ইসলামী অর্থনীতির পথিকৃৎ ড. এম উমর চাপরা আর নেই

পড়তে ১ মিনিট

বিশ্বখ্যাত ইসলামী অর্থনীতিবিদ ও সৌদি আরবের আধুনিক ব্যাংকিং ব্যবস্থার অন্যতম রূপকার ড. এম উমর চাপরা ৯৩ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। শনিবার আসরের পর তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বলে তাঁর পরিবার জানিয়েছে। রবিবার মক্কার পবিত্র মসজিদুল হারামে ফজরের নামাজের পর তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয় এবং পরে তাঁকে মক্কার ঐতিহাসিক আল-মা'লা কবরস্থানে দাফন করা হয়।

১৯৩৩ সালে জন্মগ্রহণকারী ড. মুহাম্মদ উমর চাপরা ছিলেন ইসলামী অর্থনীতি ও অর্থব্যবস্থার একজন অগ্রগণ্য চিন্তাবিদ। তিনি ১৯৬৫ সালে সৌদি আরবে পাড়ি জমান এবং দেশটির আর্থিক ও ব্যাংকিং খাতের বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। বিশেষ করে সৌদি আরবের কেন্দ্রীয় ব্যাংক (সাবেক সাউদি অ্যারাবিয়ান মনিটারি এজেন্সি—সামা) গড়ে তোলা এবং এর নীতিনির্ধারণী কাঠামো শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয়।

ড. চাপরার পুত্র আনাস চাপরা গণমাধ্যমকে জানান, তাঁর পিতা শনিবার আসরের সময় ইন্তেকাল করেন। পরিবারের পক্ষ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়, তাঁর জানাজা মসজিদুল হারামে অনুষ্ঠিত হবে এবং পরবর্তীতে মক্কায় তাঁকে সমাহিত করা হবে।

দীর্ঘ কর্মজীবনে ড. চাপরা ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের (আইডিবি) ইসলামিক রিসার্চ অ্যান্ড ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের (আইআরটিআই) উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ইসলামী অর্থনীতি ও অর্থব্যবস্থা বিষয়ে তাঁর অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯০ সালে তিনি মর্যাদাপূর্ণ কিং ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন।

শিক্ষাজীবনেও তিনি ছিলেন অত্যন্ত কৃতী। ১৯৫৬ সালে করাচি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের পর ১৯৬১ সালে যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি সম্পন্ন করেন। পরবর্তীতে তিনি মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা সহকারী এবং উইসকনসিন ও কেন্টাকি বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতির সহযোগী অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

২০১৯ সালে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ড. চাপরা সৌদি আরবে তাঁর কর্মজীবনের শুরুর স্মৃতিচারণ করেন। তিনি জানান, বাদশাহ ফয়সালের শাসনামলে তিনি সৌদি আরবে যান এবং তৎকালীন অর্থমন্ত্রী শেখ মোহাম্মদ আবালখাইলের সঙ্গে কাজ করার সুযোগ পান। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মুদ্রানীতি প্রণয়নের ক্ষেত্রে সৌদি নেতৃত্ব বিশেষভাবে পরামর্শ গ্রহণে আগ্রহী ছিল। বাদশাহ ফয়সাল ও তাঁর মন্ত্রিসভার দূরদর্শিতার প্রশংসা করে ড. চাপরা বলেন, তাঁরা শুধু পরামর্শ শুনতেন না, তা বাস্তবায়নেও উদ্যোগী হতেন।

সৌদি আরবের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও আর্থিক খাতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে সৌদি নাগরিকত্ব প্রদান করা হয়, যা বিদেশি নাগরিকদের জন্য অত্যন্ত বিরল সম্মান।

ড. চাপরা ইসলামী অর্থনীতির তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মাণে বিশেষ অবদান রাখেন। তাঁর রচিত প্রায় ১৫টি বই ও মনোগ্রাফ এবং ৯০টিরও বেশি গবেষণা নিবন্ধ বিশ্বজুড়ে ইসলামী অর্থনীতি শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ “Towards a Just Monetary System” ইসলামী মুদ্রানীতির অন্যতম প্রভাবশালী রচনা হিসেবে স্বীকৃত। এই বইকে ব্রিটেনের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রডনি উইলসন ইসলামের মুদ্রাতত্ত্বের সবচেয়ে সুস্পষ্ট ও গ্রহণযোগ্য উপস্থাপনাগুলোর একটি বলে অভিহিত করেছিলেন।

ড. উমর চাপরার বই ও গবেষণাকর্ম বিশ্বের বহু ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠ্যসূচির অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ন্যায়ভিত্তিক অর্থনীতি, সুদমুক্ত ব্যাংকিং ব্যবস্থা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং মানবকল্যাণকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক চিন্তার ক্ষেত্রে তাঁর অবদান তাঁকে ইসলামী অর্থনীতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ মনীষীর মর্যাদা দিয়েছে।

তাঁর মৃত্যুতে ইসলামী অর্থনীতি, ব্যাংকিং ও একাডেমিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে। তিনি রেখে গেলেন জ্ঞান, গবেষণা ও ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক দর্শনের এক সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার, যা আগামী প্রজন্মের গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের পথ দেখাবে।

এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন