মার্কিন নির্বাচন ও ইসরাইলের আরব-সমর্থিত সরকার : নেতৃত্বের পরিবর্তন, নাকি সমতা ও ফিলিস্তিনের অধিকার ফিরবে?
লেখক:
ইসরাইল নির্বাচন-গ্রাফিক্স আরব নিউজ
ইসরাইলে আরব রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থনে সরকার গঠনের সম্ভাবনা দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে একটি মৌলিক প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে—সরকারে আরব রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণ কি ইসরাইলের গণতন্ত্রে প্রকৃত পরিবর্তনের ইঙ্গিত, নাকি কেবল রাজনৈতিক নেতৃত্বের পালাবদল? এতে কি ফিলিস্তিনিদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের বৈষম্য ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে চলমান দখলদারিত্বের অবসান ঘটবে?
২০২৬ সালের ২৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত ইসরাইলের নির্বাচন দেশটির রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। আরব রাজনৈতিক দলগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল একটি বিরোধী সরকারের সম্ভাবনা জাতীয় সরকার গঠনের ক্ষেত্রে আরব দলগুলোকে দীর্ঘদিন ধরে দূরে রাখার প্রচলিত রাজনৈতিক ধারাকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। তবে এই পরিবর্তনের তাৎপর্য বুঝতে হলে তিনটি মৌলিক বিষয় বিবেচনায় নিতে হবে। এগুলো হলো—রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, সমতা ও বৈষম্য এবং গাজা, পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমের ফিলিস্তিনিদের প্রতি ইসরাইলের নীতি।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক আধিপত্যের অবসান
নির্বাচনে প্রধান দুই রাজনৈতিক জোটের কেউই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। নির্বাচনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন ডানপন্থী জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট পেয়েছে ৪৭টি আসন। আরব নেতৃত্বাধীন জয়েন্ট লিস্ট ও রাম পার্টি সম্মিলিতভাবে পেয়েছে ১৯টি আসন। ফলে পরবর্তী সরকার গঠনে তাদের সমর্থন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আরব দলগুলোর সংসদীয় সমর্থন নিয়ে বিকল্প সরকার গঠনের উদ্যোগ নেওয়ায় নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক অবস্থান ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ে। নির্বাচনে আরবদের অংশগ্রহণকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে তিনি বিভিন্ন চেষ্টা চালিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে নির্বাচনে কারচুপি এবং বিদেশি অর্থায়নের প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও ছিল। তবে নির্বাচনী কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে।
আরব দলগুলোর ওপর নির্ভর করে সরকার গঠনে অনিচ্ছুক নেতানিয়াহু আইজেনকটের সঙ্গে ক্ষমতা ভাগাভাগির একটি প্রস্তাব দেন। প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম দুই বছর তিনি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন এবং পরবর্তী সময়ে সেই পদ আইজেনকটের কাছে হস্তান্তর করবেন। তবে বিরোধী পক্ষ এ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে।
এদিকে নেতানিয়াহুবিরোধী বিক্ষোভকারীরা বিরোধী নেতাদের নির্বাচনের ফলাফলকে সম্মান জানিয়ে আরব প্রতিনিধিদের সমর্থনে সরকার গঠনের আহ্বান জানান। শেষ পর্যন্ত বিরোধী নেতা আইজেনকট রাজনৈতিক শিবিরের কিছু ডানপন্থী সদস্যের আপত্তি সত্ত্বেও আরব দলগুলোর সমর্থনে সরকার গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
দেশের অভ্যন্তরে দুর্নীতির মামলা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) জারি করা গ্রেফতারি পরোয়ানার কারণে নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও জটিল হয়ে উঠেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইসরাইলপন্থী লবির প্রভাব হ্রাস
২০২৬ সালের ৩ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ইসরাইল-সমর্থিত প্রার্থীদের প্রত্যাশার চেয়ে খারাপ ফলাফল ইসরাইলের জন্য, বিশেষ করে নেতানিয়াহুর জন্য, পরিস্থিতি আরও জটিল করে তুলেছে।
সিনেট ও কংগ্রেস—উভয় কক্ষেই ইসরাইলবিরোধী ও ফিলিস্তিনপন্থী প্রার্থীদের বড় বিজয় যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে ইসরাইলি অর্থের দীর্ঘদিনের প্রভাবকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। বিপুল অর্থ ব্যয় করে নির্বাচনে প্রভাব বিস্তার ও নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালানো ইসরাইলপন্থী শক্তিশালী লবি সংগঠন আমেরিকান ইসরাইল পাবলিক অ্যাফেয়ার্স কমিটি (এআইপ্যাক)-এর জন্য এ নির্বাচন বড় ধরনের বিপর্যয় হিসেবে দেখা দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের তরুণ প্রজন্মের ভোটারদের মধ্যে, এমনকি ইহুদি বংশোদ্ভূত ভোটারদের একাংশের মধ্যেও, গাজায় গণহত্যা, ফিলিস্তিনিদের হত্যায় মার্কিন অর্থের ব্যবহার এবং ইরানের বিরুদ্ধে অনুমোদনহীন যুদ্ধের বিরোধিতা জোরালো হয়েছে।
সিনেটে বিজয়ী কয়েকজন প্রার্থী, যাঁদের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম মুসলিম সিনেটর আবদুল এল-সায়েদও রয়েছেন, প্রকাশ্যেই ইসরাইল কিংবা অন্য কোনো বিদেশি দেশকে অর্থ সহায়তা দেওয়ার বিরোধিতা করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, বিদেশে অর্থ ব্যয় না করে সেই অর্থ যুক্তরাষ্ট্রের মানুষের জীবনযাত্রার অসহনীয় ব্যয়, জ্বালানি তেলের দাম, স্বাস্থ্যসেবা ও বাড়িভাড়ার ব্যয় কমাতে ব্যবহার করা উচিত। তাঁরা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধেরও বিরোধিতা করেছেন।
প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছেন, চলতি বছরের শেষ নাগাদ ইসরাইলকে মার্কিন অর্থায়ন বন্ধ করা হবে। নতুন সিনেট ও কংগ্রেস যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের কল্যাণে আরও পদক্ষেপ নিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আরব দলগুলো হয়ে উঠেছে ক্ষমতা নির্ধারণের প্রধান শক্তি
নির্বাচনের সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনাগুলোর একটি হলো আরব রাজনৈতিক দলগুলোর সংসদীয় প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি। নির্বাচনের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, দলগুলোর সম্মিলিত ১৯টি আসন একটি ঐতিহাসিক অর্জন। এর ফলে আরব নাগরিকদের জাতীয় রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে আরও বেশি প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।
ইসরাইলে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বভিত্তিক নির্বাচনী ব্যবস্থা চালু রয়েছে। এ ব্যবস্থায় ভোটাররা নির্দিষ্ট কোনো আসনের প্রার্থীকে নয়, বরং রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন। নির্বাচনে প্রতিটি দল যত শতাংশ ভোট পায়, নির্ধারিত নির্বাচনী সীমা অতিক্রম করার শর্তে সেই অনুপাতে সংসদে আসন বরাদ্দ হয়।
এ কারণে আরব দলগুলোর নির্বাচনী সাফল্য গণতান্ত্রিক দৃষ্টিকোণ থেকে যথেষ্ট তাৎপর্যপূর্ণ। এটি প্রমাণ করে, আরব নাগরিকরা গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিজেদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে আগ্রহী।
তবে এখন বড় প্রশ্ন হলো, দেশটির রাজনৈতিক নেতৃত্ব আরব নাগরিকদের এই নির্বাচনী রায়কে কতটা স্বীকৃতি দেবে এবং সরকার পরিচালনায় তাদের অর্থবহ অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করবে কি না।
আরব দলগুলোকে বাদ দেওয়া জাতিগত বৈষম্যের শামিল
প্রধান ইহুদিপ্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আরব নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সহযোগিতার ব্যাপারে অনীহা সমতা, নাগরিক অধিকার ও গণতান্ত্রিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে গুরুতর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
আরব রাজনৈতিক দল বালাদের নেতা সামি আবু শাহাদেহের অভিযোগ, জাতিগত বিদ্বেষের কারণেই নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে ইসরাইলের বিরোধী নেতারা আরব দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা করতে চাইছেন না।
তাওআল পার্টির নেতা আহমদ তিবিও জানিয়েছেন, সংসদীয় সহযোগিতার বিষয়ে বিরোধী প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। এর মধ্যে নেসেটের স্পিকার পরিবর্তনের বিষয়টিও রয়েছে।
এসব ঘটনা থেকে বোঝা যায়, আনুষ্ঠানিকভাবে সরকার গঠনের জোট নিয়ে বিতর্ক থাকলেও রাজনৈতিক সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। একটি গণতান্ত্রিক সমাজে কোনো নির্বাচিত প্রতিনিধিকে শুধু তাঁর জাতিগত কিংবা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে রাজনৈতিক প্রক্রিয়া থেকে বাদ দেওয়া উচিত নয়।
গাজা ও পশ্চিম তীর: মানবিক বিপর্যয় এখনো অব্যাহত
ইসরাইলের রাজনৈতিক পালাবদলকে গাজা যুদ্ধের ভয়াবহ মানবিক পরিণতি এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরের চলমান সংকট থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই।
ফিলিস্তিনিরা ঘরবাড়ি, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বেসামরিক অবকাঠামোর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, গণহারে বাস্তুচ্যুতি, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহে কঠোর বিধিনিষেধ এবং অসংখ্য মানুষের প্রাণহানির শিকার হয়েছেন। এই মানবিক বিপর্যয় সামরিক অভিযান পরিচালনার ধরন, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের অধীনে রাষ্ট্রগুলোর দায়িত্ব নিয়ে গভীর প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
অন্যদিকে পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণ, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা, ঘরবাড়ি ও স্থাপনা উচ্ছেদ এবং ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত করার ঘটনা আরও তীব্র হয়েছে। এতে ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা গণহত্যার মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) ইসরাইলের বিরুদ্ধে অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন। এসব নির্দেশনার গুরুত্বপূর্ণ আইনি তাৎপর্য রয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক আইনে নিষিদ্ধ কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ এবং বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করার বিষয়টিও এতে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে।
ইসরাইলের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে যে পরিবর্তনই আসুক না কেন, ফিলিস্তিনিদের মানবিক সংকটের প্রতি জরুরি মনোযোগ দেওয়া প্রয়োজন।
বসতি সম্প্রসারণ, ভূমি দখল ও গণতন্ত্রের স্ববিরোধিতা
অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণ ন্যায়সংগত ও স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠার পথে সবচেয়ে বড় বাধাগুলোর একটি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এসব বসতিকে আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী বলে বিবেচনা করে আসছে। জাতিসংঘের বিভিন্ন প্রস্তাবেও এ অবস্থানের প্রতিফলন রয়েছে।
কোনো সরকার গণতান্ত্রিক বৈধতার দাবি করলে শুধু নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে তার মূল্যায়ন যথেষ্ট নয়। সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী এবং সরকারি নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের সঙ্গে সরকার কেমন আচরণ করছে, সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
ইসরাইলের সমর্থকেরা দেশটির প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন ও সংসদীয় প্রতিষ্ঠানকে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রমাণ হিসেবে তুলে ধরেন। তবে সমালোচকদের মতে, আরব নাগরিকদের সঙ্গে অসম আচরণ এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে অব্যাহত দখলদারিত্ব গণতান্ত্রিক নীতি ও বাস্তব রাজনৈতিক চর্চার মধ্যে গভীর স্ববিরোধিতা প্রকাশ করে।
এ ক্ষেত্রে মৌলিক পরীক্ষা হলো—নাগরিক এবং রাষ্ট্রীয় নীতির দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত অন্যান্য জনগোষ্ঠীর অধিকার ও আইনি সুরক্ষা সমানভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না।
সর্বজনীন মানবাধিকার রক্ষায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব
ইসরাইলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ দেশটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপরও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলবে। গাজা যুদ্ধ, বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে আচরণের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইল ব্যাপক সমালোচনা ও আইনি পর্যালোচনার মুখে পড়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সরকারগুলোর সামনে এখন কঠিন প্রশ্ন—মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি তাদের ঘোষিত অঙ্গীকারের সঙ্গে ইসরাইলের প্রতি তাদের কূটনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?
পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি জনগোষ্ঠীর বসতি উচ্ছেদ এবং তাদের জীবিকা ধ্বংসের ঘটনা পর্যবেক্ষণ করতে যাওয়া আন্তর্জাতিক সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ ও পর্যবেক্ষকদের ওপর হামলার খবরও বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। ফিলিস্তিনি কৃষকদের উচ্ছেদ এবং তাদের জীবিকা ধ্বংসের ঘটনা নথিভুক্ত করতে যাঁরা কাজ করছেন, তাঁদের অবশ্যই ভয়ভীতি ও সহিংসতার শিকার না হয়ে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।
একইভাবে আরব ও মুসলিম জনগোষ্ঠীকে বিদ্বেষ, বৈষম্য ও সামষ্টিকভাবে দায়ী করার প্রবণতা থেকে সুরক্ষা দিতে হবে। মানবাধিকার সর্বজনীন। ধর্ম, জাতীয়তা কিংবা রাজনৈতিক পরিচয়ের ভিত্তিতে মানবাধিকারের ক্ষেত্রে কোনো পার্থক্য করা উচিত নয়।
সংসদীয় আসনের হিসাব ছাড়িয়ে গণতন্ত্রের প্রকৃত পরীক্ষা
আরব দলগুলোর সমর্থনে সরকার গঠন নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ঘটনা হবে। তবে এর মাধ্যমে ইসরাইলের কাঠামোগত বৈষম্য কিংবা ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাতের স্বয়ংক্রিয় সমাধান হবে না।
সরকারে আরব দলগুলোর অন্তর্ভুক্তি রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বাড়ানো, জনসেবার মান উন্নত করা এবং সংখ্যালঘুদের অধিকার আরও কার্যকরভাবে সুরক্ষার সুযোগ তৈরি করতে পারে। কিন্তু এর প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে এই অংশগ্রহণের ফলে সমতা, নাগরিক স্বাধীনতা এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি আচরণে বাস্তব ও পরিমাপযোগ্য পরিবর্তন আসে কি না, তার ওপর।
আইজেনকট ও বিরোধী জোটের অন্য নেতাদের স্পষ্ট করতে হবে, দখলদারিত্ব, বসতি সম্প্রসারণ এবং গাজায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ের মতো বিষয় মোকাবিলা করার পাশাপাশি তাঁদের সরকার কীভাবে গণতান্ত্রিক সমতা নিশ্চিত করবে।
যেসব মানুষের মৌলিক অধিকার সরকারের নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তাঁদের অধিকার উপেক্ষা করে কোনো সরকারই গণতান্ত্রিক নবজাগরণের দাবি করতে পারে না।
উপসংহার: গণতন্ত্রের অর্থ সমতা, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা
২০২৬ সালের ২৭ অক্টোবরের ইসরাইলের নির্বাচন দেশটির সামনে এমন এক রাজনৈতিক সম্ভাবনা তৈরি করেছে, যা কেবল একজন প্রধানমন্ত্রীর পরিবর্তনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। মূল প্রশ্ন হলো, ইসরাইল তার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আরব নাগরিকদের সমান রাজনৈতিক অধিকার এবং দখলদারিত্বের অধীনে বসবাসরত ফিলিস্তিনিদের মৌলিক অধিকারকে কতটা সমন্বিত করতে পারবে।
গণতন্ত্র মানে শুধু ভোট দেওয়ার অধিকার নয়। এর অর্থ সমান নাগরিকত্ব, জবাবদিহিমূলক সরকার, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা এবং মানুষের মর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা।
যুক্তরাষ্ট্রের সিনেট ও কংগ্রেসে ডেমোক্রেটিক পার্টির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় দীর্ঘদিনের মার্কিন-ইসরাইল সম্পর্ক নতুন করে পর্যালোচনার মুখে পড়তে পারে। এত দিন এই সম্পর্কের কারণে ফিলিস্তিনের অবৈধ দখলদারিত্ব ও গাজায় গণহত্যা অব্যাহত রাখার সুযোগ তৈরি হয়েছিল।
ইসরাইলের নতুন সরকারকে এখন এক ঐতিহাসিক পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হবে। রাজনৈতিক ক্ষমতা কি সমতা, ন্যায়বিচার ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের স্বার্থে ব্যবহৃত হবে, নাকি ভিন্ন রাজনৈতিক নেতৃত্বের অধীনেও বর্জন, বৈষম্য ও দখলদারিত্বের পুরোনো ধারা অব্যাহত থাকবে?
লেখক: ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. শাহজাহান খান OAM অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ডের ইমেরিটাস অধ্যাপক, বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের প্রবাসী ফেলো এবং ঢাকার এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের সাবেক উপাচার্য।


