ইসরাইলের ‘সম্প্রসারণবাদী’ নীতির বিরুদ্ধে বৈশ্বিক পদক্ষেপ প্রয়োজন : আঙ্কারা
লেখক:
ইসরাইলি বিমান হামলার স্থানটিতে স্থানীয় বাসিন্দাদের ভিড় | ছবি: ইপিএ
ইসরাইলের সামরিক কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করে দেশটির সরকারকে ‘সম্প্রসারণবাদী ও আগ্রাসী’ নীতি অনুসরণের জন্য অভিযুক্ত করেছে তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় বলেছে, ইসরাইলের এ ধরনের নীতি আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে।
বৃহস্পতিবার ইস্তাম্বুলে বায়কারের ওজদেমির বায়রাকতার ন্যাশনাল টেকনোলজি সেন্টারে তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এতে সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম, সীমান্ত নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক সামরিক সহযোগিতার পাশাপাশি তুরস্কের ক্রমবর্ধমান প্রতিরক্ষা ও মহাকাশ সক্ষমতার বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র জেকি আকতুর্ক বলেন, ইসরাইল সরকার পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে সংঘাতের একটি অঞ্চলে পরিণত করার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।
তিনি অভিযোগ করেন, সামরিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে ইসরাইল সিরিয়া ও লেবাননের ভৌগোলিক অখণ্ডতা লঙ্ঘন করছে। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনে ‘অবৈধ বসতি স্থাপনকারীদের সন্ত্রাসবাদকে’ উৎসাহিত করছে।
জেরুজালেমে মুসলিমদের পবিত্র স্থানগুলোর ঐতিহাসিক ও আইনগত মর্যাদা লঙ্ঘন করে ইসরাইল উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে বলেও অভিযোগ করে তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়।
আকতুর্ক বলেন, ‘ইসরাইলের কর্মকাণ্ড শুধু আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাকেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে না, বরং বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলছে। একই সঙ্গে এসব কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি এই অঞ্চলের মানুষের আস্থাকে ক্রমেই দুর্বল করে দিচ্ছে।’
তিনি বলেন, আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় তুরস্ক তার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখবে এবং ইসরাইলের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য চাপ দেবে।
আকতুর্ক জোর দিয়ে বলেন, ‘ইসরাইলের সম্প্রসারণবাদী ও গণহত্যামূলক অবস্থানের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের যে যৌথ দায়িত্ব রয়েছে, সে বিষয়ে আমরা তাদের মনে করিয়ে দিতে থাকব এবং সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানাব।’
তুরস্ককে সামরিক হুমকি হিসেবে দেখলে ভুল করবে ইসরাইল
এদিকে ইসরাইলের চ্যানেল ১২-এর (এন১২) এক বিশ্লেষণে মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুরস্কের ক্রমবর্ধমান প্রভাবের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। এতে সতর্ক করে বলা হয়েছে, আঙ্কারাকে সামরিক হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা ইসরাইলের জন্য ‘গুরুতর কৌশলগত ভুল’ হতে পারে।
ইসরাইলের সাবেক সামরিক গোয়েন্দা প্রধান তামির হেইম্যানের মূল্যায়নের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রকাশিত ওই বিশ্লেষণে মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকাজুড়ে তুরস্কের বাড়তে থাকা সামরিক ও রাজনৈতিক প্রভাব পর্যালোচনা করা হয়েছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়, বর্তমানে তুরস্ক অন্তত ১৩টি দেশে সামরিক উপস্থিতি বজায় রেখেছে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে দেশটির ১০০টিরও বেশি সামরিক স্থাপনা রয়েছে। এ ছাড়া লোহিত সাগর ও পারস্য উপসাগরেও তুরস্ক সক্রিয়।
হেইম্যানের মতে, তুরস্কের ক্রমবর্ধমান শক্তিকে সরাসরি সামরিক হুমকি বা শত্রুতার দৃষ্টিতে দেখলে ইসরাইল ভুল করতে পারে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, ইসরাইলের যে নিরাপত্তা নীতিতে পররাষ্ট্রনীতির কেন্দ্রে সামরিক শক্তিকে রাখা হয়, তুরস্কের ক্ষেত্রে সেই নীতি প্রয়োগ করলে সম্ভাব্য বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
হেইম্যানের মতে, ইসরাইলের হুমকি মূল্যায়নের তালিকায় তুরস্ককে অন্তর্ভুক্ত করা উচিত নয় এবং কার্যত দেশটিকে শত্রু রাষ্ট্রে পরিণত করাও ঠিক হবে না। এমনটি করা হলে তা ইসরাইলের জন্য ‘গুরুতর কৌশলগত ভুল’ হবে।
ওয়াইপিজি নিয়ে দাবি প্রত্যাখ্যান
সিরিয়া প্রসঙ্গে তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, সিরিয়ার ভৌগোলিক অখণ্ডতা রক্ষা এবং ‘এক রাষ্ট্র, এক সেনাবাহিনী’ নীতি জোরদারের প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে সন্ত্রাসী সংগঠন ওয়াইপিজির বিলুপ্তির প্রক্রিয়াটি তারা ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
বিদেশি ওয়াইপিজি-সংশ্লিষ্ট সদস্যরা সিরিয়া ছেড়ে চলে যাবে এবং তাদের কেউ কেউ তুরস্কে প্রবেশ করবে—এমন খবরও প্রত্যাখ্যান করেছে মন্ত্রণালয়। এসব দাবি সত্য নয় উল্লেখ করে প্রক্রিয়াটি নিয়ে কেবল সরকারি বক্তব্যের ওপর নির্ভর করার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে।
মন্ত্রণালয় স্পষ্ট করে বলেছে, ‘ওয়াইপিজির বিদেশি সদস্যরা সিরিয়া ছেড়ে যাবে এবং তাদের কেউ কেউ তুরস্কে আসবে—এমন দাবি সত্য নয়।’
মক্কা প্রতিরক্ষা জোট
তুরস্ক, পাকিস্তান ও সৌদি আরবের মধ্যে গঠিত মক্কা প্রতিরক্ষা জোট নিয়েও সংবাদ সম্মেলনে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয় জানায়, তিন দেশ তাদের সহযোগিতাকে আরও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় নিয়ে যাওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে।
জোটের কাঠামোর আওতায় গত ৩১ আগস্ট ইস্তাম্বুলে তিন দেশের প্রতিরক্ষামন্ত্রী, পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং সেনাপ্রধানরা বৈঠক করেন। বৈঠকে সহযোগিতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে সৌদি আরবে একজন মহাসচিবের নেতৃত্বে একটি সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিষয়ে সম্মত হয় তিন দেশ।
মন্ত্রণালয় জানায়, মহাসচিবের পদটি তিন দেশের মধ্যে পর্যায়ক্রমে পরিবর্তিত হবে। প্রথম তিন বছরের জন্য মহাসচিব নিয়োগ করবে পাকিস্তান।
জোটের আওতায় যৌথ সামরিক পরিকল্পনা, প্রশিক্ষণ ও মহড়ার মাধ্যমে তিন দেশের পারস্পরিক সামরিক সক্ষমতা ও সমন্বয় বাড়ানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি যৌথ উৎপাদন, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা শিল্পে সহযোগিতা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তুরস্কের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, এসব ব্যবস্থা জোটের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা ও প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ানোর পাশাপাশি আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতায় অবদান রাখবে।


