ইস্তাম্বুল সম্মেলনে মুসলিম বিশ্বকে ঐক্যবদ্ধ করতে নতুন সনদের আহ্বান

পড়তে ১ মিনিট

ইস্তাম্বুলে মুসলিম আলেম, বুদ্ধিজীবী ও ধর্মীয় নেতাদের তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন | ছবি : আল-উম্মাহ

মুসলিম বিশ্বে ঐক্য জোরদার, ফিরকাগত ও মাযহাবগত বিভেদ দূর এবং অভিন্ন নীতিগুলোকে বাস্তব সহযোগিতায় রূপ দেওয়ার আহ্বানের মধ্য দিয়ে ৩০ অক্টোবর ইস্তাম্বুলে শেষ হয়েছে মুসলিম আলেম, বুদ্ধিজীবী ও ধর্মীয় নেতাদের তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন।

‘মধ্যপন্থার উম্মাহর ঐক্য: মৌলিক নীতি থেকে ঐক্যের সনদ’ শীর্ষক সম্মেলনটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব মুসলিম স্কলার্স এবং এনডাউমেন্ট অব ইসলামিক স্কলার্সের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত হয়। এতে ৩০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সম্মেলনের মূল লক্ষ্য ছিল মুসলিম সংহতির প্রচলিত আহ্বানের বাইরে গিয়ে ধর্মীয়, রাজনৈতিক, শিক্ষাগত, বৈজ্ঞানিক ও মানবিক ক্ষেত্রে বিভেদ দূর করা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে একটি কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা।

সম্মেলনে উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব মুসলিম স্কলার্সের সভাপতি আলি মহিউদ্দিন আল-কারাদাগি, এনডাউমেন্ট অব ইসলামিক স্কলার্সের সভাপতি নুসরেতুল্লাহ মুফতুওগলু, সিরিয়ার ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী মোহাম্মদ আবু আল-খায়ের শুকরি এবং সম্মেলনের আয়োজক কমিটির চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াহাব একিনচি।

সম্মেলনে অংশ নেন আল-উম্মাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাকির হোসেনও। পরে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তিনি বলেন, “মুসলিম বিশ্বে ঐক্য, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতা জোরদার করার ক্ষেত্রে এই সম্মেলন একটি সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ।”

আল-উম্মাহ সাময়িকীর প্রধান সম্পাদক জাকির হোসেন আরও বলেন, “প্রস্তাবিত ‘ঐক্যের সনদ’ অভিন্ন নীতিগুলোকে যৌথ কর্মসূচি ও উদ্যোগে রূপ দেওয়ার একটি সম্ভাবনাময় রূপরেখা তুলে ধরেছে।”

সনদটির গুরুত্ব তুলে ধরে এর বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, “শুধু ঘোষণা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। বিশেষ করে শিক্ষা, গবেষণা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানবিক কর্মকাণ্ডে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং ধারাবাহিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, “ঐক্যকে মানবজাতির অগ্রগতি, শান্তি ও সামগ্রিক কল্যাণের জন্য একটি কার্যকর শক্তিতে পরিণত করতে হবে।”

ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জের মুখে ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা

বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনের সমাপনী ঘোষণায় মুসলিম ঐক্যকে কেবল ধর্মীয় আকাঙ্ক্ষা কিংবা রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে বিবেচনা না করে ধর্মীয় দায়িত্ব, সভ্যতাগত লক্ষ্য এবং অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা হিসেবে তুলে ধরা হয়।

অংশগ্রহণকারীরা স্বীকার করেন, মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরীণ বিভাজন পারস্পরিক সহযোগিতার সম্ভাবনাকে দুর্বল করেছে, অভিন্ন স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং সংঘাত ও মানবিক সংকট মোকাবিলাকে আরও জটিল করে তুলেছে।

তারা বলেন, ঐক্য প্রতিষ্ঠার অর্থ ইসলামী ফিকহ ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের মধ্যে বিদ্যমান বৈধ মতপার্থক্যগুলোকে অস্বীকার করা নয়। বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আলেমদের মধ্যে সংলাপ এবং ইসলামের মৌলিক নীতির প্রতি অভিন্ন অঙ্গীকারের ভিত্তিতেই এ ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।

সম্মেলনের ঘোষণায় সাম্প্রদায়িকতা, ফিরকাবাজি, চরমপন্থা ও অসহিষ্ণুতা প্রত্যাখ্যানের পাশাপাশি মধ্যপন্থা, পরামর্শ ও পারস্পরিক সহযোগিতার চর্চা বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়। এতে বলা হয়, মুসলিম ঐক্য অন্যান্য জাতি ও দেশের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক জোরদার করবে; বিচ্ছিন্নতা কিংবা বিভাজন সৃষ্টি করবে না।

মুসলিম উম্মাহর জন্য ঐক্যের সনদ

সম্মেলনের অন্যতম প্রধান প্রস্তাব ছিল ‘মধ্যপন্থার উম্মাহর সনদ: মৌলিক নীতি ও উদীয়মান বিষয়াবলি’ শীর্ষক একটি দলিল প্রণয়ন। মুসলিম সমাজের জন্য অভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে প্রস্তাবিত এ সনদ।

এতে অকাট্য ধর্মীয় দলিল দ্বারা প্রতিষ্ঠিত মৌলিক নীতিমালা এবং যেসব বিষয়ে বৈধ ব্যাখ্যা ও ইজতিহাদের সুযোগ রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।

অংশগ্রহণকারীদের মতে, এ পার্থক্য স্বীকার করা হলে ইসলামের মৌলিক নীতির প্রতি আনুগত্য বজায় রেখেই সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় নমনীয়তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে আলেমদের বৈধ মতামতের পরিসর সংকুচিত না করেই পারস্পরিক সহযোগিতার একটি অভিন্ন ভিত্তি তৈরি হবে।

সনদটি যেন সর্বসম্মত মতামতের প্রতিফলন ঘটায়, সে জন্য আলেম, বুদ্ধিজীবী, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতাদের এর খসড়া প্রণয়নে অবদান রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সম্মেলনে বলা হয়, ঐক্য প্রতিষ্ঠা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এর জন্য সাময়িক সংহতি ঘোষণা যথেষ্ট নয়; বরং প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন সংলাপ, পারস্পরিক আস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গীকার।

নীতি থেকে বাস্তব কর্মসূচিতে

সম্মেলনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল বৃহৎ লক্ষ্য ও ঘোষণাগুলোকে বাস্তব প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ।

এ লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—

১. গবেষণা পরিচালনা ও বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণের জন্য ‘সেন্টার ফর ইউনিটি স্টাডিজ অ্যান্ড প্রজেক্টস ফর ইউনিটি অ্যান্ড রেনেসাঁ’ প্রতিষ্ঠা।

২. সংলাপের পরিবেশ তৈরি এবং বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে এবং অন্যান্য দেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ‘ঐক্য কমিটি’ গঠন।

৩. ঐক্য প্রতিষ্ঠার পথে প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা এবং কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করতে নিয়মিত একাডেমিক সভা, কর্মশালা ও সম্মেলনের আয়োজন।

৪. ইসলামী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যৌথ গবেষণা, শিক্ষামূলক ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু।

৫. কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে প্রজ্ঞা, মধ্যপন্থা, গঠনমূলক অংশগ্রহণ ও সামাজিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে নতুন ইসলামী দাওয়াহ কার্যক্রম শুরু।

সম্মেলনের ঘোষণায় অগ্রগতি পর্যালোচনা, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং উদ্যোগগুলোর ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয় কেন্দ্র স্থাপনের সুপারিশ করা হয়।

শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও গণমাধ্যমের বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। অংশগ্রহণকারীরা বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও সামাজিক সম্প্রীতি জোরদারে যৌথ গবেষণা প্রকল্প, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।

তাদের মতে, সাম্প্রদায়িক উসকানি, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও অসহিষ্ণুতা প্রতিরোধের পাশাপাশি অভিন্ন মূল্যবোধ ও পারস্পরিক স্বার্থ তুলে ধরতে গণমাধ্যমকে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে।

ফিলিস্তিনসহ বিভিন্ন মানবিক সংকট

সম্মেলনে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব বিস্তারকারী বিভিন্ন সংঘাত ও মানবিক সংকট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এসব সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন অংশগ্রহণকারীরা।

আলোচনায় ফিলিস্তিনের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। অংশগ্রহণকারীরা গাজায় সহিংসতা এবং পশ্চিম তীরে মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনি বন্দিদের সুরক্ষা, বিশেষ করে পবিত্র আল-আকসা মসজিদসহ ইসলামের পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসানের দাবি জানান।

সম্মেলনের ঘোষণায় মুসলিম প্রতিষ্ঠান ও নেতাদের বৈধ ও দায়িত্বশীল উপায়ে ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় নিজেদের প্রচেষ্টা সমন্বিত করার আহ্বান জানানো হয়।

ইয়েমেন প্রসঙ্গে দেশটির ঐক্য, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন অংশগ্রহণকারীরা। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।

সুদানের পরিস্থিতি নিয়ে সম্মেলনে মানবিক সহায়তা বাড়ানো, রক্তপাত বন্ধ এবং দেশটিতে শান্তি, সার্বভৌমত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানানো হয়।

এ ছাড়া মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিম এবং পূর্ব তুর্কিস্তানের মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন অংশগ্রহণকারীরা। তাদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।

আফ্রিকার মুসলিম সম্প্রদায়গুলোর শিক্ষাগত, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন জোরদার করার বিষয়েও আলোচনা হয়। এ ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বিদ্যমান সম্পদের কার্যকর ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

চরমপন্থা প্রত্যাখ্যান ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের আহ্বান

মুসলিম সংহতি জোরদারের পাশাপাশি সম্মেলনে সব ধরনের সন্ত্রাসবাদ প্রত্যাখ্যানের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান ইসলামবিদ্বেষ ও ধর্মীয় বিদ্বেষের বিষয়ে সতর্ক করা হয়।

মসজিদ ও গির্জাসহ বিভিন্ন উপাসনালয়ে হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, মৌলিক অধিকার সুরক্ষা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।

অংশগ্রহণকারীরা বলেন, ইসলামী ঐক্যের লক্ষ্য হবে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা নয়; বরং আন্তর্জাতিক শান্তি, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষায় অবদান রাখা।

ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা

সম্মেলনের সমাপনী পর্বে খসড়া প্রণয়ন কমিটিকে আগামী ১০ দিনের মধ্যে প্রস্তাবিত সনদটি চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। দলিলটি প্রকাশের পর বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করে সভা, সেমিনার ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারের পরিকল্পনা রয়েছে।

আয়োজকদের প্রত্যাশা, প্রস্তাবিত সনদটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনামূলক দলিল হিসেবে কাজ করবে। এর মাধ্যমে ইসলামের অভিন্ন নীতিগুলো সম্পর্কে সচেতনতা বাড়বে, বিভিন্ন মতাদর্শের আলেমদের মধ্যে সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার ভিত্তি গড়ে উঠবে।

অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মুখে থাকা মুসলিম বিশ্বের জন্য প্রস্তাবিত এই সনদ একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এর লক্ষ্য কেবল ঐক্যের আহ্বান জানানো নয়; বরং সেই আহ্বানকে সুসংগঠিত, কার্যকর ও বাস্তবসম্মত যৌথ কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া।

মুসলিম বিশ্বে ঐক্য জোরদার, ফিরকাগত ও মাযহাবগত বিভেদ দূর এবং অভিন্ন নীতিগুলোকে বাস্তব সহযোগিতায় রূপ দেওয়ার আহ্বানের মধ্য দিয়ে ৩০ অক্টোবর ইস্তাম্বুলে শেষ হয়েছে মুসলিম আলেম, বুদ্ধিজীবী ও ধর্মীয় নেতাদের তিন দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সম্মেলন।

‘মধ্যপন্থার উম্মাহর ঐক্য: মৌলিক নীতি থেকে ঐক্যের সনদ’ শীর্ষক সম্মেলনটি ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব মুসলিম স্কলার্স এবং এনডাউমেন্ট অব ইসলামিক স্কলার্সের সহযোগিতায় অনুষ্ঠিত হয়। এতে ৩০টিরও বেশি দেশের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

সম্মেলনের মূল লক্ষ্য ছিল মুসলিম সংহতির প্রচলিত আহ্বানের বাইরে গিয়ে ধর্মীয়, রাজনৈতিক, শিক্ষাগত, বৈজ্ঞানিক ও মানবিক ক্ষেত্রে বিভেদ দূর করা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়াতে একটি কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা।

সম্মেলনে উল্লেখযোগ্য অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ছিলেন ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন অব মুসলিম স্কলার্সের সভাপতি আলি মহিউদ্দিন আল-কারাদাগি, এনডাউমেন্ট অব ইসলামিক স্কলার্সের সভাপতি নুসরেতুল্লাহ মুফতুওগলু, সিরিয়ার ধর্মবিষয়ক মন্ত্রী মোহাম্মদ আবু আল-খায়ের শুকরি এবং সম্মেলনের আয়োজক কমিটির চেয়ারম্যান আব্দুল ওয়াহাব একিনচি।

সম্মেলনে অংশ নেন আল-উম্মাহ ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাকির হোসেনও। পরে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে তিনি বলেন, “মুসলিম বিশ্বে ঐক্য, পারস্পরিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতা জোরদার করার ক্ষেত্রে এই সম্মেলন একটি সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ।”

আল-উম্মাহ সাময়িকীর প্রধান সম্পাদক জাকির হোসেন আরও বলেন, “প্রস্তাবিত ‘ঐক্যের সনদ’ অভিন্ন নীতিগুলোকে যৌথ কর্মসূচি ও উদ্যোগে রূপ দেওয়ার একটি সম্ভাবনাময় রূপরেখা তুলে ধরেছে।”

সনদটির গুরুত্ব তুলে ধরে এর বাস্তবায়নের ওপর জোর দিয়ে তিনি বলেন, “শুধু ঘোষণা দিয়েই দায়িত্ব শেষ করলে চলবে না। বিশেষ করে শিক্ষা, গবেষণা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও মানবিক কর্মকাণ্ডে কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং ধারাবাহিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।”

তিনি আরও বলেন, “ঐক্যকে মানবজাতির অগ্রগতি, শান্তি ও সামগ্রিক কল্যাণের জন্য একটি কার্যকর শক্তিতে পরিণত করতে হবে।”

ক্রমবর্ধমান চ্যালেঞ্জের মুখে ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা

বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক চ্যালেঞ্জের প্রেক্ষাপটে অনুষ্ঠিত এ সম্মেলনের সমাপনী ঘোষণায় মুসলিম ঐক্যকে কেবল ধর্মীয় আকাঙ্ক্ষা কিংবা রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে বিবেচনা না করে ধর্মীয় দায়িত্ব, সভ্যতাগত লক্ষ্য এবং অভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা হিসেবে তুলে ধরা হয়।

অংশগ্রহণকারীরা স্বীকার করেন, মুসলিম সমাজের অভ্যন্তরীণ বিভাজন পারস্পরিক সহযোগিতার সম্ভাবনাকে দুর্বল করেছে, অভিন্ন স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে এবং সংঘাত ও মানবিক সংকট মোকাবিলাকে আরও জটিল করে তুলেছে।

তারা বলেন, ঐক্য প্রতিষ্ঠার অর্থ ইসলামী ফিকহ ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের মধ্যে বিদ্যমান বৈধ মতপার্থক্যগুলোকে অস্বীকার করা নয়। বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আলেমদের মধ্যে সংলাপ এবং ইসলামের মৌলিক নীতির প্রতি অভিন্ন অঙ্গীকারের ভিত্তিতেই এ ঐক্য গড়ে তুলতে হবে।

সম্মেলনের ঘোষণায় সাম্প্রদায়িকতা, ফিরকাবাজি, চরমপন্থা ও অসহিষ্ণুতা প্রত্যাখ্যানের পাশাপাশি মধ্যপন্থা, পরামর্শ ও পারস্পরিক সহযোগিতার চর্চা বাড়ানোর আহ্বান জানানো হয়। এতে বলা হয়, মুসলিম ঐক্য অন্যান্য জাতি ও দেশের সঙ্গে শান্তিপূর্ণ সম্পর্ক জোরদার করবে; বিচ্ছিন্নতা কিংবা বিভাজন সৃষ্টি করবে না।

মুসলিম উম্মাহর জন্য ঐক্যের সনদ

সম্মেলনের অন্যতম প্রধান প্রস্তাব ছিল ‘মধ্যপন্থার উম্মাহর সনদ: মৌলিক নীতি ও উদীয়মান বিষয়াবলি’ শীর্ষক একটি দলিল প্রণয়ন। মুসলিম সমাজের জন্য অভিন্ন বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধর্মীয় দিকনির্দেশনা হিসেবে কাজ করবে প্রস্তাবিত এ সনদ।

এতে অকাট্য ধর্মীয় দলিল দ্বারা প্রতিষ্ঠিত মৌলিক নীতিমালা এবং যেসব বিষয়ে বৈধ ব্যাখ্যা ও ইজতিহাদের সুযোগ রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে।

অংশগ্রহণকারীদের মতে, এ পার্থক্য স্বীকার করা হলে ইসলামের মৌলিক নীতির প্রতি আনুগত্য বজায় রেখেই সমসাময়িক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় নমনীয়তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে আলেমদের বৈধ মতামতের পরিসর সংকুচিত না করেই পারস্পরিক সহযোগিতার একটি অভিন্ন ভিত্তি তৈরি হবে।

সনদটি যেন সর্বসম্মত মতামতের প্রতিফলন ঘটায়, সে জন্য আলেম, বুদ্ধিজীবী, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতাদের এর খসড়া প্রণয়নে অবদান রাখার আহ্বান জানানো হয়েছে।

সম্মেলনে বলা হয়, ঐক্য প্রতিষ্ঠা একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এর জন্য সাময়িক সংহতি ঘোষণা যথেষ্ট নয়; বরং প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন সংলাপ, পারস্পরিক আস্থা এবং প্রাতিষ্ঠানিক অঙ্গীকার।

নীতি থেকে বাস্তব কর্মসূচিতে

সম্মেলনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল বৃহৎ লক্ষ্য ও ঘোষণাগুলোকে বাস্তব প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে রূপ দেওয়ার ওপর গুরুত্বারোপ।

এ লক্ষ্যে বেশ কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—

১. গবেষণা পরিচালনা ও বাস্তবভিত্তিক উদ্যোগ গ্রহণের জন্য ‘সেন্টার ফর ইউনিটি স্টাডিজ অ্যান্ড প্রজেক্টস ফর ইউনিটি অ্যান্ড রেনেসাঁ’ প্রতিষ্ঠা।

২. সংলাপের পরিবেশ তৈরি এবং বিভিন্ন কার্যক্রমের মধ্যে সমন্বয় সাধনের জন্য মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে এবং অন্যান্য দেশের মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে ‘ঐক্য কমিটি’ গঠন।

৩. ঐক্য প্রতিষ্ঠার পথে প্রতিবন্ধকতা চিহ্নিত করা এবং কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করতে নিয়মিত একাডেমিক সভা, কর্মশালা ও সম্মেলনের আয়োজন।

৪. ইসলামী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যৌথ গবেষণা, শিক্ষামূলক ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু।

৫. কোরআন ও সুন্নাহর আলোকে প্রজ্ঞা, মধ্যপন্থা, গঠনমূলক অংশগ্রহণ ও সামাজিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দিয়ে নতুন ইসলামী দাওয়াহ কার্যক্রম শুরু।

সম্মেলনের ঘোষণায় অগ্রগতি পর্যালোচনা, অভিজ্ঞতা বিনিময় এবং উদ্যোগগুলোর ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যোগাযোগ ও সমন্বয় কেন্দ্র স্থাপনের সুপারিশ করা হয়।

শিক্ষা, বৈজ্ঞানিক গবেষণা ও গণমাধ্যমের বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। অংশগ্রহণকারীরা বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ ও সামাজিক সম্প্রীতি জোরদারে যৌথ গবেষণা প্রকল্প, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার এবং প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সহযোগিতা বাড়ানোর আহ্বান জানান।

তাদের মতে, সাম্প্রদায়িক উসকানি, বিদ্বেষমূলক বক্তব্য ও অসহিষ্ণুতা প্রতিরোধের পাশাপাশি অভিন্ন মূল্যবোধ ও পারস্পরিক স্বার্থ তুলে ধরতে গণমাধ্যমকে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে হবে।

ফিলিস্তিনসহ বিভিন্ন মানবিক সংকট

সম্মেলনে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব বিস্তারকারী বিভিন্ন সংঘাত ও মানবিক সংকট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এসব সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেন অংশগ্রহণকারীরা।

আলোচনায় ফিলিস্তিনের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব পায়। অংশগ্রহণকারীরা গাজায় সহিংসতা এবং পশ্চিম তীরে মানবাধিকার লঙ্ঘন বন্ধের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ফিলিস্তিনি বন্দিদের সুরক্ষা, বিশেষ করে পবিত্র আল-আকসা মসজিদসহ ইসলামের পবিত্র স্থানগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে ইসরাইলি দখলদারিত্বের অবসানের দাবি জানান।

সম্মেলনের ঘোষণায় মুসলিম প্রতিষ্ঠান ও নেতাদের বৈধ ও দায়িত্বশীল উপায়ে ফিলিস্তিনিদের অধিকার রক্ষায় নিজেদের প্রচেষ্টা সমন্বিত করার আহ্বান জানানো হয়।

ইয়েমেন প্রসঙ্গে দেশটির ঐক্য, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার প্রতি সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন অংশগ্রহণকারীরা। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানান।

সুদানের পরিস্থিতি নিয়ে সম্মেলনে মানবিক সহায়তা বাড়ানো, রক্তপাত বন্ধ এবং দেশটিতে শান্তি, সার্বভৌমত্ব ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার আহ্বান জানানো হয়।

এ ছাড়া মিয়ানমারের রোহিঙ্গা মুসলিম এবং পূর্ব তুর্কিস্তানের মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন অংশগ্রহণকারীরা। তাদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষার প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্বারোপ করা হয়।

আফ্রিকার মুসলিম সম্প্রদায়গুলোর শিক্ষাগত, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক উন্নয়ন জোরদার করার বিষয়েও আলোচনা হয়। এ ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি এবং বিদ্যমান সম্পদের কার্যকর ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।

চরমপন্থা প্রত্যাখ্যান ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের আহ্বান

মুসলিম সংহতি জোরদারের পাশাপাশি সম্মেলনে সব ধরনের সন্ত্রাসবাদ প্রত্যাখ্যানের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করা হয়। একই সঙ্গে বিশ্বজুড়ে ক্রমবর্ধমান ইসলামবিদ্বেষ ও ধর্মীয় বিদ্বেষের বিষয়ে সতর্ক করা হয়।

মসজিদ ও গির্জাসহ বিভিন্ন উপাসনালয়ে হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, মৌলিক অধিকার সুরক্ষা এবং বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করার আহ্বান জানানো হয়।

অংশগ্রহণকারীরা বলেন, ইসলামী ঐক্যের লক্ষ্য হবে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা নয়; বরং আন্তর্জাতিক শান্তি, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং মানবিক মর্যাদা রক্ষায় অবদান রাখা।

ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা

সম্মেলনের সমাপনী পর্বে খসড়া প্রণয়ন কমিটিকে আগামী ১০ দিনের মধ্যে প্রস্তাবিত সনদটি চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। দলিলটি প্রকাশের পর বিভিন্ন ভাষায় অনুবাদ করে সভা, সেমিনার ও শিক্ষামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারের পরিকল্পনা রয়েছে।

আয়োজকদের প্রত্যাশা, প্রস্তাবিত সনদটি একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনামূলক দলিল হিসেবে কাজ করবে। এর মাধ্যমে ইসলামের অভিন্ন নীতিগুলো সম্পর্কে সচেতনতা বাড়বে, বিভিন্ন মতাদর্শের আলেমদের মধ্যে সংলাপের ক্ষেত্র তৈরি হবে এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতার ভিত্তি গড়ে উঠবে।

অভ্যন্তরীণ বিভাজন ও ক্রমবর্ধমান বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জের মুখে থাকা মুসলিম বিশ্বের জন্য প্রস্তাবিত এই সনদ একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এর লক্ষ্য কেবল ঐক্যের আহ্বান জানানো নয়; বরং সেই আহ্বানকে সুসংগঠিত, কার্যকর ও বাস্তবসম্মত যৌথ কর্মসূচিতে রূপ দেওয়া।

এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন