ট্রাম্পের মার্কিন সহায়তা বন্ধের সিদ্ধান্তে নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ইসরাইলি বিরোধীদের ক্ষোভ
লেখক:
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা শুরু করেছেন বিরোধী নেতারা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২০২৬ সালের শেষ নাগাদ ইসরাইলকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের আর্থিক সহায়তা বন্ধের পরিকল্পনা ঘোষণা করার পর প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে তীব্র সমালোচনা শুরু করেছেন দেশটির বিরোধী নেতারা। তাঁদের অভিযোগ, নেতানিয়াহুর দায়িত্বহীনতার কারণে ইসরাইলের নিরাপত্তা ও অর্থনীতি ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এদিকে ট্রাম্পের ঘোষণায় ইসরাইলের জ্যেষ্ঠ প্রতিরক্ষা ও অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।
সাবেক সেনাপ্রধান ও বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকোট নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর দাবি জানিয়েছেন। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের এমন গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের বিষয়ে দেশের প্রধান প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবহিত করতে সরকারের ব্যর্থতা গুরুতর প্রশাসনিক দুর্বলতা প্রকাশ করেছে।
এক বিবৃতিতে আইজেনকোট বলেন, ‘ইসরাইলের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যখন দেশের জনগণের মতোই গণমাধ্যমের মাধ্যমে কৌশলগত সম্পর্কের পরিবর্তনের খবর জানতে পারে, তখন তা বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর আচরণ কতটা বিপজ্জনক, সেটিই প্রমাণ করে।’
তিনি আরও বলেন, ‘তাঁকে আর বিশ্বাস করা যায় না। তাঁর পরিবর্তন হওয়া জরুরি।’
ইসরাইলের ডেমোক্র্যাটস পার্টির নেতা ইয়ার গোলানও এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি একে নেতানিয়াহু সরকারের আরেকটি বড় ব্যর্থতা হিসেবে উল্লেখ করেন।
দীর্ঘদিনের আঞ্চলিক সংঘাতের কারণে ইসরাইলের সামরিক ব্যয় বেড়েছে। একই সঙ্গে অস্ত্রের মজুত পুনরায় পূরণ করতে দেশটি চাপের মুখে রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা বন্ধের ঘোষণা ইসরাইলের জন্য নতুন সংকট তৈরি করতে পারে বলে সতর্ক করেছেন গোলান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, মার্কিন সহায়তা বন্ধ হলে ইসরাইলি করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ তৈরি হবে। পাশাপাশি দেশের প্রতিরক্ষা চাহিদা পূরণের সক্ষমতাও দুর্বল হয়ে পড়বে।
গোলান বলেন, ‘দীর্ঘ যুদ্ধের কারণে ইসরাইলের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সক্ষমতা কমে গেছে।’ তাঁর মতে, বিদ্যমান মার্কিন সহায়তা বন্ধ হতে দেওয়ার পরিবর্তে সরকারের উচিত ছিল ওয়াশিংটনের কাছ থেকে আরও বেশি সহায়তা আদায়ের চেষ্টা করা।
তিনি আরও বলেন, ‘একজন দায়িত্বশীল প্রধানমন্ত্রী মার্কিন সহায়তা বন্ধ করার পরিবর্তে তা বাড়ানোর জন্য লড়াই করতেন।’
গোলান নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ইসরাইলের অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাগত সংকট আরও বাড়িয়ে তোলা এবং দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতাকে ঝুঁকির মুখে ফেলার অভিযোগও করেন।
এর আগে মঙ্গলবার ট্রাম্প ঘোষণা করেন, চলতি বছরের শেষ নাগাদ ইসরাইলকে দেওয়া মার্কিন আর্থিক সহায়তা বন্ধ করে দেওয়া হবে। কয়েক মাস আগে নেতানিয়াহুর সঙ্গে এ বিষয়ে সমঝোতা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এমন এক সময়ে ট্রাম্পের এই ঘোষণা এলো, যখন যুক্তরাষ্ট্রে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি এবং সিনেটের ৩৫টি আসনে মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
ইসরাইলের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম কান জানিয়েছে, ট্রাম্পের মন্তব্যে দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় ও সামরিক বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তারা বিস্মিত হয়েছেন। এ ঘটনায় সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে দেশের নিরাপত্তা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আদৌ কোনো পরামর্শ করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে চ্যানেল ১২ জানিয়েছে, ট্রাম্পের প্রকাশ্য ঘোষণার আগে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও পরিকল্পিত সহায়তা বন্ধের বিষয়ে কিছু জানতেন না।
সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সমন্বয়ের অভাবের অভিযোগ বিরোধী রাজনীতিকদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে। তাঁদের প্রশ্ন, দেশের প্রধান সামরিক সহযোগী যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের এত বড় পরিবর্তনের বিষয়ে সরকার কেন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগে থেকে অবহিত করেনি এবং প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেয়নি।
২০১৬ সালে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারক অনুযায়ী, ২০২৮ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে ইসরাইলকে ৩৮ বিলিয়ন ডলার সামরিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। সে হিসাবে প্রতিবছর সহায়তার পরিমাণ প্রায় ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলার।
চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৭ ও ২০২৮ সালেও ইসরাইলের প্রতিরক্ষা বাজেটের অন্যতম প্রধান অর্থায়নের উৎস হিসেবে এই সহায়তা অব্যাহত থাকবে বলে প্রত্যাশা করা হয়েছিল।
তবে নেতানিয়াহু এর আগেও মার্কিন সামরিক সহায়তার ওপর ইসরাইলের নির্ভরতা কমানো এবং দেশীয় অস্ত্র উৎপাদন বাড়ানোর পক্ষে মত দিয়েছেন। তাঁর যুক্তি, সামরিক সরঞ্জাম উৎপাদনে স্বনির্ভরতা বাড়লে ইসরাইলের কৌশলগত স্বাধীনতা আরও শক্তিশালী হবে।
অন্যদিকে বিরোধী নেতারা সতর্ক করে বলেছেন, প্রতিরক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা আকস্মিকভাবে বন্ধ হয়ে গেলে ইসরাইলের বাজেটের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে।
দেশটির সংসদীয় নির্বাচনের ফলাফল ঘিরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেই এ বিতর্ক সামনে এসেছে।
প্রতিবেদিত ফলাফল অনুযায়ী, ১২০ সদস্যের ইসরাইলি সংসদ নেসেটে নেতানিয়াহুর জোট ৫৩টি আসন পেয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী দলগুলো পেয়েছে ৪৮টি এবং আরব দলগুলো পেয়েছে ১৯টি আসন।
সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় ৬১টি আসন কোনো পক্ষই নিশ্চিত করতে পারেনি। ফলে নতুন সরকার গঠনের আলোচনায় আরব আইনপ্রণেতারা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইসরাইলের কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন বুধবার চূড়ান্ত সরকারি ফলাফল ঘোষণা করবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জাতীয় নিরাপত্তা, সরকারি অর্থায়ন এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পরিচালনায় নেতানিয়াহু সরকারের ভূমিকা নিয়ে যখন দেশটিতে উদ্বেগ বাড়ছে, তখন মার্কিন সহায়তা বন্ধের ঘোষণা তাঁর সরকারের জন্য নতুন রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।


