ডিজিটাল যুগে শিশুদের সুরক্ষা: বাংলাদেশে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধের পক্ষে যুক্তি

পড়তে ১ মিনিট

ডিজিটাল যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাব থেকে শৈশবকে সুরক্ষিত রাখা এখন আর শুধু অভিভাবকের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রীয় নীতি এবং সরকারের দায়িত্বের বিষয়।

নিঃসন্দেহে, সমসাময়িক বিশ্বে স্মার্টফোন শৈশবকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিতকারী প্রযুক্তিগুলোর একটি হয়ে উঠেছে। আমাদের শিশুদের ইন্টারনেটে ক্ষতিকর নয়—এমন সব কনটেন্টে পূর্ণাঙ্গ প্রবেশাধিকার থাকা উচিত। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম শিক্ষা, যোগাযোগ ও বিনোদনের সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অবাধ প্রবেশ শিশুদের সাইবার বুলিং, যৌন শোষণ, ভুল তথ্য, আসক্তিকর অ্যালগরিদম, জুয়া, মাদকাসক্তির ক্ষতিকর প্রচার, সহিংস ও ভয়াবহ কনটেন্ট এবং এমন অপরিচিত ব্যক্তিদের সংস্পর্শে নিয়ে যেতে পারে, যারা তাদের প্রভাবিত বা নির্যাতনের চেষ্টা করতে পারে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রশ্নটি এখন আর শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহার করা উচিত কি না, সেটি নয়। তাদের ইন্টারনেট ব্যবহার করা উচিত—এবং করতেই হবে। কারণ আধুনিক বিশ্বে শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের জন্য ডিজিটাল দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বরং গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের কি সামাজিক যোগাযোগ, ব্যবহারকারীর অংশগ্রহণ, পণ্য বিপণন ও বাণিজ্যিক আকর্ষণকে কেন্দ্র করে তৈরি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোতে অবাধ বা সীমাহীন প্রবেশাধিকার দেওয়া উচিত? আমার উত্তর—না।

অস্ট্রেলিয়া ও যুক্তরাজ্যের পথ অনুসরণ করে বাংলাদেশকেও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মে অ্যাকাউন্ট খোলা বা পরিচালনা ঠেকাতে আইন প্রণয়নের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা উচিত।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বয়সসীমা নির্ধারণ করে অস্ট্রেলিয়া

অস্ট্রেলিয়া বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ক্ষেত্রে জাতীয়ভাবে ১৬ বছর বয়সসীমা কার্যকর করেছে। ২০২৫ সালের ১০ ডিসেম্বর থেকে দেশটির নতুন নিয়মের আওতাভুক্ত প্ল্যাটফর্মগুলোকে ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের অ্যাকাউন্ট খোলা বা পরিচালনা ঠেকাতে ‘যুক্তিসংগত পদক্ষেপ’ নিতে বাধ্য করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই আইনে দায়িত্ব শিশু বা তাদের অভিভাবকের ওপর নয়, বরং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর দেওয়া হয়েছে। আইন অমান্য করলে সংশ্লিষ্ট প্ল্যাটফর্মকে সর্বোচ্চ ৪ কোটি ৯৫ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলার জরিমানা করা হতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার এই নীতির মূল ভিত্তি হলো—শিশুদের এমন অত্যাধুনিক ডিজিটাল ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নিজেদের সুরক্ষিত করার দায়িত্ব দেওয়া উচিত নয়, যেসব ব্যবস্থা ব্যবহারকারীদের সম্পৃক্ততা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়ার জন্য পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয়েছে এবং যা শিশুদের জন্য শোষণমূলক ও ক্ষতিকর হতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার এই উদ্যোগের অর্থ এই নয় যে ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের ইন্টারনেট ব্যবহার পুরোপুরি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। শিক্ষামূলক ওয়েবসাইট, সাধারণ ওয়েব ব্রাউজিং এবং বিভিন্ন ধরনের ডিজিটাল যোগাযোগের সুযোগ তাদের জন্য উন্মুক্ত রয়েছে। মূল লক্ষ্য হলো, শিশুরা যাতে ক্ষতিকর কনটেন্ট শনাক্ত ও বুঝতে এবং অনলাইন ঝুঁকি মোকাবিলা করার মতো পরিপক্বতা অর্জনের আগ পর্যন্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের সুযোগ না পায়।

অস্ট্রেলিয়ার পথ অনুসরণ করছে ব্রিটেন

যুক্তরাজ্য এখন আরও কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দিয়েছে। ব্রিটিশ সরকার জানিয়েছে, ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের সুযোগ বন্ধে আইন প্রণয়ন করা হবে। প্রস্তাবিত এই সুরক্ষা ব্যবস্থা ২০২৭ সালের বসন্তে কার্যকর হওয়ার কথা রয়েছে। সরকার বলছে, এ উদ্যোগের প্রতি অভিভাবকদের ব্যাপক সমর্থন রয়েছে।

ব্রিটেনের এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে স্পষ্ট হচ্ছে, শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ শুধু অস্ট্রেলিয়ার একক কোনো বিষয় নয়; এটি এখন জাতীয় সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক উদ্বেগের বিষয়ে পরিণত হচ্ছে।

অন্যান্য দেশও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ অথবা আরও কঠোর বয়স যাচাইয়ের ব্যবস্থা নিয়ে ভাবছে। উদাহরণস্বরূপ, নিউজিল্যান্ড ১৬ বছরের কম বয়সীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপের প্রস্তাব নিয়ে কাজ করছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাও বয়স যাচাই এবং শিশুদের অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্ল্যাটফর্মগুলোর দায়িত্ব বাড়ানোর উদ্যোগ নিচ্ছে।

এখনই বাংলাদেশের পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন

আমাদের শিশুদের এমন একটি স্বাভাবিক পরিবেশে বেড়ে ওঠার সুযোগ পাওয়া উচিত, যেখানে প্রযুক্তি কিংবা অতিপ্রক্রিয়াজাত খাবারের অতিরিক্ত প্রভাব নেই; বরং নৈতিকতা, সামাজিক মূল্যবোধ, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও শারীরিক সক্ষমতা নিয়ে তারা ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য প্রস্তুত হতে পারে।

বাংলাদেশের অনেক শিশু ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মারাত্মকভাবে আসক্ত হয়ে পড়ছে, যার ফলে তাদের পড়াশোনা এবং স্বাভাবিক শারীরিক ও মানসিক বিকাশ ব্যাহত হচ্ছে। সময়ের অভাব কিংবা ডিজিটাল বিষয়ে পর্যাপ্ত জ্ঞানের ঘাটতির কারণে অনেক অভিভাবক সন্তানদের পর্যাপ্ত পর্যবেক্ষণ ও তদারকি করতে পারছেন না। ফলে শিশুরা বিপজ্জনক ও আসক্তিকর কনটেন্টে অতিরিক্ত সময় ব্যয় করছে।

অনেক শিশু অভিভাবকদের অজান্তেই অনলাইন জুয়ার ফাঁদ, যৌন শোষণ এবং বিপজ্জনক সম্পর্কের শিকার হচ্ছে। এমনকি অপরাধী চক্র বা শিকারিদের দ্বারা তারা মাদকাসক্তির দিকেও ঠেলে দেওয়া হতে পারে।

বাংলাদেশের শিশুদের জীবন ও আচরণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্ষতিকর প্রভাব ইতোমধ্যে দৃশ্যমান। সমস্যা আরও ভয়াবহ হওয়ার এবং আরও অনেক শিশুর ভবিষ্যৎ নষ্ট হওয়ার অপেক্ষা না করে বাংলাদেশের এখনই পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।

ইউনিসেফের গবেষণাতেও বাংলাদেশের শিশুদের অনলাইন অভিজ্ঞতা নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় দেখা গেছে, ৬৩ শতাংশ শিশু মূলত নিজেদের কক্ষে ইন্টারনেট ব্যবহার করে। ফলে অভিভাবকদের পক্ষে তাদের অনলাইন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।

এ ছাড়া ইউনিসেফের উদ্যোগে পরিচালিত একটি জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশের ৩২ শতাংশ উত্তরদাতা অনলাইনে বুলিংয়ের শিকার হয়েছে। চেহারা, পরীক্ষার ফলাফল, ধর্মসহ বিভিন্ন বিষয়কে কেন্দ্র করে তাদের হয়রানি করা হয়েছে।

২০২৫ সালে প্রকাশিত ইউনিসেফের আরেকটি যুব জরিপে দেখা যায়, বাংলাদেশের প্রতি তিনজন তরুণের মধ্যে প্রায় দুজন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অতিরিক্ত ভুয়া খবর ও ভুল তথ্যকে সবচেয়ে বড় মানসিক চাপের কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বুলিং ও নেতিবাচক মন্তব্যও ছিল মানসিক অস্বস্তির বড় কারণ। এ ছাড়া প্রতি সাতজনের একজন ক্ষতিকর বা কষ্টদায়ক কনটেন্টে আক্রান্ত হওয়াকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানসিক চাপের প্রধান কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

এসব কোনো কাল্পনিক বা দূরবর্তী ঝুঁকি নয়। এগুলো প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের শিশুরাও ইতোমধ্যে ডিজিটাল পরিবেশের ক্ষতিকর দিকগুলোর মুখোমুখি হচ্ছে।

বিপদ শুধু সাইবার বুলিংয়ে সীমাবদ্ধ নয়

সাইবার বুলিং সমস্যার একটি মাত্র অংশ। শিশুরা অনলাইনে যৌন শোষণ ও যৌন প্রলোভনের শিকার হচ্ছে; তাদের কাছে ছবি বা ব্যক্তিগত তথ্য চাওয়া হচ্ছে; যৌন ছবি দেখিয়ে ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় এবং ছবি-ভিত্তিক নির্যাতনের ঘটনা ঘটছে।

এ ছাড়া ঘৃণাত্মক বক্তব্য, ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক উসকানি, সহিংস ও যৌন কনটেন্ট, ভুল তথ্য ও ষড়যন্ত্র তত্ত্ব, বিপজ্জনক অনলাইন চ্যালেঞ্জ, জুয়া-সংক্রান্ত প্রচারণা, প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ড, অপরিচিত ব্যক্তিদের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির চেষ্টা এবং এমন অ্যালগরিদম রয়েছে, যা শিশুদের বারবার আরও চরম ও ক্ষতিকর কনটেন্টের দিকে ঠেলে দিতে পারে।

অতিরিক্ত ও নিয়ন্ত্রণহীন পর্দা ব্যবহারের ফলে ঘুম, পড়াশোনা, শারীরিক কর্মকাণ্ড এবং পারিবারিক সম্পর্কও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

অনলাইনে যৌন শোষণের বিষয়টি বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। চলতি সপ্তাহে প্রকাশিত ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২১টি দেশের প্রায় ২ কোটি ইন্টারনেট ব্যবহারকারী শিশু এক বছরে অনলাইনে যৌন শোষণ বা নির্যাতনের শিকার হয়েছে। ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম, স্ন্যাপচ্যাট ও টিকটকের মতো প্ল্যাটফর্মে এসব নির্যাতনের বড় অংশ ঘটেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ধরনের নির্যাতনের সংস্পর্শে আসার সঙ্গে উদ্বেগ ও আত্মহত্যার চিন্তার ঝুঁকি বৃদ্ধির সম্পর্কও পাওয়া গেছে।

বাংলাদেশ কোনোভাবেই ধরে নিতে পারে না যে, এ বৈশ্বিক ঝুঁকি থেকে দেশের শিশুরা স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিরাপদ।

বয়সসীমা ১৬ বছর কেন?

কেউ প্রশ্ন করতে পারেন—১৩, ১৪ কিংবা ১৮ বছর নয়, কেন ১৬ বছর? ১৬ এমন কোনো জাদুকরী বয়স নয়, যে বয়সে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে একটি শিশু অনলাইন ক্ষতি থেকে পুরোপুরি নিরাপদ হয়ে যাবে। এটি মূলত একটি নীতিগত সীমা, যা বিভিন্ন পর্যায়ের আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারিত।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অ্যালগরিদমভিত্তিক সুপারিশ, সামাজিক তুলনা, অবিরাম নোটিফিকেশন, প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া, লক্ষ্যভিত্তিক বিজ্ঞাপন এবং অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ—এসব শক্তিশালী বৈশিষ্ট্য একসঙ্গে কাজ করে। অন্যদিকে শিশুদের বিচার-বিবেচনা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা তখনো বিকাশমান থাকে।

তাই ন্যূনতম বয়সসীমার উদ্দেশ্য ১৫ বছর বয়সী একজন কিশোর প্রযুক্তি ব্যবহারে অক্ষম—এমন ঘোষণা দেওয়া নয়। বরং এটি স্বীকার করা যে, তরুণদের পূর্ণাঙ্গ বাণিজ্যিক ও সামাজিক চাপপূর্ণ প্রাপ্তবয়স্কদের ডিজিটাল পরিবেশে প্রবেশের আগে শৈশবকে একটি সুরক্ষিত সময় দেওয়া প্রয়োজন।

পুরো দায়িত্ব অভিভাবকদের ওপর দেওয়া যায় না

অনেকে বলবেন, অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের অনলাইন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা। নিঃসন্দেহে অভিভাবকদের দায়িত্ব অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু কোটি কোটি ডলারের প্রযুক্তি কোম্পানির সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে সন্তানদের নিরাপদ রাখা অভিভাবকদের একার পক্ষে বাস্তবসম্মত নয়।

একজন অভিভাবক সন্তানকে ৩০ মিনিট অনলাইনে থাকতে বলতে পারেন। কিন্তু প্ল্যাটফর্মটি সারা সন্ধ্যা নোটিফিকেশন পাঠাতে পারে। অভিভাবক একটি ক্ষতিকর অ্যাকাউন্ট সরিয়ে দিতে পারেন, কিন্তু সুপারিশ ব্যবস্থা নতুন আরেকটি ক্ষতিকর অ্যাকাউন্ট বা কনটেন্ট সামনে আনতে পারে। অভিভাবক সন্তানকে অপরিচিত ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ না করতে শেখাতে পারেন, কিন্তু একজন অপরাধী বা শিকারি কয়েক সপ্তাহ ধরে শিশুটির সঙ্গে সম্পর্ক ও বিশ্বাস তৈরি করতে পারে।

এ কারণেই প্রযুক্তি জায়ান্টগুলোর দায়িত্ব নিশ্চিত করতে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ ও আইন প্রয়োজন। অভিভাবকদের সন্তানকে শিক্ষা ও তদারকি করতে হবে, প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে আরও নিরাপদ ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে এবং সরকারকে কার্যকর ও প্রয়োগযোগ্য ন্যূনতম মানদণ্ড নির্ধারণ করতে হবে।

তবে বাংলাদেশকে সরল ‘ইন্টারনেট নিষেধাজ্ঞা’ এড়িয়ে চলতে হবে

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বয়সসীমা আরোপের উদ্যোগ যেন শিশুদের ডিজিটাল জগত থেকে বিচ্ছিন্ন করার প্রচেষ্টায় পরিণত না হয়। সেটি হবে উল্টো ফলদায়ক।

বিদ্যালয়গুলোতে ডিজিটাল শিক্ষা অব্যাহত রাখতে হবে। শিশুদের শিক্ষামূলক ওয়েবসাইট, গবেষণার উপকরণ, সরকারি সেবা এবং বয়স উপযোগী যোগাযোগের সুযোগ থাকতে হবে।

তাই প্রস্তাবিত বিধিনিষেধের আওতায় পুরো ইন্টারনেট নয়, বরং যেসব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো প্রকাশ্য সামাজিক যোগাযোগ, অ্যালগরিদমভিত্তিক ফিড এবং উন্মুক্ত যোগাযোগ—সেসব প্ল্যাটফর্মে অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।

একই সঙ্গে শিক্ষামূলক ও শিশু সুরক্ষা-সংক্রান্ত সেবার জন্য সুস্পষ্ট ব্যতিক্রম রাখা প্রয়োজন।

আইন শিশুদের নয়, বড় প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে লক্ষ্য করবে

এ ক্ষেত্রে অস্ট্রেলিয়ার কাছ থেকে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা নেওয়া উচিত। ন্যূনতম বয়সসীমা কার্যকরের দায়িত্ব মূলত প্ল্যাটফর্মগুলোর ওপর থাকতে হবে, শিশুদের ওপর নয়।

কোনো শিশুকে অ্যাকাউন্ট খোলার জন্য জরিমানা করা বা অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। কোনো শিশু বয়সসীমা এড়িয়ে অ্যাকাউন্ট খুলতে পারলে তার জন্য অভিভাবকদেরও অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।

বরং প্ল্যাটফর্মগুলোকে কার্যকর বয়স যাচাই ব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং তারা ইচ্ছাকৃতভাবে কিংবা অবহেলার কারণে অপ্রাপ্তবয়স্কদের অ্যাকাউন্ট ব্যবহারের সুযোগ দিলে তাদের বিরুদ্ধে উল্লেখযোগ্য জরিমানার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

এটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বয়স যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত সক্ষমতা ও আর্থিক সামর্থ্য রয়েছে।

বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক সংবেদনশীলতা, ধর্মীয় নির্দেশনা এবং পরিবার ও সমাজের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে অনলাইন জুয়া, মাদক কেনাবেচা এবং স্পষ্ট যৌন কনটেন্ট শুধু শিশুদের জন্য নয়, সব বয়সী মানুষের জন্যই নিষিদ্ধ করা উচিত।

গোপনীয়তা সুরক্ষার সঙ্গে বয়স যাচাই

বয়স যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে যৌক্তিক উদ্বেগ থাকতে পারে। তবে এটিকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করে লাখ লাখ শিশুর কাছ থেকে অতিরিক্ত ব্যক্তিগত তথ্য, বায়োমেট্রিক তথ্য কিংবা পরিচয়পত্র সংগ্রহ করা উচিত নয়।

অভিভাবকের অনুমোদনসহ বৈধ জন্মনিবন্ধন সনদ ব্যবহার বয়স যাচাইয়ের একটি কার্যকর ব্যবস্থা হতে পারে।

বাংলাদেশকে এ ক্ষেত্রে কঠোর গোপনীয়তা সুরক্ষা, প্রয়োজনের অতিরিক্ত তথ্য সংগ্রহ না করা, স্বাধীন নিরীক্ষা এবং বয়স যাচাইয়ের তথ্য অপব্যবহারের জন্য কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

প্রয়োজন জাতীয় শিশু ডিজিটাল নিরাপত্তা কাঠামো

বাংলাদেশের উচিত একটি জাতীয় শিশু ডিজিটাল নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করা। এর আওতায় বড় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোকে ১৬ বছরের কম বয়সী শিশুদের অ্যাকাউন্ট খোলা বা পরিচালনার সুযোগ দেওয়া থেকে বিরত রাখতে হবে।

আইনি দায় মূলত প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর ওপর থাকতে হবে এবং আইন অমান্য করলে উল্লেখযোগ্য আর্থিক জরিমানার ব্যবস্থা থাকতে হবে।

ডিজিটাল নাগরিকত্ব, ভুল তথ্য, সাইবার বুলিং, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, অনলাইন প্রতারণা এবং দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়গুলো স্কুলের পাঠ্যক্রমে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত।

অভিভাবকদের জন্যও সন্তানদের ডিজিটাল জীবন পরিচালনার বিষয়ে বাস্তবভিত্তিক নির্দেশনা ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করতে হবে, যাতে তাদের শুধু নজরদারির ওপর নির্ভর করতে না হয়।

এ ছাড়া বাংলাদেশে একটি স্বাধীন ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রক সংস্থা প্রতিষ্ঠা বা বিদ্যমান কোনো সংস্থাকে শক্তিশালী করা প্রয়োজন, যাতে সেটি প্ল্যাটফর্মগুলোর কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ, অভিযোগ তদন্ত এবং শিশু সুরক্ষার মানদণ্ড কার্যকর করতে পারে।

কোনো বড় দুর্ঘটনার অপেক্ষা করা উচিত নয়

অনেক দেশে সরকার সাধারণত সংকট তৈরি হওয়ার পর ব্যবস্থা নেয়, সংকট প্রতিরোধে নয়। বাংলাদেশকে এ ক্ষেত্রে ভিন্ন ও আগাম পদক্ষেপ নেওয়ার নীতি গ্রহণ করতে হবে।

শিশুরা সাইবার বুলিং, ভুল তথ্য, যৌন শোষণ ও ক্ষতিকর কনটেন্টের মুখোমুখি হচ্ছে—এ বিষয়ে ইতোমধ্যে যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে। তাই আরও হাজার হাজার শিশু ক্ষতির শিকার হওয়ার পর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য নীতিনির্ধারকদের অপেক্ষা করা উচিত নয়।

অস্ট্রেলিয়া নেতৃত্ব দিয়েছে। ব্রিটেন সেই পথ অনুসরণ করছে। অন্যান্য দেশও একই ধরনের পদক্ষেপ বিবেচনা করছে। এসব উদ্যোগ বাংলাদেশের জন্যও একটি প্রশ্ন সামনে নিয়ে এসেছে—অন্য দেশের আইন হুবহু অনুকরণ করা যাবে কি না, সেটি নয়; বরং বাংলাদেশের শিশুদের জন্য আমরা কেমন ডিজিটাল শৈশব চাই?

সমৃদ্ধ ভবিষ্যতের জন্য শৈশবকে সুরক্ষিত করতে হবে

প্রতিটি শিশুরই নিরাপদ পরিবেশে স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার জন্য সময় প্রয়োজন। পড়াশোনা, খেলাধুলা, ঘুম, শরীরচর্চা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ এবং বাস্তব জীবনে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার সুযোগ তাদের থাকতে হবে।

প্রযুক্তির মধ্যে মৌলিকভাবে কোনো সমস্যা নেই। তবে প্রযুক্তির উচিত শৈশবের সেবা করা; শৈশবের প্রযুক্তির সেবা করা নয়।

তাই লক্ষ্য হওয়া উচিত বাংলাদেশকে প্রযুক্তিবিরোধী কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমবিরোধী দেশে পরিণত করা নয়। বরং ডিজিটাল সুযোগ ও ডিজিটাল শোষণের মধ্যে একটি যৌক্তিক সীমারেখা তৈরি করা, যাতে শিশুদের স্বাভাবিক বিকাশ ঝুঁকির মুখে না পড়ে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে ১৬ বছরের ন্যূনতম বয়সসীমা সব সমস্যার সমাধান করবে না। শিশুরা অনলাইনে নানা ঝুঁকির মুখোমুখি হয়েই থাকবে এবং অনেক কিশোর-কিশোরী বিধিনিষেধ এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করবে। আইন প্রয়োগও কঠিন হবে। বয়স যাচাইয়ের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা সুরক্ষাও অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। বয়স সঠিকভাবে নির্ধারণ ও প্রয়োগ করাই হবে এই উদ্যোগের সাফল্যের অন্যতম প্রধান চাবিকাঠি।

তবে আইন পুরোপুরি কার্যকর করা কঠিন—এটি কিছুই না করার যুক্তি হতে পারে না।

বাংলাদেশের উচিত শিশুদের এমন একটি সুযোগ দেওয়া, যাতে তারা বড় হয়ে ওঠার পর এমন এক অনলাইন জগতে প্রবেশ করে, যা তাদের মনোযোগ আকর্ষণ, আচরণে প্রভাব বিস্তার এবং তাদের দুর্বলতাকে বাণিজ্যিকভাবে কাজে লাগানোর জন্য ক্রমেই বেশি পরিকল্পিত হয়ে উঠছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভয়াবহ ঝুঁকি থেকে শিশুদের সুরক্ষা তাদের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ নয়; বরং তাদের নিরাপত্তা ও নির্মল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করার উদ্যোগ।


এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন