ফিলিস্তিনের পক্ষে স্লোগান দেওয়া ম্যাকলেমোরের সমর্থনে এড শিরানের মার্কিন ট্যুর ছাড়লেন সহশিল্পীরা
লেখক:
ম্যাকলমোরের পাশে ব্রিটিশ সংগীতশিল্পী এড শিরান | ছবি : সংগৃহীত
মার্কিন র্যাপার ম্যাকলেমোর-কে মঞ্চে ফিলিস্তিনপন্থী মন্তব্য করার কারণে লাইনআপ থেকে বাদ দেওয়ার পর ব্রিটিশ গায়ক এড শিরান-এর মার্কিন সফরের বাকি সব সহশিল্পীরা সফর ছেড়ে দিয়েছে। এর ফলে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকায় চলমান এড শিরানের কনসার্ট সফর নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
এড শিরান সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ম্যাকলেমোরকে সফর থেকে বাদ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, সিদ্ধান্তটি তাঁর নয়, সফরের প্রমোটারদের। তাঁর এই বক্তব্য প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই আইরিশ শিল্পী অ্যারন রো, আইরিশ ফোক ব্যান্ড বিওগা, ড্যানিশ ব্যান্ড লুকাস গ্রাহাম এবং মার্কিন সংগীতশিল্পী ফিনিয়াস সফর থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন।
অ্যারন রো ও লুকাস গ্রাহামের যুক্তরাষ্ট্রে শিরানের বাকি কনসার্টগুলোতে ম্যাকলেমোরের পরিবর্তে পারফর্ম করার কথা ছিল। অন্যদিকে বিওগা শিরানের প্রতিটি পরিবেশনার মধ্যবর্তী সময়ে কয়েকটি গান পরিবেশন করছিল। বিলি আইলিশের ভাই ও সংগীত সহযোগী ফিনিয়াস চলতি বছরের শেষ দিকে দক্ষিণ আমেরিকা সফরে শিরানের সঙ্গে পারফর্ম করার কথা ছিল।
ফিনিয়াস ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, নিপীড়িত মানুষের পক্ষে কথা বলার সময় শিল্পীদের কণ্ঠ রোধ করা উচিত নয়। তিনি ফিলিস্তিন ও ফিলিস্তিনি জনগণের প্রতি সমর্থন জানিয়ে এড শিরানের সঙ্গে তাঁর আসন্ন সফরের তারিখগুলো থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তের কথা জানান।
বিওগা ও অ্যারন রো নিজেদের আইরিশ পরিচয় এবং আয়ারল্যান্ডের ঔপনিবেশিক ইতিহাসের প্রসঙ্গ তুলে ম্যাকলেমোরের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। ‘আইরিশ আর্টিস্টস ফর প্যালেস্টাইন’ আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য বিওগা জানায়, উপনিবেশবাদের অভিজ্ঞতা থেকে তারা ন্যায়বিচারের বিষয়ে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং ভবিষ্যতেও সেই অবস্থান অব্যাহত রাখবে।
অ্যারন রো এড শিরানকে বন্ধু এবং তাঁর জীবনে পরিবর্তন আনা একজন ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করলেও ম্যাকলেমোরের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। তাঁর বক্তব্যে আইরিশদের ঔপনিবেশিকতা, দুর্ভিক্ষ ও দখলদারিত্বের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার কথা উঠে আসে। তিনি বলেন, অর্থ ও ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিরা তাদের অবস্থান ব্যবহার করে ন্যায্য কণ্ঠস্বরকে চেপে দিতে পারেন না।
লুকাস গ্রাহামও সফর থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্তকে কঠিন বলে উল্লেখ করে এড শিরানের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে। ব্যান্ডটির বক্তব্য, অর্থের পরিমাণ কাউকে কথোপকথন নিয়ন্ত্রণ করার অধিকার দেয় না এবং কে কথা বলতে পারবে বা কার দুর্ভোগ স্বীকার করা হবে, তা কারও আর্থিক অবস্থান দিয়ে নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়।
গত ৫ সেপ্টেম্বর নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে নিজের প্রতিবাদী গান ‘হিন্ডস হল’ পরিবেশনের সময় ‘ফ্রি প্যালেস্টাইন’ স্লোগান দেন ম্যাকলেমোর। এরপর তাঁকে এড শিরানের ‘লুপ সফর’ থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এড শিরান বলেন, ম্যাকলেমোরকে সফর থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণভাবে প্রমোটারদের এবং এতে তাঁর কোনো ভূমিকা নেই।
শিরান বলেন, পরিকল্পনা করে রাখা কনসার্টে অংশ নেওয়া ভক্তদের হতাশ করতে চান না। একই সঙ্গে সফরের সঙ্গে যুক্ত কর্মী, সহযোগী শিল্পী ও সংগীতশিল্পীদের জীবিকাও অনিশ্চয়তার মধ্যে ফেলতে চান না।
ম্যাকলেমোরের প্রতি সম্মান জানিয়ে শিরান বলেন, নিজের বিশ্বাসের পক্ষে দাঁড়ানো এবং জোরালো কণ্ঠে কথা বলার ক্ষেত্রে তাঁর দৃঢ়তাকে তিনি সম্মান করেন। তবে শান্তির লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য একাধিক পথ থাকতে পারে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। নিজের খ্যাতি ও মঞ্চকে পারস্পরিক কূটনীতি এবং উন্মুক্ত আলোচনার জন্য নিরাপদ জায়গা হিসেবে ব্যবহার করতে চান বলে জানান শিরান।
ম্যাকলেমোরের দাবি, এনএফএলের নিউ ইংল্যান্ড প্যাট্রিয়টসের মালিক রবার্ট ক্রাফটের উদ্যোগের পর কয়েকটি মার্কিন ভেন্যু ও প্রমোটার শিরানের উদ্বোধনী শিল্পী হিসেবে তাঁকে পারফর্ম করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ক্রাফটের মালিকানাধীন গিলেট স্টেডিয়ামও এর মধ্যে রয়েছে বলে ম্যাকলেমোর দাবি করেন।
সোমবার দেওয়া এক বিবৃতিতে ক্রাফট বলেন, ম্যাকলেমোরের সাম্প্রতিক মন্তব্য এবং ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতি অপমানজনক বলে তিনি যে বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন, সেগুলোর কারণেই তাকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে ম্যাকলেমোরের প্রতি সংহতি জানিয়ে শিল্পীদের সফর থেকে সরে দাঁড়ানোর বিষয়ে ক্রাফটের প্রতিনিধিরা তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি।
১০টি কনসার্ট নিয়ে গঠিত এই স্টেডিয়াম সফরের আটটিতে ম্যাকলেমোরের পারফর্ম করার কথা ছিল। আগামী শনিবার ফিলাডেলফিয়ায় এ সফর আবার শুরু হওয়ার কথা রয়েছে।
এদিকে ‘গেম অব থ্রোনস’খ্যাত আইরিশ অভিনেতা ও দীর্ঘদিনের ফিলিস্তিনপন্থী কর্মী লিয়াম কানিংহাম সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ম্যাকলেমোরকে বাদ দেওয়ার ঘটনায় এড শিরানের সমালোচনা করেছেন। তিনি শিরানের নিরপেক্ষতার অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এবং গাজায় চলমান যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে নিরপেক্ষ থাকার দাবি নিয়েও মন্তব্য করেন।
ম্যাকলেমোরকে সফর থেকে বাদ দেওয়া, পরবর্তী সময়ে শিরানের বক্তব্য এবং একাধিক শিল্পীর সফর থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘটনায় সংগীতাঙ্গনে ফিলিস্তিন ইস্যুতে শিল্পীদের অবস্থান ও শিল্পের স্বাধীনতা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।



