দুই সভ্যতার সঙ্ঘাত ও সমঝোতার প্রশ্ন

পড়তে ১ মিনিট

দুই সভ্যতার সঙ্ঘাত ও সমঝোতার প্রশ্ন

এক.

বর্তমানে এই বিশ্বাসটি অত্যন্ত প্রবল হয়ে উঠেছে যে, কমিউনিজমের পতনের ফলে দীর্ঘস্থায়ী ‘স্নায়ুযুদ্ধ’ (ঈড়ষফ ডধৎ) শেষ হলেও সঙ্ঘাতের অবসান ঘটেনি। মার্কিন নেতৃত্বাধীন বিজয়ী পশ্চিমা শক্তি এখন ইসলামকে তাদের নতুন লক্ষ্যবস্তু (ঞধৎমবঃ) হিসেবে গ্রহণ করেছে। ফলে এক সময় কমিউনিজমের সাথে পশ্চিমের যে দ্বন্দ্ব ছিল, আজ সেই একই সঙ্ঘাতের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে ইসলাম। এই ধারণা কেবল মুসলিম বিশ্বের একার নয়, বরং পশ্চিমা বিশ্বের অনেক প্রখ্যাত চিন্তাবিদও অনুরূপ মত পোষণ করছেন।

হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির ‘জন এম. অলিন ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ’-এর পরিচালক ও প্রখ্যাত রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল হান্টিংটন তার বিখ্যাত নিবন্ধ ‘ঞযব ঈষধংয ড়ভ ঈরারষরুধঃরড়হং’ (সভ্যতার সঙ্ঘাত)-এ বিশ্ব সঙ্ঘাতের ইতিহাস বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন যে, আধুনিক যুগের সর্বশেষ সঙ্ঘাতটি হবে বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে। বিশেষ করে, পশ্চিমা সভ্যতার সঙ্গে ইসলামী সভ্যতার সঙ্ঘাতই হবে এর মূল কেন্দ্রবিন্দু।

স্যামুয়েল হান্টিংটন তার এই তত্ত্বের পক্ষে বেশ কিছু জোরালো যুক্তি উপস্থাপন করেছেন:

  • সভ্যতার সচেতনতা: বিভিন্ন সভ্যতার মধ্যে বর্তমানে নানামুখী বিতর্ক বাড়ছে। এর ফলে স্ব-স্ব সভ্যতা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত আন্তঃসভ্যতা বৈচিত্র্য ও বিরোধের ক্ষেত্রকে আরও প্রসারিত করছে।

  • দীর্ঘস্থায়ী সাংস্কৃতিক বিভাজন: তার মতে, পশ্চিমা ও ইসলামী সভ্যতার মধ্যে প্রায় তেরশ বছর ধরে সঙ্ঘাত বিদ্যমান। ইউরোপের অভ্যন্তরীণ আদর্শিক বিভাজন ও বিরোধ মিটে যাওয়ার পর তাদের সেই পুরনো সাংস্কৃতিক ভিন্নতা পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে।

  • ঐতিহাসিক সামরিক সঙ্ঘাত: হান্টিংটন মনে করেন, ইসলাম ও পশ্চিমের মধ্যকার কয়েক শতাব্দীর সামরিক সঙ্ঘাতের ইতিহাস মুছে যাওয়ার নয়। এটি বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিম দেশগুলোতে পশ্চিমা-বিরোধী মনোভাবকে আরও তীব্র করে তুলছে।

  • নতুন বিশ্ব ব্যবস্থার আকাঙ্ক্ষা: ভারতীয় সাংবাদিক এম. জে. আকবরের বক্তব্য উদ্ধৃত করে তিনি বলেন, মরক্কো থেকে পাকিস্তান পর্যন্ত বিস্তৃত মুসলিম জাতিগুলোর একটি নিজস্ব ‘নতুন বিশ্ব ব্যবস্থা’ গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে।

  • সাম্প্রতিক দাঙ্গা ও গৃহযুদ্ধ: যুক্তি হিসেবে তিনি সুদান ও চাদের গৃহযুদ্ধ, নাইজেরিয়া ও আফ্রিকার শৃঙ্গ (ঐড়ৎহ ড়ভ অভৎরপধ)-র সঙ্ঘাত, ভারতে বাবরি মসজিদ ধ্বংস কেন্দ্রিক হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা, বসনিয়া ও ফিলিপাইনে খ্রিস্টানদের সাথে লড়াই এবং ফিলিস্তিনে ইহুদি ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বৌদ্ধদের সাথে মুসলমানদের দ্বন্দ্বকে উল্লেখ করেছেন।

তবে হান্টিংটনের এই ‘সভ্যতার সঙ্ঘাত’ তত্ত্বকে পশ্চিমা বিশ্বের অনেকেই ‘হাস্যকর’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাদের মতে, এসব যুক্তির বাস্তব ভিত্তি অত্যন্ত দুর্বল। এই সমালোচকদের মধ্যে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটনের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অ্যান্থনি লেক অন্যতম প্রধান কণ্ঠস্বর।

১৯৯৪ সালের ৬ মে ওয়াশিংটনে ‘ইনস্টিটিউট ফর নিয়ার ইস্ট পলিসি’ আয়োজিত এক সেমিনারে তিনি এই তত্ত্বকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বলেন:

“আমরা ভবিষ্যতের সম্ভাব্য সঙ্ঘাতকে কোনোভাবেই ‘সভ্যতার সঙ্ঘাত’ বলে মনে করি না। কেউ কেউ বলছেন যে, স্নায়ুযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্ব মৌলিকভাবে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছেÑযেখানে পশ্চিমা উদারপন্থী গণতন্ত্রের প্রতিপক্ষ হলো ইসলাম ও অন্যান্য ধর্মভিত্তিক সভ্যতা। তাদের তত্ত্ব অনুযায়ী, পশ্চিম ও অবশিষ্ট বিশ্বের মধ্যে সমঝোতার কোনো স্থান নেই এবং একমাত্র মহাশক্তি হিসেবে আমেরিকা এখন কমিউনিজমের শূন্যস্থান পূরণকারী হিসেবে ইসলামের বিরুদ্ধে ‘ক্রুসেড’ বা ধর্মযুদ্ধ শুরু করবে।”

অ্যান্থনি লেক এই মতের তীব্র বিরোধিতা করে বলেন:

“সন্দেহ নেই যে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে কিছু বিভাজন রয়েছে। কিন্তু সেই বিভাজনের মূল কারণ সভ্যতা বা ধর্ম নয়। বরং আজকের বিভাজনটি গড়ে উঠেছে নিপীড়ন বনাম গণতান্ত্রিক শাসন, রুদ্ধদ্বার নীতি বনাম উন্মুক্ত দৃষ্টিভঙ্গি এবং উদারতা বনাম চরমপন্থার মধ্যে।”

নিজের বক্তব্যকে আরও স্পষ্ট করে তিনি বলেন:

“ইসলামী বিশ্বের প্রচলিত মূল্যবোধের সাথে পশ্চিমা বা গণতান্ত্রিক আদর্শের সঙ্ঘাত অনিবার্যÑএই ধারণা আমরা বিশ্বাস করি না। কারণ ইসলামী মূল্যবোধের প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলোÑযেমন পারিবারিক ও সামাজিক সংহতি, বিশ্বাস এবং সৎকর্মের প্রতি নিষ্ঠাÑআমাদের কাছে মোটেও অপরিচিত কিছু নয়। মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার মানুষ যখন তাদের রাষ্ট্র ও সমাজে এই মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠা নিয়ে বিতর্ক করে, তা আমাদের অবাক করে না। বিশ্বের অন্যান্য প্রান্তের মানুষের মতোই তারা একটি জনমুখী সরকার, মানবাধিকারের নিশ্চয়তা এবং সুষ্ঠু জীবনব্যবস্থা গড়ে তোলার পথ খুঁজছে। এই প্রেক্ষাপটে তারা যদি ইসলামের দিকে ফিরে তাকায়, তবে তা খুবই স্বাভাবিক ও সার্বজনীন একটি বিষয়। এটি সঙ্ঘাতের কোনো কারণ হতে পারে না।”

বসনিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের উদাহরণ টেনে তিনি আরও বলেন:

“আজকের বিশ্ব বিবেককে যা পীড়িত করছে তা সভ্যতার সঙ্ঘাত নয়। বসনিয়াতে আমাদের শত্রু ছিল চরম গোঁড়ামি ও সংকীর্ণ জাতীয়তাবাদ। সার্বরা তাদের নগ্ন আগ্রাসন আড়াল করতে মুসলিম অগ্রযাত্রার অজুহাত দিলেও আমরা তা বিশ্বাস করি না। আমরা বসনিয়াকে এমন একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চেয়েছি যেখানে খ্রিস্টান ও মুসলমানরা শান্তিতে সহাবস্থান করবে। একইভাবে সাদ্দাম হোসেন কুয়েত দখলের সময় ইসলামের স্লোগান দিলেও সেখানে ধর্ম কোনো মুখ্য বিষয় ছিল না। আমরা লিবিয়া ও সুদানÑউভয় দেশেরই বিরোধিতা করি, তবে তা ইসলামের কারণে নয়, বরং তাদের উগ্রপন্থার কারণে। ঠিক তেমনি কিছু গোষ্ঠী যখন ইসলামের আড়ালে চরমপন্থা অবলম্বন করে, আমরা তখন কেবল সেই চরমপন্থারই বিরোধিতা করি, ইসলামের নয়।”

অ্যান্থনি লেক এরপর তাদের তিন দফা রাজনৈতিক লক্ষ্যের কথা ঘোষণা করেছেন, যার ওপর ভিত্তি করেই মার্কিন পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হয়। প্রথমত, অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে আরব-ইসরায়েল শান্তি প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়া; দ্বিতীয়ত, যেসব দেশ ধর্মীয় বা সেক্যুলার উগ্রপন্থা ও সন্ত্রাসবাদকে উৎসাহিত করে তাদের প্রতিহত করা; এবং তৃতীয়ত, যেসব দেশ মুক্তবাজার অর্থনীতি, গণতন্ত্রের বিকাশ এবং গণবিধ্বংসী অস্ত্র নিয়ন্ত্রণে সচেষ্ট তাদের সর্বাত্মক সহায়তা প্রদান। সম্ভবত এই তিন নীতির আলোকেই তিনি তার পূর্বোক্ত বক্তব্যটি সাজিয়েছেন।

মার্কিন প্রশাসনের আরেকজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি, নিকট প্রাচ্য বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি অফ স্টেট রবার্ট পেলেট্রু, ‘মিডল ইস্ট পিস কাউন্সিল’ আয়োজিত এক সিম্পোজিয়ামে ইসলাম সম্পর্কে মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট করেছেন। মার্কিন সমাজে ‘মৌলবাদ’ নিয়ে প্রবল ভীতি ও বিরোধিতা রয়েছেÑএ কথা স্বীকার করে তিনি বলেন:

“মধ্যপ্রাচ্যের অনেক ক্ষেত্রেই ‘ইসলামী মৌলবাদ’ শব্দটি অত্যন্ত অসংগতভাবে ব্যবহার করা হয়। কখনও সৌদি আরবের ক্ষেত্রে, কখনও যারা স্রেফ নিজস্ব বিশ্বাস ও নৈতিক মূল্যবোধের উজ্জীবন চায় অথবা দুর্নীতিগ্রস্ত সরকার ও পশ্চিমা অপপ্রভাবের প্রতিবাদ করে তাদের ক্ষেত্রে, আবার কখনও বা যারা ইসলামের নাম নিয়ে সন্ত্রাস ও সহিংসতায় লিপ্ত তাদের ক্ষেত্রেওÑএই শব্দটির যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে।”

পেলেট্রু আরও বলেন যে, ‘পলিটিক্যাল ইসলাম’ বা ‘ইসলামিস্ট’ শব্দগুলোর ক্ষেত্রেও একই বিভ্রান্তি কাজ করে। বর্তমানে ‘ইসলামিস্ট’ বলতেই রাজনৈতিক লক্ষ্য-উজ্জীবিত মুসলিমদের বোঝানো হচ্ছে, যা মার্কিন প্রশাসন নীতিগতভাবে ভুল মনে করে না। কারণ, বহু বৈধ ও সামাজিকভাবে দায়বদ্ধ মুসলিম সংগঠন রাজনৈতিক লক্ষ্য নিয়ে কাজ করে। তবে তিনি স্পষ্ট করেন যে, যারা আইন ভঙ্গ করে এবং অস্ত্রের জোরে লক্ষ্য অর্জন করতে চায়, তারা চরমপন্থীÑআর এমন চরমপন্থী সেক্যুলারদের মধ্যেও রয়েছে।

রবার্ট পেলেট্রু স্বীকার করেছেন যে, ইসলাম একটি মহান ধর্ম এবং এর ঐতিহাসিক সভ্যতা পশ্চিমা সংস্কৃতিকেও সমৃদ্ধ করেছে। মধ্যযুগে ইসলাম বিশ্বজুড়ে জ্ঞান-বিজ্ঞানের যে বিকাশ ঘটিয়েছিল তাও অনস্বীকার্য। তা সত্ত্বেও পশ্চিমা গণমাধ্যমে ইসলাম ও মৌলবাদকে কেবল রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা, জাতিগত দাঙ্গা কিংবা সন্ত্রাসবাদের সমার্থক হিসেবে দেখানো হয়। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে বোমা হামলা, মিসর ও আলজেরিয়ায় বিদেশিদের ওপর আক্রমণ এবং ইরান ও লিবিয়ার বিভিন্ন ঘটনা মার্কিন জনগণের মনে ইসলাম সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা সৃষ্টি করেছে।

অ্যান্থনি লেক এবং রবার্ট পেলেট্রুর বক্তব্যের মূল সুর হলো: ইসলামের সাথে পশ্চিমের কোনো মৌলিক বিরোধ নেই; বিরোধ কেবল উগ্রপন্থা ও উগ্রপন্থীদের সাথে। গণমাধ্যমের প্রভাবে পশ্চিমাদের চোখে ইসলাম কেবল ‘সহিংসতা ও অসহিষ্ণুতা’র ধর্ম হিসেবে চিত্রিত হচ্ছে, যার ফলে একধরণের বিভ্রান্তি ও বিরোধিতা তৈরি হয়েছে। তবে এর অর্থ এই নয় যে, পশ্চিমা ও ইসলামী সভ্যতার মধ্যে অনিবার্য কোনো যুদ্ধ শুরু হয়েছে বা হবে।

তাদের এই যুক্তি মেনে নিলেও একটি বড় প্রশ্ন থেকেই যায়: পশ্চিমা বিশ্ব না হয় খণ্ডিত তথ্যের কারণে ইসলাম সম্পর্কে বিভ্রান্ত হলো, কিন্তু সারা বিশ্বের সাধারণ মুসলমানদের মনে কেন এই বদ্ধমূল ধারণা তৈরি হলো যে, পশ্চিমারা ইসলামকে বৈরিতার চোখে দেখে এবং তারা কোথাও ইসলামকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হতে দিতে চায় না? কেবল গুটিকয়েক উগ্রপন্থী গোষ্ঠীর সন্ত্রাস দেখে কি মুসলিম জনমনে এমন গভীর ক্ষোভ তৈরি হয়েছে? পৃথিবীতে এমন সহিংস ঘটনা কয়টিই বা ঘটেছে? তাছাড়া সেসব ঘটনার অধিকাংশ ছিল নির্দিষ্ট কোনো দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়। সেই ঘটনাগুলোতে মার্কিন বিরোধিতার বিষয়টি এতটাও প্রকট ছিল না যে তা বিশ্বব্যাপী পশ্চিম-বিরোধী জনমত তৈরি করবে।

আসলে মুসলিম বিশ্বে এই তীব্র মার্কিন-বিরোধী মনোভাবের পেছনে রয়েছে এক দীর্ঘ পটভূমি। স্নায়ুযুদ্ধের সময়কার বামপন্থী প্রচারণার রেশ আজও কিছুটা বিদ্যমান থাকলেও মূলত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব নীতিই মুসলমানদের এই ক্ষোভের প্রধান কারণ।

  • ফিলিস্তিন নীতি ও ইসরায়েল তোষণ

মার্কিন মধ্যপ্রাচ্য নীতির সবচেয়ে বিতর্কিত দিক হলো ইসরায়েলের নিরাপত্তা ও সমৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া। আশ্চর্যের বিষয় হলো, ইসরায়েল রাষ্ট্র গঠনের মূলে ব্রিটেন ও রাশিয়ার অগ্রণী ভূমিকা থাকলেও, একে রক্ষার একক দায়িত্ব কাঁধে তুলে নেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এটি করতে গিয়ে তারা গোটা মুসলিম বিশ্বের জনমতকে চরমভাবে উপেক্ষা করেছে। প্রাথমিক পর্যায়ে কাশ্মীর বা আফগান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের কিছুটা ইতিবাচক ভূমিকা থাকলেও, তা ফিলিস্তিন প্রশ্নে মুসলমানদের আহত হৃদয়ে প্রলেপ দিতে পারেনি।

  • নীতিগত দ্বিমুখী আচরণ

রাশিয়া যখন কাশ্মীর ও আফগানিস্তানের প্রেক্ষাপট থেকে সরে দাঁড়ালো, তখন এই দুই ইস্যুতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ভোল পাল্টালো, তাতে মুসলিম বিশ্বে ধারণা তৈরি হয়েছে যেÑযুক্তরাষ্ট্রের আগের নীতি ছিল কেবল রুশ-বিরোধিতার কৌশল, মুসলমানদের প্রতি কোনো দরদ থেকে নয়। বর্তমানে ইসলামপন্থীদের কোনো সুযোগ না দেওয়ার যে মানসিকতা তারা দেখাচ্ছে, তা এই ধারণাকেই বদ্ধমূল করেছে।

  • কুয়েত ও ইরাক ইস্যুতে দ্বৈতনীতি

কুয়েতকে ইরাকি দখলদারিত্ব থেকে মুক্ত করতে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা অবশ্যই প্রশংসার দাবি রাখে। কিন্তু তারা কাক্সিক্ষত প্রশংসা পায়নি দু’টি কারণে। প্রথমত, ইরাকি দখলদারিত্বকে তারা যেভাবে দেখেছে, ফিলিস্তিনে ইহুদিদের দখলদারিত্বকে সেভাবে দেখেনি। দ্বিতীয়ত, কুয়েত উদ্ধারের ক্ষেত্রে মার্কিন তেল-স্বার্থই মুখ্য ছিল বলে সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করে। যুক্তরাষ্ট্র এই ভুল ধারণা ভাঙাতে ব্যর্থ হয়েছে।

  • বসনিয়া ও সার্ব আগ্রাসন

বসনিয়ার ক্ষেত্রে ইউরোপীয় দেশগুলোর তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও মুসলমানদের মনে খটকা রয়ে গেছে। তারা দেখেছে, আগ্রাসী ইরাকের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তার চেয়েও জঘন্য ও রক্তক্ষয়ী আগ্রাসন চালানো সার্বদের বিরুদ্ধে তারা সেই একই কঠোরতা দেখায়নি। এখান থেকেই ধারণা জন্মেছে যে, পশ্চিমা নীতির ভিত্তি ন্যায়-অন্যায় বা গণতন্ত্র-স্বৈরতন্ত্র নয়, বরং ‘ধর্মীয় সভ্যতা’।

  • গণতন্ত্র নিয়ে স্ববিরোধিতা

যুক্তরাষ্ট্রের একটি ঘোষিত নীতি হলো: ‘যারা ক্ষমতা দখলের জন্য গণতন্ত্রকে ব্যবহার করে এবং ক্ষমতায় গিয়ে সেই গণতন্ত্রকেই ধ্বংস করে দেয়, তাদের প্রতি আমরা সন্দিহান।’ এই নীতিটি আলজেরিয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রকটভাবে দৃশ্যমান হয়েছে। সেখানে ইসলামপন্থীরা নির্বাচনে নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করলেও ‘গণতন্ত্রের রক্ষক’ যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সমর্থন পায়নি। উল্টো আলজেরিয়ার সামরিক জান্তা যখন নির্বাচন বাতিল করে বিজয়ী ‘ইসলামিক স্যালভেশন ফ্রন্ট’কে বেআইনি ঘোষণা করল, তখন যুক্তরাষ্ট্র নীরব ছিল। অথচ মিয়ানমারে (বার্মা) অং সান সু চির দলের বিজয়ের পক্ষে পশ্চিমারা এতটাই সোচ্চার ছিল যে তাকে নোবেল পুরস্কার পর্যন্ত দেওয়া হয়।

যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্ব মনে করে, আলজেরিয়ার ইসলামপন্থীরা আসলে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী নয় এবং ক্ষমতায় গেলে তারা গণতন্ত্র বজায় রাখবে না। এই ধারণাটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক এবং এর সপক্ষে তাদের কাছে কোনো অকাট্য প্রমাণ নেই। ইরানেও দলীয় ব্যবস্থা ও নির্বাচন বিদ্যমান। ইসলামপন্থীরা ক্ষমতায় এলে গণতন্ত্র থাকবে নাÑএই আগাম ধারণা পোষণ করার অর্থ হলো, যুক্তরাষ্ট্র এখানে ইসলামকেই ‘অপরাধী’ হিসেবে কাঠগড়ায় দাঁড় করাচ্ছে।

তিনি কার্যত এটাই বোঝাতে চাইছেন যে, ইসলামে গণতন্ত্রের কোনো স্থান নেই। উল্লেখ্য, পশ্চিমা বিশ্বে বা তাদের মিত্রদের মধ্যে এমন ধারণা পোষণকারীর অভাব নেই। যেমন, ইসরায়েলি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী মার্টিন ক্রোমার বলেছেন:

“গরষরঃধহঃ ওংষধসরপ মৎড়ঁঢ়ং, নু হধঃঁৎব, পধহহড়ঃ নব ফবসড়পৎধঃরপ, ঢ়ষঁৎধষরংঃরপ, বমধষরঃধৎরধহ ড়ৎ ঢ়ৎড়-বিংঃবৎহ.” অর্থাৎ, সংগ্রামী বা ‘মিলিট্যান্ট’ ইসলামি গোষ্ঠীগুলো স্বভাবগতভাবেই গণতান্ত্রিক, বহুত্ববাদী, সমতাবাদী কিংবা পশ্চিম-ঘেঁষা হতে পারে না। এখানে ক্রোমার যে ‘মিলিট্যান্ট’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন, এটি এমন এক পরিভাষা যা দিয়ে যেকোনো ইসলামি দলকেই গণতন্ত্র-বিরোধী হিসেবে দাগিয়ে দেওয়া সহজ।

একই সুর প্রতিধ্বনিত হয়েছে প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ বার্নার্ড লুইসের কণ্ঠেও। তার মতেÑইসলাম ও উদারনৈতিক গণতন্ত্র কখনো স্বাভাবিক সহযোগী হতে পারে না (“ঞযব হধঃঁৎব ধহফ যরংঃড়ৎু ড়ভ ওংষধস ফড় হড়ঃ সধশব ষরনবৎধষ ফবসড়পৎধপু ধহফ ওংষধস হধঃঁৎধষ নবফ-ভবষষড়ংি”)। ইসলাম সম্পর্কে গভীর জ্ঞান না রেখেও ‘ইসলাম বিশেষজ্ঞ’ সেজে বসা এসব পণ্ডিতদের কথাই যদি মার্কিন নীতিনির্ধারকদের ধ্রুবসত্য হয়, তবে আলজেরিয়ার ইসলামপন্থী গণতন্ত্রীদের তারা অবিশ্বাস করবেÑএটাই স্বাভাবিক।

যদি বিষয়টি এমনই হয়, তবে অ্যান্থনি লেক ও রবার্ট পেলেট্রুর সেই দাবিÑ ’বর্তমান সঙ্ঘাত ইসলাম ও পশ্চিমা সভ্যতার সঙ্ঘাত নয়’Ñতা ধোপে টেকে না। কারণ, ইসলামে যদি গণতন্ত্রেরই স্থান না থাকে, তবে গণতন্ত্রকে প্রাণশক্তি হিসেবে গণ্য করা পশ্চিমা সভ্যতার সাথে ইসলামের সহাবস্থান সম্ভব হবে কীভাবে?

আবার যদি লেক ও পেলেট্রুর কথাই সত্য হয়Ñঅর্থাৎ তারা যদি সত্যিই বিশ্বাস করেন যে ইসলাম ও গণতন্ত্র পরস্পর বিরোধী নয়Ñতবে আলজেরিয়ার ক্ষেত্রে তাদের নীতি ছিল চরম ভুল। তাদের অবশ্যই এটি বিশ্বাস করতে হবে যে, প্রকৃত ইসলামি দল ও গোষ্ঠীগুলো আদর্শগতভাবেই গণতান্ত্রিক। বিশ্ব যখন রাষ্ট্রব্যবস্থায় নির্বাচন বা প্রতিনিধি নির্বাচনের কথা ভাবতেও শেখেনি, ইসলাম তখন মানুষকে এই অধিকারের পথ দেখিয়েছে এবং বাস্তবে তা প্রয়োগ করে প্রমাণ করেছে। রাষ্ট্র ও নির্বাচন পদ্ধতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ইসলাম বিশেষজ্ঞ বা সুধী সমাজকে (আহলে রায়) যে ব্যাপক স্বাধীনতা দিয়েছে, তা ইসলামের সীমাবদ্ধতা নয়; বরং ইসলাম যে সব কাল ও সব পরিবেশের জন্য উপযোগীÑএটি তারই প্রগতিশীল প্রমাণ।

সারকথা হলো, অ্যান্থনি লেক ও রবার্ট পেলেট্রু অস্বীকার করলেও ইসলামি ও পশ্চিমা সভ্যতার দ্বন্দ্বের একটি ঐতিহাসিক অস্তিত্ব রয়েছে। আবার সঙ্ঘাতের যে ভিন্ন ব্যাখ্যা তারা দিয়েছেন, সেটিও একটি রূঢ় বাস্তবতা। বাস্তবতা হলোÑদু’টি সভ্যতা পাশাপাশি থাকলেই যে তাদের মধ্যে সঙ্ঘাত অনিবার্য, তা নয়। বিশেষ করে ইসলামি সভ্যতা এবং খ্রিস্টধর্ম দ্বারা প্রভাবিত পশ্চিমা সভ্যতার মধ্যে সঙ্ঘাতের চেয়ে মৈত্রীর উপাদানই বেশি। মৌলিক বিশ্বাস ও নৈতিক মূল্যবোধের বহু ক্ষেত্রে এই দুই সভ্যতার মধ্যে গভীর সাদৃশ্য রয়েছে। এমনকি পশ্চিমা সভ্যতাকে যদি ধর্মীয় পরিচয়ের বদলে ‘উদারনৈতিক গণতন্ত্রভিত্তিক’ সভ্যতাও বলা হয়, তবুও গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও যুক্তিবাদের মতো বিষয়ে ইসলামের সাথে এর ব্যাপক মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

এতদসত্ত্বেও স্যামুয়েল হান্টিংটন যে সঙ্ঘাতের কথা বলেছেন, তার অস্তিত্ব অস্বীকার করার উপায় নেই। তবে বর্তমানের এই সঙ্ঘাত পুরোপুরি রাজনৈতিক। আমরা জানি, ভৌগোলিক উপনিবেশবাদের যুগ শেষ হলেও পশ্চিমারা এখন অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যের নতুন জাল বিস্তার করেছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে তাদের অপ্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক শক্তি। এই ত্রিমুখী শক্তিতে বলীয়ান হয়ে পশ্চিমা বিশ্ব আজ মুসলিম দেশ ও উন্নয়নশীল বিশ্বের কাছ থেকে ‘শর্তহীন আনুগত্য’ দাবি করছে। ইসলামের অদম্য স্বাধীনচেতা শক্তিই তাদের এই পথে প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। আর ইসলামের এই আত্মিক ও রাজনৈতিক শক্তি ধারণ করছে তারাই, যাদের পশ্চিমাদের ভাষায় ‘মৌলবাদী’ বলা হয়। ঠিক এই বিন্দুতেই দুই সভ্যতার সঙ্ঘাতটি অনিবার্য হয়ে সামনে চলে আসে, যা অ্যান্থনি লেকরা কৌশলে এড়িয়ে যাচ্ছেন।

তবুও আমরা লেক ও পেলেট্রুর দেওয়া আশ্বাসে বিশ্বাস রাখতে চাই; আমরা দুই সভ্যতার শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান কামনা করি। তবে এর জন্য প্রয়োজন পশ্চিমের ‘মোড়লগিরি’ বা দাদাগিরির রাজনীতির অবসান। তারা শক্তিতে বড় হতে পারে, কিন্তু সেই শ্রেষ্ঠত্ব যেন আগ্রাসনের রূপ না নেয়। এই আগ্রাসী মনোভাবটুকু ত্যাগ করলেই দুই সভ্যতার সঙ্ঘাত অন্তত আশি শতাংশ কমে যাবে এবং সহযোগিতা ও সহমর্মিতার পরিবেশ বিস্তৃত হবে। এতে করে মুসলিম বিশ্বের কোথাও কোথাও যে সহিংসতা বা উগ্রপন্থা রয়েছে, তার মূল কারণগুলোও দূর হয়ে যাবে। দিনশেষে একটি ভারসাম্যপূর্ণ, সহনশীল ও সহযোগী বিশ্বই সবার কাম্য।

দুই.

পশ্চিমা বিশ্বের প্রভাবশালী সাময়িকী ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ ইসলাম ও পাশ্চাত্যের ক্রমবর্ধমান সঙ্ঘাতের মূল কারণকে ‘রাজনৈতিক’ হিসেবে অভিহিত করেছে। তাদের মতে, দুই সভ্যতার যে মৌলিক জীবনদর্শন বা ভিত্তি, তাতে বড় কোনো বিরোধ নেই। ইকোনমিস্ট এই যুক্তিটি প্রত্যাখ্যান করেছে যে, বর্তমান সঙ্ঘাত প্রধানত আদর্শিক। তাদের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, উভয় অঞ্চলের সমসাময়িক রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক কিছু ঘটনাই এই বিরোধের প্রেক্ষাপট তৈরি করেছে।

ইকোনমিস্টের এই সুর অতীতেও অনেক পশ্চিমা পণ্ডিতের কণ্ঠে শোনা গেছে। বিশ্বখ্যাত ইতিহাসবিদ ও প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমেটিক লিটারেচার প্রোগ্রামের প্রধান ফিলিপ হিত্তি লিখেছেন:

“আদর্শের চেয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিই ইসলাম ও পাশ্চাত্যের মধ্যে ব্যবধান ও বিচ্ছিন্নতা তৈরি করেছে বেশি।”

তিনি এই দুই সভ্যতার আদর্শিক ঐক্যের কথা বলতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন যে, জুডাইজম (ইহুদি ধর্ম) ও খ্রিস্টবাদ যদি যথাক্রমে ‘ওল্ড টেস্টামেন্ট’ ও ‘নিউ টেস্টামেন্ট’-এর সৃষ্টি হয়, তবে ইসলামের উৎস হলো কুরআন নামক ‘থার্ড টেস্টামেন্ট’।

সাম্প্রতিক সময়ে মারভিন স্টোন ও টমাস টোল তাদের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘ঊহপড়ঁহঃবৎ রিঃয ঃযব ঋঁঃঁৎব: অ ঋড়ৎবপধংঃ ড়ভ খরভব রহঃড় ঃযব ২১ংঃ ঈবহঃঁৎু’-তে পশ্চিমা সভ্যতার বন্ধু ও শত্রুদের নিয়ে আলোচনা করেছেন। তারা দেখিয়েছেন যে, খ্রিস্টধর্ম এখন পশ্চিমা সভ্যতার অবিচ্ছেদ্য অংশ, তাই সেখান থেকে কোনো চ্যালেঞ্জ আসার সম্ভাবনা নেই। অন্যদিকে জুডাইজম, বৌদ্ধধর্ম কিংবা হিন্দুধর্মের সেই সামর্থ্য নেই যে তারা পাশ্চাত্যের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দাঁড়াবে। তাদের মতে, একমাত্র ইসলামের সাথেই পশ্চিমা সভ্যতার সঙ্ঘাত অনিবার্য হয়ে উঠছে। এই বিরোধের উৎস মূলত রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক। তাদের ভাষায়:

“কেবল ইসলামই পাশ্চাত্যের জন্য হুমকি; যা গত ২০ বছর ধরে অর্থনৈতিকভাবে, ১৮০ বছর ধরে রাজনৈতিকভাবে এবং দীর্ঘ ১৫০০ বছর ধরে সামরিকভাবে বিদ্যমান। ইরানে আমাদের (যুক্তরাষ্ট্রকে) ‘শয়তান’ বলে সম্বোধন এবং মুসলিম বিশ্বে ইসরায়েলকে সমর্থনের কারণে ইসলাম আবারও আমাদের মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।”

তবে কেবল রাজনৈতিক ও সামরিক ভীতি কিংবা গত কয়েক দশকের অর্থনৈতিক শক্তিই এই বিরোধের একমাত্র কারণÑএই ব্যাখ্যা পূর্ণাঙ্গ নয়। যদিও সত্য যে, ১৫০০ বছরের সামরিক সঙ্ঘাতের ইতিহাস এবং এই বহুমুখী ভীতি থেকেই পাশ্চাত্য শাহ-এর মতো স্বৈরাচারী ও ইসলাম-বিদ্বেষী শাসকদের সমর্থন দিয়ে আসছে এবং ইসরায়েলের মতো বৈরী শক্তিকে মদদ দিচ্ছে। এসব দৃশ্যমান রাজনৈতিক কারণের অন্তরালে পাশ্চাত্যের আরেকটি রূপও স্পষ্ট হয়ে উঠছেÑতা হলো ইসলামের ধর্মীয় নীতি ও মূল্যবোধকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করা।

মারভিন স্টোন ও টমাস টোল তাদের উল্লিখিত গ্রন্থে আরও বলেছেন:

“পাশ্চাত্যের চোখে ইসলাম এতটাই দুর্জ্ঞেয় যে, এর আচার-অনুষ্ঠান ও নীতিগুলোকে আমরা বর্তমান যুগে অচল মনে করি। ইসলামি আইন ভঙ্গের দায়ে বেত্রাঘাত, পাথর নিক্ষেপ, অঙ্গচ্ছেদ কিংবা প্রাণদণ্ডের মতো শাস্তিকে আমরা ‘অভিশাপ’ বলে মনে করি।”

তারা আরও যোগ করেন যে, মুসলিম বিশ্বে মসজিদ ও রাষ্ট্র পৃথক নয়; সেখানে রাষ্ট্রই হলো মসজিদ। ফলে ইসলামের সমালোচনাকে কেবল একটি মতপ্রকাশ হিসেবে নয়, বরং রাষ্ট্র ও সমাজের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা হিসেবে গণ্য করা হয়।

পশ্চিমা লেখকদের এই বক্তব্যে যে দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ পেয়েছে, তা কোনোভাবেই রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক নয়Ñবরং পুরোপুরি আদর্শিক। তারা ইসলামের বিধানগুলোকে ‘অভিশাপ’ মনে করছেন কারণ এর অন্তর্নিহিত দর্শন তারা বোঝেন না এবং বুঝতে চেষ্টাও করেন না। তারা ইসলামকে বিচার করছেন একান্তই নিজস্ব নীতি ও মূল্যবোধের মাপকাঠিতে। এই দৃষ্টিভঙ্গিগত পার্থক্যই মূলত ইসলাম ও পাশ্চাত্যের মধ্যে বিশাল ব্যবধান তৈরি করেছে এবং পাশ্চাত্য এই মতপার্থক্যকে এখন সক্রিয় ‘বিরোধিতায়’ রূপান্তর করেছে।

যেকোনো বিষয়ে মতপার্থক্য থাকা স্বাভাবিক, কিন্তু সেই পার্থক্যকে যখন অন্য পক্ষকে দমনের হাতিয়ার করা হয়, তখন তা শান্তি ও সহাবস্থানকে বিঘ্নিত করে সঙ্ঘাত ডেকে আনে। পাশ্চাত্য আজ কেবল ইসলামি আইনের সাথে দ্বিমত পোষণ করেই ক্ষান্ত নয়, বরং তারা বিশ্বজুড়ে এর বিরুদ্ধে তীব্র প্রপাগান্ডায় লিপ্ত হয়েছে। তাদের লক্ষ্য হলো এই দণ্ডবিধিগুলো সমূলে উৎপাটন করা। তারা এই আইনের কল্যাণকর দিক নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবতে নারাজ। একইভাবে, তারা ইসলামের পর্দা প্রথাকেও নেতিবাচকভাবে উপস্থাপন করে, অথচ পর্দার অভাবে তাদের নিজস্ব সমাজব্যবস্থা যে নৈতিক অবক্ষয়ের শিকার হচ্ছে, সেদিকে তাদের ভ্রুক্ষেপ নেই।

পাশ্চাত্য অন্ধভাবে ইসলামি নীতিবোধের বিরোধিতা করছে, যা মুসলিম দেশগুলোতে সামাজিক উত্তেজনা ও অশান্তি সৃষ্টি করছে। উদাহরণস্বরূপ, বাংলাদেশে ‘ফতোয়া’ বিরোধিতার নামে আলেম-ওলামাদের বিরুদ্ধে যে পরিকল্পিত প্রচারণা চালানো হয়, তার কথা বলা যায়। এটি সবারই জানা যে, এনজিও-র ছদ্মাবরণে পশ্চিমারাই এসব প্রচারণার নেপথ্য কারিগর। এই চিত্র কেবল বাংলাদেশের নয়, বরং প্রতিটি মুসলিম দেশেই পশ্চিমা বিশ্ব প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে ইসলামের মূল্যবোধ-বিরোধী অভিযান চালাচ্ছে। এই সামগ্রিক পরিস্থিতি এটাই প্রমাণ করে যে, এই সঙ্ঘাত কেবল রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক নয়, বরং এর মূলে রয়েছে গভীর এক আদর্শিক সংকট।

পশ্চিমের এই সর্বাত্মক অভিযানকে আজ ইসলামের বিরুদ্ধে এক গভীর আগ্রাসন হিসেবে দেখা হচ্ছে। এই আগ্রাসনের মূল লক্ষ্য হলো ইসলামের প্রাণশক্তিকে ধূলিসাৎ করা। আমরা জানি, ইসলামের প্রাণশক্তি নিহিত এর আদর্শিক দৃঢ়তা এবং দেশ-কাল-পাত্র নির্বিশেষে এর মৌলিকত্বের ওপর অটল থাকার মধ্যে। পশ্চিমা বিশ্ব এই সত্যটি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করে।

মারভিন স্টোন ও টমাস টোল তাদের গ্রন্থে ইসলামকে বর্তমান বিশ্বের দ্রুততম বিকাশমান ধর্ম হিসেবে চিহ্নিত করে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তুলেছেন: ধর্ম সম্পর্কে চরম সংশয়বাদের এই যুগে ইসলাম কীভাবে এতটা প্রাণপ্রাচুর্যে ভরপুর? তারা নিজেরাই এর উত্তর দিয়ে বলেছেন:

“ইসলাম একটি ‘মৌলবাদী’ ধর্ম (ঋঁহফধসবহঃধষরংঃ ৎবষরমরড়হ); অর্থাৎ ইসলাম তার মূলনীতির ওপর অটল এবং সেখানে কোনো প্রকার বিকৃতির অবকাশ দেয় না। সেই সূত্রে ইসলামের অনুসারীরাও নীতিনিষ্ঠ। তারা জীবন পরিচালনার ক্ষেত্রে কোনো আপস বা বিচ্যুতিকে প্রশ্রয় দেয় না।”

ইসলাম ও মুসলমানদের এই অনমনীয় বৈশিষ্ট্যই ইসলামের টিকে থাকার শক্তি। এই বৈশিষ্ট্য হারিয়ে ফেললে ইসলামও অন্যান্য অনেক ধর্মের মতো প্রাণহীন আচার-সর্বস্বতায় পর্যবসিত হতো। আর ইসলামকে এই প্রাণশক্তিহীন করার লক্ষ্যেই পাশ্চাত্যের যাবতীয় আয়োজন। তাদের এই লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দু হলো ইসলামের ‘নীতিনিষ্ঠতা’, যাকে তারা ‘মৌলবাদ’ হিসেবে নেতিবাচকভাবে প্রচার করছে। আমেরিকার প্রভাবশালী প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে মুসলিম বিশ্বের পশ্চিমা এজেন্টরা পর্যন্ত এই ‘মৌলবাদ’-এর বিরুদ্ধে সোচ্চার। আজকের বিশ্বে পশ্চিমা সভ্যতার সাথে ইসলামের প্রধান বিরোধের ক্ষেত্রও এটিই।

পাশ্চাত্য যদি ইসলামের বিরুদ্ধে এই আদর্শিক বিদ্বেষ ত্যাগ করে, তবে ফিলিস্তিন, আলজেরিয়া কিংবা সুদানের মতো জটিল সংকটের সহজ সমাধান সম্ভব। কিন্তু সমস্যা হলো, পশ্চিম এখন ‘মৌলবাদ বিরোধিতা’কে তাদের সভ্যতার অন্যতম নীতি হিসেবে গ্রহণ করেছে। তারা মুখে বলে যে তারা ‘চরমপন্থা’র বিরোধী, ‘ধর্মানিষ্ঠা’র নয়। কিন্তু এই চরমপন্থার কোনো সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা তারা আজ পর্যন্ত দেয়নি। দেখা যায়, তারা যেমন সহিংস কার্যক্রমকে চরমপন্থা বলে, তেমনি গণতান্ত্রিক ধারায় বিশ্বাসী ইখওয়ানুল মুসলিমুন বা জামায়াতে ইসলামীর মতো সংগঠনের ধর্মানিষ্ঠতাকেও ‘চরমপন্থা’ বলে আখ্যা দেয়। এখানে এসে তারা নীতিনিষ্ঠতা ও উগ্রবাদকে একাকার করে ফেলছে। তারা ধর্মীয় বিধানের একনিষ্ঠ অনুসরণকেই ‘মৌলবাদ’ ও ‘চরমপন্থা’র তকমা দিয়ে অন্ধ বিরোধিতায় লিপ্ত হয়েছে।

এই দ্বন্দ্বে পশ্চিম ‘মানবাধিকার’কে একটি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে। তারা প্রচার করতে চায় যে, ধর্মের অটল বিধি-বিধান মানবাধিকারের পরিপন্থী। অথচ তাদের এই দৃষ্টিভঙ্গি যে অবাস্তব, কৃত্রিম এবং খোদ মানবাধিকারের মৌলিক চেতনার বিরোধীÑসেটি তারা অস্বীকার করছে। মূলত বস্তুবাদী দর্শনের বিকৃতিই তাদের চিন্তাকে এই অন্ধত্বের দিকে ঠেলে দিয়েছে।

আমি আবারও বলছি, ইসলামের সাথে পশ্চিমের এই বিরোধ মূলত তাদের বস্তুবাদী দর্শনের সাথে ইসলামের আদর্শিক সঙ্ঘাত। পশ্চিমা এই বস্তুবাদী দর্শনের বয়স বড়জোর তিনশ বছর, যা আজ গোটা পাশ্চাত্যকে গ্রাস করেছে। পশ্চিম যদি তাদের এই ক্ষতিকর বস্তুবাদী প্রভাবÑবিশেষ করে ‘নীতি-বিবর্জিত যুক্তিবাদ’ ত্যাগ করতে পারে, তবে ইসলামের সাথে তাদের আদর্শিক দূরত্ব ঘুচে যাবে। তখন ধর্মানিষ্ঠা বা মৌলবাদ তাদের কাছে কোনো ভীতিকর বিষয় হবে না। রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বার্থের সঙ্ঘাত কমিয়ে আনতে পারলে ইসলাম ও পাশ্চাত্য একই মঞ্চে দাঁড়াতে পারে। নিরীশ্বরবাদী কনফুসীয় সভ্যতার চেয়ে ‘আহলে কিতাব’ বা আসমানি কিতাবে বিশ্বাসী খ্রিস্টান প্রধান পশ্চিম ইসলামের কাছে অবশ্যই অধিকতর নিকটবর্তী ও অগ্রাধিকার পাওয়ার যোগ্য।

যতদিন পর্যন্ত সেই কাক্সিক্ষত সমঝোতা না আসছে, ততদিন সবাইকে ‘শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান’ নীতি মেনে নিতে হবে। মতপার্থক্য নিয়েও পাশাপাশি থাকা সম্ভব। শিল্প-সংস্কৃতি ও সভ্যতার ক্ষেত্রেও তেমন শান্তিপূর্ণ প্রতিযোগিতা চলতে পারে, যেমনটি চলছে অর্থনীতি ও বাণিজ্যের ক্ষেত্রে। তবে এর জন্য পশ্চিমকে তাদের ‘বস্তুবাদী আগ্রাসন’ ও কৃত্রিম ‘মৌলবাদ আতঙ্ক’ ত্যাগ করতে হবে।

পরিশেষে এটি বলা আবশ্যক যে, মুসলমানদের ধর্মানিষ্ঠতা বা মৌলবাদ মূলত আত্মগঠনমূলক, শান্তিপূর্ণ ও প্রচারমুখীÑআগ্রাসী কোনো বিষয় নয়। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন তাঁর রাসূল (সা.)-কে স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, তাঁকে মানুষের ওপর ‘দারোগা’ বা জবরদস্তিকারী হিসেবে পাঠানো হয়নি; তাঁর দায়িত্ব কেবল সত্যের বাণী পৌঁছে দেওয়া। তবে ইসলামের ভিত্তিতে জীবন গঠন এবং এই জীবনব্যবস্থাকে রক্ষার ক্ষেত্রে মুসলমানরা বিন্দুমাত্র ছাড় দিতে রাজি নয়। নীতিনিষ্ঠার বিচারে এটিই ইসলামের ‘মৌলবাদ’ এবং এই বৈশিষ্ট্যই ইসলামের প্রাণ। আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের কাছ থেকে এই একনিষ্ঠ আনুগত্যই প্রত্যাশা করেন। #


এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন