অং সান সু চি ও তার নীরবতার মাশুল

পড়তে ১ মিনিট

অং সান সু চি ও তার নীরবতার মাশুল

রোহিঙ্গাদের ওপর ঘটে যাওয়া সেই গণহত্যা কোনো আকস্মিক দুর্ঘটনা ছিল না। এটি ছিল দীর্ঘ কয়েক দশকের সুপরিকল্পিত ও পদ্ধতিগত বৈষম্যের এক চূড়ান্ত রূপ। বিশ্ববাসীর চোখের সামনেই যখন এই বিভীষিকা চরম আকার ধারণ করছিল, ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা প্রভাবশালীরা তখন মুখে কুলুপ এঁটে ছিলেনÑঅথচ তারা চাইলেই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে পারতেন। তাদের মধ্যেই একজন ছিলেন মিয়ানমারের নোবেলজয়ী ও গণতন্ত্রের আইকন অং সান সু চি। যখন রোহিঙ্গাদের সবচেয়ে বেশি আশ্রয়ের প্রয়োজন ছিল, তিনি তখন দাঁড়িয়েছিলেন খুনি জেনারেলদের পাশে। আজ সেই জেনারেলরাই তাকে বন্দি করে রেখেছেন অন্ধকার এক কারাকক্ষে। তার এই করুণ পরিণতি এক গভীর নৈতিক প্রশ্নের জন্ম দেয়: যখন আপনি কোনো মজলুম মানুষের হাহাকার থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন, তখন আপনার নিজের দুর্দিনে আপনার পাশে এসে দাঁড়াবে কে?

বিপর্যয়ের ঘনঘটা

২০১৭ সালের আগস্টে সিনিয়র জেনারেল মিন অং হ্লাইংয়ের নেতৃত্বে গণহত্যার নৃশংসতম অধ্যায়টি শুরু হয়। বিদ্রোহী গোষ্ঠী ‘আরসা’ পুলিশ পোস্টে হামলা চালানোর পর, মিয়ানমার সেনাবাহিনী তথাকথিত ‘শুদ্ধি অভিযান’ শুরু করে। কিন্তু বিশ্ববাসী এর এক ভিন্ন রূপ প্রত্যক্ষ করে। স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, শত শত রোহিঙ্গা গ্রাম পুড়িয়ে ছাই করে দেওয়া হয়েছে; গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে তাদের ঘরবাড়ি, মসজিদ আর ফসলি জমি। অথচ পাশেই থাকা অ-রোহিঙ্গা জনপদগুলো ছিল একদম অক্ষত। প্রাণ বাঁচাতে সাত লাখেরও বেশি মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়, যার ফলে গড়ে ওঠে বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী শিবির। জাতিসঙ্ঘ এ ঘটনাকে ‘জাতিগত নিধনের এক ধ্রুপদী উদাহরণ’ হিসেবে আখ্যা দেয় এবং পরবর্তী সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘গণহত্যা’ হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।

নিপীড়নের পক্ষে যখন রক্ষক

আন্তর্জাতিক মহলে যখন নিন্দার ঝড় বইছিল, সু চির ভূমিকা তখন সবকিছু স্পষ্ট করে দিয়েছিল। জাতিসঙ্ঘের এক বিশাল তদন্তে যখন মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীকে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে দোষী সাব্যস্ত করা হয়, তখনও তিনি রহস্যজনকভাবে চুপ ছিলেন। ২০১৭ সালের সেই সংকটকে তিনি স্রেফ একটি ‘নিরাপত্তা অভিযান’ বলে চালিয়ে দেন। এমনকি ২০১৯ সালে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে মিয়ানমার সেনাকর্তাদের সাফাই গাইতে গিয়ে তিনি ‘রোহিঙ্গা’ শব্দটি উচ্চারণ পর্যন্ত করেননি; বরং তাদের ‘রাখাইনের মুসলমান’ বলে সম্বোধন করেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে, এই পরিচয় অস্বীকার করা ছিল মূলত রোহিঙ্গাদের অস্তিত্ব মুছে ফেলারই একটি সরকারি কৌশল। এমনকি তার প্রশাসন গণধর্ষণ ও নৃশংসতার ভয়াবহ খবরগুলোকে ‘সাজানো নাটক’ বা ‘ভুয়া ধর্ষণ’ বলে উড়িয়ে দিয়েছিল।

ভাগ্যের নির্মম পরিহাস

যে শাসনব্যবস্থাকে তিনি একসময় আগলে রেখেছিলেন, শেষ পর্যন্ত তা-ই তার কাল হয়ে দাঁড়াল। ২০২১ সালের ১ ফেব্রুয়ারি, যে সেনাবাহিনীকে তিনি আন্তর্জাতিক বিচার থেকে ঢাল হয়ে বাঁচিয়েছিলেন, তারাই এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা কেড়ে নেয়। সংসদ অধিবেশন শুরুর ঠিক আগমুহূর্তে সু চিকে গ্রেফতার করা হয়। তার বিরুদ্ধে সাজানো হলো একের পর এক রাজনৈতিক মামলাÑঅবৈধভাবে ওয়াকিটকি রাখা থেকে শুরু করে করোনা বিধি লঙ্ঘন, দুর্নীতি আর নির্বাচনী জালিয়াতির মতো হরেক রকম অভিযোগ। লোকচক্ষুর আড়ালে রুদ্ধদ্বার আদালতে বছরের পর বছর বাড়ানো হলো তার সাজা। সম্প্রতি জান্তা সরকার তার ৩৩ বছরের কারাদণ্ড কমিয়ে ২৭ বছর করেছে, কিন্তু আশির্ধ্ব এই নেত্রী এখনো বন্দি। বাইরের জগতের সাথে প্রায় সব যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন অবস্থায় তাকে কড়া পাহাড়ায় রাখা হয়েছে। তার নিজের ছেলেও মায়ের এই শোচনীয় অবস্থাকে ‘নরকবাস’ বলে অভিহিত করেছেন।

একটি সতর্কবার্তা

সু চির এই পতনের পেছনে এক চরম পরিহাস লুকিয়ে আছে। যে জেনারেলরা রোহিঙ্গা গণহত্যার মূল কারিগর ছিল, আজ তারাই সেই নারীকে বন্দি করে রেখেছে যিনি একসময় তাদের পাশেই দাঁড়িয়েছিলেন। নোবেলজয়ী এক বিশ্বনন্দিত নেত্রী থেকে আজ কারাবন্দি এক ‘সহযোগীর’ এই জীবন আমাদের এক কঠোর শিক্ষা দেয়: আপনি যদি অত্যাচারীদের আড়াল করেন, তবে শেষ পর্যন্ত আপনি নিজেই তাদের শিকারে পরিণত হতে পারেনÑএকাকী এবং অসহায় অবস্থায়।

আজ সু চি নিঃসঙ্গ, তার দীর্ঘদিনের সব অর্জন আজ ধূলিসাৎ। একসময় বিশ্বজুড়ে তার প্রতি যে অগাধ সহানুভূতি ছিল, তার নিজের নেওয়া ভুল সিদ্ধান্তের কারণেই তা আজ ফিকে হয়ে গেছে। অন্যদিকে, রোহিঙ্গাদের ভাগ্য এখনো অনিশ্চিতÑঘরবাড়ি হারিয়ে ছন্নছাড়া এই মানুষগুলোর ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ আজও থমকে আছে। পৃথিবী হয়তো তার আপন গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সেই সময়ের নীরবতার চড়া মাশুল আজও রয়ে গেছে। #


এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন