প্রিন্স তুর্কি আল-ফয়সাল: মক্কা চুক্তি ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতিফলন
লেখক:
মক্কায় সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের সঙ্গে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়িপ এরদোয়ান ও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরিফ | ছবি : সংগৃহীত
সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে স্বাক্ষরিত ‘মক্কা প্রতিরক্ষা চুক্তি’ কেবল একটি প্রচলিত সামরিক বন্দোবস্ত নয়; বরং এটি আঞ্চলিক ভূ-রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তনের প্রতিফলন বলে মন্তব্য করেছেন সৌদি আরবের সাবেক গোয়েন্দাপ্রধান ও অভিজ্ঞ কূটনীতিক প্রিন্স তুর্কি আল-ফয়সাল।
‘আশার্ক আল-আওসাত’ পত্রিকায় প্রকাশিত এক মতামত কলামে তিনি বলেন, যুদ্ধ, পরিবর্তনশীল সামরিক জোট এবং প্রচলিত নিরাপত্তা নিশ্চয়তার অনিশ্চয়তার মধ্যে আঞ্চলিক কৌশলগত ভারসাম্য পুনরুদ্ধারে এই চুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রিন্স তুর্কি আল-ফয়সাল চুক্তিটিকে কোনো নির্দিষ্ট দেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত উদ্যোগ বা সাম্প্রদায়িক জোট হিসেবে দেখার ধারণা প্রত্যাখ্যান করেন। তার ভাষায়, এটি তিনটি অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের মধ্যে একটি ‘প্রতিরক্ষামূলক জোট’। আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় বিদ্যমান বা সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলায় দেশগুলোর এ ধরনের জোট গঠনের অধিকার রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তার মূল্যায়নে, মক্কা চুক্তিকে বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দেখতে হবে। মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে চলমান সংঘাত আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যকে দুর্বল করেছে। একই সঙ্গে কয়েক দশক ধরে বিদ্যমান নিরাপত্তা কাঠামো পরিবর্তিত হওয়ায় সেখানে একটি কৌশলগত শূন্যতা তৈরির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান এসব পরিস্থিতি সম্পর্কে অনেক ক্ষেত্রে সমভাবাপন্ন এবং তাদের পরিপূরক সক্ষমতা রয়েছে, যা ওই শূন্যতা মোকাবিলায় কাজে লাগতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
তিন দেশ একত্রে উল্লেখযোগ্য কৌশলগত সক্ষমতার প্রতিনিধিত্ব করে। তুরস্কের রয়েছে সামরিক শক্তি, প্রতিরক্ষা শিল্প এবং ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য ও কৃষ্ণসাগরীয় অঞ্চলের সংযোগস্থলে গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান। পাকিস্তান দক্ষিণ এশিয়ায় তার সামরিক সক্ষমতা ও কৌশলগত অবস্থান দিয়ে এই সমীকরণে যুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্য, আফ্রিকা ও দক্ষিণ এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থান করছে এবং অর্থনীতি, কূটনীতি, ধর্ম ও জ্বালানি খাতে ব্যাপক প্রভাব রাখে।
প্রিন্স তুর্কি আরও ইঙ্গিত দেন, চুক্তির লক্ষ্য ও নীতির সঙ্গে একমত এমন অন্য দেশগুলোও ভবিষ্যতে এই উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।
তার বক্তব্যে সৌদি আরবকে শুধু এই চুক্তির অর্থদাতা বা অন্যদের কাছ থেকে নিরাপত্তা নেওয়া একটি দেশ হিসেবে দেখার ধারণারও সমালোচনা করা হয়। তিনি মনে করেন, এ ধরনের ব্যাখ্যা সৌদি আরবের নিজস্ব কৌশলগত সক্ষমতা ও সম্পদকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন করে না।
লোহিত সাগর ও আরব সাগরের কাছাকাছি সৌদি আরবের অবস্থান বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও সামুদ্রিক বাণিজ্যপথের সঙ্গে দেশটিকে কৌশলগতভাবে যুক্ত করেছে। বিশাল তেল মজুদ, উৎপাদন সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাবের কারণে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে।
এর পাশাপাশি ‘ভিশন ২০৩০’-এর মাধ্যমে সৌদি আরব বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা, উৎপাদন, খনি, পর্যটন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পারমাণবিক শক্তি ও প্রতিরক্ষা শিল্পসহ বিভিন্ন খাতে নিজেদের সক্ষমতা সম্প্রসারণ করছে।
প্রিন্স তুর্কি সৌদি আরবের ধর্মীয় ও কূটনৈতিক অবস্থানের কথাও তুলে ধরেন। মক্কা ও মদিনার কারণে বিশ্বের মুসলিম দেশ ও জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সৌদি আরবের একটি বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে। এর সঙ্গে জি-২০-এর সদস্যপদ, বিস্তৃত কূটনৈতিক যোগাযোগ এবং বিশ্বের প্রধান শক্তিগুলোর সঙ্গে বিভিন্ন অংশীদারিত্ব যুক্ত হওয়ায় রিয়াদের বহুমাত্রিক প্রভাব রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
প্রিন্স তুর্কির মতে, মক্কা চুক্তিকে শুধু তাৎক্ষণিক কোনো হুমকি মোকাবিলার উদ্যোগ হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং এটি নিজস্ব নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি মুসলিম দেশের সম্মিলিত সক্ষমতা বৃদ্ধির একটি প্রচেষ্টা।
তিনি বলেন, সৌদি আরবের জন্য এই জোট জাতীয় শক্তি কিংবা বিদ্যমান আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্বের বিকল্প নয়। বরং এটি কৌশলগত নিরাপত্তার একটি অতিরিক্ত স্তর, যা ক্রমবিকাশমান বহুমেরু বিশ্বে নতুন আঞ্চলিক ভারসাম্য তৈরিতে ভূমিকা রাখার পাশাপাশি সৌদি আরবের চলমান রূপান্তর প্রক্রিয়াকে সুরক্ষিত রাখতে সহায়তা করতে পারে।



