সিঙ্গাপুরের মসজিদ বেনকুলেনের ২০০ বছর: ঈমান, ঐতিহ্য ও সেবার অনন্য ইতিহাস

পড়তে ১ মিনিট

সিঙ্গাপুরের অন্যতম প্রাচীন মসজিদ বেনকুলেন । ছবি: দ্য স্ট্রেইটস টাইমস

সিঙ্গাপুরের ঐতিহাসিক মসজিদ বেনকুলেন তার ২০০তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করেছে। দুই শতাব্দী ধরে মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় চর্চা, ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও জনসেবায় অবদান রাখার স্বীকৃতি হিসেবে এই বার্ষিকী বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এ উপলক্ষে মসজিদটির ইতিহাস ও ঐতিহ্য রক্ষায় বিভিন্ন প্রজন্মের অবদানকে সম্মান জানানো হয়। পাশাপাশি ১৮২৫ সাল থেকে মসজিদটির পথচলার ইতিহাস তুলে ধরে একটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ করা হয়।

গত ১৮ অক্টোবর-২০২৬ দেশটির সরকারি ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইসলামিক রিলিজিয়াস কাউন্সিল অব সিঙ্গাপুর (মাজলিস উগামা ইসলাম সিঙ্গাপুরা—মুইস) জানায়, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মসজিদ বেনকুলেন মুসলিমদের ইবাদতের স্থান, সামাজিক মেলবন্ধনের কেন্দ্র এবং আত্মিক পরিচয় গড়ে তোলার গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছে।

মুসলিমবিষয়ক ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী জাকি মোহাম্মদ (মাঝে) বলেন, সিঙ্গাপুরের উন্নয়নে ভারতীয় মুসলিম সম্প্রদায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। (ছবি: দ্য স্ট্রেইটস টাইমস)

২০০ বছর উদযাপন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মুসলিমবিষয়ক ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ রাষ্ট্রমন্ত্রী জাকি মোহাম্মদ, মুইসের সভাপতি মোহাম্মদ সা’আত আবদুল রহমানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা, স্বেচ্ছাসেবক, দাতা ও স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যরা।

ঐতিহাসিক শিকড়

মুইসের তথ্য অনুযায়ী, মসজিদ বেনকুলেনের ইতিহাস সিঙ্গাপুরের প্রাথমিক ভারতীয় মুসলিম সম্প্রদায়ের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। ১৮২৫ সালে ভারতীয় মুসলিম ব্যবসায়ী, শ্রমিক ও বসতি স্থাপনকারীরা ইবাদতের স্থান এবং সামাজিক জীবনের কেন্দ্র হিসেবে মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন।

গত দুই শতাব্দীতে সিঙ্গাপুরের ব্যাপক পরিবর্তনের সাক্ষী হয়েছে মসজিদ বেনকুলেন। একই সঙ্গে এটি ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন প্রজন্মের মুসল্লি ও তাঁদের পরিবারকে সেবা দিয়ে এসেছে। মসজিদটির কার্যক্রম শুধু ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং ইসলামি শিক্ষা, সামাজিক উদ্যোগ ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এর পরিধি বিস্তৃত হয়েছে। এসব কার্যক্রম মসজিদ ও আশপাশের সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্পর্ককে আরও দৃঢ় করেছে।

ঐতিহ্য সংরক্ষণ ও প্রজন্মের দায়িত্ব

মুইসের বিবৃতিতে মোহাম্মদ আবদুল জলিলের অবদানের কথাও তুলে ধরা হয়। তিনি ভারতের চেন্নাই থেকে ছোট শিশু হিসেবে সিঙ্গাপুরে এসেছিলেন। মসজিদ বেনকুলেনের সঙ্গে তাঁর গড়ে ওঠে গভীর সম্পর্ক। এখানেই তিনি খুঁজে পান আপনত্ব, সামাজিক বন্ধন ও সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত থাকার অনুভূতি।

যে প্রতিষ্ঠান তাঁকে আন্তরিকভাবে গ্রহণ করেছিল, পরবর্তী সময়ে সেই প্রতিষ্ঠানের প্রতি কৃতজ্ঞতা থেকে তিনি মসজিদ ব্যবস্থাপনা বোর্ডের অবৈতনিক চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তিনি মসজিদটির সহ-সভাপতি বা ভাইস-চেয়ারম্যান হিসেবে প্রশাসনিক কার্যক্রমে অবদান রাখছেন।

মুইসের মতে, তাঁর এই পথচলা সেবা, দায়িত্ববোধ এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠান সংরক্ষণের প্রতি অঙ্গীকারের একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। এসব মূল্যবোধই প্রজন্মের পর প্রজন্ম মসজিদটিকে সক্রিয় ও প্রাণবন্ত রাখতে সহায়তা করেছে।

অনুষ্ঠানে বক্তব্য দিতে গিয়ে জাকি মোহাম্মদ ইসলামের ‘আমানাহ’ ধারণার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। আমানাহ বলতে বিশ্বাস, আমানত রক্ষা, যত্ন ও দায়িত্ববোধকে বোঝায়। তিনি বলেন, মসজিদ বেনকুলেনের দীর্ঘ ইতিহাস ও ঐতিহ্য গড়ে ওঠার পেছনে এসব মূল্যবোধ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

তিনি আরও ব্যাখ্যা করেন, মসজিদটির ঐতিহ্যকে শুধু অতীত থেকে পাওয়া কোনো উত্তরাধিকার হিসেবে দেখলে চলবে না। বরং এটি একটি চলমান দায়িত্ব, যা প্রতিটি প্রজন্মকে গ্রহণ করতে হবে, যত্নের সঙ্গে সংরক্ষণ করতে হবে এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে হবে।

জাকি মোহাম্মদ মসজিদ কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের প্রতি তরুণদের সহায়তা অব্যাহত রাখার, সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের মধ্যে সম্পর্ক জোরদার করার এবং আগামী ২০০ বছর ও তার পরেও মসজিদটিকে সবার জন্য উন্মুক্ত ও স্বাগতপূর্ণ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে রাখার আহ্বান জানান।

স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ

২০০ বছর উদযাপনের অংশ হিসেবে মসজিদটির ইতিহাস, ঐতিহ্য ও বিকাশের ধারাবাহিকতা নথিভুক্ত করে একটি স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ করা হয়। গ্রন্থটির নাম মসজিদ বেনকুলেন: ২০০ ইয়ার্স—সেলিব্রেটিং টু সেঞ্চুরিজ অব ফেইথ অ্যান্ড সার্ভিস সিন্স ১৮২৫।

১৮২৫ সাল থেকে মসজিদটির দুই শতাব্দীর পথচলা, মুসলিম সম্প্রদায়ের প্রতি এর অবদান এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণে বিভিন্ন প্রজন্মের ভূমিকা তুলে ধরাই এই গ্রন্থের মূল উদ্দেশ্য।

তরুণদের জন্য নতুন কর্মসূচি

নেতৃত্বের দায়িত্ব নিতে আগ্রহী তরুণ স্বেচ্ছাসেবীদের জন্য ‘নেতৃত্ব উন্নয়নমূলক রিট্রিট’ (প্রশিক্ষণ ও কর্মশালা)-সহ নতুন কর্মসূচির মাধ্যমে তরুণদের সঙ্গে যোগাযোগ ও সম্পৃক্ততা আরও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে।

পাশাপাশি সুবিধাবঞ্চিত পরিবারগুলোর সহায়তায় বিভিন্ন সামাজিক কর্মসূচি পরিচালনার লক্ষ্যও নির্ধারণ করেছে মসজিদ কর্তৃপক্ষ। এসব উদ্যোগের মাধ্যমে উদারতা, সহমর্মিতা, যত্ন ও পারস্পরিক সহযোগিতার চর্চা আরও জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে।

দুই শতাব্দীর ইতিহাস পেরিয়ে মসজিদ বেনকুলেনের এই উদযাপন শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নয়; বরং সিঙ্গাপুরের মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ঐতিহ্য, সামাজিক সংহতি এবং প্রজন্মান্তরে সেবার অঙ্গীকারেরও প্রতিফলন।


এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন