রোহিঙ্গা সংকট : বাংলাদেশের ওপর চাপানো বোঝা, বিশ্ববিবেকের পরীক্ষা

পড়তে ১ মিনিট

২০২৪ সালে বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লব | ছবি : সংগৃহীত

সম্প্রতি বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় 'আল-উম্মাহ' ওয়েবসাইট ও জার্নালের উদ্বোধন অনুষ্ঠানের ফাঁকে আমরা একটি গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নিয়েছিলাম যেখানে দেশটির প্রায় এক দশক ধরে অন্যতম প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে থাকা রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনা করা হয়। 'সেন্টার ফর সিভিলিজেশনাল ডায়ালগ' এবং 'বাংলাদেশ ইসলামিক অ্যান্ড সোশ্যাল ট্রাস্ট' (BIIT Trust) আয়োজিত এই গোলটেবিল বৈঠকের শিরোনাম ছিল : 'রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলা : প্রত্যাবর্তন কি এখনও সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন?'

বৈঠকে শিক্ষাবিদ, গবেষক, মানবাধিকার কর্মী, গণমাধ্যম প্রতিনিধি, প্রাক্তন কূটনীতিক এবং থিঙ্ক ট্যাঙ্কের নির্বাহীরা অংশ নেন। আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল যে, রোহিঙ্গা বিষয়টি এখন আর কেবল বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক সমাধানের বিষয় নয়। এটি আন্তর্জাতিক আইন, মানবাধিকার, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং সর্বোপরি বিশ্বের বিবেকের জন্য একটি বড় মানবীয় পরীক্ষা।


এখন বাংলাদেশে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী বসবাস করছে


রোহিঙ্গাদের অধিকাংশই কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে এবং কিছু অংশ ভাসানচর দ্বীপে বসবাস করছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী শিবিরে পরিণত হওয়া এই ক্যাম্পগুলো প্রাথমিক পর্যায়ে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছিল। কিন্তু বছরের পর বছর পার হওয়ার সাথে সাথে এই অস্থায়ী ব্যবস্থা স্থায়ী হতে শুরু করেছে এবং জরুরি অবস্থাই যেন দৈনন্দিন জীবনে পরিণত হয়েছে।

ক্যাম্পগুলোতে জন্ম নেওয়া শিশু রয়েছে। এমন তরুণরাও আছে যারা কখনো মিয়ানমার চোখেও দেখেনি। সেখানে রাষ্ট্রহীন, ভবিষ্যৎহীন এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে বেড়ে উঠছে এক নতুন প্রজন্ম।

একটি শরণার্থী সংকটের সবচেয়ে বিপজ্জনক পর্যায় কেবল মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়া নয়। আসল বিপদ হলো সময়ের সাথে সাথে এই বাস্তুচ্যুতি সাধারণ ঘটনায় রূপ নেওয়া বা স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া। বিশ্ব কিছুদিন পর ক্যাম্প, পরিসংখ্যান এবং সাহায্যের আবেদনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে। প্রথম দিকের যে দৃশ্যগুলো বিবেককে নাড়িয়ে দিয়েছিল, তা ধীরে ধীরে সাধারণ খবরের উপাদানে পরিণত হয়। আন্তর্জাতিক মনোযোগ অন্য সংকটের দিকে চলে যায় এবং পেছনে পড়ে থাকে এক বিস্মৃত জনগোষ্ঠী।

রোহিঙ্গাদের দীর্ঘস্থায়ী করুণ ট্র্যাজেডি ঠিক এটাই।

মিয়ানমারের আরাকান (রাখাইন) অঞ্চলে বসবাসকারী এই মুসলিম সম্প্রদায় দীর্ঘ বছর ধরে পরিকল্পিত বৈষম্যের শিকার হয়েছে। তাদের নাগরিকত্ব অধিকার ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাদের চলাচলের স্বাধীনতা সীমিত করা হয়েছে। তাদের সম্পত্তির অধিকার গ্রাস করা হয়েছে। তাদের গ্রাম পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। মানুষ হত্যা করা হয়েছে এবং নারী ও শিশুরা গুরুতর নির্যাতনের শিকার হয়েছে। বিশেষ করে ২০১৭ সালে সংঘটিত সহিংসতার এক ভয়াবহ ঢেউ লাখ লাখ মানুষকে বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য করেছিল।

বাংলাদেশ নিজের অর্থনৈতিক ও ডেমোগ্রাফিক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও এই অসহায় মানুষদের জন্য নিজের দরজা খুলে দিয়েছিল। এটি কেবল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছিল না, বরং এক মহান নৈতিক দায়িত্বের উদাহরণ ছিল। ইতিহাস বাংলাদেশকে এমন একটি দেশ হিসেবে মনে রাখবে যা নির্যাতিত জনগোষ্ঠীর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়নি—যখন বিশ্বের বড় একটি অংশ কেবল দূর থেকে সমবেদনা প্রকাশ করেই ক্ষান্ত ছিল।

তবে এখানে একটি খুব স্পষ্ট সত্য আমাদের স্বীকার করতেই হবে: বাংলাদেশ একা যে বোঝা বহন করছে, তা আর দীর্ঘমেয়াদে চালিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়।

যেসব এলাকায় ক্যাম্পগুলো অবস্থিত, সেখানে সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত চাপ ক্রমশ বাড়ছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও শরণার্থীদের মধ্যে সম্পদ ভাগাভাগি কঠিন হয়ে পড়ছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য ও বাসস্থানের মতো মৌলিক চাহিদা পূরণ আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সাহায্য তহবিল কমে যাওয়ার ফলে ক্যাম্পগুলোর জীবনযাত্রা আরও ভঙ্গুর হয়ে উঠছে। এই দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তা মানব পাচার, মাদক চক্র, অবৈধ অভিবাসনের পথ এবং অন্যান্য নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করছে।

অতএব, বাংলাদেশের মানবিক দায়িত্বের কেবল প্রশংসা করাই যথেষ্ট নয়; এই বোঝা আন্তর্জাতিক স্তরে সত্যিকারের অর্থে ভাগ করে নেওয়া প্রয়োজন।


হাসিনা আমল থেকে নতুন প্রশাসন


বাংলাদেশে জুলাই বিপ্লবের পর তৈরি হওয়া নতুন রাজনৈতিক আবহাওয়া রোহিঙ্গা সংক্রান্ত পদ্ধতির ক্ষেত্রেও নতুন প্রত্যাশার জন্ম দিচ্ছে।

শেখ হাসিনা সরকার আন্তর্জাতিক অঙ্গনে রোহিঙ্গা সংকটকে জিইয়ে রাখার চেষ্টা করলেও, সময়ের সাথে সাথে তাদের নীতিতে নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক বোঝা এবং নিয়ন্ত্রণের বিষয়গুলোই প্রাধান্য পেতে শুরু করেছিল। সংকটের দীর্ঘসূত্রতা, আন্তর্জাতিক সমর্থনের ঘাটতি এবং ক্যাম্পের জনসংখ্যা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে তৎকালীন সরকার আরও কঠোর ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার দিকে ঝুঁকতে বাধ্য হয়।

অন্যদিকে, নতুন প্রশাসনের কাছে প্রত্যাশা হলো তারা বিষয়টিকে আরও মানবিক, আরও স্বচ্ছ এবং অধিকার-ভিত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করবে। রোহিঙ্গাদের কেবল নিরাপত্তা ঝুঁকি বা অর্থনৈতিক বোঝা হিসেবে দেখা কোনো সমাধান এনে দিতে পারে না। তারা সবকিছুর আগে অধিকার থেকে বঞ্চিত এবং নিজ দেশ থেকে জোরপূর্বক তাড়িয়ে দেওয়া মানুষ।

তবে বাংলাদেশে সরকার পরিবর্তন হলেও সমস্যার আসল উৎস দূর হয়ে যায় না। কারণ স্থায়ী সমাধান বাংলাদেশে নয়, বরং মিয়ানমারে নিহিত।


প্রত্যাবর্তন মানে কেবল সীমান্ত পার হওয়া নয়


বৈঠকের মূল প্রশ্নটি ছিল : প্রত্যাবর্তন কি সত্যিই এক সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন?

রোহিঙ্গাদের বড় অংশই নিজেদের দেশে ফিরে যেতে চায়। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো—কোন শর্তে এই প্রত্যাবর্তন সম্পন্ন হবে? মানুষকে কেবল সীমান্তের ওপারে পাঠিয়ে দেওয়াকেই প্রত্যাবর্তন বলা যায় না।

প্রকৃত প্রত্যাবর্তন মানে হলো—নিরাপত্তা, নাগরিকত্ব, আইনি মর্যাদা, সম্পত্তির অধিকার এবং মানবিক মর্যাদা পুনর্ধারণ করা।

আজ মিয়ানমারে এই শর্তগুলোর একটিও পুরোপুরি বিদ্যমান নেই। রোহিঙ্গারা আজও নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। রাখাইন অঞ্চলে সংঘাত অব্যাহত রয়েছে। নিরাপত্তার নিশ্চয়তা অনিশ্চিত। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পাশাপাশি ওই অঞ্চলে অবস্থান শক্ত করা অন্যান্য সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধেও রোহিঙ্গাদের অধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে যেকোনো ধরনের প্রত্যাবর্তন মানুষকে আবারও সহিংসতা ও বিতাড়নের মুখে ঠেলে দিতে পারে।


শুরু থেকেই তুরস্কের ধারাবাহিক সমর্থন


রোহিঙ্কা সংকটে তুরস্কের ভূমিকা বিশেষভাবে উল্লেখ করার দাবি রাখে। তুরস্ক শুরু থেকেই কেবল কূটনৈতিক বিবৃতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে, মাঠপর্যায়ে প্রত্যক্ষ ও ধারাবাহিক সহমর্মিতা নিয়ে এই সংকটে পাশে দাঁড়িয়েছে।

২০১৭ সালে রাষ্ট্রপতি রজব তাইয়্যেব এরদোয়ানের স্ত্রী এমিনে এরদোয়ানের কক্সবাজারের শরণার্থী শিবির সফরটি ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। যখন বিশ্বের বড় একটি অংশ নীরব ছিল, তখন এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দৃষ্টি রোহিঙ্গা ট্র্যাজেডির দিকে আকর্ষণ করতে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীকী পদক্ষেপগুলোর একটি হিসেবে কাজ করেছিল। সেই সফরটি প্রমাণ করেছিল যে, তুরস্ক এই সংকটকে দূরের কোনো ভৌগোলিক অঞ্চলের মানবিক নাটক হিসেবে দেখেনি, বরং সরাসরি পাশে দাঁড়ানোর মতো এক বিবেকের বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেছে।

তুর্কি রেড ক্রিসেন্ট, আফাদ (AFAD), তুর্কি দিয়ানেত ফাউন্ডেশন, আইএইচএইচ (IHH) এবং অন্যান্য অনেক বেসরকারি সংস্থা বহু বছর ধরে এই অঞ্চলে খাদ্য, স্বাস্থ্য, বাসস্থান, শিক্ষা এবং এতিম সহায়তা কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছে। তুরস্কের এই সমর্থন কেবল সংকটের মুহূর্তে দৃশ্যমান সাময়িক কোনো ত্রাণ কার্যক্রম নয়, বরং এটি রাষ্ট্র ও সমাজ পর্যায়ে গড়ে ওঠা এক ধারাবাহিক ভ্রাতৃত্ব ও সহমর্মিতা।

বাংলাদেশে আমাদের যাদের সাথে কথা হয়েছে, তারাও তুরস্কের এই আন্তরিকতার কথা বিশেষভাবে মনে রেখেছেন এবং এর ভূয়সী প্রশংসা করেছেন।

এই প্রসঙ্গে সিরিয়া সংকটে তুরস্কের অভিজ্ঞতাও পুরো বিশ্বের সামনে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা তুলে ধরে। তুরস্ক যখন লাখ লাখ সিরীয়দের জন্য নিজের দরজা খুলে দিয়েছিল, তখন তাকে বিশাল অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপ সহ্য করতে হয়েছিল। বছরের পর বছর ধরে এই নীতি দেশে ও বিদেশে সমালোচিত হয়েছে। কিন্তু আজ আমরা দেখতে পাচ্ছি যে, মানবিক দায়িত্ব গ্রহণ করা এবং কৌশলগত অবস্থান অর্জন করা—এ দুটি একে অপরের বিপরীত বিষয় নয়।

রোহিঙ্গাদের প্রতি বাংলাদেশ যে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করেছে, তাকেও একইভাবে মূল্যায়ন করা উচিত। এই ত্যাগকে কেবল আজকের অর্থনৈতিক খরচ দিয়ে মাপা যাবে না। ইতিহাস সংকটের মুহূর্তে শক্তিশালীদের হিসাব-নিকাশ দেখে না, বরং যারা নিপীড়িত মানুষের পাশে দাঁড়ায় তাদের অবস্থানকেই স্মরণ রাখে।


আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের করণীয় কী?


আজ কেবল ত্রাণ সামগ্রী বা সাহায্য প্যাকেজ পাঠিয়েই দায়িত্ব শেষ করা যাবে না, এর চেয়েও বেশি কিছু প্রয়োজন।

প্রথমত, মিয়ানমারের ওপর নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা এবং মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার বিষয়ে কার্যকর কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, বাংলাদেশ যে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বোঝা বহন করছে, তা একটি প্রকৃত আন্তর্জাতিক দায়িত্ব ভাগাভাগি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে লাঘব করতে হবে।

তৃতীয়ত, জাতিসংঘ, আসিয়ান (ASEAN), ইসলামিক সহযোগিতা সংস্থা (OIC), তুরস্ক এবং অন্যান্য প্রভাবশালী দেশগুলোর মধ্যে একটি টেকসই কূটনৈতিক সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে।

চতুর্থত, রোহিঙ্গা ইস্যুটিকে আন্তর্জাতিক মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু থেকে সরে যেতে দেওয়া যাবে না। কারণ ভুলে যাওয়া সংকটগুলোর সমাধান হয় না; সেগুলো কেবল আরও গভীর হয়।

রোহিঙ্কা সংকট মূলত বিশ্বের বিচার ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ক্ষমতার এক বড় পরীক্ষা।

লেখক সম্পর্কে

শিক্ষাবিদ, সমাজবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক চিন্তাবিদ

এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন