অধ্যাপক ইসমাইল রাজি আল-ফারুকী : যিনি প্রত্যাখ্যানের চিঠিকেও মানবিক করে তুলেছিলেন

পড়তে ১ মিনিট

অধ্যাপক ইসমাইল রাজি আল-ফারুকীর কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন | ছবি : ডেইলি সাবাহ

অধ্যাপক ইসমাইল রাজি আল-ফারুকী আমাকে যে শিক্ষাটি দিয়েছিলেন এবং যা আমার সবচেয়ে বেশি মনে আছে, তা কোনো ক্লাসরুমে দেওয়া হয়নি।

​এটি ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ের কথা, যখন তিনি ফিলাডেলফিয়ার টেম্পল ইউনিভার্সিটিতে আমার শিক্ষক ও একাডেমিক উপদেষ্টা ছিলেন। একই সময়ে, তিনি ভার্জিনিয়া-ভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ ইসলামিক থট (IIIT) প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করছিলেন, যা উচ্চশিক্ষার জন্য বৃত্তির ঘোষণা দিয়েছিল। অধ্যাপক আল-ফারুকী আমাকে পাকিস্তানি ও কাশ্মীরি সংবাদপত্রগুলোতে বিজ্ঞাপন দিতে বলেন, আর তিনি নিজে আরবি প্রকাশনাগুলোতে এই প্রোগ্রামের বিজ্ঞাপন দেন।

​শত শত আবেদন জমা পড়তে লাগল। একদিন তিনি আমাকে তাঁর অফিসে ডাকলেন। তিনি বললেন, “গোলাম, আমি শত শত আবেদন পেয়েছি, যার মধ্যে কাশ্মীর থেকেও বেশ কয়েকটি রয়েছে। তাদের অনেকেই আন্ডারগ্রাজুয়েটের (স্নাতক) শিক্ষার্থী, কিন্তু এই বৃত্তিগুলো কেবল গ্রাজুয়েট (স্নাতকোত্তর) প্রোগ্রামের জন্য। আমাদের দেওয়ার মতো মাত্র পঞ্চাশটি বৃত্তি আছে।”

​এরপর তিনি একটু থামলেন। “আমি এই তরুণ মুসলিম শিক্ষার্থীদের মন ভাঙতে চাই না।” মৃদু হেসে তিনি যোগ করলেন, “আমি যখন তাদের প্রত্যাখ্যানের চিঠি পাঠাব, তখন তাতে এক টন চিনি মিশিয়ে দেব (অর্থাৎ অত্যন্ত মিষ্টি ও সান্ত্বনাদায়ক ভাষায় লিখব)।” এমনই ছিলেন আল-ফারুকী।

​এই সপ্তাহে সেই স্মৃতিটি উজ্জ্বলভাবে ফিরে আসে, যখন ভারতের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন বিশিষ্ট অধ্যাপক ওয়াশিংটনে আমার সাথে দেখা করতে আসেন। অন্যান্য তরুণ গবেষকদের মতোই, তিনিও কেবল অধ্যাপক আল-ফারুকীর বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান সম্পর্কেই নয়, বরং এই ব্যক্তিত্বের নেপথ্যের মানুষটি সম্পর্কেও জানতে চেয়েছিলেন। আমাদের কথোপকথন আমাকে মনে করিয়ে দিলো যে, অনেকেই তাঁর বই এবং চিন্তাভাবনা সম্পর্কে জানলেও, তাঁর অসাধারণ মানবিকতা সম্পর্কে খুব কম মানুষই জানেন।

​অধ্যাপক ইসমাইল রাজি আল-ফারুকীকে উত্তর আমেরিকায় ইসলামি শিক্ষার অন্যতম পথপ্রদর্শক হিসেবে যথাযথভাবেই স্বীকৃতি দেওয়া হয়। তাঁর পাণ্ডিত্য এমন একটি ইসলামি বিশ্ববীক্ষা বা দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করতে চেয়েছিল, যা আধুনিক জ্ঞানের সাথে সম্পৃক্ত হতে সক্ষম এবং একই সাথে নিজস্ব ধর্মীয় ভিত্তির প্রতি বিশ্বস্ত থাকবে। তিনি মুসলমানদের তাদের বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য নিয়ে সমালোচনামূলকভাবে চিন্তা করার আহ্বান জানান এবং অমুসলিমদের বিশ্ব সভ্যতায় ইসলামের অবদানকে মূল্যায়ন করতে উৎসাহিত করেন।

​তবুও, তাঁর সবচেয়ে বড় অমূল্য অবদান হয়তো শুধু তাঁর লেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এটি বেঁচে আছে সেই হাজার হাজার শিক্ষার্থীর মাঝে, যাদের জীবন তিনি বদলে দিয়েছিলেন।

​আল-ফারুকীর কাছে মুসলিম স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (MSA) কেবল একটি ক্যাম্পাস সংগঠন ছিল না। এটি এমন এক 'উম্মাহর' সম্ভাবনার প্রতিনিধিত্ব করত যা জাতীয়তা, জাতিগোষ্ঠী এবং বর্ণকে ছাড়িয়ে যায়। টেম্পল ইউনিভার্সিটিতে, যেখানে ৪০টি দেশের ৩৫০ জনেরও বেশি মুসলিম শিক্ষার্থী একসাথে পড়াশোনা করত, সেখানে তিনি আমাদের জাতীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভাজন প্রত্যাখ্যান করতে এবং পরিবর্তে একটি ঐক্যবদ্ধ সম্প্রদায় গড়ে তোলার তাগিদ দিতেন।

তার দিকনির্দেশনায় টেম্পল বিশ্ববিদ্যালয়ের মুসলিম স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন (এমএসএ) উল্লেখযোগ্যভাবে বিকশিত হয়। তাঁর তত্ত্বাবধানে সংগঠনটির প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সেই নির্বাচনে বর্তমানে মালয়েশিয়ার ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটির রেক্টর অধ্যাপক ওসমান বাকর সভাপতি নির্বাচিত হন এবং আমি সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হই। তিনি আমাদের জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত বক্তৃতার আয়োজন করতে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বৃহত্তর সম্প্রদায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে এবং মুসলিম শিক্ষার্থীরাও যে ক্যাম্পাসজীবনে ইতিবাচক অবদান রাখতে পারে—তা প্রমাণ করতে উৎসাহিত করতেন। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বের ফলে টেম্পল বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএসএ একটি সম্মানিত ও সুপ্রতিষ্ঠিত সংগঠনে পরিণত হয়।

​কয়েক বছর পর, যখন আমি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মুসলিম স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পাই, তখন আমি নিজে প্রত্যক্ষ করেছি যে তাঁর দর্শন কতটা গভীরভাবে শিকড় গেড়েছিল। উত্তর আমেরিকা জুড়ে এমএসএ চ্যাপ্টারগুলো বিমানবন্দরে নতুন আসা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্বাগত জানাত, তাদের বাসস্থান খুঁজে পেতে সাহায্য করত এবং স্বার্থের চেয়ে সেবামূলক মনোভাবের ভিত্তিতে একটি সমাজ গড়ে তুলেছিল। সেই প্রচেষ্টাগুলো আল-ফারুকীর এই বিশ্বাসের প্রতিফলন ছিল যে—পাণ্ডিত্য এবং চরিত্র সবসময় একসাথে চলা উচিত।

​তাঁর বাড়িটি ছিল তাঁর ক্লাসরুমেরই একটি বর্ধিত অংশ। তাঁর স্ত্রী ড. লামিয়া আল-ফারুকীকে সাথে নিয়ে তিনি নিয়মিত শিক্ষার্থীদের নিজেদের বাড়িতে স্বাগত জানাতেন। তাঁদের নৈশভোজ এবং পিকনিকগুলো ছিল কিংবদন্তিতুল্য—কেবল প্রচুর খাবারের জন্যই নয়, বরং প্রতিটি অতিথির সাথে তাঁরা যে আন্তরিকতা ভাগ করে নিতেন তার জন্য। তাঁদের কাছে আতিথেয়তা কোনো সামাজিক সৌজন্য ছিল না; এটি ছিল ঈমানের বহিঃপ্রকাশ।

​আইআইআইটি (IIIT)-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ড. আহমেদ তোতোনজি একবার মন্তব্য করেছিলেন যে, আল-ফারুকী “আপনার কথা এমনভাবে শুনতেন যেন আপনিই তাঁর শিক্ষক।” সেই বিনয়ই ব্যাখ্যা করে যে কেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম শিক্ষার্থীরা তাঁর বুদ্ধিমত্তার পাশাপাশি তাঁর চরিত্রের জন্য তাঁকে এতটা শ্রদ্ধা করত।

​তাঁর প্রভাব টেম্পল ইউনিভার্সিটির বাইরেও অনেক দূর ছড়িয়ে পড়েছিল। অধ্যাপক ইমতিয়াজ ইউসুফ, অধ্যাপক ওসমান বকর, অধ্যাপক মো. সালেহ ইয়াপার এবং অধ্যাপক জন এল. এস্পোসিটোর মতো বিশিষ্ট পণ্ডিতেরা সবাই তাঁদের বুদ্ধিবৃত্তিক যাত্রায় এবং বিশ্বজুড়ে ইসলামি শিক্ষার বিকাশে তাঁর গভীর প্রভাবের কথা স্বীকার করেছেন।

​অধ্যাপক এস্পোসিটো, যিনি ২০২৬ সালের ১৫ জুলাই ইন্তেকাল করেছেন, তিনি তাঁর একটি বক্তৃতায় বলেছিলেন, “অধ্যাপক আল-ফারুকী সংলাপে গভীরভাবে বিশ্বাস করতেন। তিনি মুসলমান, খ্রিস্টান এবং ইহুদিদের মধ্যে অর্থপূর্ণ সম্পৃক্ততাকে কোনো আপস হিসেবে নয়, বরং একটি বুদ্ধিবৃত্তিক এবং নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে দেখতেন। এমন একটি সময়ে যখন ধর্মীয় মেরুকরণ উন্মুক্ত বক্তৃতাগুলোকে শাসন করছে, তখন সম্মানজনক কথোপকথনের প্রতি তাঁর প্রতিশ্রুতি অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছে।”

​আইআইইউএম (IIUM)-এর রেক্টর অধ্যাপক ওসমান বকর ইসলাম ও অন্যান্য ধর্মের মধ্যে সংলাপ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে আল-ফারুকীর প্রচেষ্টার উচ্চ প্রশংসা করতেন। আধুনিক জ্ঞানের সাথে ইসলামি শিক্ষার সমন্বয় সাধনে তাঁর ভূমিকার কদর করেন তিনি। ওসমান বকরের কাছে আল-ফারুকী ছিলেন ইসলামি বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবনের একজন কেন্দ্রীয় ব্যক্তিত্ব।

​তাঁর অন্যতম ছাত্র অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ ইউসুফ অধ্যাপক আল-ফারুকীকে “একজন বুদ্ধিবৃত্তিক মুজাহিদ, একজন উজ্জ্বল মানুষ যিনি ইসলামের চলন্ত এনসাইক্লোপিডিয়া বা বিশ্বকোষ ছিলেন এবং ধর্মের একাডেমিক অধ্যয়নের পথপ্রদর্শক” হিসেবে অভিহিত করেছেন। আবেগপূর্ণভাবে বলতে গিয়ে অধ্যাপক ইমতিয়াজ বলেন যে, অধ্যাপক আল-ফারুকী ইসলামের একাডেমিক অধ্যয়ন, ধর্মের ইতিহাস ও ফেনোমেনোলজি এবং আন্তঃধর্মীয় সংলাপের মতো বিস্তৃত ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

১৯৮৬ সালে অধ্যাপক আল-ফারুকী এবং ড. লামিয়া আল-ফারুকীর মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ড দুটি অসাধারণ জীবনের আকস্মিক সমাপ্তি ঘটায়। কিন্তু তাঁদের প্রভাব সেদিন শেষ হয়ে যায়নি। এটি ক্লাসরুম, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং সর্বোপরি, যাঁদের তাঁরা অনুপ্রাণিত করেছিলেন তাঁদের জীবনের মাধ্যমে আজও অব্যাহত রয়েছে।

​আজ যখন আমি অধ্যাপক আল-ফারুকীর কথা ভাবি, তখন আমার তাঁর লেখা বহু বই বা তাঁর আন্তর্জাতিক খ্যাতির কথা মনে পড়ে না। আমার মনে পড়ে এমন একজন শিক্ষকের কথা, যিনি বৃত্তি না পাওয়া ব্যর্থ আবেদনকারীদের অনুভূতি নিয়ে চিন্তিত ছিলেন এবং এমনকি তাঁর প্রত্যাখ্যানের চিঠিতেও “এক টন চিনি” মিশিয়ে দিতে চেয়েছিলেন।

​যে যুগে দয়ার চেয়ে মেধার জয়গান বেশি গাওয়া হয়, সেখানে এটিই হয়তো আমাদের জন্য তাঁর রেখে যাওয়া সবচেয়ে স্থায়ী শিক্ষা।

মহান ​আল্লাহ আল-ফারুকী দম্পতির আত্মাকে জান্নাতুল ফিরদাউসে স্থান দিন! আমিন।


লেখক : ​ড. ফাই ওয়ার্ল্ড কাশ্মীর অ্যাওয়ারনেস ফোরামের সাধারণ সম্পাদক। 


[তথ্যসূত্র ও ছবি : ডেইলি সাবাহ]

এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন