​কাতারের আধুনিক রূপকার ও ‘ফাদার আমির’ শেখ হামাদ বিন খলিফা আর নেই

পড়তে ১ মিনিট

​​কাতারের আধুনিকায়নের প্রধান স্থপতি ও সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি | ছবি : আল জাজিরা

​​কাতারের আধুনিকায়নের প্রধান স্থপতি ও দেশটির সাবেক আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর।

​রোববার (১২ জুলাই) কাতারের আমিরি দিওয়ান এক বিবৃতিতে তাঁর ইন্তেকালের খবর নিশ্চিত করে।

​বিবৃতিতে আমিরি দিওয়ান জানায়, "আল্লাহর বিধান ও ভাগ্যের প্রতি অবিচল বিশ্বাস রেখে, আমিরি দিওয়ান গভীর শোকের সাথে জাতির এক মহান অভিভাবক ‘ফাদার আমির’ শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির মৃত্যুর খবর জানাচ্ছে, যিনি রোববার সকালে ইন্তেকাল করেছেন।"

​৪ দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা

​ফাদার আমিরের মৃত্যুতে কাতারে রোববার থেকে চার দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। এই সময়কালে দেশের সমস্ত সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম স্থগিত থাকবে এবং জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হবে।

​আধুনিক কাতারের রূপকার ও তাঁর অবদান

​শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি ১৯৯৫ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত কাতার শাসন করেন। ক্ষুদ্র ও গ্যাসসমৃদ্ধ এই দেশটিকে বিশ্বের অন্যতম ধনী ও প্রভাবশালী রাষ্ট্রে পরিণত করার পেছনে মূল দূরদর্শী নেতৃত্ব ছিল তাঁরই।

​অর্থনৈতিক বিপ্লব : তাঁর শাসনামলে কাতার বিশ্বের বৃহত্তম তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (LNG) রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হয়। এর মাধ্যমে অর্জিত অর্থ তিনি দেশের শিক্ষা, সংস্কৃতি এবং অবকাঠামোগত উন্নয়নে ব্যাপকভাবে বিনিয়োগ করেন।

​আল জাজিরা প্রতিষ্ঠা : তাঁরই হাত ধরে ১৯৯৬ সালে বিশ্বখ্যাত গণমাধ্যম 'আল জাজিরা নিউজ চ্যানেল' যাত্রা শুরু করে, যা পরবর্তীতে বিশ্ব গণমাধ্যমের চিত্র সম্পূর্ণ বদলে দেয়।

​রাজনৈতিক ও সামাজিক সংস্কার : ২০০৪ সালে তাঁর নির্দেশেই কাতারের প্রথম স্থায়ী সংবিধান প্রণয়ন করা হয়। এ ছাড়া তাঁর সময়েই স্থানীয় নির্বাচনে কাতারি নারীদের ভোট দেওয়ার এবং প্রার্থী হওয়ার অধিকার দেওয়া হয়।

​বিশ্বমঞ্চে কাতার : তাঁর দূরদর্শী নীতির কারণেই কাতার ২০২২ সালে মধ্যপ্রাচ্যের প্রথম দেশ হিসেবে সফলভাবে ফিফা পুরুষ বিশ্বকাপ ফুটবল আয়োজন করার গৌরব অর্জন করে।

​বিরল ক্ষমতা হস্তান্তর

​২০১৩ সালে শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানি এক ঐতিহাসিক ও বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। তিনি স্বেচ্ছায় তাঁর ৩৩ বছর বয়সী ছেলে ও বর্তমান আমির শেখ তামিম বিন খলিফা আল থানির কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করে রাজনীতি থেকে ইস্তফা নেন। এরপর থেকে তিনি কাতারে ‘ফাদার আমির’ বা জাতির জনক সমতুল্য সম্মানীয় উপাধিতে ভূষিত ছিলেন।

​বিশ্বনেতাদের শোক প্রকাশ

​শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির মৃত্যুতে বিশ্বজুড়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। মিশরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের (UAE) প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানসহ বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা কাতারের বর্তমান আমির ও জনগণের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। বিশ্বনেতারা আঞ্চলিক শান্তি, উন্নয়ন এবং আধুনিক কাতার গঠনে তাঁর অসামান্য অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করছেন।

কাতার বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আবদুল্লাহ বান্দার আল-ওতাইবি বলেন, শেখ হামাদ কাতারকে একটি ‘অসাধারণ রাষ্ট্রে’ পরিণত করেছিলেন।

তিনি বলেন, তিনি শুধু কাতারেই নয়, সারা বিশ্বে একটি অনন্য উত্তরাধিকার রেখে গেছেন। কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি একটি সাধারণ দেশকে গুরুত্বপূর্ণ ও অসাধারণ রাষ্ট্রে রূপান্তর করেছেন। তাঁর ছিল অনেক স্বপ্ন। তিনি এলএনজি খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করেছিলেন, যা কাতারের উন্নয়নকে আরও ত্বরান্বিত করেছে।

মিসরের প্রেসিডেন্ট আবদেল ফাত্তাহ আল-সিসি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, “ভ্রাতৃপ্রতিম রাষ্ট্র কাতার, এর আমির, সরকার ও জনগণের প্রতি গভীর সমবেদনা জানাই। আল্লাহ যেন মরহুম ফাদার আমির শেখ হামাদ বিন খলিফা আল থানির প্রতি রহম করেন।”

পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি গভীর শোক প্রকাশ করে বলেন, তিনি বর্তমান আমির শেখ তামিম বিন হামাদ আল থানি, কাতার সরকার এবং দেশটির জনগণের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি শেখ হামাদের দূরদর্শী নেতৃত্ব, কাতারের উন্নয়ন এবং আঞ্চলিক শান্তি ও সহযোগিতায় তার গুরুত্বপূর্ণ অবদানের প্রশংসা করেন।

সংযুক্ত আরব আমিরাতের প্রেসিডেন্ট শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানও শোক প্রকাশ করে বলেন, আমার ভাই শেখ তামিম বিন হামাদ এবং তাঁর পরিবারের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানাই। আল্লাহ যেন তাঁর পিতার প্রতি রহম করেন, তাকে চিরশান্তি দান করেন এবং এই কঠিন সময়ে তাঁর পরিবারকে ধৈর্য ও শক্তি দান করেন।

এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন