কাবুল ও ইসলামাবাদে তুর্কি জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানের সফরের তাৎপর্য

পড়তে ১ মিনিট

কাবুল ও ইসলামাবাদে তুর্কি জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার প্রধানের সফর



তুর্কি জাতীয় গোয়েন্দা সংস্থার (MIT) প্রধান ইব্রাহিম কালান সাম্প্রতিক দিনগুলোতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন। আফগানিস্তান থেকে পাকিস্তানে তাঁর সফর কেবল একটি আঞ্চলিক সফরের ধারাবাহিকতা নয়; বরং এমন এক সময়ে এটি অনুষ্ঠিত হয়েছে, যখন দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বেশ কয়েকটি নিরাপত্তা সংকট পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েছে।

তালেবান সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে কাবুল ও কান্দাহারে বৈঠকের পর কালান ইসলামাবাদে যান। সেখানে তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং গোয়েন্দা সংস্থা (ISI)-এর প্রধান আসিম মালিকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ তাঁকে অভ্যর্থনা জানান। তুর্কি নিরাপত্তা সূত্রের তথ্যমতে, এসব আলোচনায় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তা সহযোগিতার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ঘটনাবলি এবং সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকিও উঠে আসে।

১৫ সেপ্টেম্বর একটি সামরিক অনুশীলনের সময় ভারতীয় নৌবাহিনীর একটি জাহাজের সঙ্গে পাকিস্তানি একটি জাহাজের সংঘর্ষ (উত্তেজনা) ঘটে। এর পরিপ্রেক্ষিতে দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক পর্যায়ে প্রতিবাদ বিনিময় হয়। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভারতীয় জাহাজটি পাকিস্তানের বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের (EEZ) ভেতরে বিপজ্জনক মহড়া চালিয়েছে। তবে ভারত এই ঘটনার ভিন্ন বিবরণ দিয়েছে।

কালানের সফরের সময়কাল বোঝার ক্ষেত্রে ঘটনাটি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, এই সামুদ্রিক ঘটনার মাত্র দুই দিন পর তাঁর সফর অনুষ্ঠিত হয়। একই সময়ে ইসলামাবাদ আফগানিস্তানের সঙ্গে নিরাপত্তা সংকট এবং মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির নেতিবাচক প্রভাবেরও মুখোমুখি হচ্ছিল। ফলে পাকিস্তানি নেতৃত্ব যে তীব্র নিরাপত্তা চাপের মধ্যে কাজ করছে, ঘটনাটি তারই একটি চিত্র তুলে ধরে।

ইসরাইলের বিষয়টি এই পরিস্থিতিতে অন্য একটি দৃষ্টিকোণ থেকে সামনে আসে। যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ কালান আফগান ও পাকিস্তানি—উভয় পক্ষের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল। তুর্কি সূত্রগুলো জানিয়েছে, ইসলামাবাদে তাঁর বৈঠকগুলোতে যুদ্ধের পর মধ্যপ্রাচ্যে তৈরি হওয়া নিরাপত্তার ভারসাম্য, এর রাজনৈতিক, নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক প্রভাব এবং অন্যান্য অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

পাকিস্তানি নিরাপত্তাবিষয়ক বক্তব্যে এই বিষয়টি মাঝেমধ্যে ভারত ও ইসরাইলের সঙ্গে একসঙ্গে যুক্ত করা হয়। গত কয়েক মাসে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা মুহাম্মদ আসিফ তাঁর দেশের মুখোমুখি হওয়া কৌশলগত পরিবেশের একটি উপাদান হিসেবে ভারত ও ইসরাইলের সামরিক সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেছেন। অন্য কিছু বক্তব্যে তিনি ভারত, আফগানিস্তান, ইরান ও ইসরাইলকে পাকিস্তানের চারপাশের ঝুঁকির প্রেক্ষাপটে একই সূত্রে গাঁথার চেষ্টা করেছেন। এগুলো একজন পাকিস্তানি কর্মকর্তার রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাবিষয়ক নিজস্ব অবস্থান। তবে ইসলামাবাদের বিরুদ্ধে কোনো সমন্বিত চারদলীয় অক্ষ থাকার বিষয়ে এগুলো স্বাধীনভাবে প্রমাণিত কোনো সত্য নয়।

তুরস্ক ও আফগানিস্তানের মধ্যে নিরাপত্তা ও গোয়েন্দা সহযোগিতার বিষয়টিও কালানের আলোচনায় স্থান পায়। পাশাপাশি আঞ্চলিক ঘটনাবলি, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ও ইরানের মধ্যকার যুদ্ধ, সন্ত্রাসবাদ দমন, মানব পাচার এবং মাদক চোরাচালানের বিষয়গুলোও আলোচনায় উঠে আসে।

ইসলামাবাদে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু এরপর সরে যায় আফগান সংকটের অন্য পক্ষের দিকে। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে তালেবান সরকারের সঙ্গে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মুখোমুখি হচ্ছে। ইসলামাবাদ অভিযোগ করে আসছে, পাকিস্তানবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে আফগান ভূখণ্ড থেকে কার্যক্রম চালানোর সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। কালান পৌঁছানোর আগের দিন ইসলামাবাদ জাতিসংঘে নিশ্চিত করে যে, আফগানিস্তান থেকে উদ্ভূত সন্ত্রাসী হুমকির বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার্থে জবাব দেওয়ার পূর্ণ অধিকার তাদের রয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে কালানের পদক্ষেপের সবচেয়ে স্পষ্ট দিক বলে মনে হয় কাবুল ও ইসলামাবাদের মধ্যে যোগাযোগের পথ খোলা রাখার চেষ্টা। তুর্কি সূত্রগুলো নিশ্চিত করেছে, আঙ্কারা আলোচনার মাধ্যমে দুই পক্ষের উত্তেজনা কমাতে সহায়তা করার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাবে। অন্যদিকে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, তারা বাহ্যিক মধ্যস্থতার প্রচেষ্টার প্রতি উন্মুক্ত। তবে এর জন্য আফগান ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত সশস্ত্র কর্মকাণ্ড বন্ধের নিশ্চয়তা পাওয়ার শর্ত রয়েছে।

এই সম্ভাব্য মধ্যস্থতা আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ এ ক্ষেত্রে তুরস্ক কোনো বহিরাগত পক্ষ নয়। তুর্কি গোয়েন্দা সংস্থা এর আগেও পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টায় অংশ নিয়েছে। আঙ্কারা ও ইস্তাম্বুলে দুই দেশের মধ্যে আলোচনার আয়োজন করা হয়েছে, যেমনটি কাতারও করেছে। আফগান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কাবুলে সাম্প্রতিক তুর্কি ও কাতারি উদ্যোগ পাকিস্তানের অনুরোধেই নেওয়া হয়েছে। তবে তুর্কি ও পাকিস্তানি সরকার এ তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেনি।

তবে আফগানিস্তান পাকিস্তানের সামগ্রিক হিসাব-নিকাশের কেবল একটি স্তর। কারণ ইসলামাবাদ এমন একটি বিস্তৃত নিরাপত্তা পরিবেশের মধ্যে কাজ করছে, যার মধ্যে ভারতের সঙ্গে উত্তেজনা, ইরান ও ইসরাইল-সম্পর্কিত ঘটনাবলি এবং পূর্ববর্তী উত্তেজনার বিষয়গুলোও রয়েছে।

এখানেই সৌদি ফাইল এবং ‘মক্কা চুক্তি’ সমীকরণে প্রবেশ করে। কালান পাকিস্তানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে সৌদি আরব ও হুথিদের মধ্যকার উত্তেজনা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর এর সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে আলোচনা করেছেন। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে যে, সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তিটি সহযোগিতার একটি বিদ্যমান কাঠামো হিসেবে রয়েছে। একই সঙ্গে তারা জোর দিয়ে বলেছে, লোহিত সাগর ও বাব আল-মান্দেব সংকটের সমাধান সংলাপ ও কূটনীতির ভিত্তিতে হওয়া উচিত।

এই ঘটনাবলি এমন এক সময়ে ঘটেছে, যখন পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ নিশ্চিত করেছেন যে, সংঘাত বৃদ্ধি পেলে তাঁর দেশ সৌদি আরবের পাশে দাঁড়াবে। অন্যদিকে পাকিস্তানি কর্মকর্তারা বলেছেন, ‘মক্কা চুক্তি’ হলো পাকিস্তান, তুরস্ক ও সৌদি আরবের মধ্যে সমন্বয়ের একটি যৌথ কাঠামো। পাশাপাশি ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানিয়েছে, পাকিস্তান সেনাপ্রধান আসিম মুনির ইরানকে সৌদি আরবের ওপর হুথি হামলা বন্ধে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি সতর্ক করে দিয়েছেন, রিয়াদ যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তির অধীনে অনুরোধ জানালে ইসলামাবাদকে সৌদি আরবকে রক্ষা করতে হতে পারে।

‘‘পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ইরানকে সৌদি আরবে হুথি হামলা বন্ধে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন।’’

‘‘এই সমীকরণের সব পক্ষের সঙ্গেই তুরস্কের সুদৃঢ় সম্পর্ক রয়েছে।’’

অতএব, কালানের এই পদক্ষেপের গুরুত্ব এখানেই স্পষ্ট যে, এটি আপাতদৃষ্টিতে দুটি ভিন্ন পথকে একত্রিত করেছে। একটি দক্ষিণ এশীয় পথ, যা আফগান-পাকিস্তান বিরোধ থেকে শুরু হয়েছে; অন্যটি মধ্যপ্রাচ্যীয় পথ, যা ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে সৌদি আরব ও লোহিত সাগরের নিরাপত্তা পর্যন্ত বিস্তৃত। এই দুই পথের মাঝখানে রয়েছে পাকিস্তান। এমন এক সময়ে দেশটিকে তালেবান, ভারত, ইরান, সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে একই সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে হচ্ছে, যখন আঞ্চলিক উত্তেজনার পরিধি ক্রমেই বাড়ছে।

অন্যদিকে, তুরস্কের কাছে এই সমীকরণের একাধিক পক্ষের সঙ্গে যোগাযোগের একটি বিশেষ সুবিধা রয়েছে। তালেবানদের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক কাবুলের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ দেয়। পাকিস্তানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা সম্পর্ক ইসলামাবাদের সঙ্গে যোগাযোগের সুযোগ তৈরি করে। আর ‘মক্কা চুক্তি’ তাদের সৌদি আরব ও পাকিস্তানের সঙ্গে একটি প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কাঠামোর মধ্যে রাখে।

তাই এই পর্যায়ে আঙ্কারার ভূমিকা কোনো সংঘাতের সরাসরি অংশীদার হওয়ার চেয়ে যোগাযোগের পথগুলো সক্রিয় রাখা এবং একটি সংকট যেন অন্য অঞ্চলে ছড়িয়ে না পড়ে, তা ঠেকানোর চেষ্টার কাছাকাছি।

এই অর্থে, কাবুল থেকে ইসলামাবাদ পর্যন্ত ইব্রাহিম কালানের সফরের ধারাবাহিকতা প্রতিটি বৈঠক বা বিরতির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি কেবল বৈঠকগুলোতে কী আলোচনা হয়েছে, তা নিয়ে নয়; বরং পাকিস্তানের কাছে এসে মিলিত হওয়া সংকটের পুরো জালটিকে বোঝার একটি প্রচেষ্টা। এর মধ্যে রয়েছে তালেবানদের সঙ্গে উত্তেজনা, ভারতের সঙ্গে ঘর্ষণ, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক, সৌদি আরবের নিরাপত্তা এবং শেষ পর্যন্ত মক্কা চুক্তি।

এই জটিল সমীকরণে তুরস্ক তার মধ্যস্থতাকারী ও উন্মুক্ত যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে ভূমিকা ধরে রাখতে চায়। অন্যদিকে পাকিস্তান এমন একটি ব্যবস্থা খুঁজছে, যা একাধিক নিরাপত্তা চাপের মুখে তার সীমান্ত ও আঞ্চলিক পরিমণ্ডলে একই সঙ্গে একাধিক সংকট তৈরি হওয়া প্রতিরোধ করতে পারে।

এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন