জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানবতাবিরোধী অপরাধ: ওবায়দুল কাদেরসহ সাত আওয়ামী লীগ নেতার মৃত্যুদণ্ড
লেখক:
ঢাকা
বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ দলটির সাতজন শীর্ষ নেতা | ছবি : কোলাজ
২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ দলটির সাতজন শীর্ষ নেতাকে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল।
মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের ট্রাইব্যুনাল এই রায় ঘোষণা করেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় এটি সপ্তম রায়। এর আগে গত বছরের নভেম্বরে দলটির সভাপতি ও ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল।
মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের পরিচয়
এই মামলায় সজাপ্রাপ্ত মূল আসামি ওবায়দুল কাদের ছাড়াও অন্য আসামিরা হলেন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত, কার্যক্রম নিষিদ্ধ যুবলীগের চেয়ারম্যান শেখ ফজলে শামস পরশ এবং সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হোসেন খান নিখিল। এছাড়াও অভিযুক্ত হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি সাদ্দাম হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানকে। মামলার বিচার চলাকালীন সকল আসামিই পলাতক ছিলেন, তবে তাঁদের পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত (স্টেট ডিফেন্স) আইনজীবী বিচারে অংশ নেন।
গুরুতর সব অভিযোগ প্রমাণিত
রায়ের পর সংবাদ সম্মেলনে চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম জানান, আসামিদের বিরুদ্ধে আনা চারটি করে অভিযোগ আদালতে নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে আন্দোলন দমনে ষড়যন্ত্র, উসকানি, হত্যা, অপহরণ, গুম এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমে গণহত্যা চালানোর নির্দেশ দেওয়ার অপরাধ প্রমাণিত হয়েছে। বিচার চলাকালে ওবায়দুল কাদেরের বেশ কিছু ফোনালাপের অডিও ট্রাইব্যুনালে বাজিয়ে শোনানো হয়। ১১ জুলাই ছাত্রলীগের সভাপতিকে ফোনে সরাসরি আন্দোলনকারীদের মারধর ও দমনের নির্দেশ দেন তিনি। এর পরবর্তীতে ১৯শে জুলাই তিনি কারফিউ জারি করে ‘দেখামাত্রই গুলি’ (শ্যুট অ্যাট সাইট) করার ঘোষণা নিশ্চিত করতে নেতৃত্ব দেন।
গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণ ও সশস্ত্র হামলা
তৎকালীন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী আরাফাত আন্দোলনকারীদের ‘সন্ত্রাসী’ আখ্যা দেন এবং সরকারের সহিংস কর্মকাণ্ডের খবর প্রচার বন্ধ করতে বাংলা ভিশন, দেশ টিভি, চ্যানেল ২৪ ও এনটিভির সম্প্রচার সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেন। এছাড়া বাহাউদ্দিন নাছিম, সাদ্দাম হোসেন ও শেখ ওয়ালী আসিফ ইনানের উসকানিতে এবং শেখ ফজলে শামস পরশের নেতৃত্বে যুবলীগ ও ছাত্রলীগের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশে আন্দোলনকারীদের ওপর নৃশংস হামলা চালায়। চিফ প্রসিকিউটর জানান, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সশস্ত্র ক্যাডারদের এসব আক্রমণে ১,৪০০-এর বেশি ছাত্র-জনতা নিহত এবং ২৫,০০০-এর বেশি মানুষ গুরুতর আহত হন।
সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও জুলাই ফাউন্ডেশন
রায়ের এক পর্যবেক্ষণে ট্রাইব্যুনাল দণ্ডপ্রাপ্ত প্রতিটি আসামির স্থাবর ও অস্থাবর মোট সম্পত্তির ৫০ শতাংশ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করার নির্দেশ দিয়েছেন। প্রসিকিউশন থেকে জানানো হয়, রোম স্ট্যাটিউটের ধারার আলোকে এই নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। বাজেয়াপ্ত করা সম্পত্তি বিক্রয় করে প্রাপ্ত অর্থ ‘জুলাই ফাউন্ডেশন’ বা কোনো বিধিবদ্ধ সংস্থার মাধ্যমে আন্দোলনে নিহতদের পরিবার এবং আহতদের সহায়তায় বিলি-বণ্টন করার বিধান রাখা হয়েছে।
আইনি প্রক্রিয়ার পরবর্তী ধাপ
আইন অনুযায়ী রায় ঘোষণার পর থেকে পলাতক আসামিদের আপিল করার জন্য ৩০ দিন সময় থাকবে। এই ৩০ দিনের মেয়াদ পার হওয়ার পর সরকার আসামিদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা ও রায় বাস্তবায়নের আইনি পদক্ষেপ নিশ্চিত করতে পারবে। তবে আসামিরা পলাতক থাকা অবস্থায় কোনো বক্তব্য দিলে তা আদালতে গ্রহণযোগ্য হবে না বলে প্রসিকিউশন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে।



