বিকল্প মাইক্রোফাইন্যান্স : সর্বাধিক মুনাফা অর্জনের লক্ষ্য থেকে সামাজিক দায়বদ্ধতার প্রেরণা
মদিনার আদর্শে অনুপ্রাণিত সামাজিক দায়বদ্ধতাভিত্তিক সুদমুক্ত মাইক্রোফাইন্যান্স প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিপূরক হতে পারে।
মানবিকতা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অভূতপূর্ব অগ্রগতি সত্ত্বেও দারিদ্র্য আজও মানবজাতির অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এমন এক সময়ে, যখন নজিরবিহীন পরিমাণ সম্পদ অল্পসংখ্যক ধনী ও বিলিয়নিয়ারের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়েছে—এমনকি বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ারেরও আবির্ভাব ঘটেছে—তখনও কোটি কোটি মানুষ খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা এবং মানসম্মত আবাসনের মতো মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত।
এই বৈপরীত্য অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও মানবিকভাবে অপমানজনক। অত্যাধুনিক অস্ত্র উৎপাদন ও ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ পরিচালনার জন্য বিপুল অর্থ সহজেই বরাদ্দ করা হয়; কিন্তু দারিদ্র্য দূরীকরণ এবং মানুষের কল্যাণে সেই তুলনায় অনেক কম সম্পদ ব্যবহৃত হয়।
গত কয়েক দশকে সরকার, আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলো দারিদ্র্য বিমোচনে বিপুল বিনিয়োগ করেছে। ক্ষুদ্রঋণ বা মাইক্রোফাইন্যান্সকে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের একটি কার্যকর মাধ্যম হিসেবে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়েছে। তবুও বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ এখনও দারিদ্র্য, ঋণের বোঝা এবং অর্থনৈতিক অনিরাপত্তার মধ্যে জীবনযাপন করছে। তাই একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—মাইক্রোফাইন্যান্স কি প্রধানত মুনাফাভিত্তিক থাকবে, নাকি সামাজিক দায়বদ্ধতার ভিত্তিতে নতুনভাবে পুনর্গঠিত হবে?
প্রচলিত অনেক মাইক্রোফাইন্যান্স প্রতিষ্ঠান দরিদ্র গ্রাহকদের থেকে ২০ শতাংশেরও বেশি হারে সুদ আদায় করে। কিন্তু ঐতিহ্যগত ফ্ল্যাট-রেট পদ্ধতিতে ঋণ পরিশোধের ফলে কার্যত ঋণগ্রহীতাদের বার্ষিক ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ বা তারও বেশি হারে সুদ পরিশোধ করতে হয়। সীমিত আয়ের দরিদ্র পরিবারের জন্য এটি এক বিরাট আর্থিক বোঝা এবং অমানবিক ব্যবস্থা।
অপরদিকে, যদি ঋণগ্রহীতাদের কেবল মূলধনটি কিস্তিতে পরিশোধ করতে হতো এবং কোনো সুদ দিতে না হতো, তাহলে তাদের জন্য ঋণ পরিশোধ অনেক সহজ হতো। স্বাভাবিকভাবেই কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে—সুদমুক্ত ঋণব্যবস্থা কি সম্ভব? এটি কি টেকসই হতে পারে? মুনাফা না হলে অর্থায়ন করবে কে?
এই প্রশ্নগুলোর উত্তর নির্ভর করে আমরা সম্পদ এবং মানবজীবনের সাফল্যকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করি তার ওপর।
মানুষ কেবল অর্থনৈতিক সত্তা নয়, যার একমাত্র লক্ষ্য আর্থিক মুনাফা সর্বাধিক করা। মানুষ একই সঙ্গে সমাজের সদস্য, যার সহমানুষের প্রতি দায়িত্ব রয়েছে। প্রকৃত সাফল্যের পরিমাপ শুধু কত সম্পদ অর্জন করা হয়েছে তা নয়; বরং সেই সম্পদ সমাজের কল্যাণে কতটা অবদান রেখেছে, সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
দরিদ্র মানুষকে দারিদ্র্য থেকে মুক্ত করতে সহায়তা করার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত তাদের মর্যাদা রক্ষা করা, তাদের অসহায়ত্ব থেকে মুনাফা অর্জন করা নয়। দরিদ্র হওয়ার কারণেই কেন একজন মানুষকে ধার নেওয়া অর্থের চেয়ে বেশি অর্থ ফেরত দিতে হবে? একটি প্রকৃত সমৃদ্ধ সমাজ হলো সেই সমাজ, যেখানে সম্পদ সীমিত কয়েকজনের হাতে কেন্দ্রীভূত না হয়ে সমাজের সর্বস্তরে সঞ্চালিত হয়।
মূল দার্শনিক প্রশ্নটি অত্যন্ত সহজ—আমাদের পরিবার, প্রতিবেশী এবং সমাজের মানুষ যদি কষ্টে থাকে, তাহলে শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সমৃদ্ধি কি প্রকৃত সুখ এনে দিতে পারে?
যে সমাজে সাফল্য কেবল অর্থের অঙ্কে পরিমাপ করা হয়, সেখানে সুদমুক্ত মাইক্রোফাইন্যান্স অবাস্তব বলে মনে হতে পারে। কিন্তু যেখানে মানুষ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি সামাজিক দায়িত্বও স্বীকার করে, সেখানে এ ধরনের ব্যবস্থা সম্পূর্ণ বাস্তবসম্মত।
বাংলাদেশকে আধুনিক মাইক্রোফাইন্যান্সের জন্মভূমি হিসেবে বিশ্বব্যাপী স্বীকৃতি দেওয়া হয়। কিন্তু অসংখ্য ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠান থাকা সত্ত্বেও এদেশের দারিদ্র্য নির্মূল করা এখনও সম্ভব হয়নি। এর অন্যতম কারণ হলো প্রচলিত মাইক্রোফাইন্যান্স মূলত এমন একটি ব্যবসায়িক কাঠামোর মধ্যে পরিচালিত হয়, যেখানে বিনিয়োগকৃত মূলধন থেকে সর্বাধিক আর্থিক মুনাফা অর্জনই প্রধান লক্ষ্য। দারিদ্র্য বিমোচনকে উদ্দেশ্য হিসেবে তুলে ধরা হলেও, বাস্তবে মুনাফা অর্জনই পরিচালনাগত প্রধান চালিকাশক্তি।
ঐতিহ্যগত গ্রুপ-ভিত্তিক ঋণব্যবস্থা পারস্পরিক দায়বদ্ধতার মাধ্যমে ঋণ আদায়ের হার বাড়াতে সফল হয়েছে। কিন্তু এর মৌলিক আর্থিক কাঠামো এখনও দেশের সবচেয়ে অসহায় জনগোষ্ঠীর কাছ থেকেই সুদ আদায়ের ওপর নির্ভরশীল।
প্রচলিত অর্থনৈতিক চিন্তাধারার একটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো মানুষকে শুধু অর্থনৈতিক সত্তা হিসেবে দেখা। অথচ মানুষ একই সঙ্গে সামাজিক সত্তা, যার সমাজের প্রতি নৈতিক দায়িত্ব রয়েছে। আধুনিক শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থা মানুষকে বিনিয়োগের সর্বোচ্চ মুনাফা অর্জনের শিক্ষা দেয়, কিন্তু সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ে তোলার ওপর তুলনামূলকভাবে খুব কম গুরুত্ব দেয়।
এর ফলে সমাজ ক্রমেই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে এবং বিত্তবানদের মধ্যে অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রেরণা কমে যায়। তাই অর্থনৈতিক কল্যাণের পাশাপাশি সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করাও অপরিহার্য। অর্থনৈতিক সাফল্য পরিবারকে স্বাচ্ছন্দ্য দেয়, আর সামাজিক দায়িত্ব সমাজে সম্প্রীতি, মানবিক বন্ধন এবং স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করে।
ইসলাম সামাজিক ন্যায়বিচার, সম্পদের ন্যায্য বণ্টন এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষার মাধ্যমে এই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠার একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো প্রদান করে। ইসলামের দৃষ্টিতে মানুষের সম্পদ তার চূড়ান্ত মালিকানা নয়; বরং আল্লাহ্ (সুবহানাহু ওয়া তা'আলা) প্রদত্ত একটি আমানত, যা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য মানুষের কাছে ন্যস্ত থাকে।
যাকাত, উশর, ওয়াক্ফ, কারদে হাসান (সুদমুক্ত ঋণ), সদকা এবং সুদমুক্ত নৈতিক ব্যবসা—এসব ইসলামী আর্থিক ব্যবস্থা দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক সুরক্ষা এবং টেকসই সমাজ গঠনের কার্যকর উপায়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে এগুলোকে প্রায়শই কেবল ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখা হয়; অথচ এগুলোর মধ্যে দারিদ্র্য দূরীকরণের শক্তিশালী অর্থনৈতিক সম্ভাবনা নিহিত রয়েছে।
ইতিহাস এ বিষয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক উদাহরণ প্রদান করে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবদ্দশায় এবং খুলাফায়ে রাশেদীনের আমলে এসব নীতি সামাজিক কল্যাণের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। বিশেষ করে খলিফা উমর ইবন আবদুল আজিজ (রহ.)-এর শাসনামলে দারিদ্র্য এতটাই কমে গিয়েছিল যে, যাকাত গ্রহণের উপযুক্ত মানুষ খুঁজে পাওয়াই কঠিন হয়ে পড়েছিল বলে ঐতিহাসিক সূত্রে উল্লেখ রয়েছে। যদিও বর্তমান সময়ের বাস্তবতা ভিন্ন, তবুও এই অভিজ্ঞতা আজও ন্যায়ভিত্তিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার জন্য অনুপ্রেরণা হয়ে আছে।
ইসলামী আর্থিক ব্যবস্থার অন্যতম শক্তিশালী উপকরণ কারদে হাসান বা কল্যাণমূলক সুদমুক্ত ঋণ বাংলাদেশে আরও বৃহত্তর প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।
এই ব্যবস্থায় ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান একটি তহবিলে অর্থ প্রদান করবে, যেখান থেকে দরিদ্র মানুষ সুদমুক্ত ঋণ গ্রহণ করবে। ঋণগ্রহীতা কেবল মূলধন কিস্তিতে পরিশোধ করবে। প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক ব্যয় দাতারা পৃথকভাবে বহন করবেন—সাধারণত মূল অনুদানের অতিরিক্ত প্রায় ৮ থেকে ১০ শতাংশ প্রদান করে—ফলে ঋণগ্রহীতাকে কোনো প্রশাসনিক ব্যয় বা সুদ পরিশোধ করতে হবে না।
বিকল্পভাবে, দাতারা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য ফেরতযোগ্য তহবিলও প্রদান করতে পারেন এবং সেই সঙ্গে প্রশাসনিক ব্যয় বহন করতে পারেন। ঋণ পরিশোধের পর মূলধন পুনরায় নতুন ঋণগ্রহীতাদের জন্য ব্যবহার করা যাবে, ফলে একটি টেকসই ঘূর্ণায়মান তহবিল (Revolving Fund) গড়ে উঠবে, যা ধারাবাহিকভাবে সুবিধাবঞ্চিত মানুষের কল্যাণে কাজ করবে।
বাংলাদেশে ইতোমধ্যে সীমিত পরিসরে এ ধরনের উদ্যোগ রয়েছে। তবে জাতীয় পর্যায়ে কারদে হাসান বাস্তবায়নের জন্য এখনও একটি বিশ্বাসযোগ্য, স্বচ্ছ এবং পেশাদারভাবে পরিচালিত প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি।
মদিনার আদর্শে অনুপ্রাণিত সামাজিক দায়বদ্ধতাভিত্তিক সুদমুক্ত মাইক্রোফাইন্যান্স প্রচলিত ক্ষুদ্রঋণ ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিপূরক হতে পারে। এটি বিদ্যমান আর্থিক ব্যবস্থার বিকল্প নয়; বরং সহমর্মিতা, পারস্পরিক দায়িত্ববোধ এবং মানবিক মর্যাদার ভিত্তিতে গড়ে ওঠা একটি নতুন পথ।
বাংলাদেশের রয়েছে প্রয়োজনীয় আর্থিক সামর্থ্য, ধর্মীয় ঐতিহ্য এবং সামাজিক ভিত্তি। এখন প্রয়োজন দূরদর্শী নেতৃত্ব, জনআস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সততা। এই তিনটি উপাদান একত্রিত করা গেলে, একটি সুসংগঠিত কারদে হাসান ব্যবস্থা লক্ষ লক্ষ সুবিধাবঞ্চিত মানুষের জীবনমান উন্নত করতে পারে এবং প্রমাণ করতে পারে যে দারিদ্র্য বিমোচনের চালিকাশক্তি শুধু মুনাফা নয়—সামাজিক দায়বদ্ধতাও হতে পারে।
লেখক : এমেরিটাস অধ্যাপক ড. শাহজাহান খান, ওএএম
ইউনিভার্সিটি অব সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া।
সাবেক উপাচার্য, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ঢাকা; এবং প্রবাসী ফেলো, বাংলাদেশ বিজ্ঞান একাডেমি।


