ইস্তাম্বুল সম্মেলনে বৈশ্বিক প্রকাশক প্ল্যাটফর্মের পরিকল্পনা

পড়তে ১ মিনিট

ইস্তাম্বুলের ইস্তাম্বুল সাবাহাত্তিন জাইম ইউনিভার্সিটির বাইরে 'ইসলামি প্রকাশনা বিষয়ক আন্তর্জাতিক সম্মেলন'-এ অংশগ্রহণকারীদের একটি দলীয় ছবি।

ইস্তাম্বুলে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ইসলামি প্রকাশনা সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রকাশকদের মধ্যে তথ্য, প্রকাশনা স্বত্ব, অনুবাদ, সম্ভাব্য অংশীদার, প্রশিক্ষণ ও বাজারসংক্রান্ত তথ্য বিনিময়ের জন্য একটি যৌথ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম গড়ে তোলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বইমেলায় যৌথ অংশগ্রহণ, অনুবাদ ও সহ-প্রকাশনা, সীমান্ত পেরিয়ে বই বিতরণ এবং প্রকাশনা খাতের পেশাগত সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

২৫ থেকে ২৭ সেপ্টেম্বর ইস্তাম্বুল সাবাহাত্তিন জায়েম বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক ইসলামি বই প্রকাশক ইউনিয়নের উদ্যোগে অনুষ্ঠিত তিন দিনব্যাপী এ সম্মেলনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রকাশনা খাতের পেশাজীবী, বুদ্ধিজীবী ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সম্মেলনে বই, অনুবাদ ও প্রকাশনা স্বত্বকে ভাষা ও জাতীয় সীমানা পেরিয়ে বিশ্বের পাঠকদের কাছে পৌঁছে দেওয়ার উপায় নিয়ে আলোচনা হয়। প্রকাশকদের মধ্যে পেশাগত যোগাযোগ বৃদ্ধি, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র তৈরির বিষয়ও গুরুত্ব পায়।

সম্মেলনটি আন্তর্জাতিক ইসলামি বই প্রকাশক ইউনিয়নের প্রথম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের পাশাপাশি অনুষ্ঠিত হয়। তুরস্কের ধর্মীয় বিষয়ক অধিদপ্তর, সংস্কৃতি ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং তুর্কি সহযোগিতা ও সমন্বয় সংস্থা এতে সহযোগিতা করে।

ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরুর পর সংগঠনটির সদস্যসংখ্যা ৬৮টি দেশের ২০০-এর বেশি প্রকাশনায় পৌঁছেছে।

সম্মেলনে উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন আল-উম্মাহ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও বহুভাষিক মাসিক ‘আল-উম্মাহ’-এর প্রধান সম্পাদক মোহাম্মদ জাকির হোসাইন। এছাড়া বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থটের (বিআইআইটি) মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ আব্দুল আজিজসহ বিভিন্ন দেশের প্রকাশক, গবেষক, শিক্ষাবিদ ও প্রকাশনা সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের অংশগ্রহণ সম্মেলনটিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও বৈচিত্র্যময় করে তোলে।

২০২১ সালের উদ্যোগ থেকে বৈশ্বিক ইউনিয়ন

আন্তর্জাতিক ইসলামি বই প্রকাশক ইউনিয়নের উদ্যোগের সূত্রপাত ২০২১ সালে ইস্তাম্বুলে। সে সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রকাশকরা ইসলামি বই প্রকাশনা খাতে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতার পথ খুঁজতে একত্রিত হন। সেই উদ্যোগকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন দেশের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবীদের মধ্যে ধারাবাহিক যোগাযোগ ও মতবিনিময়ের মাধ্যমে একটি বৃহত্তর সহযোগিতামূলক আন্দোলনের বিকাশ ঘটে, যা ‘গ্রেট ভিশন মুভমেন্ট’ নামে পরিচিতি পায়।

প্রতিষ্ঠাতা সদস্যদের মধ্যে তুরস্ক, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, পাকিস্তান, ভারত, জর্ডান, মিসর, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রকাশনা সংস্থা ও সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীরা যুক্ত হন। তাদের অভিন্ন লক্ষ্য ছিল—দেশ, ভাষা ও বাজারের সীমা অতিক্রম করে ইসলামি বই, জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যকে আরও বিস্তৃত পাঠকসমাজের কাছে পৌঁছে দেওয়া।

প্রায় পাঁচ বছর ধরে পরামর্শ, যোগাযোগ ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের পর চলতি বছরের জানুয়ারিতে ইস্তাম্বুলে সদর দপ্তর স্থাপন করে ইউনিয়নটি আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে।

IUIBP কি?

এই প্রক্রিয়ার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ হলো ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব ইসলামিক বুক পাবলিশার্স বা আইইউআইবিপি (IUIBP)। এটি বিশ্বজুড়ে ইসলামি বই প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত প্রকাশনা সংস্থা, পেশাজীবী, প্রকাশনা স্বত্ব ব্যবস্থাপক ও অনুবাদকদের একটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম। ইউনিয়নটির সদর দপ্তর ইস্তাম্বুলে অবস্থিত।

ইউনিয়নের লক্ষ্য হলো ইসলামি প্রকাশনায় বৈশ্বিক সহযোগিতা জোরদার করা, কপিরাইট ও অনুবাদ প্রকল্পে সহযোগিতা করা, পেশাগত মান উন্নত করা এবং ইসলামি চিন্তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের বইগুলোকে বিশ্বের বিভিন্ন ভাষা ও বাজারে পৌঁছে দেওয়া।

এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা ও মধ্যপ্রাচ্যের প্রকাশনা সম্প্রদায়ের প্রতিনিধিদের নিয়ে প্রতিষ্ঠাতা পর্ষদ গঠন করা হয়েছে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরুর পর ইউনিয়নটির সদস্যসংখ্যা ৬৮টি দেশের ২০০-এর বেশি প্রকাশনায় পৌঁছেছে বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

দীর্ঘ প্রতীক্ষিত প্ল্যাটফর্ম

সম্মেলন সম্পর্কে মোহাম্মদ জাকির হোসাইন বলেন, ইসলামি প্রকাশনা দীর্ঘদিন ধরে সমন্বয়ের অভাবে ভুগেছে। বিশ্বের এক প্রান্তে তৈরি হওয়া মূল্যবান বই ও চিন্তাভাবনা ভাষাগত, বাণিজ্যিক বা বিতরণসংক্রান্ত বাধার কারণে অনেক সময় অন্য প্রান্তের পাঠকদের কাছে পৌঁছায় না।

তিনি বলেন, ইস্তাম্বুল সম্মেলন প্রকাশকদের সরাসরি যুক্ত করা এবং তাদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতাকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে এই ব্যবধান দূর করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নিয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সম্মেলনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য ছিল এর বৈচিত্র্য। বিভিন্ন দেশের প্রকাশকরা নিজেদের অভিজ্ঞতা বিনিময়ের পাশাপাশি বিভিন্ন বাজারের চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে জানতে এবং কোন কোন ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাস্তব ফলাফল আনতে পারে, তা চিহ্নিত করার সুযোগ পেয়েছেন।

মোহাম্মদ জাকির হোসাইন বলেন, ‘আমি মনে করি ইস্তাম্বুল শুভ সূচনা করেছে। এটি বিশ্বজুড়ে ইসলামি প্রকাশনার জন্য একটি দীর্ঘ প্রতীক্ষিত প্ল্যাটফর্ম। এখানে আমরা যে প্রচেষ্টা চালিয়েছি, তা যদি অব্যাহত থাকে, তবে এই সম্মেলনটি কেবল আরেকটি আন্তর্জাতিক সমাবেশ হিসেবে নয়; বরং আরও সুসংহত, পেশাদার ও বৈশ্বিকভাবে সম্পৃক্ত প্রকাশনা সম্প্রদায় গড়ে তোলার পথে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে স্মরণীয় হয়ে থাকবে।’

যৌথ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও তথ্যভান্ডার

সম্মেলনে ডিজিটাল প্রকাশনা, অনুবাদ, প্রশিক্ষণ, প্রকাশনা স্বত্ব, বইমেলা এবং শিল্পসংক্রান্ত তথ্য নিয়ে বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পাশাপাশি সদস্য প্রকাশকদের তথ্য, তাদের প্রকাশনার ক্ষেত্র, ভাষা, স্বত্ব এবং সম্ভাব্য সহযোগিতার সুযোগ নিয়ে একটি যৌথ তথ্যভান্ডার তৈরির পরিকল্পনা করা হয়েছে।

প্রকাশনা খাতের বাজারপ্রবণতা, চ্যালেঞ্জ, অনুবাদ, বিতরণ, ডিজিটাল রূপান্তর ও স্বত্বসংক্রান্ত বিষয়ে পর্যায়ক্রমিক প্রতিবেদন প্রকাশের জন্য ‘ইসলামি প্রকাশনা পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র’ গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে।

সম্মেলনে যৌথ অনুবাদ ও সহ-প্রকাশনা প্রকল্প, আন্তর্জাতিক বইমেলায় যৌথ প্যাভিলিয়ন, সীমান্ত পেরিয়ে বই বিতরণব্যবস্থা এবং গ্রন্থচৌর্যবৃত্তির বিরুদ্ধে সমন্বিত পদক্ষেপ নিয়েও আলোচনা হয়।

এ ছাড়া বইয়ের সূচীকরণ ও অনুবাদে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারকে সমর্থন করা হলেও লেখকদের অধিকার, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তি ও প্রকাশিত কাজের মৌলিকত্ব রক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

ইস্তাম্বুল ঘোষণা

সম্মেলনের অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক ইসলামি বই প্রকাশক ইউনিয়নের প্রতিষ্ঠাতা সম্মেলন থেকে ‘ইসলামি বই প্রকাশকদের মধ্যে সহযোগিতার জন্য ইস্তাম্বুল ঘোষণা’ প্রকাশ করা হয়।

ঘোষণায় বইকে জ্ঞান, মানবসচেতনতা, সর্বজনীন মূল্যবোধ এবং বিভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির মধ্যে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ইসলামি বইকে সংলাপ ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার একটি সেতু এবং ইসলাম ও এর মানবিক মূল্যবোধ সম্পর্কে সুষম ও গঠনমূলক ধারণা তুলে ধরার মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

ঘোষণায় প্রকাশনার দায়িত্বশীল স্বাধীনতা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের প্রতি সম্মান, বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তির অধিকার সুরক্ষা এবং গ্রন্থচৌর্যবৃত্তি প্রতিরোধের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

লেখক, প্রকাশক, অনুবাদক, চিত্রশিল্পীসহ বই প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত পেশাজীবীদের অধিকার সুরক্ষাকে টেকসই প্রকাশনা শিল্পের জন্য অপরিহার্য বলে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কপিরাইট লঙ্ঘন ও বেআইনি ব্যবহার প্রতিরোধে সদস্যদের মধ্যে তথ্য বিনিময় ও সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।

অনুবাদ ও বৈশ্বিক বাজারে প্রবেশ

ইস্তাম্বুল ঘোষণায় অনুবাদকে বিভিন্ন জাতি ও সংস্কৃতির মধ্যে সংযোগ স্থাপনের গুরুত্বপূর্ণ সেতু হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। উচ্চমানের অনুবাদ, সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিভাষা, সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটের প্রতি সংবেদনশীলতা এবং অনুবাদক ও সম্পাদকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালুর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

আন্তর্জাতিক বইমেলা ও প্রকাশনা বাজারে ইসলামি বইয়ের উপস্থিতি বাড়ানো এবং বিশ্বের পাঠক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গ্রন্থাগার, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও গবেষণা কেন্দ্রের কাছে এসব বইয়ের সহজলভ্যতা নিশ্চিত করার কথাও ঘোষণায় বলা হয়েছে।

সদস্য প্রকাশকদের বহুভাষিক পেশাদার তালিকা তৈরি, সম্পাদনা, নকশা, উৎপাদন ও বিপণনের মান উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বিতরণ ও প্রকাশনা স্বত্ব ব্যবস্থাপনায় সক্ষমতা বৃদ্ধির আহ্বান জানানো হয়েছে।

ডিজিটাল প্রকাশনা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা

ঘোষণায় প্রকাশনা খাতের ডিজিটাল রূপান্তরকে কৌশলগত প্রয়োজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। মুদ্রিত বইয়ের পাশাপাশি ই-বুক, শ্রুতিবই, শিক্ষামূলক প্ল্যাটফর্ম, তথ্যভান্ডার, মিথস্ক্রিয়ামূলক বিষয়বস্তু এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য সহজলভ্য প্রকাশনা ব্যবস্থার বিকাশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

সম্পাদনা, সূচীকরণ, তথ্যবিন্যাস, সহায়ক অনুবাদ, বিপণন ও তথ্য বিশ্লেষণের মতো ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সম্ভাব্য ব্যবহারের কথা বলা হলেও প্রযুক্তি ব্যবহারে বুদ্ধিবৃত্তিক সম্পত্তির অধিকার, স্বচ্ছতা ও নৈতিক মানদণ্ড বজায় রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

তরুণ ও উদীয়মান প্রকাশকদের সহায়তা

প্রকাশনা শিল্পের ভবিষ্যৎ টেকসই করতে নতুন প্রজন্মের প্রকাশক, ছোট ও মাঝারি আকারের প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এবং উদীয়মান বাজারে কাজ করা প্রকাশকদের সহায়তার প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে।

এ জন্য পেশাগত প্রশিক্ষণ, দক্ষতা উন্নয়ন, পরামর্শমূলক কর্মসূচি, যোগাযোগ ও অংশীদারত্বের সুযোগ এবং প্রকাশনা স্বত্ব, বিতরণ, বিপণন, ডিজিটাল প্রকাশনা ও আন্তর্জাতিক বইমেলায় অংশগ্রহণ বিষয়ে জ্ঞান অর্জনের ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে।

যৌথ বইমেলা ও বিতরণ উদ্যোগ

আন্তর্জাতিক বইমেলায় যৌথ প্যাভিলিয়ন স্থাপন, প্রকাশক ও পরিবেশকদের মধ্যে পেশাগত যোগাযোগ এবং পরিবহন, গুদামজাতকরণ, বিতরণ ও ডিজিটাল বিপণনের ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

একই সঙ্গে জাতীয় আইন এবং লেখক ও প্রকাশকদের অধিকারকে সম্মান রেখে সীমান্ত পেরিয়ে ইসলামি বইয়ের চলাচল ও বিতরণ সহজ করতে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্ম ও সহযোগিতামূলক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার কথা বলা হয়েছে।

বাংলাদেশের অংশগ্রহণ

ইস্তাম্বুল সম্মেলনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিক ইসলামি প্রকাশনা ও জ্ঞানচর্চার পরিসরে দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পৃক্ততার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত হিসেবে উঠে আসে।

বাংলাদেশ থেকে আল-উম্মাহ ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা ও বহুভাষিক মাসিক ‘আল-উম্মাহ’-এর প্রধান সম্পাদক মোহাম্মদ জাকির হোসাইন এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইসলামিক থটের (বিআইআইটি) মহাপরিচালক ড. মোহাম্মদ আব্দুল আজিজ অংশ নেন।

বিভিন্ন দেশের প্রকাশক, শিক্ষাবিদ, গবেষক ও পেশাজীবীদের সঙ্গে একই প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে ইসলামি জ্ঞান, গবেষণা ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মতবিনিময় এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার সুযোগ তৈরি হয়েছে।

তিন বছরের কর্মপরিকল্পনা

সম্মেলনে ইউনিয়নের আগামী তিন বছরের জন্য একটি কর্মপরিকল্পনার ভিত্তি নির্ধারণ করা হয়। এতে সদস্যপদ সম্প্রসারণ, প্রকাশনা স্বত্ব, অনুবাদ, প্রশিক্ষণ, ডিজিটাল প্রকাশনা, বইমেলা ও শিল্পসংক্রান্ত তথ্য নিয়ে বিশেষায়িত কমিটি গঠন, নিয়মিত প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু এবং প্রকাশকদের পেশাদার তথ্যভান্ডার প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে।

পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বইমেলা, সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব, অনুবাদ, বিতরণ ও ডিজিটাল প্রকাশনায় যৌথ উদ্যোগ এবং ইসলামি প্রকাশনা শিল্পের অবস্থা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে পর্যায়ক্রমিক প্রতিবেদন প্রকাশের পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে।

তিন দিনের সম্মেলনের কর্মসূচি

২৫ সেপ্টেম্বর শুক্রবার ইস্তাম্বুল সাবাহাত্তিন জায়েম বিশ্ববিদ্যালয়ে নিবন্ধন ও স্বাগত পর্বের মধ্য দিয়ে সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়। সকাল সাড়ে ৯টায় উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পবিত্র কোরআন তিলাওয়াত, পরিচিতিমূলক প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন ও প্রটোকল বক্তব্যের পর আন্তর্জাতিক ইসলামি বই প্রকাশক ইউনিয়নের পরিচিতি তুলে ধরা হয়।

সকাল ১০টা ৩০ মিনিটে বিরতির পর বেলা ১১টা থেকে ‘পরিবর্তনশীল বিশ্বে ইসলামি প্রকাশনা’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। অধ্যাপক ড. মেহমেত বুলুতের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত এ অধিবেশনে ড. মুহাম্মদ আল-মুখতার আল-শানকিতি, অধ্যাপক ড. মেহমেত গোরমেজ এবং অধ্যাপক টিম উইন্টার (আবদাল হাকিম মুরাদ) বক্তব্য দেন।

জুমার নামাজ ও মধ্যাহ্নভোজের পর বেলা আড়াইটায় শুরু হয় বিষয়ভিত্তিক গোলটেবিল বৈঠকের প্রথম পর্ব। বিকেল সাড়ে ৪টায় বিরতির পর দ্বিতীয় পর্বের গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এসব বৈঠকে প্রকাশনা শিল্পের বিভিন্ন দিক, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, অনুবাদ, প্রকাশনা স্বত্ব, ডিজিটাল রূপান্তর, প্রশিক্ষণ, বইমেলা ও বিতরণব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা হয়।

সন্ধ্যায় গোলটেবিলের চেয়ার ও সহ-চেয়াররা নিজ নিজ কমিশনের প্রতিবেদন চূড়ান্ত করেন। এরপর রাতের খাবার ও বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদে জামাতে মাগরিবের নামাজের পর রাত ৮টায় রয়্যাল লরিয়েট অধ্যাপক তান শ্রী ড. সৈয়দ মুহাম্মদ নাকিব আল-আত্তাসের স্মরণে একটি স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তা ছিলেন সহযোগী অধ্যাপক ড. খাইরিল হুসাইনি। অনুষ্ঠানটি ইংরেজি ভাষায় অনুষ্ঠিত হয় এবং এতে কোনো দোভাষী বা অনুবাদের ব্যবস্থা ছিল না।

২৬ সেপ্টেম্বর শনিবার দ্বিতীয় দিনের কর্মসূচি শুরু হয় সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের মধ্য দিয়ে। সকাল ৯টা থেকে অনুষ্ঠিত এ অধিবেশনে কার্যক্রম প্রতিবেদন, আর্থিক প্রতিবেদন, বিভিন্ন প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা এবং পরিচালনা পর্ষদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।

সকাল ১০টা ৪৫ মিনিটে গোলটেবিল বৈঠকের প্রতিবেদন উপস্থাপন ও আগামী তিন বছরের কর্মপরিকল্পনা নির্ধারণের অধিবেশন শুরু হয়। এতে বিভিন্ন কমিশনের প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয় এবং ইউনিয়নের পরবর্তী তিন বছরের কর্মপরিকল্পনার ভিত্তি নির্ধারণ করা হয়।

দুপুর ১২টায় ‘ইসলামি বই প্রকাশকদের মধ্যে সহযোগিতার জন্য ইস্তাম্বুল ঘোষণা’ পাঠ ও আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হয়। এর পর অংশগ্রহণকারীদের দলগত ছবি তোলা ও মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করা হয়।

দুপুরের পর সম্মেলনের অংশগ্রহণকারীদের জন্য সাংস্কৃতিক ভ্রমণের আয়োজন করা হয়। বিকেল ২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত তারা সুলায়মানিয়া পাণ্ডুলিপি গ্রন্থাগার ও সুলায়মানিয়া মসজিদ পরিদর্শন করেন। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে বসফরাসে নৈশভোজ ও নৌভ্রমণের আয়োজন করা হয়। সেখানে নবনির্বাচিত পরিচালনা পর্ষদের পরিচিতি, সদস্যপদ সনদ প্রদান এবং অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও মতবিনিময়ের সুযোগ তৈরি হয়।

২৭ সেপ্টেম্বর রবিবার ছিল ঐচ্ছিক কর্মসূচির দিন। ভোর সাড়ে ৫টায় হোটেল থেকে অংশগ্রহণকারীরা ঐতিহাসিক উপদ্বীপের উদ্দেশে যাত্রা করেন। এরপর হায়া সোফিয়া গ্র্যান্ড মসজিদে ফজরের নামাজ আদায় এবং ঐতিহাসিক হায়া সোফিয়া চত্বরে প্রাতঃভ্রমণের আয়োজন করা হয়। সকাল সাড়ে ৮টার দিকে হোটেলে ফিরে নাশতার পর অংশগ্রহণকারীদের বিমানবন্দরে স্থানান্তর এবং পরবর্তী সময় মুক্ত কর্মসূচির জন্য রাখা হয়।

প্রকাশনার নতুন সহযোগিতামূলক পরিসর

তিন দিনের সম্মেলনের আলোচনা, সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত, গোলটেবিল বৈঠক, ইস্তাম্বুল ঘোষণা এবং আগামী তিন বছরের কর্মপরিকল্পনার মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিক ইসলামি বই প্রকাশনার জন্য একটি সমন্বিত সহযোগিতামূলক কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সম্মেলনে অংশগ্রহণকারীরা আন্তর্জাতিক ইসলামি বই প্রকাশক ইউনিয়নকে একটি কার্যকর, পেশাদার, উন্মুক্ত ও দূরদর্শী আন্তর্জাতিক কাঠামো হিসেবে গড়ে তোলার অঙ্গীকার করেন। একই সঙ্গে ইসলামি বইয়ের বৈশ্বিক উপস্থিতি জোরদার, সদস্যদের বৈধ অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা এবং জ্ঞান, সংলাপ ও পারস্পরিক বোঝাপড়ার প্রসারে প্রকাশনা খাতের ভূমিকা বাড়ানোর প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করা হয়।

ইস্তাম্বুলে ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে প্রতিষ্ঠাতা সম্মেলনের সমাপনীতে গৃহীত ‘ইসলামি বই প্রকাশকদের মধ্যে সহযোগিতার জন্য ইস্তাম্বুল ঘোষণা’ সেই উদ্যোগের একটি আনুষ্ঠানিক ভিত্তি তৈরি করেছে। আর যৌথ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, প্রকাশনা স্বত্ব ও অনুবাদ সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক বইমেলায় যৌথ অংশগ্রহণ, সীমান্ত পেরিয়ে বই বিতরণ, প্রশিক্ষণ এবং প্রকাশনা শিল্পের তথ্যভান্ডার তৈরির পরিকল্পনা সামনে রেখে ইউনিয়নটি আগামী দিনে বৈশ্বিক ইসলামি প্রকাশনা সম্প্রদায়ের মধ্যে আরও কার্যকর যোগাযোগ ও সহযোগিতার ক্ষেত্র তৈরির লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে।

এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন