মানবিকতা, গণমাধ্যম এবং উম্মাহর ভবিষ্যৎ : সম্মিলিত পুনর্জাগরণের রূপরেখা

পড়তে ১ মিনিট

আল-উম্মাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান জাকির হোসেন; তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগানের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ইয়াসিন আকতাই; বাংলাদেশের তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী এম জহির উদ্দিন স্বপন; বাংলাদেশের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক ধর্মবিষয়ক উপদেষ্টা ড. এ এফ এম খালিদ হোসেন এবং অন্যরা। (বাঁ থেকে) | ছবি : আল উম্মাহ ফাউন্ডেশন


মুসলিম বিশ্ব আজ এক ক্রান্তিকাল অতিক্রম করছে। এই মুহূর্তে আমাদের সভ্যতার মূল তিন মিশন—মানবিক সেবা, জ্ঞান উৎপাদন এবং দায়িত্বশীল যোগাযোগের সমন্বয় ঘটাতে পারে এমন দূরদর্শী প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয়তা আজ সবচেয়ে বেশি।

এমন এক যুগে যখন মুসলিম বিশ্ব অভূতপূর্ব সব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করছে, ঠিক তখনই অসাধারণ কিছু সুযোগও আমাদের হাতের মুঠোয় আসছে। এই সময়ে কেবল আনুষ্ঠানিক সম্মেলন বা বৈঠকের গণ্ডি পেরিয়ে এমন সব প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা অত্যন্ত জরুরি, যা আমাদের দায়িত্ব পুনর্বিবেচনা, পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদার এবং সম্মিলিত দৃষ্টিভঙ্গি পুনর্গঠনে ভূমিকা রাখবে। আল-উম্মাহ ফাউন্ডেশন অত্যন্ত অর্থপূর্ণ এক প্ল্যাটফর্মে জ্ঞান ও চিন্তার মেলবন্ধন ঘটিয়েছে, যা যেকোনো একক রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের সীমানা ছাড়িয়ে পারস্পরিক সংলাপের এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।

আমি বাংলাদেশের জনগণ ও সরকারের প্রতি আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। বাংলাদেশ এমন একটি দেশ, যা অসাধারণ সহনশীলতা, মানবিক প্রতিশ্রুতি, সামাজিক গতিশীলতা এবং নৈতিক নেতৃত্বের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। সমকালীন মুসলিম বিশ্বে খুব কম দেশই রয়েছে, যারা পরম ধৈর্য, সামাজিক সংহতি এবং ভবিষ্যতের প্রতি অবিচল আস্থা রেখে এমন গভীর প্রতিকূলতা জয় করতে পেরেছে। বাংলাদেশ আজ প্রমাণ করেছে যে, কীভাবে সম্মিলিত সংকল্পের মাধ্যমে যেকোনো কঠিন চ্যালেঞ্জকে সম্ভাবনায় রূপান্তর করা যায়।

মুসলিম বিশ্ব আজ এক কঠিন ক্রান্তিলগ্নে দাঁড়িয়ে। আমাদের সভ্যতার তিন মূল ভিত্তি—মানবিক সেবা, জ্ঞান সৃষ্টি এবং দায়িত্বশীল যোগাযোগকে একসূত্রে বাঁধতে পারে, এমন রূপান্তরকামী প্রতিষ্ঠানের আজ বড় বেশি প্রয়োজন।

আল-উম্মাহ ফাউন্ডেশনের মধ্যে এই পরিবর্তনের নেতৃত্ব দেওয়ার এবং এই গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর মধ্যে সেতু গড়ে তোলার এক বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। আমাদের মুসলিম বিশ্বে রয়েছে বিশাল মানবসম্পদ, সমৃদ্ধ সভ্যতা, গভীর বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্য এবং শক্তিশালী আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ। আমাদের আসলে যোগ্যতার অভাব নেই, অভাব রয়েছে সমন্বয়ের; সম্ভাবনার অভাব নেই, অভাব রয়েছে সুসংগঠিত কাঠামোর; সহমর্মিতার অভাব নেই, অভাব রয়েছে সেই সহমর্মিতাকে সম্মিলিত কর্মে রূপ দেওয়ার কার্যকরী ব্যবস্থার। আমাদের আসল চ্যালেঞ্জ হলো এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যা হৃদয় ও মস্তিষ্কের, আদর্শ ও কর্মের এবং স্থানীয় উদ্যোগের সাথে বৈশ্বিক প্রভাবের চমৎকার মেলবন্ধন ঘটাবে।

গণমাধ্যম ও সত্যের সংগ্রাম

বর্তমান সময়ে তথ্য হয়ে উঠেছে ক্ষমতার অন্যতম প্রধান উৎস। অথচ অতীতে ক্ষমতা বা আধিপত্য পরিমাপ করা হতো মূলত সামরিক শক্তি, ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ বা অর্থনৈতিক সম্পদের মাপকাঠিতে। আজ বয়ান বা ন্যারেটিভই বাস্তবতাকে রূপ দেয়, মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি প্রভাবিত করে আন্তর্জাতিক নীতিকে, আর কোনো ট্র্যাজেডি বা মানবিক সংকট বিশ্ববাসীর নজরে আসবে আর কোনটি ধামাচাপা পড়ে থাকবে—তা নির্ধারণ করে দেয় প্রচার মাধ্যমের গল্পগুলোই। মুসলিম বিশ্ব প্রায়ই কেবল রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জেরই মুখোমুখি হয় না, বরং বয়ান বা ন্যারেটিভের লড়াইয়েও পিছিয়ে থাকে। আমাদের বাস্তবতাগুলো অনেক সময়ই অন্যের চোখ দিয়ে উপস্থাপিত হয়, আমাদের কণ্ঠস্বরগুলো আটকা পড়ে যায় বিদেশি কাঠামোর ছাঁকনিতে, আর আমাদের অভিজ্ঞতাগুলো ভুলভাবে উপস্থাপিত, অতিসরলীকৃত কিংবা পুরোপুরি উপেক্ষিত হয়।

এই সমস্যাটি কেবল জনসংযোগের নয়, বরং এটি সরাসরি ন্যায়বিচারের সাথে জড়িত। কারণ ন্যায়বিচারের ভিত্তি হলো সত্য, আর সত্যের জন্য প্রয়োজন সঠিক উপস্থাপন। আমরা এমন এক যুগে বাস করছি যেখানে সত্যের চেয়ে মিথ্যা বা ভুল তথ্য দ্রুত ছড়ায়; যেখানে ডিজিটাল প্রযুক্তি সাধারণ মানুষের হাতে যোগাযোগের ক্ষমতা তুলে দেওয়ার পাশাপাশি অপপ্রচারের নতুন নতুন চোরাবালিও তৈরি করেছে। যে সামাজিক প্ল্যাটফর্মগুলো সাধারণ নাগরিককে শক্তিশালী করতে পারত, সেগুলোই আবার সমাজকে মেরুকরণ করছে; যে নেটওয়ার্ক মানবজাতিকে যুক্ত করতে পারত, তা-ই আবার ছড়াচ্ছে ঘৃণা ও বিকৃতি।

আজ গণমাধ্যমের কাঁধে এক বিশাল দায়িত্ব। এটি জনমত গঠন করে, আন্তর্জাতিক নীতি নির্ধারণী আলোচনাকে প্রভাবিত করে, মানবিক সাড়া জাগিয়ে তোলে এবং সাংস্কৃতিক মেলবন্ধন বা ভুল বোঝাবুঝি তৈরি করে। মুসলিম সংবাদ মাধ্যমগুলোর সামনে এই চ্যালেঞ্জটি অত্যন্ত গভীর। আমাদের কেবল প্রতিক্রিয়াশীল (reactive) হলে চলবে না, বরং সক্রিয় ও দূরদর্শী (proactive) কৌশল গ্রহণ করতে হবে। আমাদের এমন সাংবাদিকতা তৈরি করতে হবে যা নির্ভরযোগ্য, পেশাদার, তথ্যভিত্তিক এবং নৈতিকভাবে সুদৃঢ়। আমাদের যেকোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের ঊর্ধ্বে উঠে প্রোপাগান্ডা ও সস্তা উত্তেজনা সৃষ্টির প্রবণতা প্রতিহত করতে হবে এবং মানুষের মর্যাদা রক্ষা করতে হবে। আমাদের কেবল দুঃখ-কষ্টের চিত্রই নয়, বরং মানুষের সহনশীলতা, সংকট উত্তরণের গল্প, সাফল্য এবং চমৎকার সব সমাধানের কথাও বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরতে হবে।

দীর্ঘকাল ধরে মুসলিম সমাজের গল্প মানেই যুদ্ধ, সহিংসতা, অস্থিতিশীলতা আর সংকটের আখ্যান। অথচ আমাদের সমাজেও প্রতিনিয়ত তৈরি হচ্ছেন বিশ্বমানের বিজ্ঞানী, উদ্ভাবক, উদ্যোক্তা, শিল্পী, শিক্ষাবিদ ও মানবসেবীরা। এই ইতিবাচক গল্পগুলো বিশ্বমঞ্চে আসা প্রয়োজন, এগুলোর জন্য বৈশ্বিক দর্শক-শ্রোতা তৈরি করা দরকার। গণমাধ্যম এখন আর কেবল যোগাযোগের মাধ্যম নয়, এটি প্রভাব বিস্তারের, আত্মপরিচয় গঠনের এবং সামাজিক পরিবর্তনের এক শক্তিশালী হাতিয়ার। যারা বয়ান বা ন্যারেটিভ নিয়ন্ত্রণ করে, মূলত তারাই ভবিষ্যৎ গড়ে তোলে।

আল-উম্মাহ প্ল্যাটফর্মের গুরুত্ব

এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় আল-উম্মাহ মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম-এর রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা। মুসলিম বিশ্বের কেবল সংখ্যাগতভাবে বেশি গণমাধ্যমের প্রয়োজন নেই, বরং প্রয়োজন গুণগতভাবে উন্নত ও রুচিশীল মাধ্যমের—এমন প্রতিষ্ঠানের, যা পেশাদারিত্বের পাশাপাশি নৈতিক দায়িত্ববোধের পরিচয় দেবে। এই প্ল্যাটফর্মটি হতে পারে মানবিক সংকটের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর, মুসলিম সমাজগুলোর সংযোগ সেতু, তরুণ বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, গবেষক ও উদ্ভাবকদের কণ্ঠস্বর জোরালো করার মাধ্যম এবং ডিজিটাল জ্ঞান উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র। সর্বোপরি, এটি এমন এক ক্ষেত্র হতে পারে যেখানে প্রজ্ঞা ও দায়িত্বশীলতার সাথে সত্যের প্রকাশ ঘটবে।

এই প্ল্যাটফর্মের লক্ষ্য কেবল সংবাদ পরিবেশনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়, বরং সচেতন নাগরিক ও দায়িত্বশীল সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখা উচিত। জ্ঞান উৎপাদনকে এর মূল ভাবনায় স্থান দিতে হবে; গবেষণা প্রতিবেদন, ডিজিটাল প্রকাশনা, শিক্ষামূলক কনটেন্ট, অনলাইন সেমিনার, পডকাস্ট এবং বিশ্লেষণধর্মী আলোচনার মাধ্যমে মুসলিম বিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। একই সাথে, মানবিক সহায়তার পক্ষে আওয়াজ তোলাকেও একটি প্রধান ভিত্তি হিসেবে বজায় রাখতে হবে। শরণার্থী, যুদ্ধবিধ্বস্ত মানুষ এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর যন্ত্রণার কথা নিয়মমাফিকভাবে নথিবদ্ধ করে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরতে হবে। তাদের জীবনের গল্প যেন কেবল পরিসংখ্যানের পাতায় হারিয়ে না যায়; মানুষের কষ্টকে মানুষের আবেগ দিয়েই অনুভব করাতে হবে।

তরুণদের ক্ষমতায়নে এই প্ল্যাটফর্মের বড় ধরনের বিনিয়োগ করা উচিত, কারণ বিশ্বজুড়ে তরুণদের এক বিশাল অংশই মুসলিম। এই জনমিতিক বা ডেমোগ্রাফিক বাস্তবতা আমাদের জন্য এক বিশাল সুযোগ অথবা এক বিরাট চ্যালেঞ্জ—তা নির্ভর করছে আমরা কীভাবে তাদের গড়ে তুলছি তার ওপর। তরুণদের নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা, মিডিয়া সচেতনতা, ডিজিটাল দক্ষতা এবং উদ্যোক্তা হওয়ার মনোভাব গড়ে তোলার জন্য প্রশিক্ষণ, মেন্টরশিপ ও উপযুক্ত প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজন। যে প্রজন্ম কেবল তথ্য বা জ্ঞান ভোগ করবে না, বরং নতুন জ্ঞান উৎপাদন করবে—তারাই বদলে দেবে আমাদের ভবিষ্যৎ। সবশেষে, এই প্ল্যাটফর্মটিকে বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, থিঙ্ক ট্যাংক, গবেষণা কেন্দ্র এবং সংবাদমাধ্যমের সাথে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে। মনে রাখতে হবে, ভবিষ্যৎ কোনো একক বিচ্ছিন্ন প্রতিষ্ঠানের নয়, বরং শক্তিশালী নেটওয়ার্কের। ডিজিটাল যুগে যে প্রতিষ্ঠানগুলো জ্ঞান সৃষ্টি করবে এবং সত্যের পক্ষে লড়বে, সমাজ পরিবর্তনের চাবিকাঠি থাকবে তাদের হাতেই।

বাংলাদেশ ও তুরস্ক: একটি কৌশলগত সম্পর্ক

বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যকার সম্পর্ক কেবল দুটি রাষ্ট্রের মধ্যকার আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়; এর শিকড় প্রোথিত রয়েছে ইতিহাস, সংস্কৃতি, ঐতিহাসিক স্মৃতি এবং অভিন্ন প্রত্যাশার গভীরে। তুর্কি জনগণ বাংলাদেশকে কেবল একটি বন্ধুভাবাপন্ন রাষ্ট্র হিসেবে দেখে না, বরং তাদের ঐতিহাসিক স্মৃতিতে বাংলাদেশের একটি অত্যন্ত বিশেষ স্থান রয়েছে। আনাতোলিয়া যখন দখলদারদের কবলে ছিল এবং আমাদের জাতি যখন অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে লড়ছিল, তখন হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে বসবাসকারী ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিমরা অত্যন্ত সীমিত সামর্থ্য সত্ত্বেও বড় ধরনের আত্মত্যাগের মাধ্যমে তুরস্কের স্বাধীনতা যুদ্ধকে সমর্থন জুগিয়েছিল। সেই নৈতিক সমর্থনের তাৎপর্য বস্তুগত মূল্যের চেয়ে বহুগুণ বেশি ছিল। এটি প্রমাণ করেছিল যে আমরা একা নই এবং মুসলিম উম্মাহর হৃদস্পন্দন আনাতোলিয়ার সাথেই স্পন্দিত হচ্ছিল। এক শতাব্দী পরেও এই কৃতজ্ঞতা তুরস্কের মানুষ ভোলেনি।

আজ বাংলাদেশে দাঁড়িয়ে আমাদের একটুও মনে হয় না যে আমরা কোনো ভিনদেশে আছি; বরং মনে হয় আমরা আমাদের ভাই-বোনদের মাঝেই আছি, যাদের সাথে আমরা ইতিহাসজুড়ে আনন্দ ও বেদনা ভাগাভাগি করেছি। আমাদের ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সবচেয়ে মজবুত ভিত্তি হবে এই অভিন্ন ইতিহাস, ভ্রাতৃত্ববোধ এবং পারস্পরিক আনুগত্যের চেতনা। আধুনিক ইতিহাসে উভয় দেশই গভীর সংগ্রাম দেখেছে, মর্যাদা, উন্নয়ন ও স্বাধীনতার সন্ধান করেছে, প্রতিকূলতার মুখে ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং মুসলিম বিশ্বে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করেছে।

উচ্চপর্যায়ের সফর, প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা, শিক্ষা বিনিময় এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সম্পর্কের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও তুরস্কের সম্পর্ক প্রতিনিয়ত জোরদার হচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে, উভয় দেশই ওআইসি (OIC)-র মতো আন্তর্জাতিক সংস্থায় একসঙ্গে কাজ করে; বিশেষ করে মানবিক বিষয়, উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ, শান্তি, ন্যায়বিচার এবং মানবাধিকার রক্ষায় দুই দেশের ভাবনা অত্যন্ত কাছাকাছি। সাংস্কৃতিক দিক থেকেও দুই দেশের মানুষের মাঝে চমৎকার মিল রয়েছে। শিক্ষা বিনিময় ও একাডেমিক সহযোগিতা দিন দিন বাড়ছে, আর পর্যটন ও সাংস্কৃতিক কূটনীতি পারস্পরিক বোঝাপড়ার নতুন পথ খুলে দিচ্ছে।

বাণিজ্য সম্পর্ক বাড়লেও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এখনো অনেক বড় বড় সম্ভাবনা অব্যবহৃত রয়ে গেছে। টেক্সটাইল, অবকাঠামো, নির্মাণ খাত, ম্যানুফ্যাকচারিং, তথ্যপ্রযুক্তি এবং জ্বালানি খাতে সহযোগিতার বিপুল সুযোগ রয়েছে। উভয় দেশেরই রয়েছে অত্যন্ত গতিশীল বেসরকারি খাত, যা পারস্পরিক লাভজনক অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে পারে। কৌশলগত দিক থেকে, প্রতিরক্ষা খাতে সহযোগিতা অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে তুরস্কের অগ্রগতি এবং বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান কৌশলগত সক্ষমতার মেলবন্ধন এক গঠনমূলক সহযোগিতার পথ উন্মুক্ত করতে পারে। একইভাবে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, জাতিসংঘ শান্তি রক্ষা মিশন, মানবিক লজিস্টিকস এবং জরুরি সাড়াদানের ক্ষেত্রেও দুই দেশের যৌথ কাজ আমাদের সক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করবে।

তবে সহযোগিতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটি লুকিয়ে আছে ভাবনার জগতে। মুসলিম বিশ্বের শুধু শক্তিশালী অর্থনীতিরই প্রয়োজন নেই, প্রয়োজন আরও জোরালো বুদ্ধিবৃত্তিক সংযোগ, শিক্ষামূলক অংশীদারিত্ব, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং মিডিয়া সহযোগিতা। বাংলাদেশ ও তুরস্ক এই উদ্যোগে বড় অবদান রাখতে পারে। আমরা এমন এক স্কলার, সাংবাদিক, গবেষক, উদ্যোক্তা এবং সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে পারি, যারা সমকালীন চ্যালেঞ্জগুলোর উদ্ভাবনী সমাধান খুঁজে বের করতে সক্ষম হবেন। তাই আমাদের সম্পর্কের ভবিষ্যৎ কেবল সরকারগুলোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ, বিশ্ববিদ্যালয়, ফাউন্ডেশন এবং জনগণের সাথে জনগণের (people-to-people) যোগাযোগের ওপর গড়ে তোলা উচিত। কারণ চূড়ান্ত বিচারে, রাষ্ট্রের চেয়ে সমাজের গভীর সম্পর্কই সবচেয়ে টেকসই হয়।

একটি যৌথ ভবিষ্যৎ বিনির্মাণ

পৃথিবী আজ এক গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রযুক্তিগত বিপ্লব বদলে দিচ্ছে অর্থনীতিকে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) পাল্টে দিচ্ছে যোগাযোগের ধারা। জলবায়ু পরিবর্তন তৈরি করছে নিত্যনতুন সংকট। অন্যদিকে ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বিশ্বকে অস্থিতিশীল করে রাখছে। এর মাঝেই অনেক সমাজ বিশ্বাস, পরিচয় এবং সামাজিক সংহতির সংকটে ভুগছে। মুসলিম বিশ্ব এই পরিবর্তনের বাইরে নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রেই আমরা এই বৈশ্বিক রূপান্তরের কেন্দ্রবিন্দুতে অবস্থান করছি।

এই বাস্তবতায় আমাদের এমন এক নতুন প্রজন্মের নেতৃত্ব প্রয়োজন, যারা নৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সাথে বাস্তব কাজের দক্ষতার সমন্বয় ঘটাতে পারবেন; যারা ঐতিহ্য ও আধুনিকতা—উভয়কেই বুঝবেন; বিভেদ না বাড়িয়ে গড়ে তুলবেন মিলনের সেতু এবং ক্ষমতার মতোই গুরুত্ব দেবেন জ্ঞানকে। অতীতমুখী নস্টালজিয়া কিংবা অন্ধ অনুকরণ দিয়ে ভবিষ্যৎ গড়া যায় না। এর জন্য প্রয়োজন সৃজনশীলতা, আত্মবিশ্বাস এবং মজবুত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো। আর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন আশা—যা কেবল একটি নিষ্ক্রিয় অনুভূতি নয়, বরং বর্তমানের সমস্ত কঠিন পরিস্থিতির মাঝে দাঁড়িয়ে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার এক সক্রিয় অঙ্গীকার।

মুসলিম সভ্যতার ইতিহাস আমাদের শেখায় যে, পতন বা অবক্ষয়ের সময় কখনোই স্থায়ী হয় না। সভ্যতার প্রতিটি পুনর্জাগরণ শুরু হয় নতুন ভাবনা দিয়ে, প্রতিটি রূপান্তর ঘটে মানুষের হাত ধরে এবং প্রতিটি ইতিবাচক পরিবর্তন আসে নিজের মূল্যবোধ ও যোগ্যতার ওপর গভীর আত্মবিশ্বাস থেকে। প্রশ্ন এটি নয় যে, মুসলিম বিশ্বের ঘুরে দাঁড়ানোর মতো সম্পদ আছে কি না—অবশ্যই তা আছে। আসল প্রশ্ন হলো, আমরা সেই সম্পদগুলোকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারছি কি না; মূল্যবোধকে বাস্তবে রূপ দিতে পারে এমন প্রতিষ্ঠান আমরা গড়তে পারছি কি না; এবং আমাদের সহমর্মিতাকে রাষ্ট্রীয় নীতিতে, জ্ঞানকে টেকসই উন্নয়নে এবং বিশ্বাসকে গঠনমূলক সামাজিক উদ্যোগে রূপান্তর করতে পারছি কি না।

লেখক : তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়্যেব এরদোগানের সাবেক উপদেষ্টা

লেখক সম্পর্কে

শিক্ষাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক চিন্তাবিদ

এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন