যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলে এখনো জাতিবিদ্বেষ ও অস্পৃশ্যতার ভয়াবহ চিত্র

পড়তে ১ মিনিট


বর্তমানে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় রয়েছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। একটি হলো ইসরাইলের নির্বাচন ও সেখানে সৃষ্ট রাজনৈতিক অচলাবস্থা। অন্যটি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ও সিনেটের মধ্যবর্তী নির্বাচন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, উভয় ক্ষেত্রেই জাতিবিদ্বেষ, বর্ণবৈষম্য ও অস্পৃশ্যতার প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অথচ এই দেশগুলোই নিজেদের সভ্যতা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের অন্যতম ধারক-বাহক হিসেবে দাবি করে। বাস্তবতা হলো, আধুনিক সভ্যতার নানা অর্জনের পরও এসব দেশে বৈষম্য ও বিদ্বেষের চর্চা এখনো প্রবলভাবে বিদ্যমান।

‘আপার্টহাইট’ শব্দটি উচ্চারিত হলেই আমাদের মনে পড়ে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থার কথা। শ্বেতাঙ্গ শাসকদের আমলে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো হতো ভয়াবহ নির্যাতন। তাদের বসবাসের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল। শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থানসহ নাগরিক জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হতো। বর্ণবৈষম্য, বর্ণবাদ, পৃথকীকরণ ও জাতিবিদ্বেষ—এসবই ছিল সেই ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

শ্বেতাঙ্গ শাসকেরা কৃষ্ণাঙ্গদের সমান নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চাইতেন না। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রাম করেছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা। তাঁকে বছরের পর বছর কারাগারে বন্দি থাকতে হয়েছিল। অবশেষে তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলন সফল হয় এবং ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটে। সে সময় বর্ণবাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। বিশ্ববাসী প্রত্যাশা করেছিল, মানবসভ্যতা একদিন বর্ণবৈষম্যের কলঙ্ক থেকে মুক্ত হবে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং তাদের মিত্রদের ইতিহাসেও বর্ণবাদ ও জাতিবিদ্বেষের গভীর শিকড় রয়েছে। এসব দেশের ঔপনিবেশিক শাসন, ভূমি দখল, দাসপ্রথা ও গণহত্যার ইতিহাস আজও মানবসভ্যতার জন্য এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। আমেরিকার শ্বেতাঙ্গদের হাতে আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের হত্যা, তাঁদের ভূমি দখল এবং নির্যাতনের ঘটনা ইতিহাসে সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। একইভাবে কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে চালানো হয়েছে অমানবিক নির্যাতন ও নিপীড়ন।

হ্যারিয়েট বিচার স্টো রচিত টম কাকার কুটির উপন্যাসে মার্কিন সমাজে দাসপ্রথা ও কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর নির্যাতনের একটি মর্মস্পর্শী চিত্র ফুটে উঠেছে। এই সাহিত্যকর্ম শুধু একটি সময়ের বাস্তবতাকেই তুলে ধরেনি, বরং বর্ণবৈষম্য ও মানবিক মর্যাদাহানির বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে সচেতনতা তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

দুঃখজনক হলো, ইতিহাসের সেই বৈষম্যমূলক মানসিকতা এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং তাদের মিত্রদের নীতিতে বিভিন্ন সময়ে বর্ণবাদ, জাতিবিদ্বেষ, দমন-পীড়ন ও সামরিক আগ্রাসনের প্রতিফলন দেখা যায়। সাম্প্রতিক দুটি ঘটনা এ বাস্তবতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

ইসরাইলে ফিলিস্তিনিরা এখনো বৈষম্যের শিকার

বর্তমান বিশ্বে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জাতিগত বৈষম্য ও নিপীড়নের অন্যতম বড় উদাহরণ হিসেবে ইসরাইলের কথা সামনে আসে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ, বাস্তুচ্যুত করা এবং সেখানে ইহুদি বসতি স্থাপনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে ইহুদিদের এনে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বসতি স্থাপনের প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে নতুন রূপ লাভ করে।

এরপর থেকে ফিলিস্তিনিদের ভূমি দখল, বসতি সম্প্রসারণ, হত্যা ও উচ্ছেদের ঘটনা ধারাবাহিকভাবে ঘটছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তাঁর সরকারের নীতির কারণে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযান, ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামো ধ্বংসের ঘটনা বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছে। নিহতদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক নারী ও শিশু রয়েছে। ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনেকেও ইসরাইলি হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন।

গাজায় সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসযজ্ঞকে গণহত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক থাকলেও, এর ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় অস্বীকার করার সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, নেতানিয়াহু এবং পশ্চিমা বিশ্বের অনেক সরকার ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ফলে ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ অব্যাহত রয়েছে। গাজার পাশাপাশি পশ্চিমতীর ও লেবাননেও ইসরাইলি সামরিক অভিযান এবং হামলার ঘটনা ঘটছে।

এসব ঘটনার মধ্যেই ইসরাইলের সাম্প্রতিক নির্বাচন দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে।

দীর্ঘদিন ধরেই ইসরাইলে জোটনির্ভর সরকারব্যবস্থা চলে আসছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি বড় রাজনৈতিক শক্তি হলেও এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ২০২৬ সালের নির্বাচনেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কোনো দল বা জোট এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। গাজায় হত্যাযজ্ঞ, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাতের পরও নেতানিয়াহু প্রত্যাশিত জনসমর্থন পাননি। বরং ইরানের পাল্টা হামলায় ইসরাইলের বিভিন্ন শহর ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির জন্য দেশটির একাংশের মানুষ নেতানিয়াহু সরকারের নীতিকে দায়ী করেছেন। ফলে তাঁর দলের আসনসংখ্যাও আগের তুলনায় কমেছে। এখন সরকার গঠনের জন্য অন্য দলগুলোর সমর্থন প্রয়োজন লিকুদ পার্টির।

অন্যদিকে, ইসরাইলের অভ্যন্তরে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি আরব জনগোষ্ঠীও দেশটির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রাখে। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ফিলিস্তিনি আরব। তাঁদের সংখ্যা আনুমানিক ২১ লাখ। এবারের নির্বাচনে আরব দলগুলো সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সরকার গঠনের সমীকরণে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নির্বাচনের পর প্রকাশিত আসনবণ্টনের হিসাব অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে বিরোধী নেতা গাদি আইসেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোটের আসনসংখ্যা ৬৭। ফলে আরব দলগুলোই হয়ে উঠেছে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক শক্তি।

কিন্তু এখানেই প্রকাশ পেয়েছে ইসরাইলের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ফিলিস্তিনি আরবদের প্রতি বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি। নেতানিয়াহু বারবার আরব ফিলিস্তিনি সংসদ সদস্যদের সন্ত্রাসবাদের সমর্থক বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁদের নির্বাচনী সাফল্যের পেছনে কাতারসহ বিভিন্ন দেশের অর্থায়ন রয়েছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন। এমনকি তাঁদের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন তিনি।

যদিও ইসরাইলের নির্বাচন কমিশন এসব অভিযোগের পক্ষে ভিত্তি থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছে, তারপরও দেশটির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেত বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। এ ঘটনায় কয়েকজন ফিলিস্তিনি আরবকে গ্রেপ্তারের কথাও জানা গেছে। তবে অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত সুস্পষ্ট প্রমাণ সামনে আসেনি।

বাস্তবে আরব দলগুলোর ১৯টি আসন সরকার গঠনের সমীকরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা নেতানিয়াহুকে সমর্থন করবে না—এমনটাই ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে বিরোধী জোটের নেতা গাদি আইসেনকোটের প্রতি সমর্থন দেওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। কিন্তু তিনিও আরব ফিলিস্তিনিদের সমর্থন গ্রহণ করতে দ্বিধায় রয়েছেন। কারণ, তাঁদের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করলে তাঁকে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে চিহ্নিত করা হতে পারে—এমন রাজনৈতিক আশঙ্কা তাঁর মধ্যে কাজ করছে।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। নেতানিয়াহু ও আইসেনকোট রাজনৈতিকভাবে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও ফিলিস্তিনি আরবদের রাজনৈতিক সমর্থন গ্রহণের প্রশ্নে তাঁদের মধ্যে একধরনের অস্বস্তি রয়েছে। দুজনের রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য থাকলেও ফিলিস্তিনিদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে বৈষম্যের প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, ইসরাইলের নাগরিক হয়েও ফিলিস্তিনি আরবরা কি দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সমান মর্যাদা ও অধিকার পাচ্ছেন?

এ যেন প্রাচীন ভারতের অস্পৃশ্যতা প্রথারই এক আধুনিক রাজনৈতিক সংস্করণ। সেখানে ধর্ম ও জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা হতো। আর এখানে মুসলিম ও ফিলিস্তিনি পরিচয়ের কারণে নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রেও মুসলিমদের প্রতি বৈষম্য ও বিদ্বেষ

জাতিবিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতার আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে। নিজেদের গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের আদর্শের প্রবক্তা হিসেবে পরিচয় দেওয়া দেশটিতেও মুসলিম রাজনীতিকদের প্রায়ই ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে আক্রমণের শিকার হতে হচ্ছে।

২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মুসলিম রাজনীতিক আবদুল আল-সাইয়েদের বিজয় বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। তাঁর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ভোটারদের তাঁকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাম্পের প্রচারণা ও সমালোচনা উপেক্ষা করে ভোটারদের সমর্থনে তিনি জয়ী হয়েছেন। তাঁর এই বিজয় মার্কিন রাজনীতিতে মুসলিমদের অংশগ্রহণ ও গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

একইভাবে মুসলিম নারী কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমরকেও ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন। এমনকি তাঁর নাগরিকত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে এ ধরনের বক্তব্য শুধু ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বরং ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতারও বহিঃপ্রকাশ।

প্রশ্ন হলো, যে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার কথা বলে, সেই দেশেই যদি মুসলিম পরিচয়ের কারণে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বারবার অপমান ও সন্দেহের মুখে পড়তে হয়, তাহলে দেশটির ঘোষিত মূল্যবোধের সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক কোথায়?

অস্পৃশ্যতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি

দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসনের অবসান ঘটেছে। নেলসন ম্যান্ডেলার দীর্ঘ সংগ্রাম বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছে, ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মাধ্যমে বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার অবসান ঘটানো সম্ভব। কিন্তু সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরিবর্তে বিশ্বের ক্ষমতাধর কিছু রাষ্ট্র এখনো ধর্ম, বর্ণ ও জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষের অধিকার সংকুচিত করছে।

ইসরাইলে ফিলিস্তিনি আরবদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে বিতর্ক, গাজায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় এবং যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম রাজনীতিকদের প্রতি বিদ্বেষ—সবকিছুই একই বাস্তবতার ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও উন্নত প্রযুক্তির যুগেও মানুষের প্রতি মানুষের বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি দূর হয়নি।

একসময় বর্ণের ভিত্তিতে মানুষকে অস্পৃশ্য মনে করা হতো। আজ অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়কে কেন্দ্র করে একই ধরনের বিভাজন তৈরি করা হচ্ছে। বিশেষ করে মুসলিমদের বিরুদ্ধে এই বিদ্বেষ ও বৈষম্যের প্রবণতা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে উদ্বেগজনকভাবে দৃশ্যমান।

তাই বলা যায়, টম কাকার কুটিরে যে নিপীড়ন, অবমাননা ও অস্পৃশ্যতার চিত্র ফুটে উঠেছিল, তার অবসান এখনো ঘটেনি। বরং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তা নতুন নতুন রূপে ফিরে আসছে। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে মজলুম মানুষকে আরও দীর্ঘদিন সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। কারণ, মানুষের মর্যাদা, সমান অধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ছাড়া কোনো রাষ্ট্রই প্রকৃত অর্থে সভ্য হয়ে উঠতে পারে না।


বর্তমানে বিশ্বজুড়ে আলোচনায় রয়েছে দুটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। একটি হলো ইসরাইলের নির্বাচন ও সেখানে সৃষ্ট রাজনৈতিক অচলাবস্থা। অন্যটি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস ও সিনেটের মধ্যবর্তী নির্বাচন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, উভয় ক্ষেত্রেই জাতিবিদ্বেষ, বর্ণবৈষম্য ও অস্পৃশ্যতার প্রবণতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অথচ এই দেশগুলোই নিজেদের সভ্যতা, গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের অন্যতম ধারক-বাহক হিসেবে দাবি করে। বাস্তবতা হলো, আধুনিক সভ্যতার নানা অর্জনের পরও এসব দেশে বৈষম্য ও বিদ্বেষের চর্চা এখনো প্রবলভাবে বিদ্যমান।

‘আপার্টহাইট’ শব্দটি উচ্চারিত হলেই আমাদের মনে পড়ে দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থার কথা। শ্বেতাঙ্গ শাসকদের আমলে কৃষ্ণাঙ্গ জনগোষ্ঠীর ওপর চালানো হতো ভয়াবহ নির্যাতন। তাদের বসবাসের জন্য নির্দিষ্ট এলাকা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল। শিক্ষা, চিকিৎসা, কর্মসংস্থানসহ নাগরিক জীবনের প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে বৈষম্যমূলক আচরণ করা হতো। বর্ণবৈষম্য, বর্ণবাদ, পৃথকীকরণ ও জাতিবিদ্বেষ—এসবই ছিল সেই ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ।

শ্বেতাঙ্গ শাসকেরা কৃষ্ণাঙ্গদের সমান নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে চাইতেন না। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সংগ্রাম করেছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলা। তাঁকে বছরের পর বছর কারাগারে বন্দি থাকতে হয়েছিল। অবশেষে তাঁর নেতৃত্বে পরিচালিত আন্দোলন সফল হয় এবং ১৯৯৪ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসনব্যবস্থার অবসান ঘটে। সে সময় বর্ণবাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল। বিশ্ববাসী প্রত্যাশা করেছিল, মানবসভ্যতা একদিন বর্ণবৈষম্যের কলঙ্ক থেকে মুক্ত হবে।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং তাদের মিত্রদের ইতিহাসেও বর্ণবাদ ও জাতিবিদ্বেষের গভীর শিকড় রয়েছে। এসব দেশের ঔপনিবেশিক শাসন, ভূমি দখল, দাসপ্রথা ও গণহত্যার ইতিহাস আজও মানবসভ্যতার জন্য এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। আমেরিকার শ্বেতাঙ্গদের হাতে আদিবাসী রেড ইন্ডিয়ানদের হত্যা, তাঁদের ভূমি দখল এবং নির্যাতনের ঘটনা ইতিহাসে সুস্পষ্টভাবে লিপিবদ্ধ রয়েছে। একইভাবে কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর দীর্ঘদিন ধরে চালানো হয়েছে অমানবিক নির্যাতন ও নিপীড়ন।

হ্যারিয়েট বিচার স্টো রচিত টম কাকার কুটির উপন্যাসে মার্কিন সমাজে দাসপ্রথা ও কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর নির্যাতনের একটি মর্মস্পর্শী চিত্র ফুটে উঠেছে। এই সাহিত্যকর্ম শুধু একটি সময়ের বাস্তবতাকেই তুলে ধরেনি, বরং বর্ণবৈষম্য ও মানবিক মর্যাদাহানির বিরুদ্ধে বিশ্বজুড়ে সচেতনতা তৈরিতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

দুঃখজনক হলো, ইতিহাসের সেই বৈষম্যমূলক মানসিকতা এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন এবং তাদের মিত্রদের নীতিতে বিভিন্ন সময়ে বর্ণবাদ, জাতিবিদ্বেষ, দমন-পীড়ন ও সামরিক আগ্রাসনের প্রতিফলন দেখা যায়। সাম্প্রতিক দুটি ঘটনা এ বাস্তবতাকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে।

ইসরাইলে ফিলিস্তিনিরা এখনো বৈষম্যের শিকার

বর্তমান বিশ্বে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে জাতিগত বৈষম্য ও নিপীড়নের অন্যতম বড় উদাহরণ হিসেবে ইসরাইলের কথা সামনে আসে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহযোগিতায় ফিলিস্তিনিদের নিজ ভূমি থেকে উচ্ছেদ, বাস্তুচ্যুত করা এবং সেখানে ইহুদি বসতি স্থাপনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে ইহুদিদের এনে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে বসতি স্থাপনের প্রক্রিয়া শেষ পর্যন্ত ১৯৪৮ সালে ইসরাইল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে নতুন রূপ লাভ করে।

এরপর থেকে ফিলিস্তিনিদের ভূমি দখল, বসতি সম্প্রসারণ, হত্যা ও উচ্ছেদের ঘটনা ধারাবাহিকভাবে ঘটছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং তাঁর সরকারের নীতির কারণে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে গাজায় ইসরাইলি সামরিক অভিযান, ব্যাপক প্রাণহানি ও অবকাঠামো ধ্বংসের ঘটনা বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেছে। নিহতদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক নারী ও শিশু রয়েছে। ফিলিস্তিনের রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনেকেও ইসরাইলি হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন।

গাজায় সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ ও ধ্বংসযজ্ঞকে গণহত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করা নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিতর্ক থাকলেও, এর ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় অস্বীকার করার সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, নেতানিয়াহু এবং পশ্চিমা বিশ্বের অনেক সরকার ইসরাইলের কর্মকাণ্ডের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। ফলে ফিলিস্তিনিদের দুর্ভোগ অব্যাহত রয়েছে। গাজার পাশাপাশি পশ্চিমতীর ও লেবাননেও ইসরাইলি সামরিক অভিযান এবং হামলার ঘটনা ঘটছে।

এসব ঘটনার মধ্যেই ইসরাইলের সাম্প্রতিক নির্বাচন দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক বৈষম্যের বিষয়টি নতুন করে সামনে এনেছে।

দীর্ঘদিন ধরেই ইসরাইলে জোটনির্ভর সরকারব্যবস্থা চলে আসছে। প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টি বড় রাজনৈতিক শক্তি হলেও এককভাবে সরকার গঠনের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। ২০২৬ সালের নির্বাচনেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। কোনো দল বা জোট এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি। গাজায় হত্যাযজ্ঞ, ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ এবং ইরানের সঙ্গে সংঘাতের পরও নেতানিয়াহু প্রত্যাশিত জনসমর্থন পাননি। বরং ইরানের পাল্টা হামলায় ইসরাইলের বিভিন্ন শহর ও অবকাঠামোর ক্ষয়ক্ষতির জন্য দেশটির একাংশের মানুষ নেতানিয়াহু সরকারের নীতিকে দায়ী করেছেন। ফলে তাঁর দলের আসনসংখ্যাও আগের তুলনায় কমেছে। এখন সরকার গঠনের জন্য অন্য দলগুলোর সমর্থন প্রয়োজন লিকুদ পার্টির।

অন্যদিকে, ইসরাইলের অভ্যন্তরে বসবাসকারী ফিলিস্তিনি আরব জনগোষ্ঠীও দেশটির রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রাখে। দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-পঞ্চমাংশ ফিলিস্তিনি আরব। তাঁদের সংখ্যা আনুমানিক ২১ লাখ। এবারের নির্বাচনে আরব দলগুলো সম্মিলিতভাবে ১৯টি আসন পেয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ফলে সরকার গঠনের সমীকরণে তাদের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

নির্বাচনের পর প্রকাশিত আসনবণ্টনের হিসাব অনুযায়ী, নেতানিয়াহুর নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৫৩টি আসন। অন্যদিকে বিরোধী নেতা গাদি আইসেনকোটের নেতৃত্বাধীন জোটের আসনসংখ্যা ৬৭। ফলে আরব দলগুলোই হয়ে উঠেছে সরকার গঠনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক শক্তি।

কিন্তু এখানেই প্রকাশ পেয়েছে ইসরাইলের রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ফিলিস্তিনি আরবদের প্রতি বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি। নেতানিয়াহু বারবার আরব ফিলিস্তিনি সংসদ সদস্যদের সন্ত্রাসবাদের সমর্থক বলে আখ্যায়িত করেছেন। তাঁদের নির্বাচনী সাফল্যের পেছনে কাতারসহ বিভিন্ন দেশের অর্থায়ন রয়েছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন। এমনকি তাঁদের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবিও জানিয়েছেন তিনি।

যদিও ইসরাইলের নির্বাচন কমিশন এসব অভিযোগের পক্ষে ভিত্তি থাকার বিষয়টি অস্বীকার করেছে, তারপরও দেশটির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা শিন বেত বিষয়টি নিয়ে তদন্ত শুরু করেছে। এ ঘটনায় কয়েকজন ফিলিস্তিনি আরবকে গ্রেপ্তারের কথাও জানা গেছে। তবে অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত সুস্পষ্ট প্রমাণ সামনে আসেনি।

বাস্তবে আরব দলগুলোর ১৯টি আসন সরকার গঠনের সমীকরণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা নেতানিয়াহুকে সমর্থন করবে না—এমনটাই ধারণা করা হচ্ছে। অন্যদিকে বিরোধী জোটের নেতা গাদি আইসেনকোটের প্রতি সমর্থন দেওয়ার সম্ভাবনাও রয়েছে। কিন্তু তিনিও আরব ফিলিস্তিনিদের সমর্থন গ্রহণ করতে দ্বিধায় রয়েছেন। কারণ, তাঁদের সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করলে তাঁকে ফিলিস্তিনিদের প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে চিহ্নিত করা হতে পারে—এমন রাজনৈতিক আশঙ্কা তাঁর মধ্যে কাজ করছে।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। নেতানিয়াহু ও আইসেনকোট রাজনৈতিকভাবে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও ফিলিস্তিনি আরবদের রাজনৈতিক সমর্থন গ্রহণের প্রশ্নে তাঁদের মধ্যে একধরনের অস্বস্তি রয়েছে। দুজনের রাজনৈতিক অবস্থানের পার্থক্য থাকলেও ফিলিস্তিনিদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে বৈষম্যের প্রবণতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। ফলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, ইসরাইলের নাগরিক হয়েও ফিলিস্তিনি আরবরা কি দেশটির রাজনৈতিক ব্যবস্থায় সমান মর্যাদা ও অধিকার পাচ্ছেন?

এ যেন প্রাচীন ভারতের অস্পৃশ্যতা প্রথারই এক আধুনিক রাজনৈতিক সংস্করণ। সেখানে ধর্ম ও জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষকে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন করা হতো। আর এখানে মুসলিম ও ফিলিস্তিনি পরিচয়ের কারণে নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ ও গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রেও মুসলিমদের প্রতি বৈষম্য ও বিদ্বেষ

জাতিবিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতার আরেকটি উল্লেখযোগ্য উদাহরণ দেখা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে। নিজেদের গণতন্ত্র, স্বাধীনতা ও মানবাধিকারের আদর্শের প্রবক্তা হিসেবে পরিচয় দেওয়া দেশটিতেও মুসলিম রাজনীতিকদের প্রায়ই ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে আক্রমণের শিকার হতে হচ্ছে।

২০২৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে মুসলিম রাজনীতিক আবদুল আল-সাইয়েদের বিজয় বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। তাঁর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন অভিযোগ তুলে ভোটারদের তাঁকে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু ট্রাম্পের প্রচারণা ও সমালোচনা উপেক্ষা করে ভোটারদের সমর্থনে তিনি জয়ী হয়েছেন। তাঁর এই বিজয় মার্কিন রাজনীতিতে মুসলিমদের অংশগ্রহণ ও গ্রহণযোগ্যতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

একইভাবে মুসলিম নারী কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমরকেও ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন সময়ে তীব্র ভাষায় আক্রমণ করেছেন। এমনকি তাঁর নাগরিকত্ব নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির বিরুদ্ধে এ ধরনের বক্তব্য শুধু ব্যক্তিগত আক্রমণ নয়, বরং ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতারও বহিঃপ্রকাশ।

প্রশ্ন হলো, যে যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বজুড়ে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও নাগরিক স্বাধীনতার কথা বলে, সেই দেশেই যদি মুসলিম পরিচয়ের কারণে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের বারবার অপমান ও সন্দেহের মুখে পড়তে হয়, তাহলে দেশটির ঘোষিত মূল্যবোধের সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক কোথায়?

অস্পৃশ্যতা ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম এখনো শেষ হয়নি

দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদী শাসনের অবসান ঘটেছে। নেলসন ম্যান্ডেলার দীর্ঘ সংগ্রাম বিশ্ববাসীকে দেখিয়েছে, ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের মাধ্যমে বৈষম্যমূলক ব্যবস্থার অবসান ঘটানো সম্ভব। কিন্তু সেই ইতিহাস থেকে শিক্ষা নেওয়ার পরিবর্তে বিশ্বের ক্ষমতাধর কিছু রাষ্ট্র এখনো ধর্ম, বর্ণ ও জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষের অধিকার সংকুচিত করছে।

ইসরাইলে ফিলিস্তিনি আরবদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিয়ে বিতর্ক, গাজায় ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় এবং যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম রাজনীতিকদের প্রতি বিদ্বেষ—সবকিছুই একই বাস্তবতার ভিন্ন ভিন্ন প্রকাশ। এসব ঘটনা প্রমাণ করে, আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ও উন্নত প্রযুক্তির যুগেও মানুষের প্রতি মানুষের বৈষম্যমূলক দৃষ্টিভঙ্গি দূর হয়নি।

একসময় বর্ণের ভিত্তিতে মানুষকে অস্পৃশ্য মনে করা হতো। আজ অনেক ক্ষেত্রে ধর্মীয় ও জাতিগত পরিচয়কে কেন্দ্র করে একই ধরনের বিভাজন তৈরি করা হচ্ছে। বিশেষ করে মুসলিমদের বিরুদ্ধে এই বিদ্বেষ ও বৈষম্যের প্রবণতা আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে উদ্বেগজনকভাবে দৃশ্যমান।

তাই বলা যায়, টম কাকার কুটিরে যে নিপীড়ন, অবমাননা ও অস্পৃশ্যতার চিত্র ফুটে উঠেছিল, তার অবসান এখনো ঘটেনি। বরং বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে তা নতুন নতুন রূপে ফিরে আসছে। এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে মজলুম মানুষকে আরও দীর্ঘদিন সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হবে। কারণ, মানুষের মর্যাদা, সমান অধিকার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ছাড়া কোনো রাষ্ট্রই প্রকৃত অর্থে সভ্য হয়ে উঠতে পারে না।

লেখক সম্পর্কে

এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন