ইসরাইলের নির্বাচন : গণতন্ত্র, বর্ণবৈষম্য এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকারের একটি পরীক্ষা
লেখক:
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক টিকে থাকার লড়াই | ছবি : সংগৃহীত
২৭ অক্টোবর ২০২৬-এর ইসরাইলের সাধারণ নির্বাচন একটি রাজনৈতিক অচলাবস্থা তৈরি করেছে, যা একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপন করছে: একটি রাষ্ট্র কি নিজেকে গণতান্ত্রিক বলে দাবি করতে পারে, যখন তার রাজনৈতিক নেতারা নিজেদের জনসংখ্যার একটি বিশাল অংশের সঙ্গে সহযোগিতা করতে অস্বীকৃতি জানান এবং ফিলিস্তিনিরা ক্রমাগত দখলদারিত্ব, উচ্ছেদ ও ধ্বংসাত্মক সহিংসতার মুখোমুখি হতে থাকে?
এই নির্বাচনে দুটি প্রধান ইহুদি-নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোটের কোনোটিই স্বাধীনভাবে সরকার গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। অথচ আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলো অভূতপূর্ব নির্বাচনী সাফল্য নিয়ে আত্মপ্রকাশ করেছে, যা তাদের সম্ভাব্য ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণের অবস্থানে নিয়ে এসেছে। তাদের এই সাফল্য ইসরাইলের রাজনৈতিক ব্যবস্থা বৈচিত্র্যময় জনসংখ্যার গণতান্ত্রিক প্রতিনিধিত্বের ওপর প্রতিষ্ঠিত, নাকি বর্ণভিত্তিক বর্জনের ওপর—তা যাচাই করার একটি সুযোগ তৈরি করেছে।
একটি বিভক্ত সংসদ
ইসরাইলের ১২০ আসনবিশিষ্ট নেসেটে সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতার জন্য অন্তত ৬১টি আসন প্রয়োজন। ২৯ অক্টোবর পাওয়া ফলাফলের তথ্য অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর ডানপন্থী জোট ৫৩টি আসন নিশ্চিত করার পথে রয়েছে, যেখানে গাদি আইজেনকটের নেতৃত্বাধীন বিরোধী জোট ৪৮টি আসনে জয়ী হতে চলেছে। আরব-নেতৃত্বাধীন ‘জয়েন্ট লিস্ট’ ও ‘রাম’ (Ra’am) যৌথভাবে ১৯টি আসন পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চূড়ান্ত ভোট গণনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ফলাফলকে আপাতত প্রাথমিক হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে।
এই পরিসংখ্যানগুলো মূল রাজনৈতিক সংকটকে তুলে ধরে। নেতানিয়াহুর জোট বৃহত্তম হলেও তার সংখ্যাগরিষ্ঠতা নেই। আইজেনকটের বিরোধী জোটও প্রয়োজনীয় আসনের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে। অতিরিক্ত সমর্থন ছাড়া, প্রতিদ্বন্দ্বী জোটের সদস্যদের রাজি করানো কিংবা আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে কোনো সমঝোতায় পৌঁছানো ছাড়া কেউই সরকার গঠন করতে পারছে না।
নেতানিয়াহু একটি ডানপন্থী সরকারের আহ্বান জানিয়েছেন। অন্যদিকে, আইজেনকট সরকার গঠনে আরব দলগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়ে কঠিন সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়েছেন। রাজনৈতিক দলগুলো যখন দর-কষাকষি করছে, তখন নেতানিয়াহু অন্তর্বর্তীকালীন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বহাল রয়েছেন। একটি বৃহত্তর জোট সরকার গঠন কিংবা আরেকটি নির্বাচনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।
আরব দলগুলো এখন ক্ষমতার মূল নিয়ামক
সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা হলো আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর নির্বাচনী সাফল্য। তাদের সম্ভাব্য ১৯টি আসন একটি ঐতিহাসিক উচ্চতার ইঙ্গিত দেয়, যা আরব ভোটারদের বর্ধিত অংশগ্রহণ এবং দেশের রাজনৈতিক গতিপথকে প্রভাবিত করার সংকল্পের প্রতিফলন। সামগ্রিকভাবে প্রায় ৭৮ শতাংশ ভোট পড়েছে, যার মধ্যে আরব ভোটারদের উপস্থিতি ছিল বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
ইসরাইল সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব পদ্ধতি ব্যবহার করে। ভোটাররা কোনো নির্দিষ্ট আসনের প্রার্থীর পরিবর্তে রাজনৈতিক দলকে ভোট দেন। দলগুলো তাদের মোট ভোটের অনুপাত অনুযায়ী সংসদে আসন পায় এবং প্রার্থীদের তালিকার ক্রমানুসারে সদস্যরা নেসেটে প্রবেশ করেন।
অতএব, আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর এই নির্বাচনী সাফল্য ইসরাইলের সামনে একটি গুরুতর গণতান্ত্রিক পরীক্ষা দাঁড় করিয়েছে। তাদের ভোটকে কি দেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হবে, নাকি রাজনৈতিক ও বর্ণগত বাধা তাদের অর্থপূর্ণ প্রভাব বিস্তারের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করবে?
রাজনৈতিক বর্ণবাদ?
আরব দল ‘বালাদ’-এর নেতা সামি আবু শেহাদে যুক্তি দিয়েছেন যে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ইসরাইলি বিরোধী নেতাদের আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা করার ক্ষেত্রে বর্ণবাদই বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে। আল জাজিরায় প্রকাশিত মন্তব্যে তিনি মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশের প্রতিনিধিত্বকারী সম্প্রদায়কে সরকার গঠনের সম্ভাবনা থেকে বাদ দেওয়ার সমালোচনা করেন।
‘তা'আল’-এর নেতা আহমেদ তিবিও বলেছেন, নেসেটের স্পিকার পরিবর্তনের বিষয়ে সহযোগিতার আলোচনার জন্য বিরোধী দল তাঁর রাজনৈতিক শিবিরের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল। এই ঘটনাগুলো ইঙ্গিত দেয় যে আনুষ্ঠানিক সরকার গঠনের জোট বিতর্কিত হলেও কিছু বিষয়ে রাজনৈতিক যোগাযোগ সম্ভব হতে পারে।
প্রধান ইহুদি-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর আরব দলগুলোর সঙ্গে কাজ করার এই অনীহা ইসরাইলের গণতন্ত্র এবং আরবদের সমান নাগরিকত্ব নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তোলে। নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কেবল তাঁদের আরব পরিচয়ের কারণে প্রত্যাখ্যান করা হলে সমান প্রতিনিধিত্বের নীতি লঙ্ঘিত হবে।
এই নির্বাচন সেই নীতিকে তীব্র পর্যালোচনার মুখে ফেলেছে। বিরোধী দল যদি প্রমাণ করতে চায় যে তারা একটি প্রকৃত বিকল্পের প্রতিনিধিত্ব করে, তবে তাদের ব্যাখ্যা করতে হবে, কীভাবে তারা সত্যিকারের গণতন্ত্রের প্রতি নিজেদের অঙ্গীকার রক্ষা করতে চায়।
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক টিকে থাকার লড়াই
নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। যদিও তাঁর জোট সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করতে পারেনি, তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী দল থেকে সংসদ সদস্যদের নিজের পক্ষে টেনে এনে কিংবা অন্যান্য রাজনৈতিক উপদলের সঙ্গে চুক্তি করে রাজনৈতিক অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করবেন।
তাঁর আইনি জটিলতাও বেশ গুরুতর। আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত (আইসিসি) ২০২৪ সালের নভেম্বরে ফিলিস্তিন পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে যুদ্ধাপরাধ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে নেতানিয়াহু এবং সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইয়োভ গ্যালান্টের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করে।
এ ছাড়া নেতানিয়াহু নিজ দেশেও দুর্নীতির মামলার মুখোমুখি। তাঁর রাজনৈতিক বিরোধীদের যুক্তি হলো, পরবর্তী সরকার গঠনের ক্ষেত্রে জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারকে কেন্দ্রীয় বিবেচ্য বিষয় হওয়া উচিত।
তা সত্ত্বেও, রাজনৈতিক জবাবদিহি কেবল নির্বাচনী হিসাব-নিকাশের মাধ্যমে নয়, বরং আইনগত ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিশ্চিত করা উচিত। জনস্বার্থ রক্ষায় আইনের শাসনকে সম্মান করা, নির্ভরযোগ্য অভিযোগের তদন্ত করা এবং যথাযথ বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন।
অতএব, বিরোধী দলের সামনে চ্যালেঞ্জ দ্বিমুখী: একটি কার্যকর বিকল্প সরকার গঠন করা এবং প্রমাণ করা যে জবাবদিহির প্রতি তাদের অঙ্গীকার কেবল একজন রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীকে সরানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়।
গাজা এবং পশ্চিম তীর: অমীমাংসিত মানবিক সংকট
ইসরাইলের নির্বাচনের গুরুত্বকে গাজা যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতি এবং অধিকৃত পশ্চিম তীরের চলমান সংকট থেকে আলাদা করা যায় না।
ফিলিস্তিনিরা ব্যাপক উচ্ছেদ, ঘরবাড়ি ও বেসামরিক অবকাঠামোর ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ, চলাচলের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সংকট এবং অসংখ্য প্রাণহানির শিকার হয়েছে। পশ্চিম তীরে অবৈধ বসতি সম্প্রসারণ, বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা, ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়া এবং জোরপূর্বক উচ্ছেদ ফিলিস্তিনি সম্প্রদায়গুলোর ভবিষ্যৎ ও পৈতৃক ভিটায় টিকে থাকার সক্ষমতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার দায়ের করা গণহত্যা মামলায় আন্তর্জাতিক বিচার আদালত (আইসিজে) অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশনা জারি করেছে। এই আইনি পদক্ষেপগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ এবং এর গুরুতর পরিণতি রয়েছে।
এই আইনি প্রক্রিয়াগুলো মানবিক সংকটের জরুরি অবস্থা কিংবা জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তাকে কমায় না। বরং এগুলো আন্তর্জাতিক আইন ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করা, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া এবং গুরুতর লঙ্ঘনের নির্ভরযোগ্য অভিযোগগুলোর তদন্ত নিশ্চিত করার গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করে।
গাজা, পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমের ফিলিস্তিনিদের জন্য ইসরাইলি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পরিণতি তাদের বেঁচে থাকা, আশ্রয়, চলাচলের স্বাধীনতা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার সুযোগ, জীবিকা এবং উচ্ছেদ বা সহিংসতার ক্রমাগত হুমকি ছাড়া বেঁচে থাকার অধিকারকে প্রভাবিত করে।
যেকোনো অর্থপূর্ণ উন্নতির জন্য সামরিক আচরণ, মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর পথ, বসতি স্থাপন নীতি, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা এবং ফিলিস্তিনিদের অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধার ক্ষেত্রে বাস্তব পরিবর্তন প্রয়োজন।
ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ
অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলি বসতি সম্প্রসারণ একটি ন্যায়সংগত ও স্থায়ী শান্তির পথে অন্যতম প্রধান বাধা হয়ে রয়েছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের অবস্থান এবং জাতিসংঘের প্রস্তাবনাগুলোতে এই বসতিগুলোকে আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে অবৈধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
ফিলিস্তিনি পরিবারগুলো উচ্ছেদ এবং কৃষিজমি ও পৈতৃক ভিটা হারানোর মুখোমুখি হয়েছে। পাশাপাশি, ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) সহায়তায় বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার প্রতিবেদনগুলো অরক্ষিত সম্প্রদায়গুলোর সুরক্ষার বিষয়ে গুরুতর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
যে সরকার নিজেকে গণতান্ত্রিক বলে দাবি করে, তার কর্তৃত্বের অধীনে থাকা কিংবা তার নীতির দ্বারা প্রভাবিত মানুষের প্রতি আচরণের মাধ্যমেও সেই সরকারকে বিচার করা উচিত। সত্যিকারের গণতন্ত্রকে আইনের চোখে সমতা, সংখ্যালঘুদের সুরক্ষা, বর্ণবৈষম্য থেকে মুক্তি, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং মৌলিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধার মাধ্যমে পরিমাপ করতে হয়।
ইসরাইলের সমর্থকেরা দেশটির প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচনের দিকে ইঙ্গিত করতে পারেন। অন্যদিকে, সমালোচকদের যুক্তি হলো, ফিলিস্তিনিদের প্রতি আচরণ এবং আরব নাগরিকদের প্রভাবিত করে এমন বৈষম্য গণতান্ত্রিক নীতি ও রাজনৈতিক অনুশীলনের মধ্যে গুরুতর বৈপরীত্য প্রকাশ করে।
মূল বিষয়টি হলো, গণতান্ত্রিক অধিকার ও আইনি সুরক্ষাগুলো পরিচয়ভেদে বেছে বেছে প্রয়োগ করা হয়, নাকি ধারাবাহিকভাবে সবার ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়।
নেতানিয়াহুর অস্থিরতা
নেতানিয়াহুর লিকুদ দল আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর বিরুদ্ধে নির্বাচনী জালিয়াতির অভিযোগ তোলার মধ্য দিয়েও নির্বাচনটি ম্লান হয়ে গেছে। লিকুদ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছে এবং জানিয়েছে, তারা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে প্রমাণ জমা দিয়েছে। তবে নির্বাচন কর্মকর্তারা অল্প কিছু অনিয়মের কথা জানিয়েছেন। স্বাধীনভাবে যাচাই না করা পর্যন্ত এসব অভিযোগকে প্রতিষ্ঠিত সত্য হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়।
জাতিগত পরিচয়, ধর্ম কিংবা রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা নির্বিশেষে প্রতিটি দলের ক্ষেত্রেই একই মানদণ্ড ও আইনি প্রক্রিয়ার নিয়ম প্রযোজ্য হওয়া উচিত।
একই সঙ্গে, জালিয়াতির অভিযোগ যেন বৈধ প্রতিনিধিত্ব ক্ষুণ্ন করার কিংবা নির্বাচিত আরব রাজনীতিবিদদের জনজীবন থেকে বাদ দেওয়ার অজুহাতে পরিণত না হয়।
আন্তর্জাতিক মাত্রা
ইসরাইলের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ দেশটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলবে। গাজার যুদ্ধ, সামরিক অভিযানের মানবিক পরিণতি, বসতি সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিনিদের প্রতি আচরণ তীব্র আন্তর্জাতিক সমালোচনা ও আইনি যাচাই-বাছাইয়ের জন্ম দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় সরকারগুলো মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি তাদের ঘোষিত অঙ্গীকারের সঙ্গে ইসরাইলের সঙ্গে তাদের কূটনৈতিক, সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে ক্রমাগত প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছে।
সম্প্রতি বেশ কয়েকজন মার্কিন ও ইউরোপীয় সাংবাদিক এবং রাজনীতিবিদ ইসরাইলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর (আইডিএফ) সহযোগিতায় তথাকথিত বসতি স্থাপনকারীদের শারীরিক আক্রমণের শিকার হয়েছেন। তাঁদের একমাত্র অপরাধ ছিল, তাঁরা নিজেদের চোখে দেখতে চেয়েছিলেন অসহায় ফিলিস্তিনি কৃষকদের সঙ্গে কী ঘটছে, যখন তাঁদের বিদেশি দখলদারেরা পৈতৃক বাড়িঘর ও খামার থেকে উচ্ছেদ করছিল।
ইসরাইলি সরকারের নীতির সমালোচনাকে ইহুদি জনগণের প্রতি শত্রুতার সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা উচিত নয়। ইসরাইলি উগ্রপন্থী, সরকার এবং নিরাপত্তা বাহিনীর নৃশংসতার সমালোচনা করা ইহুদিবিদ্বেষ নয়। সুতরাং, রাষ্ট্রীয় নীতি, বসতি স্থাপনের প্রথা কিংবা ফিলিস্তিনিদের অধিকার লঙ্ঘনের বৈধ সমালোচনা স্তব্ধ করতে ইহুদিবিদ্বেষের অভিযোগ ব্যবহার করা উচিত নয়।
একই নীতি আরব ও মুসলিম সম্প্রদায়কে কুসংস্কার এবং সামষ্টিক দোষারোপ থেকে সুরক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। মানবাধিকার সর্বজনীন; তা ধর্ম, জাতীয়তা কিংবা রাজনৈতিক সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল নয়।
একটি গণতান্ত্রিক পরীক্ষা
এই নির্বাচন ইসরাইলের রাজনৈতিক নেতাদের সামনে একটি পছন্দ তুলে ধরেছে।
আরব-নেতৃত্বাধীন দলগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইসরাইলের সংঘাতের সমাধান করবে না কিংবা ফিলিস্তিনিদের সমান অধিকারের নিশ্চয়তাও দেবে না। এমনকি এই দলগুলোকে বাদ দেওয়ার অর্থও এই নয় যে, ইসরাইল গণতন্ত্র হিসেবে যোগ্য কি না, সে বিষয়ে সব প্রশ্নের নিষ্পত্তি হয়ে যাবে। তবে অন্তর্ভুক্ত করা বা বাদ দেওয়ার পেছনের কারণগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাজনৈতিক নেতারা যদি কেবল আরব প্রতিনিধিরা আরব বলে তাঁদের সঙ্গে সহযোগিতার বিরোধিতা করেন, তবে এই বর্জন সমান নাগরিকত্ব সম্পর্কে গুরুতর প্রশ্ন উত্থাপন করবে। যদি তাঁরা নির্দিষ্ট নীতি বা আচরণের কারণে নির্দিষ্ট দলগুলোকে প্রত্যাখ্যান করেন, তবে সেই কারণগুলো স্পষ্টভাবে প্রকাশ করা এবং ধারাবাহিকভাবে প্রয়োগ করা উচিত।
আইজেনকট ও অন্যান্য বিরোধী নেতাদের অবশ্যই ব্যাখ্যা করতে হবে, তাঁরা তাঁদের ঘোষিত রাজনৈতিক অঙ্গীকার রক্ষা করার পাশাপাশি কীভাবে গণতান্ত্রিক সমতা বজায় রাখার পরিকল্পনা করছেন।
উপসংহার
২৭ অক্টোবর ২০২৬-এর ইসরাইলের নির্বাচন কোনো সহজ বিজয়ী উপহার দেয়নি। তবে গভীর প্রশ্নটি সরকার গঠনের বাইরেও বিস্তৃত। ইসরাইল কি তার গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরব নাগরিকদের সমান রাজনৈতিক অধিকার এবং দখলদারিত্বের মধ্যে বসবাসকারী ফিলিস্তিনিদের মৌলিক অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে পারে?
রাজনৈতিক নেতারা তাঁদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মেটানোর জন্য গাজার জনগণ অনির্দিষ্টকাল অপেক্ষা করতে পারে না। পশ্চিম তীরে উচ্ছেদের মুখোমুখি ফিলিস্তিনি পরিবারগুলোর কাছে অন্য আরেকটি নির্বাচনকে সাধারণ পরিণতি হিসেবে মেনে নিয়ে বাড়িঘর ও জমি ক্রমাগত হারিয়ে যাওয়ার বিষয়টি গ্রহণযোগ্য বলে আশা করা যায় না।
গণতন্ত্র কেবল ভোট দেওয়ার অধিকারের চেয়েও বেশি কিছু। এর জন্য প্রয়োজন সমান নাগরিকত্ব, জবাবদিহিমূলক সরকার, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং বৈষম্য থেকে সুরক্ষা।
তাই ইসরাইলের নির্বাচন এমন একটি পরীক্ষা তৈরি করেছে, যার উত্তর কেবল আসনসংখ্যা গণনা করে দেওয়া যাবে না: রাজনৈতিক ক্ষমতা কি সমান অধিকার ও মানবিক মর্যাদা রক্ষায় প্রয়োগ করা হবে, নাকি বর্জন ও বৈষম্যই রাজনৈতিক বাস্তবতাকে সংজ্ঞায়িত করে চলবে?
এর উত্তর কেবল ইসরাইলি ভোটারদের জন্যই নয়, বরং ফিলিস্তিনি জনগণ, বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্য এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
লেখক : শাহজাহান খান OAM, অস্ট্রেলিয়ার ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ডের ইমেরিটাস অধ্যাপক, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের সাবেক উপাচার্য ও বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের একজন প্রবাসী ফেলো।



