বঙ্গোপসাগরের নীল জলসীমা: ২০১৪-এর রায় ও বাংলাদেশের হারানো অধিকার

পড়তে ১ মিনিট

বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্য সমুদ্রসীমা বিরোধ (২০১৪) | ছবি : সংগৃহীত


বঙ্গোপসাগরের মানচিত্রে একটি রেখা টানা হয়েছিল ২০১৪ সালের ৭ জুলাই। কাগজে সেটি ছিল একটি আন্তর্জাতিক সালিশি ট্রাইব্যুনালের রায়। কিন্তু বাংলাদেশের জন্য সেই রেখার অর্থ শুধু একটি সীমারেখা নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সার্বভৌমত্ব, জাতীয় নিরাপত্তা, মৎস্যসম্পদ, জ্বালানি, নীল অর্থনীতি, কৌশলগত গভীরতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সম্পদের প্রশ্ন।

ভারত-বাংলাদেশ সমুদ্রসীমা বিরোধের চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়েছিল নেদারল্যান্ডসের হেগে জাতিসঙ্ঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক কনভেনশন—UNCLOS-এর অধীনে গঠিত সালিশি ট্রাইব্যুনালে। রায়টি বাংলাদেশের জন্য একেবারে পরাজয়ের ছিল না; বরং বিতর্কিত ২৫,৬০২ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রাঞ্চলের মধ্যে বাংলাদেশ পেয়েছিল ১৯,৪৬৭ বর্গকিলোমিটার। ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশের ২০০ নটিক্যাল মাইলের এক্সক্লুসিভ ইকোনমিক জোন এবং ২০০ নটিক্যাল মাইলের বাইরে মহীসোপানে অধিকারও নিশ্চিত করে।
তাহলে প্রশ্নটি অন্য জায়গায়।
বাংলাদেশ কি তার সর্বোচ্চ সম্ভাব্য জাতীয় স্বার্থ আদায় করতে পেরেছিল?
আরও বড় প্রশ্ন—এই মামলার আগে এবং পরে বাংলাদেশ কি কখনো একটি পূর্ণাঙ্গ জাতীয় সামুদ্রিক কৌশল তৈরি করেছে?
আজ, এক যুগ পর, সেই প্রশ্নগুলো নতুন করে সামনে আনা দরকার।

তালপট্টি থেকে সমুদ্রসীমা

বাংলাদেশ-ভারত সামুদ্রিক বিরোধের ইতিহাস ২০১৪ সালে শুরু হয়নি। স্বাধীনতার পর থেকেই সুন্দরবনের দক্ষিণ প্রান্ত, হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মোহনা এবং বঙ্গোপসাগরের সংশ্লিষ্ট জলসীমা নিয়ে দুই দেশের মধ্যে বিরোধ ছিল।
এই ইতিহাসে দক্ষিণ তালপট্টি—ভারতে যা নিউ মুর আইল্যান্ড নামে পরিচিত—একটি বিশেষ প্রতীকী স্থান দখল করে আছে। দ্বীপটির অস্তিত্বই পরে প্রাকৃতিক ক্ষয় ও সমুদ্রের পরিবর্তনের কারণে বিলীন হয়ে যায়। ফলে আজ তালপট্টিকে ঘিরে যে রাজনৈতিক ভাষ্য তৈরি করা হয়, তার সঙ্গে বাস্তব ভূগোলের পার্থক্য বোঝা জরুরি। গবেষণামূলক নথিতেও উল্লেখ আছে যে দ্বীপটি বহু আগেই সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়েছিল।
কিন্তু একটি দ্বীপ বিলীন হয়ে গেলেই তার সঙ্গে সম্পর্কিত সামুদ্রিক ভূরাজনীতি বিলীন হয় না।
বরং তালপট্টির ইতিহাস দেখিয়ে দেয়—বঙ্গোপসাগরের প্রতিটি নদীমোহনা, দ্বীপ, চর, উপকূলীয় রেখা এবং সমুদ্রের প্রবাহের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় অধিকার কীভাবে যুক্ত হয়ে যায়।
১৯৪৭ সালের র‍্যাডক্লিফ অ্যাওয়ার্ডে পূর্ব পাকিস্তান ও ভারতের সীমারেখা নির্ধারণের সময় খুলনা ও ২৪ পরগনার সীমা দক্ষিণে গিয়ে বঙ্গোপসাগরে মিলিত হওয়ার কথা বলা হয়েছিল। ১৯২৫ সালের একটি নোটিফিকেশনও হাড়িয়াভাঙ্গা, রাইমঙ্গলসহ সংশ্লিষ্ট নদীগুলোর মধ্যস্রোতকে সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ করেছিল। ২০১৪ সালের ট্রাইব্যুনালকে শেষ পর্যন্ত এই ঐতিহাসিক দলিলগুলোর ব্যাখ্যা করে স্থলসীমার শেষ বিন্দু নির্ধারণ করতে হয়েছিল।

ট্রাইব্যুনাল সেই বিন্দুর স্থান নির্ধারণ করে ২১°৩৮′৪০.২″ উত্তর অক্ষাংশ এবং ৮৯°০৯′২০″ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে। এরপর সেখান থেকে সমুদ্রসীমা নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু হয়।
এটি নিছক মানচিত্রের হিসাব ছিল না। এই একটি বিন্দু এবং সেখান থেকে অগ্রসর হওয়া রেখার ওপর নির্ভর করছিল বিপুল সমুদ্রাঞ্চলের অধিকার।

বাংলাদেশের ‘হার’—নাকি অসম্পূর্ণ বিজয়?

২০১৪ সালের রায় নিয়ে বাংলাদেশে দুটি বিপরীত রাজনৈতিক বয়ান তৈরি হয়েছিল।
এক পক্ষ বলেছিল—এটি বাংলাদেশের ঐতিহাসিক বিজয়।
অন্য পক্ষ বলেছিল—বাংলাদেশ তার ন্যায্য সমুদ্রাঞ্চলের একটি বড় অংশ হারিয়েছে এবং ভারত লাভবান হয়েছে।
দুটির কোনোটিকেই একক সত্য হিসেবে গ্রহণ করা ঠিক হবে না।
কারণ সংখ্যার বিচারে বাংলাদেশ বিতর্কিত ২৫,৬০২ বর্গকিলোমিটারের প্রায় ৭৬ শতাংশ (১৯,৪৬৭ বর্গকিলোমিটার) পেয়েছিল। ট্রাইব্যুনালের রায় দুই দেশের জন্যই বাধ্যতামূলক ছিল এবং আপিলের সাধারণ সুযোগ ছিল না।

সুতরাং ‘বাংলাদেশ সব হারিয়েছে’ বলা যেমন ভুল, তেমনি ‘বাংলাদেশ সব জিতে গেছে’ বলাও অতিরঞ্জন।

আসল প্রশ্ন হলো—বাংলাদেশ যে ১৯,৪৬৭ বর্গকিলোমিটার পেয়েছে, তার মূল্য কত? আর যে অঞ্চলটি পায়নি, তার কৌশলগত ও অর্থনৈতিক গুরুত্ব কতটা?
এবং তার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ—মামলাটি পরিচালনার কৌশল, প্রমাণ, সমুদ্রবিজ্ঞান, ঐতিহাসিক মানচিত্র এবং আন্তর্জাতিক আইনগত প্রস্তুতি নিয়ে বাংলাদেশ কতটা সন্তুষ্ট হওয়া উচিত?

‘তিন ভারতীয় বিচারক’—একটি ভুল ধারণা

২০১৪ সালের রায় নিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় একটি অভিযোগ প্রায়ই শোনা যায়—ট্রাইব্যুনালে ভারতের তিনজন বিচারক ছিলেন এবং বাংলাদেশ কোনো বিচারক দিতে পারেনি। কিন্তু এই বক্তব্যকে বিচারব্যবস্থার কাঠামোর সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক সালিশি ট্রাইব্যুনালের সদস্যরা রাষ্ট্রের প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন না। তারা আন্তর্জাতিক আইন প্রয়োগ করে বিরোধ নিষ্পত্তি করেন। ২০১৪ সালের পাঁচ সদস্যের ট্রাইব্যুনালে ভারতীয় সালিশকার ড. পি. এস. রাও আংশিক ভিন্নমত পোষণ করেছিলেন; অন্যদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ চারজন নির্ধারিত সিদ্ধান্তে পৌঁছান।

অতএব ‘ভারতের তিন বিচারক থাকায় বাংলাদেশ হেরে গেছে’—এই সরল ব্যাখ্যা আইনগতভাবে টেকসই নয়।
কিন্তু এখানেই বাংলাদেশের জন্য আরও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক আদালতে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে হলে রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, প্রমাণের শক্তি প্রয়োজন।
প্রয়োজন আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন বিশেষজ্ঞ, হাইড্রোগ্রাফার, সমুদ্রবিজ্ঞানী, ভূগোলবিদ, নৌ-কৌশলবিদ, ইতিহাসবিদ, মানচিত্রবিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবীদের সমন্বিত দল।
প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এই সমন্বিত সক্ষমতাকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলেছিল?

হাড়িয়াভাঙ্গার মধ্যস্রোত: একটি রেখার পেছনে যে ভূরাজনীতি

২০১৪ সালের মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল স্থলসীমার শেষ বিন্দু কোথায় হবে। বাংলাদেশ ও ভারত র‍্যাডক্লিফ অ্যাওয়ার্ড এবং ১৯২৫ সালের নোটিফিকেশনের ব্যাখ্যায় ভিন্ন অবস্থান নিয়েছিল।
ট্রাইব্যুনাল সিদ্ধান্ত নেয় যে ১৯৪৭ সালে হাড়িয়াভাঙ্গা নদীর মূল চ্যানেলের মধ্যস্রোতকে ভিত্তি ধরে land boundary terminus নির্ধারণ করতে হবে। এরপর ওই বিন্দু থেকে ১২ নটিক্যাল মাইলের একটি রেখা নির্ধারণ করা হয় এবং পরবর্তী পর্যায়ে সমুদ্রসীমা নির্ধারণ করা হয়।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রয়েছে।
রাষ্ট্রের সমুদ্রসীমা আসলে সমুদ্র থেকে শুরু হয় না; তার ইতিহাস শুরু হয় স্থলসীমা, নদী, পুরনো মানচিত্র, ঔপনিবেশিক প্রশাসনিক নথি এবং বহু দশকের ভূগোল থেকে।
বাংলাদেশ যদি ভবিষ্যতে বঙ্গোপসাগর নিয়ে কোনো নতুন দাবি, পুনর্মূল্যায়ন কিংবা সমুদ্রসম্পদ ব্যবস্থাপনার কৌশল গ্রহণ করতে চায়, তাহলে এই ঐতিহাসিক দলিলভাণ্ডারকে ডিজিটাল ও বৈজ্ঞানিকভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।

শেখ হাসিনা সরকারের রাজনৈতিক বয়ান

২০১৪ সালের রায়ের পর শেখ হাসিনা সরকার এটিকে বড় ধরনের কূটনৈতিক সাফল্য হিসেবে উপস্থাপন করেছিল। এমনকি শেখ হাসিনা বলেছিলেন, ৫ জানুয়ারির নির্বাচন না হলে এই সমুদ্রসীমার বিজয় সম্ভব হতো না।
এখানেই রাজনৈতিক প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি সরকারের রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে। কিন্তু কোনো আন্তর্জাতিক আদালতের রায়কে শুধু সেই সরকারের রাজনৈতিক বৈধতার প্রশ্ন দিয়ে মূল্যায়ন করলে বাস্তব আইনি ফলাফল আড়াল হয়ে যায়।
আবার উল্টো দিকটিও সত্য। সরকার যদি কোনো আন্তর্জাতিক রায়কে নিজের রাজনৈতিক কৃতিত্ব হিসেবে তুলে ধরে, তাহলে জনগণের অধিকারও থাকে জানতে—মামলাটি কীভাবে প্রস্তুত হয়েছিল, কী দাবি করা হয়েছিল, কোন প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়েছিল এবং কোন দাবিগুলো শেষ পর্যন্ত গৃহীত হয়নি।
সমুদ্রসীমার মতো জাতীয় সম্পদের প্রশ্নে কোনো সরকারের কৃতিত্ব বা ব্যর্থতা—দুটিই নথিভিত্তিকভাবে যাচাই হওয়া উচিত।

সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা কি রায়ে, নাকি রায়ের পর?

আমার বিবেচনায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি ২০১৪ সালের রায় নয়; বরং রায়ের পর বাংলাদেশ কী করেছে।
বাংলাদেশ দুই দফায় আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রক্রিয়ায় বড় সমুদ্রাঞ্চলের অধিকার নিশ্চিত করেছে—মিয়ানমারের সঙ্গে ২০১২ সালে এবং ভারতের সঙ্গে ২০১৪ সালে। এর ফলে বাংলাদেশের সামুদ্রিক এলাকা, ২০০ নটিক্যাল মাইলের EEZ (Exclusive Economic Zone) এবং মহীসোপানের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠার পথ উন্মুক্ত হয়েছে। বিভিন্ন সরকারি ও গবেষণা নথিতে এই অর্জনের পরিমাণ প্রায় ১,১৮,৮১৩ বর্গকিলোমিটার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তাহলে আজ প্রশ্ন হওয়া উচিত— এই বিশাল সমুদ্র কোথায়? এর সম্পদ কোথায়? বাংলাদেশের গভীর সমুদ্র মৎস্যনীতি কোথায়? অফশোর গ্যাস অনুসন্ধানের অগ্রগতি কোথায়? সামুদ্রিক খনিজসম্পদের গবেষণা কোথায়? গভীর সমুদ্রবন্দর, সাবমেরিন অবকাঠামো এবং সমুদ্রনিরাপত্তার সমন্বিত পরিকল্পনা কোথায়?

রায় পাওয়া যদি প্রথম বিজয় হয়, তাহলে সেই সমুদ্রকে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত শক্তিতে রূপান্তর করাই দ্বিতীয় বিজয়। এই দ্বিতীয় পর্যায়ে বাংলাদেশ এখনো অনেক পিছিয়ে।

বঙ্গোপসাগর এখন ভারত মহাসাগরীয় প্রতিযোগিতার কেন্দ্র

আজকের বঙ্গোপসাগর ২০১৪ সালের বঙ্গোপসাগর নয়। ভারত তার পূর্ব উপকূল, আন্দামান-নিকোবর এবং বঙ্গোপসাগরকে কেন্দ্র করে নিজস্ব সামুদ্রিক কৌশল শক্তিশালী করছে। চীন কৌশলগতভাবে ভারত মহাসাগরে তার উপস্থিতি বাড়িয়েছে। মিয়ানমারের উপকূল, রাখাইন, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম ও বঙ্গোপসাগর—সবকিছু বৃহত্তর ইন্দো-প্যাসিফিক ভূরাজনীতির অংশ হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের অবস্থান এই প্রতিযোগিতার মাঝখানে। চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দর, মাতারবাড়ী, কক্সবাজার, গভীর সমুদ্রের সম্ভাব্য সম্পদ এবং বঙ্গোপসাগরের সমুদ্রপথ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক রাষ্ট্রে পরিণত হতে পারে।

কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন ‘land-centric’ রাষ্ট্রচিন্তা থেকে ‘maritime state’ হিসেবে নিজেকে পুনর্গঠন করা।

ভারতের সঙ্গে বিরোধ নয়, সক্ষমতার প্রতিযোগিতা

বাংলাদেশের সমুদ্রনীতি ভারতের বিরুদ্ধে হতে হবে—এমন নয়। বরং ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রেখেও বাংলাদেশকে নিজের সামুদ্রিক অধিকার সম্পর্কে দৃঢ় হতে হবে।
বন্ধুত্বের অর্থ অধিকার বিসর্জন নয়। আবার অধিকার রক্ষার অর্থও সংঘাত নয়।
আন্তর্জাতিক আইন, কূটনীতি, বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতা—এই চার স্তম্ভের ওপর বাংলাদেশের সামুদ্রিক নীতি দাঁড় করাতে হবে।
ভারত তার জাতীয় স্বার্থ দেখবে। চীন তার স্বার্থ দেখবে। যুক্তরাষ্ট্র তার স্বার্থ দেখবে। জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ইউরোপ—সবাই বঙ্গোপসাগরকে নিজেদের বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে দেখবে। বাংলাদেশ কেন দেখবে না?

২০১৪ সালের রায় বাতিল—বাস্তবসম্মত দাবি কি?

এখানে আবেগের বদলে আন্তর্জাতিক আইনকে সামনে রাখতে হবে। ২০১৪ সালের সালিশি রায় চূড়ান্ত ও বাধ্যতামূলক। তাই রাজনৈতিকভাবে ‘রায় বাতিল’ ঘোষণা করা সহজ; কিন্তু আন্তর্জাতিক আইনে সেটি কার্যকর করা অত্যন্ত কঠিন। বাংলাদেশের উচিত বরং একটি National Maritime Boundary Review শুরু করা।
২০১৪ সালের সম্পূর্ণ রায়, বাংলাদেশের লিখিত ও মৌখিক উপস্থাপন, বিশেষজ্ঞ প্রতিবেদন, মানচিত্র, hydrographic data, ঐতিহাসিক নথি এবং ট্রাইব্যুনালের যুক্তি—সবকিছু স্বাধীন বিশেষজ্ঞদের দিয়ে পুনর্মূল্যায়ন করা হোক। কোনো আইনগত বা প্রক্রিয়াগত গুরুতর ত্রুটি পাওয়া গেলে আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় সম্ভাব্য পথ খুঁজে দেখা যেতে পারে।
কিন্তু ফলাফল পূর্বনির্ধারিত হওয়া উচিত নয়। উদ্দেশ্য হবে সত্য জানা—যে সত্য বাংলাদেশের পক্ষে হলে তাকে প্রতিষ্ঠা করা, আর বিপক্ষে হলে তা মেনে নিয়ে ভবিষ্যতের জন্য শিক্ষা নেওয়া।

এবার প্রয়োজন বাংলাদেশের ‘মেরিটাইম ডকট্রিন’

বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি জাতীয় মেরিটাইম ডকট্রিন (Maritime Doctrine).
এর মধ্যে থাকতে হবে—
১. সমুদ্রসীমার সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা;
২. EEZ (Exclusive Economic Zone) ব্যবস্থাপনা;
৩. গভীর সমুদ্র মৎস্যসম্পদ;
৪. অফশোর তেল-গ্যাস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি;
৫. সমুদ্রবন্দর ও সামুদ্রিক যোগাযোগ;
৬. নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ডের সক্ষমতা;
৭. সামুদ্রিক গবেষণা;
৮. সুনীল অর্থনীতি (Blue Economy);
৯. সামুদ্রিক পরিবেশ সংরক্ষণ;
১০. ভারত, মিয়ানমার, চীন এবং অন্যান্য শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি। এটি কোনো সরকারের পাঁচ বছরের কর্মসূচি হওয়া উচিত নয়। এটি হওয়া উচিত রাষ্ট্রের ৫০ বছরের সামুদ্রিক কৌশল।

তালপট্টি হারিয়েছে; বঙ্গোপসাগর যেন না হারায়

দক্ষিণ তালপট্টি আজ নেই। প্রকৃতি সেটিকে নিয়ে গেছে। কিন্তু তালপট্টির স্মৃতি বাংলাদেশের জন্য একটি সতর্কবার্তা। একটি ছোট ভূখণ্ডের প্রশ্ন কীভাবে দুই দেশের সামরিক উত্তেজনার কারণ হতে পারে, আবার কয়েক দশক পরে কীভাবে সেটি একটি বৃহত্তর সমুদ্রসীমা নির্ধারণের আইনি প্রশ্নে পরিণত হতে পারে—এই ইতিহাস আমাদের ভুলে গেলে চলবে না।

২০১৪ সালের রায়কে তাই ‘জয়’ অথবা ‘পরাজয়’—এই দুই শব্দে বন্দী করা উচিত নয়। এটি ছিল একটি রাষ্ট্রীয় পরীক্ষা। বাংলাদেশ সেই পরীক্ষায় কিছু বড় অর্জন করেছে, আবার কিছু প্রশ্নও রেখে এসেছে। এখন সময় এসেছে সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার।
কারণ ভবিষ্যতের বাংলাদেশ শুধু নদী, জমি ও সড়কের বাংলাদেশ হতে পারে না। তাকে সমুদ্রের বাংলাদেশ হতে হবে। বঙ্গোপসাগর বাংলাদেশের দক্ষিণের সীমানা নয়—এটি বাংলাদেশের ভবিষ্যতের দরজা।
সেই দরজা দিয়ে জ্বালানি আসতে পারে, মাছ আসতে পারে, বাণিজ্য আসতে পারে, নতুন শিল্প আসতে পারে, কৌশলগত শক্তি আসতে পারে। আবার অদক্ষতা, দুর্বল কূটনীতি ও নীতিগত শূন্যতা থাকলে অন্য শক্তিও সেই দরজা দিয়ে ঢুকে বাংলাদেশের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
সুতরাং এখন আর প্রশ্ন হওয়া উচিত নয়—২০১৪ সালে কে জিতেছিল, কে হেরেছিল। প্রশ্ন হওয়া উচিত— বাংলাদেশ কি ২০১৪ সালের অর্জিত সমুদ্রকে ২০২৬ সালের কৌশলগত শক্তিতে রূপান্তর করতে পেরেছে? উত্তর যদি ‘না’ হয়, তাহলে সেটিই হবে বাংলাদেশের প্রকৃত সামুদ্রিক পরাজয়। আর সেই পরাজয় কোনো আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে লেখা নেই। সেটি লেখা হবে আমাদের নিজেদের অদূরদর্শিতায়।

এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন