বাংলাদেশের সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও গণভোটের পুনরাগমন
লেখক:
সুপ্রিম কোর্ট ও বাংলাদেশের সংবিধান। ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশের রাজনীতি ও সাংবিধানিক ইতিহাসের দেড় দশকের অন্ধকার অধ্যায়ের অবসান ঘটিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালত একটি ঐতিহাসিক ও যুগান্তকারী রায় প্রদান করেছেন। সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ২০১১ সালের বহুল বিতর্কিত ‘পঞ্চদশ সংশোধনী’র আংশিক বাতিলের আদেশ বহাল রেখেছেন, যার ফলে দেশে পুনরায় ফিরে এসেছে নির্দলীয় নিরপেক্ষ ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা’ এবং জনগণের প্রত্যক্ষ মতামতের হাতিয়ার ‘গণভোট’। একই সাথে বাতিল হয়েছে সংবিধানে যুক্ত করা তথাকথিত ‘অপরিবর্তনযোগ্যতার দেয়াল’।
বাংলাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতায় এই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব অপরিসীম। বিগত দেড় দশক ধরে দেশে গণতন্ত্রের যে আকাল সৃষ্টি হয়েছিল এবং নির্বাচনব্যবস্থা নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যে চিরধরা দূরত্ব তৈরি হয়েছিল, আদালতের এই রায় সেই অচলাবস্থা নিরসনে এক নতুন সাংবিধানিক বার্তা দিচ্ছে। বিচার বিভাগ স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে—সংবিধান কোনো স্থায়ী বা অপরিবর্তনযোগ্য দণ্ডবিধি নয়; এটি জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার প্রতিফলক একটি ‘জীবন্ত দলিল’ (Living Document)।
ব্যাকগ্রাউন্ড: পঞ্চদশ সংশোধনীর অন্ধকার ছায়া
২০১১ সালের ৩০ জুন তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী জাতীয় সংসদে পাস করে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ সংবিধানের মোট ৫৪টি ক্ষেত্রে একবারে পরিবর্তন আনা হয়। সবচেয়ে মারাত্মক আঘাতটি আসে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলুপ্ত করার মাধ্যমে। ১৯৯৬ সালে গঠিত ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে যে নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন ব্যবস্থার সূত্রপাত হয়েছিল, তা এক তুড়িতে ধ্বংস করে দেওয়া হয়।
পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ যুক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে সংবিধানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অনুচ্ছেদকে ‘অপরিবর্তনীয়’ ঘোষণা করা হয় এবং সেগুলোতে হাত দেওয়ার যেকোনো চেষ্টাকে ‘সাংবিধানিক রাষ্ট্রদ্রোহিতা’ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়।
আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞরা তৎকালীন এই পদক্ষেপকে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ওপর একটি চরম আঘাত এবং সংসদীয় স্বৈরাচারের সূচনা হিসেবে আখ্যা দিয়েছিলেন। এর ফলশ্রুতিতে ২০২৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, যা জাতিকে একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সংকট ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের দিকে ঠেলে দেয়।
২০২৪-এর গণ-অভ্যুত্থান এবং আইনি মোড়
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থানের মুখে তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটে। ক্ষমতার এই পালাবদলের পর সংবিধান সংস্কার ও স্বৈরাচারী কাঠামোর আইনি অবসানের দাবি তীব্র হয়। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ বিশিষ্ট নাগরিকরা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল পঞ্চদশ সংশোধনীর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট আবেদন করেন।
দীর্ঘ শুনানি শেষে ২০২৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর হাইকোর্ট বিভাগ পঞ্চদশ সংশোধনীর মূল ধারাগুলোকে অসাংবিধানিক ঘোষণা করেন। পরে বিভিন্ন পক্ষের লিভ-টু-আপিল খারিজ করে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায়কে চূড়ান্ত বলে বহাল রাখেন। রায়ের মাধ্যমে দীর্ঘ ১৫ বছরের সাংবিধানিক বিতর্কের অবসান ঘটে এবং দেশের আইনি কাঠামোর কেন্দ্রবিন্দুতে আবারও ফিরে আসে জনগণের সার্বভৌমত্ব।
রায়ের চার মূল স্তম্ভ
আপিল বিভাগের রায় মূলত চারটি মৌলিক সাংবিধানিক সিদ্ধান্তকে আইনি বৈধতা দিয়েছে:
১. তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার পুনর্বহাল: দেশে আগামী প্রতিটি জাতীয় সংসদ নির্বাচন একটি নিরপেক্ষ ও নির্দলীয় অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার অধীনে হতে হবে। এর মাধ্যমে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার রাজনৈতিক অপকৌশল বন্ধ হলো।
২. গণভোটের ফেরা: সংবিধানের মৌলিক নীতিগুলো (যেমন—অনুচ্ছেদ ৮, ৪৮, ৫৬, ৫৮, ৮০, ৯২ক, ও ১৪২) পরিবর্তনের জন্য কেবল সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ ভোটই যথেষ্ট হবে না; জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটাধিকার বা গণভোট আবশ্যক।
৩. ‘অপরিবর্তনযোগ্যতা’র অবসান: ৭(ক) ও ৭(খ) অনুচ্ছেদ বাতিলের ফলে সংবিধানকে আর কোনো চিরস্থায়ী বন্ধনে আটকে রাখা যাবে না। জনগণ চাইলে তাদের প্রতিনিধিদের মাধ্যমে যেকোনো সময় সংবিধান সংস্কার করতে পারবে।
৪. হাইকোর্টের একচ্ছত্র রিট এখতিয়ার: মৌলিক অধিকার সুরক্ষায় রিট শুনানির একচ্ছত্র অধিকার কেবল হাইকোর্ট বিভাগের কাছেই বহাল থাকছে, নিম্ন আদালতে বিচারিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণের বিতর্কিত সিদ্ধান্ত বাতিল হয়েছে।
ভবিষ্যৎ মডেল: পুরোনো ত্রয়োদশ নাকি সংস্কারকৃত কাঠামো?
যদিও আপিল বিভাগের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ফিরে এসেছে, তবে সেই সরকার ঠিক কোন মডেল বা কাঠামোয় পরিচালিত হবে—তা নিয়ে রাজনৈতিক ও আইনি মহলে বিস্তৃত বিতর্ক শুরু হয়েছে।
অতীতে ত্রয়োদশ সংশোধনী অনুযায়ী, সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতিকে প্রধান উপদেষ্টা করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের বিধান ছিল। কিন্তু এটি বিচার বিভাগকে মারাত্মকভাবে রাজনীতিকীকরণ করেছিল, কারণ বিচারকদের বয়স বাড়িয়ে পছন্দের ব্যক্তিকে বিচারপতি করার এক নোংরা প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছিল।
সরকারের আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আসাদুজ্জামান এক সংবিাদ ব্রিফিংয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, সরকার কোনো তাড়াহুড়ো বা একতরফা সিদ্ধান্ত নেবে না। পূর্ণাঙ্গ রায়ের অনুলিপি হাতে পাওয়ার পর জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের জনআকাঙ্ক্ষার সাথে সংগতি রেখে একটি উচ্চপর্যায়ের ‘সংবিধান সংস্কার কমিটি’ গঠন করা হবে। সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক দল এবং জ্যেষ্ঠ আইনজীবীদের মতামত নিয়ে গণ-পরামর্শের (Public Consultation) মাধ্যমে একটি আধুনিক, টেকসই ও নিরপেক্ষ নির্বাচনকালীন সরকারের মডেল তৈরি করা হবে।
শুনানিতে অংশ নেওয়া জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মোহাম্মদ শিশির মনির মন্তব্য করেছেন, “সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মোট ৫৪টি পরিবর্তনের মধ্যে আদালত মাত্র ৪টি মৌলিক বিষয় বাতিল করেছেন। বাকি প্রায় ৫০টি বিষয় (যেমন—প্রস্তাবনা, রাষ্ট্রীয় চার মূলনীতি ইত্যাদি) ভবিষ্যৎ জাতীয় সংসদের বিবেচনার ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। ফলে সংসদ চাইলে অতীতের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মূল চেতনা বহাল রেখে সময়োপযোগী পরিবর্তন এনে একটি আধুনিক তত্ত্বাবধায়ক সরকার কাঠামো প্রণয়ন করতে পারবে।”
আন্তর্জাতিক দৃষ্টিকোণ ও রাজনৈতিক প্রভাব
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের এই পরিবর্তনকে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা অত্যন্ত ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখছেন। কারণ একটি স্থিতিশীল গণতন্ত্র এবং নিরপেক্ষ নির্বাচনব্যবস্থা নিশ্চিত না হলে এই অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ে।
রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল সুপ্রিম কোর্টে প্রতিক্রিয়ায় জানিয়েছেন, আপিল বিভাগের এই সিদ্ধান্তের ফলে হাইকোর্টের রায়ই দেশের সর্বোচ্চ আইনি ঘোষণা হিসেবে বলবৎ হয়েছে। এর ফলে স্বৈরাচারী কায়দায় সংবিধান পরিবর্তনের পথ চিরতরে রুদ্ধ হয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মানবাধিকার কমিশন আইন সংস্কারের কাজও চূড়ান্ত পর্যায়ে এনেছে। পরবর্তী সংসদ অধিবেশনে নতুন মানবাধিকার বিল উত্থাপন এবং একটি গণতান্ত্রিক কাঠামো বিনির্মাণই এখন সরকারের প্রধান লক্ষ্য।
একটি নতুন গণতান্ত্রিক ভোরের অপেক্ষা
বাংলাদেশের ইতিহাসে বিচার বিভাগ প্রায়শই নির্বাহী বিভাগের ক্ষমতার বলয়ে পিষ্ট হয়েছে। কিন্তু সুপ্রিম কোর্টের এই রায় প্রমাণ করে যে, সংকটময় মুহূর্তে বিচার বিভাগ সংবিধানের প্রকৃত অভিভাবক হিসেবে দাঁড়িয়ে জনগণের অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে পারে।
তবে কাগজ-কলমের আইন এবং আদালতের রায়ই একটি দেশের গণতন্ত্রের শতভাগ নিশ্চয়তা দিতে পারে না। সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো রায়ের চেতনাকে রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে রূপ দেওয়া। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সৃষ্ট ক্ষত পূরণ করতে হলে রাজনৈতিক দলগুলোকে অতীত থেকে শিক্ষা নিতে হবে।
সংবিধানে গণভোটের আগমন এবং নিরপেক্ষ সরকারের প্রত্যাবর্তন কেবল একটি আইনি জয় নয়; এটি বাংলাদেশের জনগণের জন্য তাদের গণতান্ত্রিক অধিকার পুনর্দখলের একটি ঐতিহাসিক সুযোগ। আগামী দিনের সংসদ যদি আদালতের এই রায়ের আলোকে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে একটি সুদৃঢ় ও টেকসই সাংবিধানিক রূপরেখা তৈরি করতে পারে, তবেই জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের শহীদদের আত্মত্যাগ এবং জনগণের ন্যায়বিচারের আকুতি রূপ লাভ করবে। বাংলাদেশের সামনে এখন এক নতুন ভোরের সম্ভাবনা—যেখানে ক্ষমতার মালিক হবেন কেবলই এই দেশের জনগণ।



