ষে রাষ্ট্রদূত তারিগ আলি বাখিত ইসলামি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে এবং ইমাম আল-বুখারি, ইমাম আল-তিরমিজি ও ইবনে সিনার মতো মহান পণ্ডিতদের জন্মভূমি হিসেবে উজবেকিস্তানের ঐতিহাসিক গুরুত্বের ভূয়সী প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন, এ ধরনের আয়োজন "বর্তমান সময়ের ঘৃণা ও মেরুকরণের বক্তব্য" মোকাবিলা করতে সাহায্য করবে। একই সাথে তিনি যুক্তি ও বৈচিত্র্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত ইসলামী সভ্যতার আদর্শকে অনুসরণের গুরুত্বের ওপর জোর দেন।
রাষ্ট্রদূত ঐতিহ্য রক্ষা, শিক্ষা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রসার এবং সহনশীলতা ও শান্তির মূল্যবোধ ছড়িয়ে দিতে আন্তঃসাংস্কৃতিক ও আন্তঃধর্মীয় সংলাপকে উৎসাহিত করার লক্ষ্যে ওআইসি-এর প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেন।
উজবেকিস্তানের ধর্মীয় বিষয়সংক্রান্ত কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী, তাসখন্দে 'তাসখন্দ ঘোষণা' গ্রহণের মাধ্যমে এই সম্মেলন সমাপ্ত হয়। এই ঘোষণাপত্রে ইসলামী সভ্যতার বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক এবং বৈজ্ঞানিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণ, অধ্যয়ন এবং প্রচারের লক্ষ্যে ১০টি বৈশ্বিক উদ্যোগের রূপরেখা দেওয়া হয়েছে।
সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীদের দ্বারা গৃহীত এই ঘোষণাপত্রে, ২০১৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে উজবেক প্রেসিডেন্ট শওকত মির্জিওয়েভের নেওয়া উদ্যোগের প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করা হয়, যেখানে তিনি ইসলামী সভ্যতার মানবিক ঐতিহ্যকে পুনরুজ্জীবিত ও প্রচার করার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
এর পাশাপাশি, ঘোষণাপত্রে উজবেকিস্তানে 'সেন্টার অফ ইসলামিক সিভিলাইজেশন' প্রতিষ্ঠাকে এই ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের একটি মাইলফলক হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে।


