ইসরাইলি হামলার মধ্যে ট্রাম্পের গাজা পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন ফিলিস্তিনিদের
লেখক:
২০২৩ সালের ইসরাইলি হামলায় নিহত হাসায়না ও আবু শারিয়া গোত্রের ১১২ সদস্যের মরদেহের অবশিষ্টাংশ ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে উদ্ধারের পর গাজা শহরে ফিলিস্তিনি পতাকায় জড়িয়ে তাদের শেষকৃত্য সম্পন্ন করা হয়। ছবি: রয়টার্স
গাজায় ইসরাইলি হামলা অব্যাহত থাকায় প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত শান্তি পরিকল্পনার বাস্তবতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ফিলিস্তিনিরা। তাদের অভিযোগ, একদিকে যুদ্ধ বন্ধ ও হামাসের অস্ত্রসংবরণের কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে ইসরাইলি হামলা ও দখলদারত্ব অব্যাহত রয়েছে। গত বছরের যুদ্ধবিরতির পর অন্যতম প্রাণঘাতী দিনে ইসরাইলি হামলায় ১৮ জন নিহত হওয়ার পর গাজাবাসীর মধ্যে এ নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
গত বৃহস্পতিবারকে অক্টোবর মাসে সম্মত গাজা শান্তি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে ‘একটি বড় মাইলফলক’ হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন ট্রাম্প। তিনি বলেছিলেন, হামাস অস্ত্রসংবরণ করবে এবং ইসরাইল ধাপে ধাপে গাজা থেকে সেনা প্রত্যাহার করবে।
তবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের শুরুতেই দেখা দিয়েছে নানা জটিলতা। ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ রবিবার বলেছেন, হামাস অস্ত্রসংবরণ না করা এবং তাদের সুড়ঙ্গ ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত গাজা থেকে ইসরাইলি সেনারা ‘একচুলও’ সরবে না।
অন্যদিকে হামাসের বক্তব্য, ফিলিস্তিনিদের অস্ত্রসংক্রান্ত চুক্তির অংশ বাস্তবায়নের আগে ইসরাইলকে গাজায় হামলা বন্ধ করতে হবে।
যুদ্ধবিরতি তদারকির দায়িত্বে থাকা ট্রাম্পের ‘বোর্ড অব পিস’-এর গাজা বিষয়ক দূত নিকোলাই ম্লাদেনভ সোমবার ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ও অন্যান্য কর্মকর্তার সঙ্গে ‘গঠনমূলক ও বিস্তারিত’ বৈঠক করেছেন বলে জানিয়েছে বোর্ডটি। পরে এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে বোর্ড বলেছে, তাদের লক্ষ্য হলো গাজা উপত্যকা থেকে অস্ত্রের সম্পূর্ণ বিলুপ্তি এবং অস্ত্রনির্ভর শাসনব্যবস্থা থেকে বেসামরিক প্রশাসনে রূপান্তর।
বোর্ডের ভাষ্য, এ লক্ষ্য অর্জন একটি প্রক্রিয়া এবং পরবর্তী ধাপে সেই প্রক্রিয়ার বিস্তারিত নির্ধারণ করা হবে। একই সঙ্গে অক্টোবরের মার্কিন মধ্যস্থতায় হওয়া যুদ্ধবিরতির অধীনে নির্ধারিত সামরিক সীমারেখা, তথা তথাকথিত ‘হলুদ রেখা’র ওপারে ইসরাইলি বাহিনীর পূর্ণ প্রত্যাহার তখনই হবে, যখন হামাস অস্ত্রসংবরণের প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করবে।
এ ক্ষেত্রে হালকা ও ভারী অস্ত্রের পাশাপাশি হামাসের সুড়ঙ্গও অন্তর্ভুক্ত থাকবে বলে জানিয়েছে বোর্ডটি।
আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেছেন, গাজায় যুদ্ধবিরতি ও হামলা বন্ধসহ অন্যান্য সম্মত শর্তের বিষয়টি বাদ দিয়ে বোর্ডের বিবৃতিতে শুধু অস্ত্রসংবরণের ওপর গুরুত্ব দেওয়ায় ফিলিস্তিনি গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ওই কর্মকর্তা জানান, গোষ্ঠীগুলো গত বৃহস্পতিবার সম্মত শর্তগুলোর প্রতি নিজেদের প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে। একই সঙ্গে বোর্ডের সর্বশেষ বিবৃতি নিয়ে তারা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করছে।
অক্টোবরের ৭ তারিখে হামাসের অভিযানকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া প্রায় দুই বছরের যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞে গাজার বিস্তীর্ণ এলাকা এখনো ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। ফিলিস্তিনিদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক ইসরাইলি হামলা যুদ্ধবিরতি ও শান্তি প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনাকেও অনিশ্চিত করে তুলেছে।
চিকিৎসকদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সোমবার গাজা শহরে একটি গাড়িতে ইসরাইলি বিমান হামলায় দুজন নিহত হয়েছেন। এর আগে রবিবার গাজা শহরের একটি অ্যাপার্টমেন্টে ইসরাইলি হামলায় এক দম্পতি ও তাদের সন্তান নিহত হন। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, এসব হামলায় সশস্ত্র ব্যক্তিদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।
ইসরাইলি বাহিনী গাজা উপত্যকার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ ও জনশূন্য করে ফেলেছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে ২০ লাখের বেশি বাসিন্দার প্রায় সবাই উপকূলীয় একটি সংকীর্ণ এলাকায় আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। তাদের বেশিরভাগই অস্থায়ী তাঁবু কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত ভবনে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
৩২ বছর বয়সী আয়া মোহাম্মদ জাকি রয়টার্সকে ফোনে বলেন, ‘মনে হচ্ছিল যুদ্ধ আবার শুরু হয়ে গেছে। প্রতি ঘণ্টায়, কখনো তারও কম সময়ে হামলার শব্দ শোনা যাচ্ছিল। গাজা উপত্যকার উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণ—সব জায়গাতেই যুদ্ধবিমান হামলা চালিয়েছে।’
মধ্যস্থতাকারী দেশ মিশর, কাতার ও তুরস্ক গাজায় অব্যাহত ইসরাইলি হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। এক যৌথ বিবৃতিতে তারা বলেছে, এ ধরনের হামলা চুক্তির স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং এর দ্বিতীয় ধাপ বাস্তবায়নের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
‘উচ্ছেদের অপেক্ষায়’
গত বছরের যুদ্ধবিরতি চুক্তিতে প্রাথমিকভাবে গাজার প্রায় ৫৩ শতাংশ এলাকা ইসরাইলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রাখার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। পরে সেখান থেকে ইসরাইলি সেনা প্রত্যাহারের কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবে ইসরাইল নিয়ন্ত্রিত এলাকার পরিমাণ আরও বাড়িয়েছে।
ইসরাইলের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ রবিবার জানিয়েছেন, সুড়ঙ্গ খোঁজার কার্যক্রমের পাশাপাশি ইসরাইলি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকা ৬০ থেকে ৭০ শতাংশে পৌঁছেছে।
৬০ বছর বয়সী সোমাহ দাওলা জানান, ইসরাইলি বাহিনী সীমানা চিহ্নিত করতে যে হলুদ ইট বসিয়েছে, সেগুলো তার বাড়ির আরও কাছে সরিয়ে আনা হয়েছে। এতে তিনি বুঝতে পারেন, ইসরাইলি নিয়ন্ত্রিত এলাকা তার বাড়ির দিকে আরও সম্প্রসারিত হয়েছে।
দাওলা বলেন, ‘আমরা যেকোনো মুহূর্তে উচ্ছেদের অপেক্ষায় আছি। আমাদের পুরো জীবন শেষ, ভবিষ্যৎ শেষ, আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎও শেষ।’
যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজার অধিকাংশ পরিবারের মতো দাওলার পরিবারও বহুবার বাস্তুচ্যুত হয়েছে। তার চারপাশের ধ্বংসস্তূপ একসময়কার বসতিপূর্ণ গাজা শহরের একটি এলাকার চিত্র তুলে ধরছিল। কাছেই একটি তাঁবুর মেঝেতে তার নাতি-নাতনিরা প্লাস্টিকের খেলনা নিয়ে খেলছিল। স্বামীর সঙ্গে থাকার জন্য ওই তাঁবুকেই অস্থায়ী আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করছেন তিনি।
দাওলা জানান, ট্রাম্পের ঘোষণা শুনে তিনি পরিবর্তনের আশা করেছিলেন। কিন্তু তার ভাষায়, ‘উল্টো ধ্বংস আর উচ্ছেদই বেড়েছে।’
সাতজন স্থানীয় বাসিন্দা রয়টার্সকে জানিয়েছেন, সম্প্রতি ইসরাইলের ‘হলুদ রেখা’ সম্প্রসারণের কারণে গাজা সিটি, দেইর আল-বালাহ ও খান ইউনিসসহ গাজা উপত্যকার অন্তত পাঁচটি এলাকার বাসিন্দাকে নতুন করে ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়েছে।
জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক সমন্বয় কার্যালয় (ওসিএইচএ) গত ২০ জুলাই প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, ইসরাইলি উচ্ছেদ আদেশের কারণে পূর্ব গাজা শহরে ‘হলুদ রেখা’র কাছাকাছি এলাকা থেকে অন্তত ৩০টি পরিবারকে সরে যেতে হয়েছে।
চুক্তি বাস্তবায়নের অন্যতম শর্ত হিসেবে হামাস দাবি করেছে, গত অক্টোবরের যুদ্ধবিরতির পর ইসরাইল যেসব এলাকা দখল করেছে, সেখান থেকে তাদের সেনা প্রত্যাহার করতে হবে।
হামাস ‘অস্ত্রসংবরণ’ শব্দটি প্রত্যাখ্যান করেছে। তবে তারা জানিয়েছে, ইসরাইল অভিযান বন্ধ করে গত বছরের যুদ্ধবিরতি অনুযায়ী সেনা প্রত্যাহার করলে মার্কিন সমর্থিত ফিলিস্তিনি প্রশাসনের অধীনে সংরক্ষণের জন্য তারা তাদের অস্ত্র হস্তান্তর করতে প্রস্তুত।
নেতানিয়াহুর কার্যালয়ের এক মুখপাত্র রয়টার্সকে জানিয়েছেন, অস্ত্রসংবরণ পরিকল্পনা নিয়ে ইসরাইল ওয়াশিংটনের কাছে তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে।
মুখপাত্র ডোরন স্পিলম্যান বলেন, ‘ইসরাইলের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো, হামাস সম্পূর্ণ ও সত্যিকার অর্থে অস্ত্রসংবরণ না করা পর্যন্ত কোনো কিছুই এগিয়ে নেওয়া যাবে না।’
গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষের হিসাবে, অক্টোবরে ট্রাম্প সমর্থিত গাজা শান্তি পরিকল্পনায় সম্মতি দেওয়ার পর থেকে ইসরাইলি হামলায় অন্তত ১ হাজার ২৩০ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। নিহতদের অধিকাংশই বেসামরিক নাগরিক বলে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের হিসাবে, একই সময়ে গাজায় চারজন ইসরাইলি সেনা নিহত হয়েছেন।


