অধ্যাপক শাহজাহান খান ‘অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া’ পদকে ভূষিত
লেখক:
অধ্যাপক শাহজাহান খান | ফাইল ছবি
কুইন্সল্যান্ডের বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ শহর টুউম্বাতে মুসলিম প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং বহুসাংস্কৃতিক সম্পর্ক উন্নয়নে অধ্যাপক শাহজাহান খান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
এমিরিটাস অধ্যাপক শাহজাহান খান একজন বিশিষ্ট বাংলাদেশি-অস্ট্রেলিয়ান শিক্ষাবিদ ও সমাজনেতা। ২০২৬ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর ব্রিসবেনের গভর্নমেন্ট হাউসে কুইন্সল্যান্ডের গভর্নর ড. জিনেট ইয়ং এসি পিএসএম-এর কাছ থেকে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে ‘মেডেল অব দ্য অর্ডার অব অস্ট্রেলিয়া’ (OAM) গ্রহণ করেন।
অস্ট্রেলিয়া দিবস, ২৬ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে গভর্নর-জেনারেল স্যাম মোস্টিন এসি তাঁর এই পুরস্কারের ঘোষণা দেন। কুইন্সল্যান্ড ও জাতীয় পর্যায়ে তাঁর কয়েক দশকের নেতৃত্ব এবং সেবামূলক কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ‘অস্ট্রেলিয়ার মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি অবদানের জন্য’ তাঁকে এই সম্মানে ভূষিত করা হয়।
অধ্যাপক শাহজাহান খান পরিসংখ্যানে তাঁর আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন একাডেমিক ক্যারিয়ারের পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়ায় তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে সামাজিক, বহুসাংস্কৃতিক ও আন্তঃধর্মীয় সেবায় অবদান রেখেছেন।
একাডেমিক ক্যারিয়ার
কানাডার ওয়েস্টার্ন ইউনিভার্সিটি থেকে গাণিতিক পরিসংখ্যানে পিএইচডি সম্পন্ন করার পর অধ্যাপক শাহজাহান খান ১৯৯২ সালে অস্ট্রেলিয়ায় অভিবাসিত হন। পরের বছর, ১৯৯৩ সালের জানুয়ারিতে, তিনি ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ডে (বর্তমানে ইউনিএসকিউ) যোগ দেন।
ইউনিএসকিউতে দীর্ঘ ক্যারিয়ারে তিনি পরিসংখ্যান বিভাগের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক হন এবং বিভিন্ন একাডেমিক, গবেষণা ও নেতৃত্বমূলক পদে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্ট্যাটিস্টিক্যাল কনসাল্টিং ইউনিট প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করেন। পাশাপাশি একাডেমিক কাউন্সিল, প্রোগ্রাম রিভিউ ও রিসার্চ কমিটি এবং বহুসাংস্কৃতিক বিষয়ক সংস্থায়ও দায়িত্ব পালন করেন।
তিনি ২০ জন পিএইচডি শিক্ষার্থীর তত্ত্বাবধান করেছেন এবং ২৬০টিরও বেশি জার্নাল নিবন্ধ প্রকাশ করেছেন। এছাড়া গবেষণা কর্মশালা পরিচালনা, প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য প্রদান এবং আন্তর্জাতিক সম্মেলনে ব্যাপকভাবে প্রবন্ধ উপস্থাপন করেছেন। তাঁর রচিত বইগুলোর মধ্যে স্প্রিঙ্গার প্রকাশিত ‘মেটা-অ্যানালাইসিস মেথডস’ এবং পরিসংখ্যানগত পদ্ধতি ও মডেলবিষয়ক একটি বই উল্লেখযোগ্য। তিনি ‘জার্নাল অব অ্যাপ্লাইড প্রবাবিলিটি অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্স’-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রধান সম্পাদকও।
পরিসংখ্যানে অবদানের জন্য অধ্যাপক শাহজাহান খান ২০০১ সালে ইসলামিক ওয়ার্ল্ড এডুকেশনাল, সায়েন্টিফিক অ্যান্ড কালচারাল অর্গানাইজেশন (ISESCO) গোল্ড মেডেল, ২০০৭ সালে ইসলামিক কান্ট্রিজ সোসাইটি অব স্ট্যাটিস্টিক্যাল সায়েন্সেস (ISOSS) গোল্ড মেডেল এবং ২০১২ সালে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান সমিতি থেকে কাজী মোতাহার হোসেন স্বর্ণপদকসহ অসংখ্য আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছেন। তিনি ইন্ডিয়ান অ্যাসোসিয়েশন ফর রিলায়াবিলিটি অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিক্স থেকেও লাইফটাইম অ্যাচিভমেন্ট অ্যাওয়ার্ড পেয়েছেন।
আইএসওএসএস (ISOSS)-এর সভাপতি হিসেবে তিনি মালয়েশিয়া, মিশর, কাতার, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়াসহ বিভিন্ন দেশে আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান সম্মেলন আয়োজনে সহায়তা করেছেন।
ইউনিএসকিউ (UniSQ) তাঁকে ২০২২ সালে প্রফেসর এমিরিটাস নিযুক্ত করে। ২০২৩ সালে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য চালু করা হয় ‘প্রফেসর শাহজাহান খান স্কলারশিপ’।
২০২২ থেকে ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত অধ্যাপক শাহজাহান খান এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের উপাচার্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের প্রবাসী ফেলোও নির্বাচিত হন।
মুসলিম সম্প্রদায় গঠন
একাডেমিক ক্যারিয়ারের পাশাপাশি অধ্যাপক খান কুইন্সল্যান্ডের বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ শহর টুউম্বাতে মুসলিম প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা এবং বহুসাংস্কৃতিক সম্পর্ক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।
ইসলামিক সোসাইটি অব টুউম্বার প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং টুউম্বা ইসলামিক চ্যারিটেবল ট্রাস্টের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি একটি পুরোনো গির্জার ভবন অধিগ্রহণে সহায়তা করেন। পরবর্তীতে সেটিই টুউম্বার প্রথম মসজিদে পরিণত হয়।
তিনি টুউম্বা অ্যানুয়াল ইন্টারন্যাশনাল ফুড ফেস্টিভ্যাল এবং মস্ক ওপেন ডে গঠনেও সহায়তা করেন। এসব আয়োজনের মাধ্যমে খাবার, বন্ধুত্ব ও আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির বন্ধনে মুসলিম ও সাধারণ সম্প্রদায়ের হাজার হাজার মানুষ একত্রিত হয়।
২০১৫ সালে গার্ডেন সিটি মসজিদ দুটি অগ্নিকাণ্ডের হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত হলে অধ্যাপক শাহজাহান খান মুসলিম ও অমুসলিমদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন। একই সঙ্গে তিনি সমগ্র অস্ট্রেলিয়া থেকে তহবিল সংগ্রহে সহায়তা করেন এবং মসজিদটি পুনর্নির্মাণের প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দেন।
সেই প্রচেষ্টার ফলেই বিশেষ কাঠামোর একটি মসজিদ নির্মিত হয়, যেখানে একসঙ্গে ৫০০ জনেরও বেশি মুসল্লি নামাজ আদায় করতে পারেন। মসজিদটিতে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও সৌরবিদ্যুৎসহ পরিবেশবান্ধব ও টেকসই বিভিন্ন সুবিধা যুক্ত রয়েছে।
অধ্যাপক শাহজাহান খান সংসদ সদস্য, মেয়র, কাউন্সিলর, বিশপ, বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃবৃন্দ এবং সরকারি কর্মকর্তাসহ নাগরিক ও ধর্মীয় নেতাদের সঙ্গে কাজ করে আন্তঃধর্মীয় বোঝাপড়া ও সম্প্রীতি উৎসাহিত করেছেন। টুউম্বাতে তাঁর অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২১ সালে ‘টুউম্বা ক্রনিকল’ তাঁকে শহরের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে।
টুউম্বার সীমানা ছাড়িয়ে সেবা
অধ্যাপক শাহজাহান খানের সামাজিক নেতৃত্ব কুইন্সল্যান্ডের গণ্ডি পেরিয়ে পুরো অস্ট্রেলিয়ায় বিস্তৃত হয়েছে।
তিনি ইসলামিক কাউন্সিল অব কুইন্সল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ান ফেডারেশন অব ইসলামিক কাউন্সিলস-এ দায়িত্ব পালন করেছেন। পাশাপাশি মুসলিম কমিউনিটি কোঅপারেটিভ অস্ট্রেলিয়া (MCCA)-এর বোর্ড সদস্য ছিলেন।
ইউনিএসকিউতে তিনি ২০১৩ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত মাল্টিকালচারাল স্টাফ নেটওয়ার্কের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় তিনি বহুসাংস্কৃতিক ও বহুধর্মীয় সেমিনার, সম্মেলন এবং সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন।
তিনি ২০০১ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ইউনিএসকিউ ইসলামিক সেন্টার প্রতিষ্ঠা ও সমন্বয়ের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রার্থনাকেন্দ্রে মুসলিমদের জন্য নামাজের সুবিধা প্রতিষ্ঠায়ও তিনি অবদান রাখেন।
অধ্যাপক শাহজাহান খান সামাজিক সংহতি বৃদ্ধি এবং বর্ণবাদ, চরমপন্থা ও সামাজিক বিভাজনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন উদ্যোগে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন।
তাঁর মানবিক কাজের মধ্যে শরণার্থী, নারী, তরুণ এবং সমাজের অন্যান্য অসচ্ছল সদস্যদের সহায়তা করা রয়েছে। পাশাপাশি অস্ট্রেলিয়া ও বিদেশে সাইক্লোন, দাবানল এবং অন্যান্য দুর্যোগের পর তহবিল সংগ্রহেও তিনি সহায়তা করেছেন।
বছরের পর বছর ধরে তাঁর সামাজিক অবদানকে বেশ কয়েকটি পুরস্কারের মাধ্যমে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে কুইন্সল্যান্ড সরকার কালচারাল ডাইভারসিটি অ্যাম্বাসেডর অ্যাওয়ার্ড, কুইন্সল্যান্ড পুলিশ সার্ভিস কমিউনিটি সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড, কুইন্সল্যান্ড মাল্টিকালচারাল সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড এবং ইসলামিক কাউন্সিল অব কুইন্সল্যান্ড কমিউনিটি সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড।
তিনি ইউনিএসকিউ থেকেও গবেষণা প্রকাশনা, সমাজসেবা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ও অন্তর্ভুক্তির স্বীকৃতিস্বরূপ বেশ কয়েকটি পুরস্কার পেয়েছেন।
অধ্যাপক শাহজাহান খান উন্মুক্ত আলোচনা ও পেশাদার প্রকাশনায় তাঁর অবদান অব্যাহত রেখেছেন। এর মধ্যে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা সংস্কৃতির বিকাশ নিয়ে তাঁর লেখালেখিও রয়েছে।
তাঁর ক্যারিয়ার দু’টি সমান্তরাল সেবাক্ষেত্রের মাধ্যমে বিশেষায়িত হয়েছে—পরিসংখ্যানে একটি আন্তর্জাতিক একাডেমিক ক্যারিয়ার এবং অস্ট্রেলিয়ার মুসলিম ও বহুসাংস্কৃতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে কয়েক দশকের স্বেচ্ছাসেবী নেতৃত্ব।
লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, পরিসংখ্যান বিভাগ, সংযুক্ত আরব আমিরাত বিশ্ববিদ্যালয়, ইউএই



