মোড় পরিবর্তন: বাংলাদেশের অর্থনীতির কৌশলগত পুর্নবিন্যাস

পড়তে ১ মিনিট

মোড় পরিবর্তন: বাংলাদেশের অর্থনীতির কৌশলগত পুর্নবিন্যাস

বাংলাদেশ ২০২৬ সালে এক জটিল ও দ্বান্দ্বিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের শ্বেতপত্রে (White Paper) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, দেশের অর্থনীতি বর্তমানে কেবল সাময়িক সংকটে নেই, বরং এক গভীর স্ট্রাকচারাল ভালনারেবিলিটি বা কাঠামোগত ভঙ্গুরতার সম্মুখীন। প্রাতিষ্ঠানিক অবক্ষয়, সুশাসনের অভাব এবং ব্যাংকিং খাতের বিশৃঙ্খলা আজ সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও সামাজিক সংহতির জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

  • অর্থনৈতিক বাস্তবতা: হিসাব মেলানোর এক মুহূর্ত

রাজস্ব ভঙ্গুরতা : লাগামহীন বাজেট ঘাটতি এবং অদক্ষ সরকারি বিনিয়োগের ফলে সরকারি ঋণের বোঝা বিপজ্জনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। কর-জিডিপি অনুপাত (tax-to-GOP ratio) স্থবির হয়ে থাকার মূল কারণ হলো সংকীর্ণ স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীকে দেওয়া ঢালাও কর অব্যাহতি এবং ভ্যাট ও কাস্টমস প্রশাসনে ব্যাপক লিকেজ বা রাজস্ব চ্যুতি। বর্তমানে ঋণের কিস্তি (ডেব্ট সার্ভিসিং) মেটাতে গিয়ে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতের ব্যয় সংকুচিত (Crowding out) হচ্ছে।

মূল্যস্ফীতি ও বাহ্যিক ঝুঁকি: মুদ্রার বিনিময় হার সমন্বয় এবং বাজার ব্যবস্থায় মার্কেট কনসেন্ট্রেশন বা সিন্ডিকেটের প্রভাবে মূল্যস্ফীতি এখনো ঊর্ধ্বমুখী। অন্যদিকে, রপ্তানির ক্ষেত্রে একক পণ্যের ওপর অতি-নির্ভরতা এবং রেমিট্যান্সের অস্থিরতা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলছে।

ব্যাংকিং খাতের সিস্টেমিক রিস্ক: আর্থিক খাতের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো নন-পারফর্মিং লোন (NPL) বা খেলাপি ঋণ। রাজনৈতিক প্রভাবে ঋণদান, দুর্বল ক্রেডিট অ্যাপ্রাইজাল এবং নিয়মনীতির শিথিলতা (Regulatory Forbearance) অনেক ব্যাংককে টেকনিক্যালি দেউলিয়া করে দিয়েছে। এছাড়া ক্যাপিটাল ফ্লাইট বা অর্থ পাচার এবং ট্রেড মিস-ইনভয়েসিং বা বাণিজ্যে কারচুপির মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ সঞ্চয় বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে।

  • কেন গ্রোথ মডেল বা প্রবৃদ্ধি কাঠামোর পরিবর্তন জরুরি?

বিগত আমলের প্রবৃদ্ধি মডেল ছিল ক্যাপিটাল-ইনটেনসিভ বা পুঁজি-নিবিড় এবং ডেব্ট-ফিন্যান্সড বা ঋণ-নির্ভর। মেগা প্রকল্পগুলোতে মাত্রাতিরিক্ত ব্যয় এবং লো এমপ্লয়মেন্ট ইলাস্টিসিটি বা কর্মসংস্থান সৃষ্টির নিম্ন হার অর্থনীতির জন্য হিতে বিপরীত হয়েছে। এলডিসি উত্তরণ পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশকে এখন প্রোডাক্টিভিটি-লেড গ্রোথ বা উৎপাদনশীলতা-চালিত প্রবৃদ্ধির দিকে যেতে হবে। আমাদের নতুন লক্ষ্য হতে হবে: “বিফোর কনক্রিট, জবস; বিফোর প্রেস্টিজ, প্রোডাক্টিভিটি।”

  • সংস্কারের কৌশলগত রোডম্যাপ

আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা: কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সুপারভাইজরি ইন্ডিপেন্ডেন্স বা তদারকি স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিলীকরণ বন্ধ করে রিক্যাাপিটালাইজেশন বা পুনঃমূলধনীকরণ প্রক্রিয়ায় কঠোর শর্তারোপ করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদী অর্থায়নের জন্য ব্যাংক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ডোমেস্টিক বন্ড এবং সুকুক মার্কেট সম্প্রসারণ করতে হবে।

কর্মসংস্থান কেন্দ্রিক কৌশল: বছরে ২৫-৩০ লাখ কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে একটি ন্যাশনাল এমপ্লয়মেন্ট স্ট্র্যাটেজি প্রণয়ন করা প্রয়োজন। বিশেষ করে এগ্রো-প্রসেসিং, লাইট ম্যানুফ্যাকচারিং, ফার্মাসিউটিক্যালস এবং ডিজিটাল সার্ভিসের মতো উচ্চ উৎপাদনশীল খাতগুলোকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (ঝগঊ) জন্য সহজ শর্তে ঋণ এবং বিশেষ ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্লাস্টার তৈরি করতে হবে।

ক্লাইমেট রেজিলিয়েন্স ও গ্রিন ফিন্যান্স: জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় গ্রিন সুকুক, ব্লেন্ডেড ফিন্যান্স এবং মিউনিসিপ্যাল বন্ডের মতো আধুনিক আর্থিক হাতিয়ার ব্যবহার করে টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। ব্যাংকিং তদারকিতে ক্লাইমেট স্ট্রেস টেস্টিং অন্তর্ভুক্ত করা জরুরি।

ইসলামিক সোশ্যাল ফিন্যান্সের ভূমিকা: জাকাত, পেশাদার ওয়াকফ ব্যবস্থাপনা এবং কর্জ-এ-হাসানা তহবিলের মতো নৈতিক আর্থিক হাতিয়ারগুলো সরকারের রাজস্ব সক্ষমতার পরিপূরক হতে পারে। স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ খাত থেকে বছরে ১৫০-২০০ বিলিয়ন টাকা সংগ্রহ করে শিক্ষা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা উন্নয়নে ব্যয় করা সম্ভব।

  • সংস্কারের পর্যায়ক্রমিক ধাপ (Sequencing of Reforms)

  • প্রথম পর্যায় (২০২৬-২০২৭): ব্যাংকিং খাতের সংস্কার (ঈষবধহঁঢ়), মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং দুর্নীতিবিরোধী কঠোর পদক্ষেপের মাধ্যমে সরকারের সক্ষমতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা পুনর্গঠন।

  • দ্বিতীয় পর্যায় (২০২৮-২০৩১): এসএমই ফিন্যান্সিং স্কেল-আপ করা, ইন্ডাস্ট্রিয়াল ক্লাস্টার স্থাপন এবং জলবায়ু-সহনশীল অবকাঠামো নির্মাণ।

  • তৃতীয় পর্যায় (২০৩২-২০৩৬): দক্ষ মানবসম্পদ ও বৈচিত্র্যময় রপ্তানি খাতের মাধ্যমে বাংলাদেশকে একটি ইথিক্যাল ফিন্যান্স এবং গ্রিন ইনভেস্টমেন্ট হাবে রূপান্তর করা।

উপসংহার

বাংলাদেশের সামনে সুযোগের জানালা খুবই ছোট। শ্বেতপত্র (২০২৪) আমাদের সিস্টেমিক ব্যর্থতার এক নির্মোহ রোগ নির্ণয় করেছে। এখন প্রয়োজন টেকসই এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধির দিকে কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তন করা। যদি আমরা দৃঢ় নেতৃত্বের মাধ্যমে আর্থিক স্বচ্ছতা, সুশাসন এবং নৈতিক অর্থায়নকে অগ্রাধিকার দিতে পারি, তবেই বাংলাদেশ ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ কাজে লাগিয়ে একটি উচ্চ-আয়ের দেশে পরিণত হতে পারবে। অন্যথায় বৈষম্য ও ভঙ্গুরতার মিডল-ইনকাম ট্র্যাপে (মধ্যম আয়ের ফাঁদ) পড়ার ঝুঁকি থেকেই যাবে। #



এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন