বাংলাদেশে হেবা আইন সংশোধন নিয়ে বিতর্ক
লেখক:
বাংলাদেশে হেবা আইন সংশোধনের বিতর্ক | ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশে হেবা আইন সংশোধনের বিতর্কটি মূলত একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে ঘিরে—কোনো মুসলিম বাবা-মা সন্তানকে হেবা করে সম্পত্তি দেওয়ার পরও কি জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তির ব্যবহার ও দখলের অধিকার ধরে রাখতে পারবেন? বাংলাদেশের আইনমন্ত্রী আসাদুজ্জামান জানান, সরকার সম্পত্তি হস্তান্তর-সংক্রান্ত আইন সংশোধনের কথা বিবেচনা করছে, যাতে বাবা-মা সন্তানকে হেবা দেওয়ার পরও জীবদ্দশায় সম্পত্তি ব্যবহার ও দখলের অধিকার রাখতে পারেন।
বর্তমান আইনি কাঠামো
বাংলাদেশে হেবা শুধু ধর্মীয় ব্যক্তিগত আইনের বিষয় নয়; স্থাবর সম্পত্তির হেবা রেজিস্ট্রেশন আইনের সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত। Registration Act, 1908-এর ১৭ ধারায় মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের অধীনে declaration of heba-কে বাধ্যতামূলক নিবন্ধনযোগ্য দলিল হিসেবে রাখা হয়েছে।
এদিকে ২০২৬ সালের Registration (Amendment) Ordinance হেবা ও অন্যান্য gift-এর ক্ষেত্রে নিবন্ধন প্রক্রিয়ার কিছু বিধান আরও স্পষ্ট করেছে। যেমন, হেবা দলিলের ক্ষেত্রেও দাতা-সংক্রান্ত নির্দিষ্ট তথ্য সংযুক্তির বিধান করা হয়েছে।
বর্তমান Registration Act-এ নিকট আত্মীয়দের মধ্যে হেবা নিবন্ধনের ফি মাত্র ১০০ টাকা—স্বামী-স্ত্রী, বাবা-মা ও সন্তান, দাদা-দাদি/নানা-নানি ও নাতি-নাতনি এবং সহোদর ভাই-বোনের ক্ষেত্রে।
তাহলে বিতর্ক কোথায়
সমস্যার কেন্দ্র মালিকানা বনাম জীবনকালীন ভোগদখল।
প্রচলিত হেবার ধারণায়, বৈধভাবে হেবা সম্পন্ন হলে সম্পত্তির মালিকানা গ্রহীতার কাছে চলে যায়। আইনমন্ত্রীও বলেছেন, বাবা-মা সন্তানকে হেবা করলে প্রচলিত ব্যবস্থায় তারা মালিকানা হারান এবং পরবর্তীতে সন্তানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারেন।
এখানেই সংস্কারের পক্ষে যুক্তি: “সম্পত্তি সন্তানকে দেবেন, কিন্তু বাবা-মা জীবিত থাকা পর্যন্ত সেই বাড়ি বা জমি ব্যবহার করার অধিকার রাখবেন।”
এটি বিশেষ করে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জন্য একটি সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
কিন্তু এর বিপরীত যুক্তিও শক্তিশালী: প্রথম প্রশ্ন—এটি কি হেবার মৌলিক প্রকৃতিই পরিবর্তন করবে?
হেবা সাধারণ উত্তরাধিকার নয়; এটি জীবদ্দশায় সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি ব্যবস্থা। যদি দাতা মালিকানা হস্তান্তর করেও দীর্ঘমেয়াদি দখল ও ব্যবহারাধিকার ধরে রাখেন, তাহলে হেবা ও শর্তযুক্ত সম্পত্তি হস্তান্তরের মধ্যে নতুন আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
দ্বিতীয় প্রশ্ন—“ব্যবহারের অধিকার” কতদিন এবং কীভাবে নির্ধারিত হবে?
• জমি চাষ করবে কে?
• ভাড়া কে নেবে?
• বাড়ি ভাড়া দিলে ভাড়া কার?
• সম্পত্তি বিক্রি করতে পারবে কি সন্তান?
• বাবা-মায়ের সম্মতি ছাড়া বন্ধক রাখা যাবে কি?
• একজন (বাবা অথবা মা) মারা গেলে অপরজনের অধিকার কী হবে?
• সন্তান মারা গেলে সম্পত্তির অধিকার কার কাছে যাবে?
আইনে এগুলো পরিষ্কার না করলে হেবা-পরবর্তী বিরোধ কমার বদলে নতুন ধরনের দেওয়ানি মামলা বাড়তে পারে।
সবচেয়ে বড় ঝুঁকি: পারিবারিক ক্ষমতার ভারসাম্য
সংস্কারের পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী যুক্তি হলো বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সুরক্ষা। কিন্তু একই বিধান কখনো কখনো উল্টোভাবে ব্যবহারও হতে পারে।
ধরা যাক, একজন বাবা সন্তানকে হেবা করলেন। দলিলে বাবা-মায়ের জীবনকালীন বসবাসের অধিকার রাখা হলো। পরে সন্তান সম্পত্তি বিক্রি করতে চাইল। তখন সন্তানের মালিকানা কতটা কার্যকর?
অন্যদিকে বাবা-মা যদি সম্পত্তি ব্যবহার করতে থাকেন কিন্তু সন্তানের মালিকানা বাস্তবে কার্যকর না হয়, তাহলে হেবা একটি অসম্পূর্ণ বা দীর্ঘস্থায়ী হস্তান্তর-এ পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
উত্তরাধিকার আইনেও প্রভাব পড়তে পারে
এখানে আরও গভীর একটি প্রশ্ন আছে।
কোনো বাবা তার জীবদ্দশায় এক সন্তানকে বিপুল সম্পত্তি হেবা করে দিলেন। অন্য সন্তানরা উত্তরাধিকার থেকে সেই সম্পত্তি পাবে না—কারণ মালিকানা বাবা মারা যাওয়ার আগেই হস্তান্তরিত হয়েছে।
ফলে হেবা অনেক ক্ষেত্রে উত্তরাধিকার ব্যবস্থাকে পাশ কাটিয়ে সম্পত্তি বণ্টনের একটি পথ হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।
অতএব নতুন আইন করতে হলে শুধু বাবা-মায়ের অধিকার নয়, অন্যান্য উত্তরাধিকারীর স্বার্থ, প্রতারণামূলক হেবা এবং মৃত্যুর আগে সম্পত্তি দ্রুত স্থানান্তরের প্রবণতা—সবই বিবেচনায় নিতে হবে।
বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্টের মামলাতেও হেবা দলিল, নিবন্ধনের সময়কাল এবং সংশ্লিষ্ট আইনি শর্ত নিয়ে বিরোধ দেখা গেছে।
হেবা পুরোপুরি পরিবর্তন না করে “Life Interest / Right of Residence”-এর মতো একটি পৃথক আইনি সুরক্ষা তৈরি করা বেশি নিরাপদ হতে পারে।
অর্থাৎ—মালিকানা সন্তানকে যাবে, কিন্তু বাবা-মায়ের জীবদ্দশায় নির্দিষ্ট সম্পত্তিতে বসবাস, ব্যবহার অথবা নির্ধারিত আয় ভোগের অধিকার আইনে সুরক্ষিত থাকবে।
দলিলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকবে:
১. সম্পত্তির মালিক কে;
২. বাবা-মায়ের জীবনকালীন অধিকার কী;
৩. সম্পত্তি বিক্রি/বন্ধক দেওয়ার সীমাবদ্ধতা;
৪. ভাড়া বা কৃষিজ আয় কে পাবেন;
৫. বাবা-মায়ের একজন মারা গেলে অপরজনের অধিকার কী;
৬. বাবা-মাকে উচ্ছেদ করা যাবে কি না;
৭. প্রতারণা বা জবরদস্তির অভিযোগ উঠলে কী হবে;
৮. বিরোধ নিষ্পত্তির দ্রুত ব্যবস্থা।
এতে হেবার মূল ধারণা অক্ষুণ্ণ রেখে বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব।
একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন
এটি তাই শুধু “হেবা আইন সংশোধন” নয়। এর ভেতরে তিনটি বৃহৎ বিষয় একসঙ্গে আছে—ব্যক্তিগত ধর্মীয় আইন + সম্পত্তির মালিকানা + বৃদ্ধ বাবা-মায়ের সামাজিক নিরাপত্তা।
সংস্কারটি সঠিকভাবে করা হলে এটি বাংলাদেশের পারিবারিক সম্পত্তি-বিরোধ কমাতে পারে। কিন্তু তাড়াহুড়ো করে মালিকানা ও দখলের ধারণা মিশিয়ে দিলে হেবা-সংক্রান্ত নতুন মামলা, উত্তরাধিকার বিরোধ এবং সম্পত্তি জালিয়াতির সুযোগও বাড়তে পারে।
বায়তুল মোকাররমের খতিবের আপত্তি
জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব মুফতি আব্দুল মালেকের বক্তব্যের সারকথা হলো, হেবা সম্পূর্ণ হওয়ার পর সম্পত্তির মালিকানা দাতার কাছ থেকে গ্রহীতার কাছে চলে যেতে হবে এবং গ্রহীতাকে দখলও দিতে হবে। দাতা একই সঙ্গে সম্পত্তির জীবনকালীন মালিকানা/স্বত্ব রেখে দিলে সেটি প্রকৃত হেবা থাকে না—এমনটাই তার ফতোয়ার মর্ম।
বিশেষ করে তার আপত্তির জায়গাগুলো হলো—
• হেবায় তাৎক্ষণিক মালিকানা হস্তান্তর হতে হবে;
• হেবার সঙ্গে এমন শর্ত জুড়ে দেওয়া যাবে না, যাতে দাতা নিজের মালিকানা বা স্বত্ব বজায় রাখেন;
• “জীবনস্বত্ব রেখে হেবা” প্রচলিত হেবার শরয়ি (শরিয়তসম্মত) কাঠামোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক;
• এ ধরনের ব্যবস্থা কার্যকর হলে মিরাস বা উত্তরাধিকার বিধানের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে;
• পুত্রসন্তান না থাকা পরিবারের কন্যাসন্তানদের উত্তরাধিকার সুরক্ষার নামে হেবার কাঠামো পরিবর্তন করাও তার দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়।
একটি প্রতিবেদনে তার অবস্থানকে সরাসরি এভাবে তুলে ধরা হয়েছে—“জীবনস্বত্ব রেখে হেবা শরিয়ত পরিপন্থী।”
অন্য ধর্মীয় নেতাদের অবস্থান
বিষয়টি এখন শুধু একজন খতিবের ফতোয়ায় সীমাবদ্ধ নেই। খেলাফত মজলিসও সম্পত্তি হস্তান্তর-সংক্রান্ত সংশোধনীকে শরিয়াহর সঙ্গে সাংঘর্ষিক বলে প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে—এমন প্রতিবেদন পাওয়া যাচ্ছে।
আরও কিছু আলেম ও ধর্মীয় মহলের বক্তব্যের মূল আপত্তি একই জায়গায় কেন্দ্রীভূত হচ্ছে—আইন করে এমন একটি হেবা ব্যবস্থা চালু করা যাবে কি না, যেখানে সম্পত্তি সন্তানকে দিয়ে দেওয়ার পরও বাবা-মা নিজের জীবনকাল পর্যন্ত সেই সম্পত্তির স্বত্ব বা নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখবেন। সাম্প্রতিক সংবাদ বিশ্লেষণেও আলেমদের আপত্তির এই দিকটিই সামনে এসেছে।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে: ধর্মীয় নেতাদের আপত্তিকে “বাবা-মায়ের জীবনকালীন বসবাসের অধিকারও থাকবে না”—এভাবে সরলীকরণ করা ঠিক হবে না।
আসল বিতর্ক হলো: বাবা-মায়ের জীবনকালীন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে আইন কি হেবার মৌলিক মালিকানা কাঠামো পরিবর্তন করবে?
এখানে দুটো আলাদা মডেল হতে পারে।
মডেল–১: জীবনস্বত্বসহ হেবা
বাবা সম্পত্তি সন্তানকে হেবা করলেন, কিন্তু নিজের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মালিকানা/স্বত্ব নিজের কাছে রাখলেন।
→ এখানেই শরিয়াহভিত্তিক আপত্তি সবচেয়ে বেশি।
মডেল–২: হেবা + বসবাসের অধিকার
মালিকানা সন্তানকে দিয়ে দেওয়া হলো; কিন্তু দলিলে বাবা-মায়ের আজীবন বসবাসের/ব্যবহারের অধিকার আলাদাভাবে সুরক্ষিত করা হলো।
→ এটি প্রথম মডেলের চেয়ে আলাদা আইনি কাঠামো এবং শরিয়াহ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলাদাভাবে আলোচনা করা প্রয়োজন।
কেন বিষয়টি এখন বড় বিতর্কে পরিণত হচ্ছে
সরকারের যুক্তি হলো—অনেক বাবা-মা সন্তানকে সম্পত্তি হেবা করার পর বয়সের শেষ পর্যায়ে নিজেদের বাড়ি-জমি নিয়ে নিরাপত্তাহীন হয়ে পড়েন। তাই হেবা করার পরও তাদের জীবনকালীন ব্যবহার ও দখলের অধিকার নিশ্চিত করার চিন্তা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে আলেমদের প্রশ্ন : বাবা-মাকে সুরক্ষা দিতে গিয়ে কেন হেবার শরিয়াহ কাঠামো পরিবর্তন করতে হবে?
এর বিকল্প হিসেবে তারা এমন কোনো ব্যবস্থা চান কি না, যেখানে হেবা অপরিবর্তিত থাকবে কিন্তু বাবা-মায়ের ভরণপোষণ, বসবাস ও নিরাপত্তা আলাদা আইনি ব্যবস্থায় নিশ্চিত হবে—এটি এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন।



