ব্রিকস সম্মেলন ২০২৬: বাড়ছে প্রভাব, বিভক্ত স্বার্থ

পড়তে ১ মিনিট

ব্রিকস সম্মেলন ২০২৬ | ছবি : সংগৃহীত

২০২৬ সালের ১২ সেপ্টেম্বর নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১৮তম ব্রিকস (BRICS) সম্মেলন এমন একটি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার পক্ষে জোরালো আহ্বান জানিয়েছে, যেখানে উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর জন্য আরও ভালো প্রতিনিধিত্ব, অধিকতর আর্থিক স্বায়ত্তশাসন এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বৃহত্তর সহযোগিতার ওপর জোর দেওয়া হবে।

সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’-য় জাতিসংঘ সংস্কার ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্য থেকে শুরু করে সন্ত্রাসবাদ, এআই এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো স্থান পেয়েছে।

বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের প্রতিনিধিত্বকারী এই জোট ক্রমেই গতি অর্জন করেছে এবং বিশ্বের একটি বড় অংশে প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। সম্মিলিতভাবে ব্রিকস দেশগুলো বিশ্বব্যাপী জিডিপির অন্তত ৪০ শতাংশ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ২৬ শতাংশের প্রতিনিধিত্ব করছে। এর ফলে বিশ্ব পরিচালনব্যবস্থায় আরও বড় ভূমিকা দাবি করা দেশগুলো একটি বিশেষ অবস্থান লাভ করেছে। তবে ব্রিকসের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক শক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক ঐক্যে রূপান্তরিত হয়নি।

ব্রিকসের সদস্য দেশগুলোর ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ সবসময় এক নয়। ফলে জোটের সদস্যরা দীর্ঘমেয়াদে কতটা ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যেতে পারবে, তা নিয়ে আবারও প্রশ্ন উঠেছে। তা সত্ত্বেও বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের মধ্যেও জোটটি সম্প্রসারিত হচ্ছে।

একটি ভারসাম্যপূর্ণ বিশ্ব ব্যবস্থার তাগিদ

আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কারের বিষয়টি ঘোষণাপত্রে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। চীন ও রাশিয়ার স্থায়ী সদস্যপদ বহাল রাখার অবস্থানকে স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি জাতিসংঘে, বিশেষ করে নিরাপত্তা পরিষদে ব্রাজিল ও ভারতের আরও বড় ভূমিকার প্রতি ব্রিকস তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।

উদীয়মান ও উন্নয়নশীল অর্থনীতিগুলোকে তাদের অর্থনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভোটাধিকার দেওয়ার লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) ও বিশ্বব্যাংকের সংস্কারেরও দাবি জানিয়েছে জোটটি। এ ক্ষেত্রে কোনো বিলম্ব না করে আইএমএফের ১৬তম কোটা পর্যালোচনার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নেরও জোরালো আহ্বান জানানো হয়েছে।

বাণিজ্যের ক্ষেত্রে নেতৃবৃন্দ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর বিরোধ নিষ্পত্তি ব্যবস্থা পুনরুজ্জীবিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে একতরফা নিষেধাজ্ঞা ও কার্বন বর্ডার অ্যাডজাস্টমেন্ট ব্যবস্থার বিরোধিতা করেছেন।

এসব দাবি উদীয়মান অর্থনীতিগুলোর দীর্ঘদিনের উদ্বেগকে প্রতিফলিত করে। তাদের মতে, বিদ্যমান আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেদের যথেষ্টভাবে খাপ খাইয়ে নিতে পারেনি।

আর্থিক স্বাধীনতা

সম্মেলনের অন্যতম ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করা বিষয় ছিল আন্তর্জাতিক লেনদেনে মার্কিন ডলারের ওপর নির্ভরতা কমানো। ব্রিকসের জন্য একটি একক বা অভিন্ন মুদ্রা চালুর প্রতিশ্রুতির পরিবর্তে ঘোষণাপত্রে বাণিজ্য নিষ্পত্তি ও বিনিয়োগে জাতীয় মুদ্রার ব্যবহার বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আন্তঃসীমান্ত পেমেন্ট ব্যবস্থায় সহযোগিতা এগিয়ে নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ব্রিকস পেমেন্ট টাস্কফোর্সকে।

ঘোষণাপত্রে স্বীকার করা হয়েছে যে সব সদস্যের জন্য উপযোগী এমন কোনো একক ও সর্বজনীন পন্থা নেই। আর্থিক একত্রীকরণের গতি ও পরিধি নিয়ে সদস্য দেশগুলোর মধ্যে যে পার্থক্য রয়েছে, এই অবস্থান তারই প্রতিফলন।

মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত

সম্মেলনে পশ্চিম এশিয়ায় ক্রমবর্ধমান উত্তেজনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে সর্বোচ্চ সংযম প্রদর্শনের পাশাপাশি বেসামরিক নাগরিক, পারমাণবিক স্থাপনা ও গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সুরক্ষা নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে।

ফিলিস্তিন প্রশ্নে ২০২৫ সালের অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি চুক্তি সত্ত্বেও গাজায় চলমান সহিংসতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ব্রিকস। জোটটি ফিলিস্তিনিদের জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতির বিরোধিতা করেছে। একই সঙ্গে পূর্ব জেরুজালেমকে ফিলিস্তিনের রাজধানী করে ১৯৬৭ সালের সীমান্তের ভিত্তিতে দ্বি-রাষ্ট্র সমাধান এবং জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের সদস্যপদের প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে।

ঘোষণাপত্রে ২০২৫ সালের এপ্রিলে ভারতের পেহেলগামে সংঘটিত সন্ত্রাসী হামলারও তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে, যাতে ২৬ জন নিহত হয়েছিলেন। এতে সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা, সন্ত্রাসী অর্থায়ন ও নিরাপদ আশ্রয়ের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দ্বিমুখী নীতি পরিহার করে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদারের আহ্বান জানানো হয়েছে।

সুদান ও সিরিয়ার সংঘাত এবং লেবাননের পরিস্থিতিসহ অন্যান্য আঞ্চলিক বিষয়ও সম্মেলনে গুরুত্ব পেয়েছে। তবে উল্লেখযোগ্যভাবে, ঘোষণাপত্রে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের নাম সরাসরি উল্লেখ করা এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এটি রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল বিভিন্ন ইস্যুতে ঐকমত্যে পৌঁছানোর জটিলতাকেই সামনে নিয়ে আসে।

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) এবং জ্বালানি নিরাপত্তা

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সহযোগিতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। নেতৃবৃন্দ সাইবার নিরাপত্তা ও আন্তঃসীমান্ত ডিজিটাল অপরাধ মোকাবিলার পাশাপাশি বৈশ্বিক এআই পরিচালনব্যবস্থা এগিয়ে নেওয়ার অঙ্গীকার করেছেন।

জ্বালানি নিরাপত্তাও ছিল সম্মেলনের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। ঘোষণাপত্রে স্থিতিশীল জ্বালানি বাজার, নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর সুরক্ষার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সম্পদসমৃদ্ধ দেশগুলোর সার্বভৌমত্বের প্রতি সম্মান রেখে গুরুত্বপূর্ণ খনিজের জন্য ন্যায্য ও স্থিতিস্থাপক সরবরাহ শৃঙ্খল গড়ে তোলার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সামনের চ্যালেঞ্জসমূহ

নয়াদিল্লি সম্মেলন বিশ্ব অর্থনৈতিক শাসনব্যবস্থাকে পুনর্গঠন এবং উদীয়মান শক্তিগুলোর মধ্যে সহযোগিতা জোরদারের ক্ষেত্রে ব্রিকসের ক্রমবর্ধমান আকাঙ্ক্ষাকে তুলে ধরেছে। তবে বিতর্কিত আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলোতে সতর্কতার সঙ্গে তৈরি করা রূপরেখা ভিন্ন ভিন্ন কৌশলগত অগ্রাধিকারসম্পন্ন দেশগুলোর মধ্যে ঐকমত্যের সীমাবদ্ধতাগুলোও স্পষ্ট করেছে।

চীন ২০২৭ সালে এই জোটের সভাপতিত্ব গ্রহণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। ফলে মূল প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—ব্রিকস কি তার ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রভাব ও উচ্চাভিলাষী ঘোষণাগুলোকে সমন্বিত পদক্ষেপ এবং অর্থবহ প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারে রূপান্তর করতে পারবে?

এর ভবিষ্যৎ তাৎপর্য কেবল সদস্যপদের আকার বা সম্মিলিত অর্থনৈতিক শক্তির ওপর নির্ভর করবে না; বরং নিজেদের যৌথ আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তব ও কার্যকর ফলাফলে রূপ দেওয়ার সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করবে।

এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন