কূটনীতি থমকে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আরও কঠোর সামরিক জবাবের প্রস্তুতি নিচ্ছে ইরান

পড়তে ১ মিনিট

ইরানের তেহরানের বাহারেস্তান স্কয়ারে প্রদর্শনের জন্য রাখা একটি সামরিক ড্রোন । ছবি: আনাদোলু এজেন্সি

যুক্তরাষ্ট্র যদি বড় ধরনের হামলা আবার শুরু করে, তাহলে ইরান আরও শক্তিশালী সামরিক জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। একই সময়ে ইরান যে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে, তা সফল হওয়ার সম্ভাবনা খুব কম বলেই মনে করছেন দেশটির কর্মকর্তারা।

এই পরিকল্পনা ইরানের নেতৃত্বের মধ্যে তৈরি হওয়া একটি দৃঢ় বিশ্বাসকে প্রতিফলিত করে। তেহরান আলোচনার মাধ্যমে যুদ্ধ এড়াতে চাইলেও যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে কোনো সামরিক অভিযান শুরু করলে এবার আগের চেয়ে আরও কঠোর জবাব দিতে হবে—এমন অবস্থানই নেওয়া হচ্ছে।

তিনজন জ্যেষ্ঠ ইরানি কর্মকর্তা এবং এ আলোচনা সম্পর্কে অবগত একজন ব্যক্তি জানিয়েছেন, সম্ভাব্য মার্কিন হামলার জবাব নিয়ে ইরানের জ্যেষ্ঠ কমান্ডাররা বিভিন্ন পরিকল্পনা পর্যালোচনা করছেন। এসব পরিকল্পনায় সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুর পরিধি শুধু মার্কিন-সংশ্লিষ্ট স্থাপনা বা সম্পদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে সহায়তাকারী দেশগুলো এবং সম্ভবত মধ্যপ্রাচ্যের বাইরের কিছু স্থানও অন্তর্ভুক্ত করার বিষয় বিবেচনা করা হচ্ছে।

গত সপ্তাহে প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান নিউ ইয়র্ক থেকে দেশে ফেরার পর যুক্তরাষ্ট্র আবার হামলা চালালে কীভাবে এবং কখন তার জবাব দেওয়া হবে, তা নিয়ে কমান্ডার ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা গুরুত্বের সঙ্গে আলোচনা করছেন।

যদিও এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি, তবু উভয় পক্ষের কেউই আপসের মানসিকতা না দেখানোয় ইরানের সামরিক প্রস্তুতি আরও জোরদার করা হয়েছে।

২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরাইলি হামলার মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া সাত মাসের সংঘাতের পর এই আলোচনা চলছে। যদিও ৮ এপ্রিলের একটি যুদ্ধবিরতির মাধ্যমে ৪০ দিনের যুদ্ধের অবসান ঘটে, এরপরও বিচ্ছিন্নভাবে সংঘর্ষ ও হামলা অব্যাহত রয়েছে।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ ইরান বিশ্লেষক হামিদরেজা আজিজি বলেন, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আবার বড় ধরনের সামরিক অভিযান শুরু করবেন, নাকি ইরানের পরমাণু স্থাপনায় হামলার মতো সীমিত কোনো পদক্ষেপ নেবেন—তা নিয়ে তেহরান এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।

“তবে মনে হচ্ছে, তারা কোনো প্রতীকী পদক্ষেপের প্রতীকী জবাব দেওয়ার পরিবর্তে উত্তেজনা আরও বাড়ানোর ব্যাপারে সংকল্পবদ্ধ। এর মাধ্যমে তারা পুনরায় প্রতিরোধ গড়ে তোলা এবং ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলার সক্ষমতা অর্জন করতে চায়,” বলেন আজিজি।

দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের রাজনৈতিক ঝুঁকিগুলোও তেহরান হিসাব করে দেখছে। বিভিন্ন জরিপে দেখা গেছে, আমেরিকান জনগণের কাছে এই যুদ্ধ জনপ্রিয় নয়। একই সঙ্গে মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়াও তাদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

দুজন কর্মকর্তা জানান, যুক্তরাষ্ট্র বড় ধরনের নতুন হামলা চালালে ইরানকে সহায়তা করতে লেবানন, ইয়েমেন ও ইরাকে থাকা মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে প্রস্তুত থাকার নির্দেশ দিয়েছে তেহরান।

তারা জানান, নির্দেশনায় “হরমুজ প্রণালী থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্যের ভেতরে ও বাইরে থাকা মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে” সমন্বিত পদক্ষেপের প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে রয়টার্সের মন্তব্যের অনুরোধের জবাবে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানায়নি।

কূটনীতি ও উত্তেজনা বৃদ্ধি

বৃহত্তর যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেও তেহরান আলোচনার পথ এখনো খোলা রাখছে।

বাতিল হয়ে যাওয়া চুক্তিটি পুনরুজ্জীবিত করার লক্ষ্যে ইরানের সর্বশেষ প্রস্তাবের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া নিয়ে তেহরান এখনো চিন্তাভাবনা করছে। এর মধ্যেই বৃহস্পতিবার পেজেশকিয়ান বলেন, ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় কখনোই পিছপা হবে না।

আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ তার বক্তব্য উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, “আমরা কখনোই আলোচনা থেকে পিছপা হইনি এবং কখনোই হব না, যদিও একটি চুক্তি স্বাক্ষরের পরও যুক্তরাষ্ট্র তিনবার আমাদের দেশকে লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছে।”

ইরানের হিসাব-নিকাশের পেছনে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। মার্কিন অবরোধের মুখে দীর্ঘমেয়াদি সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার মতো সক্ষমতা তাদের অর্থনীতির আছে কি না, তা নিয়ে তেহরান উদ্বিগ্ন। এসব অবরোধ ইরানের আয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস তেল রপ্তানিকে বাধাগ্রস্ত করেছে।

বছরের পর বছর ধরে চলা নিষেধাজ্ঞা এবং ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট সাধারণ ইরানিদের ওপর ইতোমধ্যে ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে।

গত সপ্তাহে নিউ ইয়র্কে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের অধিবেশনের সময় তেহরান কাতারি মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে একটি প্রস্তাব দেয়। প্রস্তাবটি গৃহীত হলে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া এবং সাত দিনের মধ্যে পুরো অঞ্চলজুড়ে শত্রুতা বন্ধ করা সম্ভব হবে বলে ইরান জানায়।

ইরানি কর্তৃপক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রস্তাবে যুদ্ধ বন্ধ করা, ইরানি বন্দরগুলোর ওপর মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহার, ইরানের অন্তত ১২ বিলিয়ন ডলার অবরুদ্ধ তহবিল মুক্ত করা এবং তেল-সংক্রান্ত নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার দাবি জানানো হয়েছে।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শনিবার জানান, তিনি ইরানের এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, কাতারের মাধ্যমে মঙ্গলবার তেহরানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি জবাব পৌঁছেছে। সেটি বর্তমানে পর্যালোচনা করছে ইরান।

ইরানি সূত্রের মতে, ওয়াশিংটন চায় ইরানের বিতর্কিত পরমাণু কর্মসূচিকেও আলোচনার অংশ করা হোক। তবে তেহরানের অবস্থান হলো, তাদের নির্ধারিত সাতটি শর্ত পূরণ হওয়ার পরই কেবল পরমাণু ইস্যুতে আলোচনা শুরু হতে পারে; তার আগে নয়।

একজন কর্মকর্তা বলেন, “এমনকি ইরান যদি যুক্তরাষ্ট্রের এই জবাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান না-ও করে এবং পরোক্ষ আলোচনা অব্যাহত রাখে, তবুও দুই পক্ষের কোনো চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনা খুবই কম।”

ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান প্রোগ্রামের পরিচালক অ্যালেক্স ভাতানকা বলেন, কূটনীতির সম্ভাবনা এখনো সীমিত।

“মার্কিন অবরোধ দীর্ঘায়িত হওয়া ইরান সহ্য করতে পারবে না। কারণ এটি পুরো পরিস্থিতি বদলে দিয়ে শেষ পর্যন্ত সরকারের টিকে থাকার সক্ষমতাকেই দুর্বল করে দিতে পারে। এই পরিস্থিতিতে উত্তেজনা বেড়ে যাওয়া খুবই স্বাভাবিক,” বলেন ভাতানকা।

আরেকটি যুদ্ধের মূল্য

সংঘাত শুরুর পর থেকে যুদ্ধের তীব্রতা কখনো কমেছে, আবার কখনো নতুন করে হামলা ও সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। এর ফলে হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে, ইরানের সামরিক সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং দেশটির আগে থেকেই ভঙ্গুর অর্থনীতি আরও দুর্বল হয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও এই যুদ্ধের মূল্য কম নয়। সংঘাতের কারণে পেন্টাগনের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদ কমেছে। অন্যদিকে, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পরিবর্তনশীল লক্ষ্যগুলোর বেশিরভাগই অর্জিত হয়নি।

ইরান ও তার মিত্ররা পুরো অঞ্চলে সংঘাত ছড়িয়ে দিয়ে, হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেল পরিবহন ব্যাহত করে এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে ঝুঁকি বাড়িয়ে ওয়াশিংটনের জন্য যুদ্ধের ব্যয় বাড়ানোর চেষ্টা করেছে।

ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। অন্যদিকে, ইয়েমেনে ইরানের মিত্র হুতিরাও সৌদি স্বার্থকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।

বাব আল-মান্দেব প্রণালীর দিকে হুতিদের অগ্রগতি বৈশ্বিক জ্বালানি রুটে চাপ সৃষ্টির আরেকটি ক্ষেত্র তৈরি করেছে। এর ফলে ইরানপন্থী এই গোষ্ঠীটি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রবেশপথে নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব বিস্তারের সুযোগ পেয়েছে।

নীতি নির্ধারণী প্রক্রিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ এক ব্যক্তি জানান, সামরিক চাপ ও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার সম্মিলিত প্রভাব ইরানের ধর্মীয় শাসকদের জন্য সামাল দেওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে।

অশান্তির আশঙ্কা

এই চাপ দেশের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা নিয়েও ইরানি নেতৃত্বের মধ্যে উদ্বেগ বাড়িয়ে তুলছে।

ইরানের একজন সাবেক জ্যেষ্ঠ সংস্কারপন্থী কর্মকর্তা জানান, নেতৃত্ব আশঙ্কা করছে যে জানুয়ারিতে দেশজুড়ে যে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি হতে পারে। সে সময় অর্থনৈতিক পরিস্থিতির অবনতির কারণে দেশজুড়ে ব্যাপক অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল।

পরে কর্তৃপক্ষ আন্দোলনকারীদের ওপর কঠোর দমন-পীড়ন চালিয়ে বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে আনে। এতে হাজার হাজার আন্দোলনকারী নিহত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ওই কর্মকর্তা বলেন, “যুক্তরাষ্ট্রের চাপ ও বোমাবর্ষণের মুখে দেশের ভেতরে এ ধরনের অশান্তির মুখোমুখি হওয়া ক্ষমতাসীন শাসনব্যবস্থার বৈধতার জন্য অত্যন্ত গুরুতর চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।”

জানুয়ারির অস্থিরতার বর্ষপূর্তি ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে কর্তৃপক্ষ জনগণের ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে। একই সঙ্গে নিজেদের সমর্থকদের প্রতি রাতে সভা-সমাবেশে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে জনসমর্থন ধরে রাখার চেষ্টা করছে।

মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, যুদ্ধ চলাকালীন ইরান সরকার ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর দমন-পীড়ন আরও জোরদার করেছে।

অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল মে মাসে জানিয়েছিল, সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে ৬ হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আর সেপ্টেম্বর মাসে জাতিসংঘের তদন্তকারীদের একটি প্রতিবেদনে গণগ্রেপ্তার, নির্যাতন এবং মৃত্যুদণ্ডের ব্যবহার বৃদ্ধির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

সূত্র: ডেইলি সাবাহ

এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন