২০২৬ সালে অতি-দক্ষিণপন্থীরা সুসংগঠিত দল থেকে সরে যাচ্ছে ডিজিটাল নেটওয়ার্কে

পড়তে ১ মিনিট

পূর্ব জার্মানির ড্রেসডেনের রাস্তায় এক মিছিলে অংশ নিচ্ছেন অতি-দক্ষিণপন্থী চরমপন্থীরা । ছবি: এএফপি

২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের ওপর ভিত্তি করে তৈরি একটি মূল্যায়নে বলা হয়েছে, অতি-দক্ষিণপন্থী চরমপন্থা ধীরে ধীরে কোনো নির্দিষ্ট নেতা বা ঐতিহ্যবাহী সুসংগঠিত দলের নেতৃত্বাধীন কাঠামো থেকে সরে বিকেন্দ্রীভূত অনলাইন নেটওয়ার্কের দিকে ঝুঁকছে। এর ফলে চরমপন্থার পরিবেশ আরও বিভক্ত হয়ে উঠছে এবং মৌলবাদ ও সম্ভাব্য হুমকি শনাক্ত করা নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য কঠিন হয়ে পড়ছে।

মূল্যায়নে বলা হয়েছে, গত এক দশকে এই পরিবর্তন আরও দ্রুত হয়েছে। চরমপন্থী কর্মকাণ্ড ক্রমেই ডিজিটাল জগতে বিস্তৃত হওয়ায় নব্য-নাৎসি ও শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদী মতাদর্শ সহজেই বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।

ছয় মাসে ২৫৫টি ঘটনা

২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে ৩০টি দেশে ২৫৫টি অতি-দক্ষিণপন্থী ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এসব ঘটনার মধ্যে প্রচার-প্রচারণা ও বিক্ষোভ থেকে শুরু করে হুমকি, হামলা এবং গুরুতর সহিংসতাও রয়েছে।

সবচেয়ে বেশি ঘটনা ঘটেছে যুক্তরাষ্ট্রে—৮২টি। এরপর যুক্তরাজ্যে ৩৩টি, ইতালিতে ২০টি এবং স্পেনে ১৬টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে।

গুরুতর সহিংসতা বা সহিংসতার চেষ্টার ঘটনা—যেমন গুলিবর্ষণ, বোমা হামলা, অগ্নিসংযোগ ও হত্যাকাণ্ড—ছিল ৩৭টি, যা মোট ঘটনার ১৪.৫ শতাংশ।

তবে নথিভুক্ত কর্মকাণ্ডের অধিকাংশই ছিল প্রচার-প্রচারণা, জনসমাবেশ বা ভয়ভীতি প্রদর্শনের সঙ্গে সম্পর্কিত। সমাবেশ, বিক্ষোভ, কনসার্ট ও প্রকাশ্য বক্তব্যের ৮১টি ঘটনা রেকর্ড করা হয়েছে। এছাড়া গ্রাফিতি, লিফলেট ও অন্যান্য লিখিত উপকরণসংক্রান্ত ঘটনা ছিল ৭৭টি। আরও ৬০টি ঘটনায় হামলা, অপমান বা হুমকির তথ্য পাওয়া গেছে।

বর্ণবাদ ও অভিবাসীবিরোধী মনোভাব

বর্ণবাদী বা জাতিগত বিদ্বেষ ছিল সবচেয়ে বেশি চিহ্নিত প্রেরণা। এমন মনোভাব ৭৬টি ঘটনায় দেখা গেছে। অভিবাসীবিরোধী ও বিদেশীবিদ্বেষী মনোভাব ছিল ৬২টি ঘটনায়।

মূল্যায়নে ৪১টি মুসলিমবিদ্বেষী (ইসলামোফোবিয়া) এবং ২৮টি ইহুদিবিদ্বেষী ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে ৩১টি ঘটনার পেছনে ছিল সরকারবিরোধী বা বিদ্যমান ব্যবস্থা-বিরোধী মতাদর্শ, যার মধ্যে এক্সিলারেটরনিজম (Accelerationism)-ও রয়েছে।

এক্সিলারেটরনিজম এমন একটি মতাদর্শ, যা বিদ্যমান রাজনৈতিক ব্যবস্থার পতনকে ত্বরান্বিত করতে রাজনৈতিক সহিংসতা ও সামাজিক অস্থিতিশীলতা বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নেয়। অতি-দক্ষিণপন্থীদের একটি অংশ এই ধারণাকে শ্বেতাঙ্গ জাতিগত-জাতীয়তাবাদী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত করে।

মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বিভিন্ন চরমপন্থী মতাদর্শ প্রায়ই পরস্পরের সঙ্গে মিশে যায়। শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদ, অভিবাসীবিরোধী বক্তব্য, ইসলামোফোবিয়া, ইহুদিবিদ্বেষ, ষড়যন্ত্র তত্ত্ব এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতি বৈরিতা একই চরমপন্থী পরিবেশে বারবার দেখা যাচ্ছে।

অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বাড়ছে নজরদারি

চরমপন্থী বিষয়বস্তু ছড়িয়ে দেওয়া এবং আন্তর্জাতিক সীমান্ত পেরিয়ে ব্যক্তিদের যুক্ত করার ক্ষেত্রে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর ভূমিকার ওপর নিরাপত্তা সংস্থাগুলো এখন আরও বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে।

ইউরোপোল সতর্ক করেছে, অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলো চরমপন্থী প্রচারণা ও মৌলবাদী ভাবধারা ছড়িয়ে দেওয়ার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে রয়ে গেছে।

বিশেষ করে ‘লোন অ্যাক্টর’ (একক অপরাধী) এবং ছোট ছোট নেটওয়ার্ক নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। কারণ, এসব ব্যক্তি প্রতিষ্ঠিত কোনো চরমপন্থী সংগঠনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত না থেকেও নিজেদের কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে পারে।

টেররগ্রাম: অনলাইন নেটওয়ার্কের উদাহরণ

অতি-দক্ষিণপন্থী চরমপন্থার পরিবর্তনশীল কাঠামোর একটি উদাহরণ হিসেবে ‘টেররগ্রাম কালেক্টিভ’ (Terrorgram Collective)-এর নাম উঠে এসেছে।

কর্তৃপক্ষের মতে, টেররগ্রামের প্রচারণামূলক উপকরণে প্রভাবিত ব্যক্তিরা বিভিন্ন দেশে হামলা ও ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এর মাধ্যমে দেখা যাচ্ছে, কোনো প্রচলিত সাংগঠনিক কাঠামো না থাকলেও কীভাবে চরমপন্থী প্রচারণা আন্তর্জাতিক সীমান্ত অতিক্রম করতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে এই আন্তঃদেশীয় শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যবাদী নেটওয়ার্ক এবং এর তিন নেতাকে ‘বিশেষভাবে চিহ্নিত বৈশ্বিক সন্ত্রাসী’ (Specially Designated Global Terrorists) হিসেবে ঘোষণা করে।

মার্কিন কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, মূলত অনলাইননির্ভর এই নেটওয়ার্ক সহিংসতায় উসকানি দিত, হামলার নির্দেশিকা-সংবলিত উপকরণ বিতরণ করত এবং সরকারি কর্মকর্তা ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে লক্ষ্যবস্তু করার জন্য অনুসারীদের উৎসাহিত করত।

অনলাইন উগ্রবাদ শনাক্তে নতুন চ্যালেঞ্জ

অনলাইন নেটওয়ার্কগুলোর ক্রমবর্ধমান ভূমিকা চরমপন্থী বক্তব্য ছড়ানো এবং প্রকৃতপক্ষে সহিংসতার দিকে ধাবিত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে পার্থক্য করা আরও জটিল করে তুলেছে।

অনলাইনে থাকা বিপুলসংখ্যক চরমপন্থী উপকরণ ফৌজদারি বিচারের আইনি সীমা অতিক্রম করে না। ফলে হুমকি দেওয়া, হামলার পরিকল্পনা করা বা বাস্তবে সহিংস কর্মকাণ্ডের দিকে এগিয়ে যাওয়া অল্পসংখ্যক ব্যবহারকারীকে শনাক্ত করতে কর্তৃপক্ষকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

তবে মূল্যায়নে উল্লেখ করা পরিসংখ্যান বিশ্বব্যাপী অতি-দক্ষিণপন্থী কর্মকাণ্ডের সম্পূর্ণ চিত্র তুলে ধরে না। এতে প্রচার-প্রচারণা ও বিক্ষোভ থেকে শুরু করে হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত বিস্তৃত বিভিন্ন ধরনের ঘটনাকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাশাপাশি ২৫৫টি ঘটনার সবগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করার জন্য সাধারণের জন্য উন্মুক্ত কোনো নির্দিষ্ট ডেটাবেসও দেওয়া হয়নি।

তবুও, অতি-দক্ষিণপন্থী চরমপন্থার ক্রমবর্ধমান বিকেন্দ্রীভূত কাঠামো এবং মৌলবাদ ছড়িয়ে দিতে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোর ভূমিকা নিয়ে ইউরোপীয় ও মার্কিন নিরাপত্তা গবেষকদের একই ধরনের সতর্কবার্তার মধ্যেই এই তথ্য সামনে এসেছে।

নিরাপত্তা সংস্থাগুলো এখন এমন ব্যক্তিদের মোকাবিলা করছে, যারা কেবল অনলাইনে চরমপন্থী সামগ্রী গ্রহণ করে, সমমনা ব্যবহারকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং অনলাইনেই ধীরে ধীরে উগ্রপন্থী হয়ে ওঠে—কোনো আনুষ্ঠানিক চরমপন্থী সংগঠনের সদস্য না হয়েই।

সূত্র : ডেইলি সাবাহ



এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন