সৃজনশীল চিন্তায় ইবনে খালদুনের শিক্ষা

পড়তে ১ মিনিট

সৃজনশীল চিন্তায় ইবনে খালদুনের শিক্ষা

মানুষের জ্ঞানের জগতে কীভাবে বড় মাপের সৃজনশীল ও প্রতিভাবান ব্যক্তি তৈরি হয়, তা বোঝার জন্য ‘জ্ঞানের সমাজতত্ত্ব’ নিয়ে চর্চা করা প্রয়োজন। দেখা যায়, সাধারণত তিনটি প্রধান বিষয় একজন মানুষকে অসাধারণ প্রতিভাবান করে তোলে : (ক) প্রচুর পড়াশোনা ও গভীর জ্ঞান (খ) সৃজনশীল কাজে উৎসাহিত করার মতো পরিবেশ (গ) ব্যক্তিত্বের বিশেষ কিছু চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য।

এই প্রবন্ধের মূল আলোকপাত বা ফোকাস দু’টি বিষয়ের ওপর। প্রথমত, ইবনে খালদুনের অর্জিত অগাধ ইসলামি জ্ঞান কীভাবে তার চিন্তার জগত বা বিশ্ববীক্ষাকে গড়ে তুলেছিল এবং এর ফলে কীভাবে তাঁর প্রখর সমাজবিজ্ঞানভিত্তিক বুদ্ধিবৃত্তিক মেধার বিকাশ ঘটেছিল, তা বিশ্লেষণ ও আলোচনা করা।

দ্বিতীয়ত, মুসলিম সংস্কৃতিতে যাকে ‘আকল-নকল মানস’ বলা হয়- যা জ্ঞান আহরণ ও সৃষ্টির প্রক্রিয়ায় ঐশী জ্ঞানকে মানুষের বিচারবুদ্ধিপ্রসূত জ্ঞানের সাথে সমন্বিত করে- জ্ঞান সৃষ্টির ক্ষেত্রে সেই পদ্ধতির নির্ভরযোগ্যতা বা গ্রহণযোগ্যতা কতটুকু তা মূল্যায়ন করা।

উভয় ক্ষেত্রই (অগাধ জ্ঞান এবং আকল-নকল জ্ঞান) মূলত ‘হিউম্যান সিম্বলস’ বা মানবিক প্রতীকী (ভাষা, চিন্তা, ধর্ম, জ্ঞান/বিজ্ঞান, মিথ, আইন, সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ এবং রীতিনীতি) ভাণ্ডারের ফলাফল; যেখানে জ্ঞান/বিজ্ঞান এবং চিন্তা হলো এই মানবিক প্রতীকী ভাণ্ডারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই দ্বিমুখী আলোকপাত করার কারণ হলো, এই প্রবন্ধে একদিকে ধরে নেওয়া হয়েছে যে, মহান বুদ্ধিবৃত্তিক মানস গঠনের জন্য অগাধ জ্ঞান অত্যন্ত মৌলিক একটি বিষয়, এবং উদ্দীপনামূলক বাহ্যিক পরিবেশ ও বিশেষ ব্যক্তিত্বের বৈশিষ্ট্যগুলো মেধাবী মনন বিকাশে অপরিহার্য সহায়ক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।

অন্যদিকে, আধুনিক পাশ্চাত্য শিক্ষিত সমাজে ‘আকল-নকল’ মানসকে জ্ঞানের দুই শাখায় (বিজ্ঞান ও কলা) নির্ভরযোগ্য জ্ঞান প্রতিষ্ঠার মাধ্যম হিসেবে খুব একটা গ্রহণ করা হয় না। এই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা বর্তমানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, কারণ প্রখ্যাত সমাজবিজ্ঞানী ইমানুয়েল ওয়ালারস্টাইন যেমনটি দাবি করেছিলেন- জ্ঞানের দুই শাখার মধ্যে জ্ঞানতাত্ত্বিক পুনর্মিলনের অভাবের কারণে বর্তমানে সামাজিক ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠছে। মুসলিম ‘আকল-নকল’ মানস কেবল জ্ঞানের এই দুই শাখার জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐক্যের জোরালো সমর্থনই করে না, বরং এটি মানুষের তৈরি জ্ঞান এবং ঐশী জ্ঞানের মধ্যকার ঐক্যেরও সুপারিশ করে।

ইবনে খালদুনের বহুমুখী জ্ঞান এবং সৃজনশীলতা

চতুর্দশ শতাব্দীতে ইবনে খালদুন যেভাবে বুদ্ধিমত্তা ও দক্ষতার সাথে ‘মানবীয় সামাজিক সংগঠন’ বা সমাজবিজ্ঞানের উদ্ভাবন করেছিলেন, তা তাকে মানব ইতিহাসের এক অনন্য পথপ্রদর্শক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাই তার সেই অগাধ জ্ঞানভাণ্ডার এবং ‘আকল-নকল’ (যুক্তি ও ঐশী জ্ঞানের সমন্বয়) ভিত্তিক চিন্তাধারা সম্পর্কে জানা এখন সময়ের দাবি।

মানবজাতির দীর্ঘ ইতিহাস এবং বিভিন্ন সভ্যতা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, জ্ঞানের যেকোনো শাখায় বড় মাপের সৃজনশীল মানুষ হওয়ার পেছনে সবসময়ই একটি উন্নত মানের ‘শিক্ষিত বা প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান’ কাজ করেছে। এর জন্য প্রধানত দু’টি বিষয় প্রয়োজন: প্রথমত, নূন্যতম অক্ষরজ্ঞান এবং দ্বিতীয়ত, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে গভীর পাণ্ডিত্য। যদিও মানুষের কিছু কিছু সৃজনশীল কাজের জন্য অক্ষরজ্ঞান বা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা সবসময় বাধ্যতামূলক নয়, কিন্তু জ্ঞানের বেশিভাগ শাখার ক্ষেত্রেই এটি অপরিহার্য। অর্থাৎ, মানববিদ্যার পরিধি বাড়াতে এবং নতুন উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে শিক্ষা বা অক্ষরজ্ঞান একটি মৌলিক হাতিয়ার।

সৃজনশীলতা বিষয়ক বিভিন্ন তত্ত্বেও জ্ঞান ও সৃজনশীলতার গভীর সম্পর্কের কথা বলা হয়েছে। মনোবিজ্ঞানী রবার্ট স্টার্নবার্গের মতে, এই সম্পর্কটি খুবই স্পষ্ট- একজন মানুষ যত বেশি জানবেন, তার পক্ষে নতুন কোনো সমাধান বের করা তত সহজ হবে। এই বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার মানুষের মস্তিষ্কে এমন এক জটিল চিন্তাপ্রক্রিয়ার জন্ম দেয়, যা প্রায়শই অসাধারণ সব উদ্ভাবন বা প্রতিভার বিচ্ছুরণ ঘটায়।

তবে একে একটি তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত বলা যেতে পারে; কারণ এটি সৃজনশীলতার প্রক্রিয়ায় যুক্ত অন্য দু’টি উপাদানের (পরিবেশ ও ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য) গুরুত্বকে কমিয়ে দেখায়। এই সতর্কতা সত্ত্বেও, ইবনে খালদুনের অগাধ ইসলামি জ্ঞান এবং তার তৈরি নতুন সমাজবিজ্ঞানের মধ্যকার সম্পর্কটি এই প্রবন্ধের মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে- যা সৃজনশীলতা বিষয়ক তত্ত্বগুলো যাচাই করার একটি ক্ষেত্র। সৃজনশীলতার একটি আদর্শ সংজ্ঞা হলো- মানুষের এমন এক সক্ষমতা যার মাধ্যমে সে প্রাপ্ত তথ্যের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে যেতে পারে এবং পুরনো সমস্যাগুলোকে নতুন ও চমৎকারভাবে উপস্থাপনের কল্পনা করতে পারে; যেমনটি স্টার্নবার্গ উল্লেখ করেছেন।

ইবনে খালদুনের শিক্ষা ও জ্ঞান

তিউনিসিয়ায় তার শৈশব ও কৈশোরে ইবনে খালদুন প্রধানত তিনটি বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেন: (১) ইসলামি শিক্ষা, যার মধ্যে ছিল কুরআন বিজ্ঞান, হাদীস এবং ইসলামি আইনশাস্ত্র (ফিকাহ)- বিশেষ করে মালেকি মাযহাবের আইন; (২) আরবি ভাষা বিষয়ক বিজ্ঞান, যা ব্যাকরণ, শব্দরূপ (তসরীফ) এবং বাগ্মিতা বা অলঙ্কার শাস্ত্র (আল-বালাগাহ) নিয়ে আলোচনা করে এবং (৩) যুক্তিবিদ্যা, দর্শন, প্রাকৃতিক বিজ্ঞান ও গণিত। তার শিক্ষকদের মধ্যে দু’জন সবচেয়ে বিশিষ্ট পন্ডিত ছিলেন আবু মুহাম্মদ ইবনে আবদ আল-মুহাইমিন আল-হাদরামি এবং আবু আবদিল্লাহ মুহাম্মদ আল-আবেলি। ইবনে খালদুন আল-হাদরামিকে ব্যাকরণ ও হাদীস শাস্ত্রের তৎকালীন মরক্কোর শ্রেষ্ঠ পন্ডিত হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার কাছ থেকে তিনি হাদীসের প্রধান ছয়টি কিতাব (সিহাহ সিত্তাহ) এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বইয়ের মৌলিক জ্ঞান অর্জন করেন।

তার দ্বিতীয় শিক্ষক আল-আবেলির কাছে তিনি ‘আল-আসলিয়্যাইনি’ বা দু’টি মৌলিক শাস্ত্র শিখেন : যা হলো যুক্তিবিদ্যা এবং দর্শন ও গণিতের সকল শাখা। আল-আবেলি এই বিষয়গুলোতে ইবনে খালদুনকে অত্যন্ত প্রতিভাবান হিসেবে খুঁজে পেয়েছিলেন।

ইবনে খালদুন নিজেই স্বীকার করেছেন যে, অতি শৈশব থেকেই তার মধ্যে জ্ঞান অর্জনের এক তীব্র আকাঙ্ক্ষা ছিল:

“একেবারে শৈশব থেকেই, এমনকি দুধ ছাড়ানোর সময় থেকেই, আমি জ্ঞান এবং সর্বোত্তম গুণাবলী অন্বেষণে কখনো ক্ষান্ত হইনি। তিউনিসিয়ায় সেই ভয়াবহ প্লেগ মহামারী আসার আগ পর্যন্ত আমি আমার পুরো সময়টি বিভিন্ন কোর্সে অংশ নিয়ে এবং পন্ডিতদের সান্নিধ্যে কাটিয়েছি। ওই মহামারীতে তিউনিসিয়ার বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি এবং আমার অধিকাংশ শিক্ষক মারা যান। ফলে, যারা এই মহামারী থেকে বেঁচে গিয়েছিলেন, সেই সব পন্ডিত ও লেখকদের অধিকাংশই মরক্কোর উদ্দেশে দেশ ত্যাগ করেন...।”

পরবর্তী সময়ে ইবনে খালদুন মরক্কোর ফেজ শহরে পুনরায় পড়াশোনা শুরু করার সুযোগ পান। সেই সময়ে আল-আন্দালুস (স্পেন) এবং তিউনিসিয়া থেকে আসা জ্ঞানী-গুণী ও লেখকদের প্রধান কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল এই শহরটি। ফেজে ছিল তৎকালীন সময়ের সবচেয়ে সমৃদ্ধ ইসলামি পাঠাগারগুলো। এমন একটি জ্ঞানদীপ্ত ও প্রেরণামূলক পরিবেশে অবস্থান ইবনে খালদুনের জ্ঞানের পরিধিকে আরো বিস্তৃত ও শক্তিশালী করেছিল এবং তার জ্ঞানতৃষ্ণাকে মিটিয়েছিল।

ইবনে খালদুনের প্রশংসিত প্রতিভা

উভয় সংস্কৃতির বিভিন্ন বিজ্ঞানে ইবনে খালদুনের উল্লিখিত শিক্ষাগত পটভূমি (যা হিউম্যান সিম্বল বা ঐঝ ভাণ্ডারের অংশ) তার বুদ্ধিবৃত্তিক মানস গঠনে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। বুদ্ধিজীবী ও পণ্ডিতদের মধ্যে বিশ্বজুড়ে একটি ব্যাপক ঐক্যমত রয়েছে যে, ইবনে খালদুন এক মহান মেধার অধিকারী ছিলেন। পশ্চিমা বিশ্ব থেকে বিখ্যাত ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ আর্নল্ড টয়েনবি ইবনে খালদুনের মেধা সম্পর্কে এভাবে বলেছেন : “তিনি (ইবনে খালদুন) ইতিহাসের এমন একটি দর্শন কল্পনা ও সূত্রবদ্ধ করেছেন যা নিঃসন্দেহে যেকোনো সময় এবং যেকোনো স্থানে যেকোনো মানুষের তৈরি এই ধরণের কাজের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ।” প্রাচ্য থেকে মরক্কোর মরহুম প্রখ্যাত বুদ্ধিজীবী এবং ইবনে খালদুনের চিন্তাধারার ওপর পিএইচডি করা লেখক আল-জাবরি তার ‘মুকাদ্দিমাহ’ গ্রন্থটিকে দেখেন একটি “পিরামিড সদৃশ ও সুসংহত কাঠামো” হিসেবে। তার মতে, এটি বিষয়বস্তুর দিক থেকে যেমন উন্নত চিন্তার ফসল, তেমনি এর অধ্যায় ও অনুচ্ছেদগুলোর বিন্যাস এবং বিভিন্ন অংশের মধ্যে বিরাজমান সামঞ্জস্যও অতুলনীয়।

জ্ঞানের নৈতিকতা

ইবনে খালদুনের বুদ্ধিবৃত্তিক মানস গঠনে ইসলামি জ্ঞানভাণ্ডারের (যা মানুষের প্রতীকী ভাণ্ডার বা ঐঝ-এর অংশ) সুনির্দিষ্ট ভূমিকা বুঝতে হলে আমাদের তৎকালীন মুসলিম পণ্ডিতদের চিন্তা করার সাধারণ বৈশিষ্ট্যগুলোর দিকে তাকাতে হবে। সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ধরে নেওয়া হয় যে, বর্তমান যুগে মুসলিম বিশ্বে পশ্চিমা আধিপত্য ও উপনিবেশ শুরুর অনেক আগেই ইবনে খালদুন তার ‘নতুন বিজ্ঞান’ (ইলম আল-উমরান আল-বাশারি) উদ্ভাবন করেছিলেন- যা মূলত সেই সময়ের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর মধ্যেই গড়ে উঠেছিল। সেই ধ্রুপদী মুসলিম বুদ্ধিজীবীদের চিন্তা ও মেধা মূলত জ্ঞান অর্জন এবং নতুন কিছু সৃষ্টির ক্ষেত্রে কুরআনের নৈতিক আদর্শ দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত ছিল।

এই নৈতিক বৈশিষ্ট্যগুলোকে নিচে সারসংক্ষেপ করা যেতে পারে :

  • কুরআন জ্ঞান অর্জন ও সৃষ্টির ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়। অবতীর্ণ হওয়া প্রথম কুরআনিক আয়াতগুলো এই মহাবিশ্বের সবকিছু সম্পর্কে বিস্তৃত জ্ঞান অর্জনের জন্য শিক্ষা এবং নিরন্তর জ্ঞানচর্চার গুরুত্বকে জোরালোভাবে তুলে ধরে।

  • জ্ঞান অন্বেষণ ও এর উন্নয়নের লক্ষ্যে কুরআনের বাণী মুসলিম ও অমুসলিম উভয়কেই তিনটি প্রধান ক্ষেত্রে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ পদ্ধতি অবলম্বনের আহ্বান জানায়: (ক) মহাবিশ্ব বা প্রকৃতি, (খ) মানব সভ্যতা ও সমাজের ঐতিহাসিক ঘটনাবলি এবং তাদের সামাজিক চরিত্রসমূহ এবং (গ) মানুষের স্বতন্ত্র প্রকৃতি।

  • কুরআনের দৃষ্টিতে, প্রকৃত ও নির্ভরযোগ্য জ্ঞান একজন বিজ্ঞানী বা পণ্ডিতকে আল্লাহর প্রতি সবচেয়ে বেশি অনুগত ও বিনয়ী করে তোলে- “আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে কেবল জ্ঞানীরাই তাঁকে ভয় করে” (আল-কুরআন, সূরা ফাতির, আয়াত: ২৮)। ইসলামি দৃষ্টিভঙ্গিতে, ভালো ও নির্ভরযোগ্য জ্ঞান অর্জন করা একজন প্রকৃত বিজ্ঞানী বা পণ্ডিতের জন্য আধ্যাত্মিক মুক্তির কাজ। এটি আধুনিক পাশ্চাত্য মানসের দুই সংস্কৃতির চিন্তাধারার চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা।

  • মানুষের জ্ঞান যত বিশাল ও বিস্তৃতই হোক না কেন, আল্লাহর অসীম, বৈশ্বিক ও নিশ্চিত জ্ঞানের তুলনায় তা সব সময়ই অত্যন্ত সীমিত (বর্তমানে করোনা মহামারী আধুনিক বিজ্ঞানের জন্য এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ)।

  • ঐশী জ্ঞান হলো পরম নির্ভরযোগ্য, নিশ্চিত এবং এই পৃথিবী ও মহাবিশ্বের সবকিছুর জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক।

মুসলিমদের বুদ্ধি ও ঐশী জ্ঞানভিত্তিক (আকল-নকল) চিন্তাধারা

মুসলিমদের এই জ্ঞানতাত্ত্বিক বা ‘মানবিক প্রতীকী’ (HS) শিক্ষার সংক্ষিপ্ত পরিচয় থেকে এটি পরিষ্কার যে, ইবনে খালদুনের শিক্ষা ও জ্ঞানগত পটভূমি এবং তিনি যে সমাজগুলো নিয়ে গবেষণা করেছিলেন, উভয়ই ছিল প্রকৃতিগতভাবে পুরোপুরি ইসলামি।

একদিকে, তার সময়ে প্রচলিত বিভিন্ন ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শাখাগুলোতে (উভয় সংস্কৃতির) তার অগাধ ও উচ্চমানের পাণ্ডিত্য ছিল, যা তার ‘মুকাদ্দিমাহ’ গ্রন্থের ষষ্ঠ খণ্ডে স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। অন্যদিকে, ইবনে খালদুনের ছিল অসংখ্য আরব মুসলিম সমাজ, উপজাতি, গোষ্ঠী ও সম্প্রদায় সম্পর্কে সরাসরি লব্ধ অভিজ্ঞতা, যা তিনি তার ‘উমরান’ বা সমাজতাত্ত্বিক মেধা দিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন এবং সেগুলো নিয়ে লিখেছেন। অন্য কথায়, তার সামাজিক তত্ত্ব এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব জ্ঞান- উভয়ই ইসলামি আদর্শ দ্বারা অনুপ্রাণিত। তাই ইবনে খালদুনের বুদ্ধিবৃত্তিক মানস ছিল অনিবার্যভাবে এক বলিষ্ঠ মুসলিম মানস, যা একই সাথে ইসলামি শিক্ষিত সংস্কৃতি এবং আরব মুসলিম সমাজের বাস্তব অভিজ্ঞতার ফসল।

একজন মহান চিন্তাবিদ হিসেবে ইবনে খালদুনের মুসলিম পরিচয় নিয়ে গিব যে বর্ণনা দিয়েছেন, তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই :

“ইবনে খালদুন কেবল একজন মুসলিমই ছিলেন না, বরং মুকাদ্দিমাহ-এর প্রায় প্রতিটি পৃষ্ঠাই সাক্ষ্য দেয় যে, তিনি ছিলেন মালেকি মাজহাবের একজন একনিষ্ঠ মুসলিম ফকিহ (আইনবিদ) এবং ধর্মতাত্ত্বিক। তার কাছে ইসলাম ধর্ম ছিল জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শরীয়াহ-ই হলো একমাত্র সঠিক পথপ্রদর্শক।”

অন্যদিকে, লেখক এম. আল-শাকা নিশ্চিত করেছেন যে, ইবনে খালদুনের ‘উমরান তত্ত্ব’ শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ইসলামি। ইবনে খালদুন যখন তার ‘নতুন বিজ্ঞান’ ধারণার ওপর বিদেশী প্রভাব অস্বীকার করেন, তখন তিনি নিজেও তার নিজস্ব এবং খাঁটি ইসলামি চিন্তাধারার দিকেই ইঙ্গিত করেছেন :

“আমরা এই বিষয়গুলো সম্পর্কে সচেতন হয়েছি আল্লাহর সাহায্যে এবং এর পেছনে এরিস্টটলের কোনো নির্দেশনা বা মোবেধানদের (পারস্যের ধর্মগুরু) কোনো শিক্ষা ছিল না।”

ইবনে খালদুনের মেধার এই ইসলামি বৈশিষ্ট্যগুলো তথাকথিত ‘আকল-নকল’ জ্ঞানতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে আরো স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। ঐতিহাসিকভাবে, আরব মুসলিম সভ্যতার শুরুর দিকের সকল শাখার পণ্ডিত ও বিজ্ঞানীরা তাদের কাজ সম্পন্ন করেছিলেন একদিকে ওহী বা পবিত্র জ্ঞান (নকল) এবং অন্যদিকে মানুষের বিচারবুদ্ধি নির্ভর অর্জিত জ্ঞান (আকল)-এর সমন্বয়ের ভিত্তিতে। ইবনে খালদুনের মুকাদ্দিমাহ-তে প্রতিষ্ঠিত বহুমুখী সমাজবিজ্ঞানও এই আকল ও নকলের সমন্বয়ের নিয়মের বাইরে নয়। অর্থাৎ, তিনি তার মুকাদ্দিমাহ-সহ সমগ্র ‘উমরান’ বা সমাজতাত্ত্বিক কাজ রচনার ক্ষেত্রে এই দ্বৈত জ্ঞানতাত্ত্বিক (আকল-নকল) দৃষ্টিভঙ্গি জোরালোভাবে গ্রহণ করেছিলেন। এই হিসেবে, খালদুনীয় চিন্তাধারা আগে বর্ণিত ধ্রুপদী মুসলিম বুদ্ধিবৃত্তিক মানসের সেই পাঁচটি প্রধান বৈশিষ্ট্যের সাথে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ, যা মূলত কুরআন দ্বারা অনুপ্রাণিত।

আকল (যুক্তি) এবং নকল (ঐশী জ্ঞান)- এই উভয় দৃষ্টিকোণ থেকে শেখার জন্য এমন চরম কৌতূহলী এবং অনুপ্রাণিত মানসিকতা মধ্যযুগের আগে আরব-মুসলিম সভ্যতার বিভিন্ন শাখায় অর্জিত বড় বড় মাইলফলকগুলো ব্যাখ্যা করতে সাহায্য করে। ইবনে খালদুনের ‘মুকাদ্দিমাহ’ গ্রন্থে ফুটে ওঠা তার অসাধারণ মেধা মূলত মুসলিমদের এই ‘আকল-নকল’ ভিত্তিক চিন্তাধারার উচ্চ বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতার একটি জোরালো উদাহরণ। এই বিশেষ ধরনের চিন্তাপদ্ধতিকেই আমরা তথাকথিত খালদুনীয় প্রাচ্য সমাজবিজ্ঞান এবং সমসাময়িক পাশ্চাত্য সমাজবিজ্ঞানের মধ্যকার বিভাজক রেখা বা পার্থক্য হিসেবে বিবেচনা করি। উদাহরণস্বরূপ, ইবনে খালদুন তার মুকাদ্দিমাহ-তে জ্ঞানের দুই সংস্কৃতির (বিজ্ঞান ও মানবিক শাখা) মধ্যে যে জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐক্য বা সমন্বয় ঘটিয়েছেন, তার জন্য সমাজবিজ্ঞানী ওয়ালারস্টাইনও তার প্রশংসা করবেন বলে আশা করা যায়।

ইসলামি জ্ঞানতাত্ত্বিক দৃষ্টিভিকোণ থেকে, আকল (যুক্তি) এবং নকল (ঐশী জ্ঞান)-এর মধ্যে কোনো উত্তেজনা বা বিরোধের স্থান মুসলিম মানসে নেই। কারণ, এই দু’টি সূত্রের উৎস এক এবং অভিন্ন : আল্লাহ। সেভাবে দেখলে, মুসলিম মানসকে পার্থিব (secular) এবং ঐশী (Revealed) জ্ঞানের একটি মিলনস্থল হিসেবে গণ্য করা যায়। বিখ্যাত ধর্মীয় পণ্ডিত আহমদ ইবনে তাইমিয়া (১২৬৩-১৩২৮) হলেন সবচেয়ে সুপরিচিত মুসলিম মনীষী, যিনি ইসলামি সংস্কৃতিতে আকল এবং নকলের সমন্বিত জ্ঞান প্রচারের বৈধতাকে জোরালোভাবে সমর্থন করেছিলেন। তার রচিত ‘দর’উ তা’আরুদিল আকলি ওয়ান নাকলি’ (আকল ও নকলের মধ্যকার বিরোধ নিরসন) গ্রন্থটি এর একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। #



এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন