রোহিঙ্গাদের সংকট মোকাবিলা : প্রত্যাবর্তন কি এখনও সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন?

পড়তে ১ মিনিট

ঢাকায় রোহিঙ্গাদের সংকট মোকাবিলা শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক | ছবি : আল উম্মাহ ফাউন্ডেশন

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকায় 'আল-উম্মাহ' ওয়েবসাইট ও জার্নালের উদ্বোধন অনুষ্ঠানের ফাঁকে আমাকে বেশ কিছু সেমিনার ও কর্মসূচিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। তার মধ্যে যেমন শিক্ষাসংক্রান্ত বিষয় ছিল, তেমনি ছিল সামাজিক-রাজনৈতিক বিষয়াদি নিয়ে আলোচনা।

এই ধারাবাহিকতায়, আমি বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের নিয়ে আয়োজিত একটি গোলটেবিল আলোচনায় অংশ নিই। সেমিনারটি আয়োজন করেছিল 'সেন্টার ফর সিভিলিজেশনাল ডায়ালগ' এবং 'বাংলাদেশ ইসলামিক অ্যান্ড সোশ্যাল ট্রাস্ট' (BIIT Trust)। আলোচনার বিষয়বস্তু ছিল: "রোহিঙ্গাদের সংকট মোকাবিলা : প্রত্যাবর্তন কি এখনও সুদূরপ্রসারী স্বপ্ন?"

সত্যি বলতে, রোহিঙ্গা সংকট—কিংবা 'রোহিঙ্গা ট্র্যাজেডি'—ফিলিস্তিনি জনগণের ট্র্যাজেডির মতোই হৃদয়বিদারক রূপ নিয়েছে। এমনকি একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত এটি সিরিয়ার জনগণের ট্র্যাজেডির খুব কাছাকাছি ছিল।

আমি একজন সিরীয় হিসেবে কথা বলছি, আমি জুলুম, হত্যা এবং বাস্তুচ্যুতির ভয়াবহ অভিজ্ঞতা নিজে প্রত্যক্ষ করেছি। বাশার আল-আসাদের স্বৈরাচারী ও সাম্প্রদায়িক শাসনব্যবস্থা প্রায় অর্ধেক সিরীয় জনগণকে বাস্তুচ্যুত হতে বাধ্য করেছিল, যার সংখ্যা ছিল প্রায় ১২ মিলিয়ন (১ কোটি ২০ লাখ) মানুষ। এটি কোনো ছোটখাটো সংখ্যা নয়।

লাখ লাখ সিরীয় তাঁবুতে জীবন কাটিয়েছেন এবং অনেকেই নিজের দেশে ফিরে যাওয়ার আশা হারিয়ে ফেলেছিলেন। এমনকি পতন হওয়া সেই স্বৈরাচারী সরকারের এক শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা বাস্তুচ্যুতদের ক্যামেরার সামনে প্রকাশ্যে হুমকি দিয়ে বলেছিলেন যে, তারা যদি ফিরে আসে, তবে তাদের জন্য ভালো কিছু অপেক্ষা করছে না।

সিরীয়রা যখন কষ্টের চরম শিখরে ছিল, তখন তারা রোহিঙ্গাদের খবর শুনত ও দেখত। আমরা তাদের সংকট মুক্তির জন্য দোয়া করতাম এবং তাদের অবস্থা আমাদের মতো হওয়ায় ব্যথিত হতাম। তবুও, এটা স্পষ্ট ছিল যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর পরিস্থিতি অনেক বেশি কঠিন ও জটিল।

আমি প্রায়ই 'ভৌগোলিক অভিশাপ' ধারণার কথা ভাবি। ইসরাইলি দখলদারিত্ব এবং ইরানের পার্শ্ববর্তী হওয়ার কারণে সিরীয়রা এই অভিশাপের শিকার হয়েছিল। সিরীয়রা অবরোধ, অনাহার এবং বোমাবর্ষণের যাতনা সহ্য করেছে। কিন্তু অন্যদিকে, ভূগোল বা ভৌগোলিক অবস্থান তাদের প্রতি কিছুটা "উদার" ছিল; তাই তারা জর্ডান, লেবানন, তুরস্ক কিংবা সুদূর ইউরোপের মতো প্রতিবেশী দেশগুলোতে পালিয়ে যেতে পেরেছিল। এটা সত্য যে অনেকেই যাত্রাপথে প্রাণ হারিয়েছেন, আর উত্তাল সমুদ্র গ্রাস করেছে হাজারো স্বপ্ন। তবু শেষ পর্যন্ত অনেকে নিরাপদ গন্তব্যে পৌঁছাতে পেরেছিলেন এবং আশ্রয় পাওয়া দেশগুলোর বাস্তবতার সঙ্গে ধীরে ধীরে নিজেদের মানিয়ে নিয়ে তুলনামূলকভাবে স্থিতিশীল জীবন গড়ে তুলতে সক্ষম হন। বিশেষ করে অনেক সিরীয় শরণার্থী নতুন পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিয়ে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও সামাজিক জীবনে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করার উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা দেখিয়েছেন।

কিন্তু সেই ভৌগোলিক অবস্থান রোহিঙ্গাদের প্রতি ততটা উদার ছিল না, যতটা সিরীয়দের প্রতি ছিল। কারণ আরাকান (রাখাইন) রাজ্যটি মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মাঝে আবদ্ধ। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর চালানো জাতিগত নিধন থেকে বাঁচতে পালিয়ে আসা মানুষের জন্য বাংলাদেশ ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না।

বাংলাদেশ নিজের অর্থনৈতিক ও ডেমোগ্রাফিক চ্যালেঞ্জ থাকা সত্ত্বেও এই শরণার্থীদের জন্য নিজের বাহু প্রসারিত করে দিয়েছিল। ইতিহাসে বাংলাদেশের এই ভূমিকা ঠিক সেভাবেই লেখা থাকবে, যেভাবে সিরীয় শরণার্থীদের পাশে দাঁড়ানো জাতিগুলোর ভূমিকা লেখা রয়েছে।

উভয় জনগোষ্ঠীর ট্র্যাজেডির তুলনায় আমরা দেখতে পাই যে, আল্লাহ তাআলা সিরিয়া ও তার জনগণকে বাশার আল-আসাদ ও তার স্বৈরাচারী শাসন থেকে মুক্ত করে স্বস্তি দিয়েছেন এবং সিরীয়রা ধীরে ধীরে তাদের জন্মভূমিতে ফিরতে শুরু করেছে। কিন্তু রোহিঙ্গাদের ক্ষেত্রে নিজেদের দেশে ফেরার স্বপ্ন এখনো অনেক দূরে।

বাস্তবতা হলো, রোহিঙ্গাদের সংকট নিয়ে বাংলাদেশ এক সময় ধাপে ধাপে নিয়ন্ত্রিত নীতি গ্রহণ করেছিল—বিশেষ করে শেখ হাসিনার শাসনের অধীনে (যাকে ২০২৪ সালে এক ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছিল)। তখন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সরকার এই বিষয়ে সোচ্চার থাকলেও, অভ্যন্তরীণভাবে বিষয়টি নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক দিক দিয়েই বেশি নিয়ন্ত্রিত হতো। বাস্তুচ্যুতির দীর্ঘসূত্রতা, আন্তর্জাতিক সাহায্যের ঘাটতি এবং বাড়তে থাকা অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপের মুখে কর্তৃপক্ষ শরণার্থীদের উপস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কড়াকড়ি আরোপ করতে শুরু করে (যেমনটি সিরীয় শরণার্থীদের ক্ষেত্রেও ঘটেছিল)।

আজ বাংলাদেশের জনগণ চায় যে, দেশের নতুন প্রশাসন একটি ভিন্ন পদ্ধতি অবলম্বন করুক—যেখানে মানবিক দিকটিকে প্রাধান্য দেওয়া হবে এবং যা স্বচ্ছতা ও মানবাধিকারের নীতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হবে। কারণ রোহিঙ্গাদের কেবল অর্থনৈতিক বোঝা বা নিরাপত্তা ঝুঁকি হিসেবে দেখা সমস্যার গভীরে পৌঁছায় না; তারা মূলত অত্যাচার ও অধিকার বঞ্চিত হওয়ার শিকার, যারা সহিংসতার হাত থেকে বাঁচতে নিজ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল। তা সত্ত্বেও, ঢাকার রাজনৈতিক পরিবর্তন যতই হোক না কেন, তার প্রভাব সীমিতই থাকবে যতক্ষণ না মূল সংকটের সমাধান মিয়ানমারের অভ্যন্তরে ঘটে—কারণ আসল সমাধানের চাবিকাঠি সেখানেই নিহিত।

প্রত্যাবর্তন কেবল স্বদেশে পৌঁছানোই নয়

সেমিনারে একটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিল: রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবর্তন কি এখনো একটি বাস্তবসম্মত বিকল্প, নাকি এটি অর্জন করা কঠিন এমন এক স্বপ্নে পরিণত হয়েছে?

এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই যে সংখ্যাগরিষ্ঠ রোহিঙ্গাই স্বদেশে ফিরে যেতে চায়। তবে সমস্যাটি 'ফিরে যাওয়ার' নীতিতে নয়, বরং এর প্রকৃতি এবং যে পরিস্থিতির মধ্যে এটি ঘটবে তার ওপর নির্ভর করছে। কারণ মিয়ানমারের ভূখণ্ডে শরণার্থীদের ফিরিয়ে দেওয়ার অর্থ এই নয় যে স্বয়ংকীয়ভাবে তাদের দুর্ভোগের অবসান ঘটবে বা অধিকার পুনরুদ্ধার হবে। পূর্ণ নাগরিকত্বের স্বীকৃতি, আইনি সুরক্ষা নিশ্চিতকরণ, ভূমির মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া এবং বিশেষ করে মানবিক মর্যাদা রক্ষা করা ছাড়া একটি প্রকৃত প্রত্যাবর্তনের কথা ভাবাই যায় না।

অথচ এই শর্তগুলো আজও অনুপস্থিত। রোহিঙ্গারা এখনো পূর্ণ নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত, অন্যদিকে রাখাইন রাজ্যে অস্থিরতা অব্যাহত রয়েছে এবং নিরাপত্তার গ্যারান্টি খুবই অপর্যাপ্ত—কিংবা বলা চলে একেবারেই অনুপস্থিত। তাছাড়া নিরাপত্তা পরিস্থিতি এখন আর কেবল মিয়ানমার সেনাবাহিনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; অঞ্চলে নতুন নতুন সশস্ত্র গোষ্ঠী নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে, যাদের বিরুদ্ধেও রোহিঙ্গাদের ওপর অত্যাচার চালানোর অভিযোগ রয়েছে। ফলে নিরাপদ ও টেকসই উপায়ে তাদের ফিরিয়ে নেওয়ার যেকোনো পরিকল্পনা আরও জটিল হয়ে পড়েছে।

সেমিনারে অনেকেই রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সীমান্ত পার করে নিজ দেশে ফিরিয়ে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছেন। আবার অন্যদিকে অনেকে জরুরি বিষয়গুলোর দিকে নজর দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন যে বিষয়গুলোতে বিলম্ব চলে না—যেমন শরণার্থীদের শিক্ষা, চিকিৎসা সেবা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।

সিরীয় শরণার্থীদের বোঝা অন্তত চারটি দেশ ভাগ করে নিয়েছিল, যাদের সামলানোর ধরণ ও মাত্রা ভিন্ন ছিল। তবে দীর্ঘায়িত যুদ্ধের পর তাদের মধ্যে একটি বিষয়ে মিল ছিল: অর্থনৈতিক বোঝা নিয়ে অভিযোগ এবং সামাজিক সংকটের আশঙ্কা (আমি তাদের অভিযোগের সত্যতা বা মাত্রা নিয়ে আলোচনায় যাব না)। তবে ভাবুন তো, বাংলাদেশের কথা! যে দেশ একা একা পুরো রোহিঙ্গা জাতিগোষ্ঠীর বোঝা বহন করে চলেছে?

এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, বাংলাদেশে প্রদত্ত মানবিক সহায়তা আর যথেষ্ট নয় এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই রোহিঙ্গা শরণার্থী সংকটের এই বোঝা ভাগ করে নিতে হবে। রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য মিয়ানমার সরকারের ওপর কার্যকর কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগ করা অত্যন্ত জরুরি। পাশাপাশি জাতিসংঘ, আসিয়ান (ASEAN), ওআইসি (OIC) এবং অন্যান্য প্রভাবশালী দেশগুলোর মধ্যে শক্তিশালী কূটনৈতিক সমন্বয় গড়ে তুলতে হবে।

বিশ্ব আজ বহু সংকট ও উত্তপ্ত ঘটনাপ্রবাহের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তা সত্ত্বেও রোহিঙ্গা সংকট যেন আন্তর্জাতিক মনোযোগের বাইরে চলে না যায়। কারণ একটি পুরো জাতির কষ্টকে ভুলে যাওয়া বা উপেক্ষা করা কেবল সংকটকে আরও গভীর করবে এবং ট্র্যাজেডিকেই দীর্ঘায়িত করবে।

এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন