ইউএস বন্ডের ইল্ড ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ, বিশ্বজুড়ে শেয়ার বিক্রির ধস আরও গভীর

পড়তে ১ মিনিট

আমেরিকার নিউ ইয়র্ক সিটির নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জের ফ্লোরে কাজ করছেন ট্রেডাররা । ছবি: রয়টার্স


বিশ্বজুড়ে শেয়ার বিক্রির ধস আরও গভীর হওয়ার মধ্যে বৃহস্পতিবার বন্ড বাজারগুলোও নতুন করে চাপের মুখে পড়েছে। মার্কিন ট্রেজারি ইল্ড কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছে শেয়ারবাজারের ওপর চাপ বাড়িয়েছে। তবে এআই চিপ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান মাইক্রনের শক্তিশালী আয়ের খবরে প্রযুক্তি খাত কিছুটা চাঙ্গা অবস্থান ধরে রাখতে পেরেছে।

বৈশ্বিক ঋণের ব্যয় এবং সম্পদের মূল্যের অন্যতম প্রধান মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত ১০ বছর মেয়াদি মার্কিন ট্রেজারি ইল্ড ৫.৩৪ শতাংশে উঠে যায়, যা ২০০২ সালের পর সর্বোচ্চ। তবে কম দামে বন্ড কেনার জন্য ক্রেতারা এগিয়ে আসায় পরে তা কিছুটা কমে ৫.২৮ শতাংশে নেমে আসে।

সেপ্টেম্বর পর্যন্ত তিন মাসে এই ইল্ড চলতি শতাব্দীর সর্বোচ্চ ত্রৈমাসিক বৃদ্ধি রেকর্ড করেছে। এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছে ফ্রান্স, ব্রিটেন ও জাপানের বন্ড বাজারেও।

জ্বালানি খরচ বেড়ে মূল্যস্ফীতি উসকে দেওয়ার আশঙ্কা এবং এআই ও ডেটা সেন্টার নির্মাণের জোয়ার বাড়তে থাকায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও স্বল্পমেয়াদি সুদের হার ভবিষ্যতে কোথায় গিয়ে ঠেকবে—তা নিয়ে অনিশ্চয়তা বেড়েছে। এর ফলে বিশ্বজুড়ে বন্ডের ইল্ড বা সুদের হারও ক্রমাগত বাড়ছে।

তেলের দামেও বাড়ছে চাপ

মধ্যপ্রাচ্যে সাত মাস ধরে চলা যুদ্ধের অবসানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শান্তি আলোচনা থমকে থাকায় অপরিশোধিত তেলের দামও চড়া রয়েছে।

জুলাই-সেপ্টেম্বর ত্রৈমাসিকে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৪২ শতাংশ বেড়েছে। বর্তমান মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহৃত ডিসেম্বরের চুক্তিতে সর্বশেষ প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ছিল প্রায় ১০০ ডলার।

রেন স্টার্লিংয়ের প্রধান বাজার কৌশলবিদ রোরি ম্যাকফারসন বলেন, “আমাদের বন্ডে দীর্ঘস্থায়ী বিক্রির ধস তৈরি হয়েছে। এগুলো তেলের দামের সঙ্গে সম্পর্কিত এবং একই সঙ্গে আমরা যুক্তরাষ্ট্রের শক্তিশালী অর্থনৈতিক তথ্যও পেয়েছি।”

তিনি আরও বলেন, “আমাদের কাছে এমন পর্যাপ্ত ক্রেতা নেই, যারা বন্ড কিনতে চান।”

এই পরিস্থিতিতে ইউরোপীয় শেয়ারবাজারও চাপের মুখে পড়ে। সামগ্রিক STOXX 600 সূচক ০.৭৫ শতাংশ এবং ইউরোপীয় ব্যাংকগুলোর শেয়ার ১.৮ শতাংশ কমে যায়। তবে মার্কিন শেয়ারের ফিউচার স্থিতিশীল ছিল।

মাইক্রনের আয়ে প্রযুক্তি খাতে স্বস্তি

এআই খাতের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহকারী মাইক্রনের শক্তিশালী আয়ের খবর মার্কিন বাজারকে কিছুটা সহায়তা করেছে।

মাইক্রনের ফলাফলে এআই মেমরি চিপের শক্তিশালী চাহিদার ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ চুক্তির আওতায় প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক প্রতিশ্রুতির পরিমাণ ৩২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে, যা জুনে ছিল ২২ বিলিয়ন ডলার।

মাইক্রনের এই ফলাফল এশিয়ার প্রযুক্তিনির্ভর শেয়ারবাজারেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। জাপানের নিক্কেই সূচক ৩ শতাংশের বেশি বেড়েছে। দক্ষিণ কোরিয়ার কসপি (KOSPI) ১.৭ শতাংশ বেড়ে আগের লোকসান পুষিয়ে নিয়েছে।

স্যাক্সোর প্রধান বিনিয়োগ কৌশলবিদ চারু চানানা বলেন, “মাইক্রনের এই পরিসংখ্যান এআই ও মেমরির চাহিদার আরেকটি শক্তিশালী প্রমাণ। তবে চাহিদা জোগানের চেয়ে বেশি থাকা সত্ত্বেও বাজার এখন ক্রমেই প্রশ্ন তুলতে পারে, আমরা মেমরি ঘাটতির একেবারে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছি কি না।”

কম দামে বন্ড কিনতে ক্রেতাদের আগমন

জ্বালানি খরচ বৃদ্ধি এবং এআই বিপ্লবের মধ্যে বন্ডের দাম ব্যাপকভাবে পড়ে যাওয়ায় সেপ্টেম্বরে বৈশ্বিক সুদের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। ফলে বিনিয়োগকারীদের এমন একটি সময়ের জন্য প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে, যখন সুদের হার দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ পর্যায়ে থাকতে পারে।

বাজারের প্রধান নজর এখন মার্কিন ট্রেজারি ইল্ডের দিকে। বিশেষ করে মানসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ৫ শতাংশের স্তরের ওপরে ইল্ড কতদিন থাকে, সেটিই বিনিয়োগকারীদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিছু বিনিয়োগকারী আবার সুদের হার ৬ শতাংশ ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও বিবেচনা করছেন।

এলএসইজি (LSEG)-এর তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বর ত্রৈমাসিকে মার্কিন ১০ বছর মেয়াদি ইল্ড ৮৭ বেসিস পয়েন্ট বেড়েছে, যা ১৯৯৪ সালের পর সর্ববৃহৎ ত্রৈমাসিক বৃদ্ধি।

ফ্রান্সের ১০ বছর মেয়াদি ইল্ড ত্রৈমাসিক হিসাবে ১২০ বেসিস পয়েন্ট বেড়েছে, যা ১৯৮৭ সালের পর সর্বোচ্চ। বৃহস্পতিবার দেশটির ইল্ড আরও ১০ বেসিস পয়েন্ট বেড়ে ৪.৯৬ শতাংশে পৌঁছায়, অর্থাৎ প্রতীকী ৫ শতাংশের স্তরের খুব কাছাকাছি চলে আসে।

পরে তা কিছুটা কমে ২ বেসিস পয়েন্ট নেমে ৪.৮২ শতাংশে দাঁড়ায়। তবে ফ্রান্সের বাজেট নিয়ে অনিশ্চয়তা বিনিয়োগকারীদের উদ্বিগ্ন রেখেছে।

জাপানেও সুদের হার কয়েক দশকের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে উঠেছে। অন্যদিকে ব্রিটেনের ৩০ বছর মেয়াদি সুদের হার ৬ শতাংশের ওপরে চলে গেছে।

ফেডের সুদের হার নিয়ে নতুন হিসাব

বুধবার প্রকাশিত মার্কিন মূল্যস্ফীতির তথ্য প্রত্যাশার তুলনায় কিছুটা কম আসায় অক্টোবরে ফেডারেল রিজার্ভ আবার সুদের হার বাড়াতে পারে—এমন প্রত্যাশাও কিছুটা কমেছে। বন্ড বাজারের সাম্প্রতিক ওঠানামার পেছনে এটিও একটি কারণ।

সিএমইর (CME) ফেডওয়াচ টুল অনুযায়ী, ব্যবসায়ীরা চলতি মাসে ফেড সুদের হার বাড়াবে—এমন সম্ভাবনা এখন ৩৮ শতাংশ মনে করছেন। এক দিন আগেও এই সম্ভাবনা ছিল ৫০ শতাংশ।

ডলারের শক্তি, বাড়ল স্বর্ণের দাম

মুদ্রাবাজারে বন্ডের দরপতনের সবচেয়ে বড় সুবিধাভোগী হয়েছে ডলার। বৃহস্পতিবারও মার্কিন মুদ্রা শক্তিশালী অবস্থানে ছিল।

ইউরোর মান ০.৩ শতাংশ কমে ১.১২৯৭ ডলারে এবং পাউন্ডের মান একই হারে কমে ১.৩২২৩ ডলারে নেমে আসে।

অন্যদিকে স্বর্ণের দাম সামান্য বেড়ে প্রতি আউন্স ৪,১৭৪ ডলারে দাঁড়িয়েছে।

সূত্র : রয়টার্স


এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন