সিরীয় কারিগরের হাত ধরে টিকে আছে আলেপ্পোর ১,৪০০ বছরের কাঠের রিলিফ শিল্প
লেখক:
সিরীয় কারিগর আইমান সাঈদ সিরিয়ার আলেপ্পোর ঐতিহাসিক সুক বা বাজারে তাঁর কর্মশালার ভেতরে ঐতিহ্যবাহী কাঠের রিলিফ শিল্পকর্ম প্রদর্শন করছেন। ছবি : আনাদোলু এজেন্সি
সিরিয়ার উত্তরাঞ্চলীয় ঐতিহাসিক শহর আলেপ্পোর পুরোনো বাজারে এখনো টিকে আছে কয়েক শতাব্দী প্রাচীন কাঠের রিলিফ শিল্প। পারিবারিক ঐতিহ্যের এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে ৪২ বছর বয়সী কারিগর আইমান সাঈদ তাঁর ছেলেকেও প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। তাঁর বিশ্বাস, নতুন প্রজন্মের কাছে এই শিল্পের দক্ষতা পৌঁছে দিতে পারলেই বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা ঐতিহ্যটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব হবে।
২০২৪ সালের ২৮ জুলাই আলেপ্পোর ঐতিহাসিক সুকে (বাজার) নিজের কর্মশালায় বসে কাঠের রিলিফ শিল্পকর্ম তৈরি ও প্রদর্শন করছিলেন সাঈদ। প্রায় তিন দশক ধরে তিনি এই শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। মাত্র ১২ বছর বয়সে পরিবারের কাছ থেকেই তিনি এই কারুশিল্পের কাজ শেখেন। এখন সেই জ্ঞান ও দক্ষতা ছেলের হাতে তুলে দিচ্ছেন তিনি।
কাঠের ওপর উঁচু করে নকশা ফুটিয়ে তোলার এই শিল্পে সাধারণত ঐতিহ্যবাহী ‘আরাবেস্ক’ নকশা ও আরবি ক্যালিগ্রাফির ব্যবহার দেখা যায়। একসময় মসজিদ, গির্জা ও রাজপ্রাসাদের দেয়াল ও ছাদ সাজাতে এই শিল্প ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। তবে আধুনিক স্থাপত্যের প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে এর ব্যবহার অনেকটাই কমে গেছে। বর্তমানে কাঠের বাক্স, দেয়ালসজ্জার সামগ্রীসহ বিভিন্ন হস্তনির্মিত পণ্যে এই শিল্পের ব্যবহার বেশি দেখা যায়।
আলেপ্পো দুর্গের ‘থ্রোন হল’ বা সিংহাসন কক্ষ এবং জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদসহ বিভিন্ন ঐতিহাসিক স্থাপনায় এখনো এই কারুশিল্পের নিদর্শন রয়েছে। এসব নিদর্শনই প্রমাণ করে, মধ্যপ্রাচ্যের স্থাপত্য ও সংস্কৃতিতে কাঠের রিলিফ শিল্পের দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ ইতিহাস রয়েছে।
সাঈদের কর্মশালায় একটি শিল্পকর্ম তৈরির কাজ শুরু হয় কাগজে আঁকা নকশা কাঠের ওপর স্থানান্তরের মাধ্যমে। এরপর বিশেষ ধরনের উদ্ভিজ্জ পেস্ট ব্যবহার করে কাঠের ওপর নকশাগুলো উঁচু করে তোলা হয়। পরবর্তী ধাপে কাঠে রং করা, সুরক্ষামূলক প্রলেপ দেওয়া এবং তুলির সাহায্যে উঁচু নকশায় রং করার কাজ চলে। সবশেষে সূক্ষ্ম কালো রেখা দিয়ে নকশার সীমানা ফুটিয়ে তোলা হয়।
‘এই কারুশিল্প কখনোই বিরক্তিকর মনে হয় না,’ বলেন সাঈদ। তাঁর মতে, প্রতিটি নতুন শিল্পকর্মে নতুন কোনো সূক্ষ্মতা আবিষ্কারের সুযোগ থাকে। ফলে দীর্ঘদিন কাজ করার পরও এই শিল্পের প্রতি তাঁর আগ্রহ কমেনি।
কাঠের রিলিফে ব্যবহৃত রং নির্বাচনেও বিশেষ যত্ন নেওয়া হয়। সাঈদ জানান, ঘরের আলো ও পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রং বেছে নেওয়া হয়। যেসব ঘরে পর্যাপ্ত সূর্যের আলো থাকে, সেখানে তুলনামূলক শীতল রং ব্যবহার করা হয়। অন্যদিকে অন্ধকার বা কম আলোযুক্ত ঘরের জন্য উষ্ণ রং বেছে নেওয়া হয়।
তাঁর কর্মশালায় আসা দর্শনার্থীরাও এই শিল্পের সূক্ষ্মতা দেখে মুগ্ধ হন। সাঈদ জানান, অনেকেই তাঁর তৈরি দেয়াল ও ছাদের জটিল নকশাগুলোর দিকে দীর্ঘক্ষণ একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকেন।
তবে ঐতিহ্যবাহী এই শিল্পের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন সাঈদ। তিনি মনে করেন, আধুনিক সময়ে এসব হস্তশিল্পের বাজার সংকুচিত হওয়ায় কারিগরদের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়ছে। তাই ঐতিহ্যবাহী হস্তশিল্পের জন্য সরকারি ও সামাজিকভাবে আরও বেশি সহায়তা প্রয়োজন।
এ জন্য তিনি একটি বিশেষ ‘হস্তশিল্প বাজার’ গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছেন। সেখানে কাঠের রিলিফ শিল্প, তামার কাজ, বুনন এবং কিলেম বা ঐতিহ্যবাহী কার্পেট তৈরির মতো বিভিন্ন কারুশিল্পের কারিগররা একসঙ্গে কাজ করতে পারবেন।
সাঈদের ভাষায়, ‘সব কর্মশালাকে এক ছাদের নিচে আনতে পারলে এসব পেশাকে বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে কারিগরদের মধ্যে সুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরি হবে, যা কাজের মান আরও উন্নত করতে সহায়তা করবে।’
নিজের ছেলে এবং নতুন প্রজন্মকে এই শিল্প শেখানোর মধ্য দিয়ে তাই শুধু পারিবারিক ঐতিহ্য নয়, আলেপ্পোর দীর্ঘ সাংস্কৃতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ও বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন আইমান সাঈদ।



