নোংরা যুদ্ধ ও বিশ্ব ব্যবস্থার পতন

পড়তে ১ মিনিট

নোংরা যুদ্ধ ও বিশ্ব ব্যবস্থার পতন

আমেরিকার বেপরোয়া আচরণ এবং ইসরাইলের নিপীড়ন- যার বহিঃপ্রকাশ বর্তমানে ইরানে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে- তা গত বেশ কিছু সময় ধরে পুরো বিশ্বকে কার্যত জিম্মি করে রেখেছে। এখনই সময় এগুলো সংশোধন করার।

২০২৬ সালে ইরানকে কেন্দ্র করে যে যুদ্ধ চলছে, তা মধ্যপ্রাচ্যের সাধারণ কোনো সঙ্ঘাত নয়। এটি একটি ভয়াবহ বিপর্যয়- যা স্পষ্টভাবে দেখিয়ে দিচ্ছে কীভাবে দু’টি রাষ্ট্রের উচ্চাকাক্সক্ষার কাছে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থা জিম্মি হয়ে পড়েছে। এই ধ্বংসযজ্ঞের কেন্দ্রে রয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার অনুগত রাষ্ট্র ইসরাইল। ইসরাইলের আগ্রাসন এবং আমেরিকার অন্ধ সমর্থনের এক বিষাক্ত সংমিশ্রণে এই দুই দেশ কেবল একটি আঞ্চলিক যুদ্ধকেই উসকে দেয়নি, বরং বিশ্বব্যবস্থার মূল ভিত্তিগুলোকেও পদ্ধতিগতভাবে ধ্বংস করে দিয়েছে; যা পুরো বিশ্বকে এক সুপরিকল্পিত অরাজকতার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

এটি একক কোনো কারণের দাবি নয়, বরং অনস্বীকার্য এক দায়বদ্ধতার স্বীকৃতি। যদিও এই মাত্রার সঙ্ঘাতগুলো বেশ জটিল হয়, তবুও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের আচরণ, কৌশল এবং রাজনৈতিক সমর্থন একটি অস্থিতিশীল পরিস্থিতিকে এমন এক পদ্ধতিগত সঙ্কটে পরিণত করেছে যা এখন পুরো বিশ্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ঘৃণ্য মিত্রতা

কয়েক দশক ধরে আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা এই নীতির ওপর নির্ভর করত যে, শক্তিশালী দেশগুলো সংযম প্রদর্শন করবে। ওয়াশিংটন এবং তেল আবিবের মধ্যকার মিত্রতা সেই নীতিকে এখন গলা টিপে হত্যা করেছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী বিশ্বব্যবস্থার কথিত রূপকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘকাল আগেই একজন নিরপেক্ষ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা ত্যাগ করেছে; বরং তারা এখন ইসরাইলের সশস্ত্র দেহরক্ষী হিসেবে কাজ করছে। যুক্তরাষ্ট্র তার ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে ইসরাইলকে জবাবদিহিতা থেকে রক্ষা করে এবং দেশটিকে অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রে ভাসিয়ে দিচ্ছে। এর মাধ্যমে আমেরিকা কার্যত তার নিজের পররাষ্ট্রনীতিকে এমন একটি উগ্র-ডানপন্থী সরকারের হাতে তুলে দিয়েছে, যাদের ইতিহাস কেবল ভূমি দখল এবং আন্তর্জাতিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানোর।

ইসরাইল তার পক্ষ থেকে আত্মরক্ষার সমস্ত অজুহাত ত্যাগ করেছে। একটি বেপরোয়া ও চরমপন্থী নিরাপত্তা দর্শনের মাধ্যমে তারা পরিকল্পিতভাবে একটি বড় ধরনের যুদ্ধ উসকে দিয়েছে। ইরানি স্থাপনাগুলোর ওপর গুপ্তহত্যা, গোপন অভিযান এবং নির্লজ্জ সামরিক হামলার যে ধারা তারা চালিয়েছে, তা ছিল মূলত আমেরিকাকে একটি অপ্রয়োজনীয় যুদ্ধে টেনে আনার একটি সুচিন্তিত কৌশল। ইসরাইল এখানে কোনো ভুক্তভোগী নয়, বরং তারা প্রধান উসকানিদাতা হিসেবে কাজ করেছে। আমেরিকান মদদপুষ্ট সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে কাজে লাগিয়ে তারা এই অঞ্চলে নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দিচ্ছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর সার্বভৌমত্বকে তুচ্ছজ্ঞান করছে।

সব মিলিয়ে, এই অংশীদারিত্ব একটি ভয়াবহ ধারার জন্ম দিয়েছে: প্রথমে ইসরাইলি উসকানি এবং এরপর আমেরিকার সরাসরি সহযোগিতা। কূটনীতির জায়গা দখল করেছে ইসরাইলের আগাম আগ্রাসন, সংযমের বদলে এসেছে সঙ্ঘাতের বিস্তার, আর আন্তর্জাতিক সমন্বয়ের সামান্যতম ছিটেফোঁটার জায়গায় বসেছে অন্ধ একতরফা সিদ্ধান্ত। এর ফল শুধু একটি বিপজ্জনক নজিরই নয়; বরং এটি আগ্রাসী যুদ্ধের বিরুদ্ধে থাকা বিশ্বজনীন নিয়ম-নীতির চূড়ান্ত পতন।

ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে যাওয়া এক যুদ্ধ

ইসরাইলের উসকানিতে যে সঙ্ঘাত শুরু হয়েছিল, তা এখন একটি বহুমুখী যুদ্ধে রূপ নিয়েছে যা পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে গ্রাস করছে এবং বিশ্বকে অস্থিতিশীল করে তুলেছে। জ্বালানি সরবরাহের পথগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, প্রক্সি নেটওয়ার্কগুলো (পরোক্ষ যুদ্ধের জাল) জ্বলছে এবং বিশ্ববাজার চরম অস্থিরতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি করিডোর ‘হরমুজ প্রণালী’ এখন একটি বারুদের স্তূপে পরিণত হয়েছে। এর ফলে সৃষ্ট মুদ্রাস্ফীতির ধাক্কা, সরবরাহ ব্যবস্থার বিপর্যয় এবং বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান ক্ষুধা- এসবই ইসরাইলের যুদ্ধংদেহী মনোভাব এবং আমেরিকার প্রশ্রয়ের সরাসরি ফল।

এখানেই ইরান যুদ্ধের চরম সত্যিকার মূল্য প্রকাশিত হয়। এটি মূলত একটি বৈশ্বিক কঠিন পরীক্ষা, যাতে বিশ্ব আজ ব্যর্থ হচ্ছে। এটি এই সত্যেরই প্রমাণ যে, কীভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনিয়ন্ত্রিত শক্তিতে বলীয়ান হয়ে ইসরাইলের মতো একটি দেশের সংকীর্ণ নিরাপত্তা স্বার্থ পুরো পৃথিবীকে জিম্মি করে ফেলতে পারে।

যুক্তরাষ্ট্র : ইসরাইলি স্বার্থ হাসিলের নোংরা খেলায় লিপ্ত

এই সঙ্ঘাতের অন্যতম সংজ্ঞায়িত এবং সবচেয়ে বিপজ্জনক বৈশিষ্ট্য হলো- কীভাবে প্রযুক্তিগত ও সামরিক শ্রেষ্ঠত্বকে স্থিতিশীলতার জন্য নয়, বরং দায়মুক্তির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। আমেরিকার তৈরি অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান, নির্ভুলভাবে লক্ষ্যভেদী গোলাবারুদ এবং অতুলনীয় গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান ইসরাইলকে চরম বেপরোয়াভাবে উচ্চ-ক্ষমতাসম্পন্ন সামরিক অভিযান পরিচালনার সুযোগ করে দিয়েছে।

অথচ রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ বা সংযমের কোনো কৌশল ছাড়াই চালিত এই হাতিয়ারগুলো তাদের ঘোষিত লক্ষ্যের ঠিক উল্টো ফল বয়ে এনেছে। এগুলো ইসরাইলের জন্য স্বল্পমেয়াদী কিছু কৌশলগত বিজয় নিশ্চিত করলেও, অন্য সবার জন্য দীর্ঘমেয়াদী এবং ভয়াবহ কৌশলগত অস্থিরতা তৈরি করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই ধ্বংসযজ্ঞের পথ প্রশস্ত করছে এবং নিশ্চিত করছে যেন তার মিত্র দেশটি সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে পারে- এমনকি যখন সেই শ্রেষ্ঠত্ব পুরো অঞ্চলকে এমন এক যুদ্ধের দিকে ঠেলে দিচ্ছে যার প্রভাব বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে।

এর অনিবার্য ফলাফল দাঁড়িয়েছে একটি সহিংস চক্র। সার্বভৌমত্ব লঙ্ঘন করার জন্য ইসরাইলের অত্যাধুনিক মারণাস্ত্রের ব্যবহার অপেক্ষাকৃত কম শক্তিশালী পক্ষগুলোকে ড্রোন এবং সাইবার টুলের মতো অভাবনীয় ও স্বল্পমূল্যের প্রযুক্তি দিয়ে পাল্টা জবাব দিতে উৎসাহিত করেছে। ইসরাইলি উসকানি বা আস্ফালন পাল্টা উসকানিকেই আমন্ত্রণ জানায়; আর এই চক্রটি যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তখন পাশে দাঁড়িয়ে এই ধ্বংসযজ্ঞের অংশীদার হচ্ছে।

আন্তর্জাতিক রীতির অবক্ষয়

সম্ভবত সবচেয়ে স্থায়ী ক্ষতিটি বস্তুগত নয় বরং প্রাতিষ্ঠানিক- এবং এটি সরাসরি মার্কিন ও ইসরাইলি নীতির একটি সরাসরি ফলাফল। এটি একটি ইচ্ছাকৃত কাজ। সম্মিলিত নিরাপত্তার ভিত্তি হিসেবে পরিকল্পিত জাতিসঙ্ঘকে বর্তমানে অক্ষম করে দেওয়া হয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ধারাবাহিকভাবে তার নিরাপত্তা পরিষদের ‘ভেটো’ ক্ষমতা ব্যবহার করেছে ইসরাইলকে তাদের অবৈধ বসতি স্থাপন, দখলদারিত্ব এবং এখন তাদের যুদ্ধাপরাধের নিন্দা থেকে রক্ষা করার জন্য। এটি দুর্ঘটনাবশত তৈরি হওয়া কোনো স্থবিরতা নয়; বরং এটি একটি সুপরিকল্পিত কৌশল যাতে নিশ্চিত করা যায় যে ইসরাইল একটি আইনি শূন্যতার মধ্যে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে।

যখন বিশ্বের একমাত্র পরাশক্তি এমন একটি রাষ্ট্রের রক্ষক হিসেবে কাজ করে যেটি আন্তর্জাতিক আইনকে তোয়াক্কা না করে পার পেয়ে যায়, তখন এটি ‘আইন-ভিত্তিক ব্যবস্থা’ এবং ‘ক্ষমতা-ভিত্তিক ব্যবস্থা’র মধ্যেকার পার্থক্যকে মুছে দেয়। ইরান যুদ্ধ এই বিষয়টি স্পষ্টভাবে ফুটিয়ে তুলেছে। আইনি অজুহাতগুলো একটি তামাশায় পরিণত হয়েছে, বেসামরিক নাগরিকদের সুরক্ষা যুদ্ধের বলি হচ্ছে এবং কূটনৈতিক মাধ্যমগুলোকে পরিকল্পিতভাবে একপাশে সরিয়ে রাখা হয়েছে। এমন এক পরিবেশে, বিশ্ব শাসন ব্যবস্থা কেবল দুর্বলই হয় না- বরং এটি একটি ভণ্ডামি হিসেবে উন্মোচিত হয়, যা কেবল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং তার সবচেয়ে বেপরোয়া মিত্রের মর্জির ওপর টিকে থাকে।

কৌশলগত লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বেসামরিক ব্যবস্থা

ইসরাইলি মডেলে আধুনিক যুদ্ধ এখন আর কেবল সামরিক উদ্দেশ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অবকাঠামো, জ্বালানি ব্যবস্থা এবং অর্থনৈতিক নেটওয়ার্কগুলো এখন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর চাপ সৃষ্টি করা দীর্ঘকাল ধরেই ইসরাইলের কৌশল। এখন আমেরিকার সমর্থনে এই পদ্ধতিটি বিশ্বায়িত হয়েছে। শিপিং লেন (নৌপথ), জ্বালানি রফতানি এবং আর্থিক প্রবাহের বিঘ্ন ঘটানো কেবল যুদ্ধের কোনো দুর্ভাগ্যজনক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নয়; বরং এগুলো যুদ্ধের একেকটি পরিকল্পিত কৌশল বা পদ্ধতি।

বিশ্বজুড়ে অসহায় জনগোষ্ঠীর জন্য এই বিঘ্নগুলোর অর্থ হলো- ক্ষুধা, চরম দারিদ্র্য এবং মৃত্যু। এর দায়ভার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল উভয়েরই। পদ্ধতিগত পরিণতির কথা চিন্তা না করেই ‘সর্বোচ্চ চাপ’ এবং সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধির কৌশল অনুসরণ করে তারা এটি নিশ্চিত করেছে যে, তাদের যুদ্ধের চড়া মূল্য দিতে হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় মানুষদের- যারা ইরান, ইসরাইল বা আমেরিকার সীমান্ত থেকে অনেক দূরে অবস্থান করছেন।

নেতৃত্বের সংকট

এর মূলে রয়েছে ওয়াশিংটন এবং তেল আবিব কর্তৃক তৈরি করা এক নেতৃত্বের সংকট। ক্ষমতার অহংকারে মত্ত হয়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার অতুলনীয় বৈশ্বিক প্রভাবকে হেলায় হারিয়েছে কেবল ইসরাইলের একটি চরম ডানপন্থী সরকারের সম্প্রসারণবাদী কল্পনাকে প্রশ্রয় দিতে গিয়ে। ইসরাইলের হাতে এখনো শক্তিশালী সামরিক সক্ষমতা রয়েছে, তবুও তাদের দীর্ঘমেয়াদী নিরাপত্তা ব্যবস্থা আগের চেয়ে অনেক বেশি নড়বড়ে- যা মূলত তাদের নিজস্ব আগ্রাসী বাড়াবাড়িরই একটি সরাসরি ফল।

শক্তির মাধ্যমে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার এই আপাতবিরোধ কোনো রহস্য নয়। কূটনৈতিক ভিত্তি বা নৈতিক সংযমহীন ক্ষমতার ব্যবহারের এটিই যৌক্তিক পরিণতি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইল মিলে ঠিক সেই নিরাপত্তাহীনতাই তৈরি করেছে যা তারা দূর করার দাবি করে। তারা নিজেরাই বিশ্বে আগুন লাগিয়ে দিয়েছে এবং এখন সেই ধ্বংসস্তূপের মাঝে দাঁড়িয়ে নিজেদের এই অগ্নিসংযোগের দায় চাপিয়ে দিচ্ছে ভুক্তভোগীদের ওপর।

পরবর্তীতে কী ঘটবে

ইরান যুদ্ধ একটি বিষয়কে ভয়াবহভাবে স্পষ্ট করে দিয়েছে: বর্তমান বৈশ্বিক ব্যবস্থার যে মডেলটি ছিল তা এখন মৃত, যা মার্কিন-ইসরাইল অক্ষশক্তি মিলে হত্যা করেছে। পুরো বিশ্বকে আজ জিম্মি করে রাখা হয়েছে। সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য এখন আর কেবল কৌশলগত রদবদল যথেষ্ট নয়; বরং এই দুই শক্তির একচেটিয়া ধ্বংসাত্মক আধিপত্যের বিরুদ্ধে একটি বিশ্বব্যাপী জাগরণ বা অভ্যুত্থান প্রয়োজন।

প্রথমত, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অবশ্যই এটি উপলব্ধি করতে হবে যে যারা যুদ্ধকে প্রাধান্য দেয়, তাদের মাধ্যমেই কূটনীতি আজ নস্যাৎ হয়েছে। যারা কূটনৈতিক সমাধান প্রত্যাখ্যান করে, বিশ্বকে অবশ্যই তাদের একঘরে করতে হবে। দ্বিতীয়ত, ‘একতরফা পদক্ষেপ’-এর রূপকথাকে তার আসল রূপে উন্মোচিত করতে হবে: যা মূলত আইনহীনতারই একটি পরিমার্জিত নাম। ইসরাইল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে যেভাবে আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, তার এই পদ্ধতিগত মূল্য এখন আর সহ্য করার মতো পর্যায়ে নেই। তৃতীয়ত, জাতিসঙ্ঘের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে অবশ্যই সংস্কার করতে হবে যাতে আমেরিকার সেই ‘ভেটো’ ক্ষমতা ভেঙে দেওয়া যায় যা ইসরাইলের দায়মুক্তিকে সম্ভব করেছে। তাদের বর্তমান এই অচলবস্থা কোনো ত্রুটি নয়, বরং এটি পরিকল্পিতভাবেই তৈরি করা হয়েছে।

উপসংহার

ইরান যুদ্ধ কোনো বিচ্ছিন্ন ব্যর্থতা নয়। এটি কয়েক দশকের সেই চয়িত নীতিরই চূড়ান্ত রূপ, যেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার দায়িত্ব পরিত্যাগ করেছে এবং ইসরাইলকে একটি ‘রোগ স্টেট’ (স্বৈরাচারী বা আইন অমান্যকারী রাষ্ট্র) হিসেবে কাজ করার সুযোগ করে দিয়েছে- যার হাতে রয়েছে এক পরাশক্তির সমান সুযোগ-সুবিধা।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ইসরাইলের নীতিগুলো এই পরিস্থিতির কেবল কেন্দ্রবিন্দু নয়; বরং এগুলোই এর মূল চালিকাশক্তি। এটি কেবল কাউকে দোষারোপ করার জন্য কোনো সরল উক্তি নয়; বরং এটি হলো আগ্রাসনের সেই অক্ষশক্তিকে চিহ্নিত করা যা বৈশ্বিক স্থিতিশীলতাকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। এই সত্যটি উপলব্ধি করাই হলো সেইসব পক্ষকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার প্রথম পদক্ষেপ, যারা বিশ্বকে আজ এক ভয়াবহ ধ্বংসের কিনারে দাঁড় করানোর জন্য দায়ী।

স্বার্থ বা ঝুঁকির পরিধি এখন আর আঞ্চলিক নয়। এগুলো এখন সভ্যতার অস্তিত্বের লড়াই। ইসরাইলের বেপরোয়া জুয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্ধ যোগসাজশের কারণে বিশ্ব এখন এমন এক যুগে প্রবেশ করছে যা কোনো ‘শৃঙ্খলা’ নয়, বরং ‘নিয়ন্ত্রিত বিশৃঙ্খলা’ দিয়ে সংজ্ঞায়িত- যেখানে সংকটগুলো কেবল পাশবিক শক্তি দিয়ে চেপে রাখা হয় কিন্তু কখনোই সমাধান করা হয় না; এবং যেখানে স্থিতিশীলতা হলো একটি সাময়িক ও ভঙ্গুর বিভ্রম, যা কেবল বন্দুকের নলের মুখে টিকিয়ে রাখা হয়েছে।

বিকল্প পথ- অর্থাৎ সংযমে ফেরা, কূটনীতিতে প্রকৃত বিনিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি পুনরায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হওয়া- এখনো টিকে আছে। কিন্তু যতক্ষণ পর্যন্ত ইসরাইলকে কোনো পরিণতির তোয়াক্কা না করে কাজ করার অনুমতি দেওয়া হবে এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তাদের এই সুযোগ করে দিতে থাকবে, ততক্ষণ সেই পথ কেবল সংকীর্ণই হবে না; বরং সুপরিকল্পিতভাবে বোমা মেরে সেই পথকে চিরতরে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হচ্ছে। #



এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন