তারেক রহমানের নিউইয়র্ক সফর : জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ, ১১ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকসহ ৩০ কর্মসূচি

পড়তে ১ মিনিট

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান | ছবি : সংগৃহীত

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে যোগ দিতে পাঁচ দিনের যুক্তরাষ্ট্র সফর শেষে দেশে ফিরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নিউইয়র্ক সফরে তিনি জাতিসংঘের সাধারণ বিতর্কে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের পক্ষে বাংলায় ভাষণ দেওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন উচ্চপর্যায়ের সভা, আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক এবং ১১টি দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেছেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চার দিনের আনুষ্ঠানিক কর্মসূচিতে তিনি মোট ৩০টি সরকারি কর্মসূচিতে অংশ নেন।

গত ২১ সেপ্টেম্বর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে ৩৫ সদস্যের বাংলাদেশ প্রতিনিধি দল নিউইয়র্কে পৌঁছায়। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকে কেন্দ্র করে সফরজুড়ে ছিল ব্যস্ত কূটনৈতিক কর্মসূচি। ২৭ সেপ্টেম্বর সকালে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী। স্থানীয় সময় শুক্রবার রাতে নিউইয়র্ক থেকে রওনা হয়ে দুবাইয়ে যাত্রাবিরতির পর রোববার সকাল ৮টা ২০ মিনিটে তাঁর ফ্লাইট ঢাকায় পৌঁছে।

জাতিসংঘে বাংলায় প্রথম ভাষণ

২৪ সেপ্টেম্বর নিউইয়র্কের স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার বিকেলে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তাঁর প্রথম ভাষণ। বাংলাদেশের পক্ষে তিনি বাংলায় প্রায় ২১ মিনিট বক্তব্য দেন।

ভাষণের শুরুতেই তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের নতুন সভাপতিকে অভিনন্দন জানান এবং বাংলাদেশের শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। এরপর বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, বহুপক্ষীয় ব্যবস্থা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, জলবায়ু পরিবর্তন, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট এবং বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যুদ্ধ ও সংঘাতের পরিবর্তে সংলাপ, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবিকতাকে বৈশ্বিক পরিবর্তনের প্রধান হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাষ্ট্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থের সুরক্ষা, সম্মান ও মর্যাদাকে ভিত্তি করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।

বাবা-মায়ের পর সন্তান—জাতিসংঘে বিরল ইতিহাস

জাতিসংঘের মঞ্চে তারেক রহমানের ভাষণের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তাঁর পরিবারের একটি ব্যতিক্রমী ধারাবাহিকতা। তাঁর আগে তাঁর বাবা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া একই বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করে ভাষণ দিয়েছেন।

১৯৮০ সালের ২৬ আগস্ট জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ১১তম বিশেষ অধিবেশনে ভাষণ দিয়েছিলেন তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। এর ১৩ বছর পর ১৯৯৩ সালের ১ অক্টোবর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৪৮তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ভাষণ দেন খালেদা জিয়া। পরবর্তী সময়েও তিনি জাতিসংঘের বিভিন্ন সাধারণ পরিষদ ও বিশেষ অধিবেশনে বক্তব্য দেন।

এবার তাঁদের সন্তান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের মঞ্চে ভাষণ দেওয়ায় একই পরিবারের বাবা, মা ও সন্তানের এই ধারাবাহিকতা পূর্ণ হলো। বাসসের প্রতিবেদনে এটিকে পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ দেওয়ার একটি বিরল ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।

নিজের ভাষণেও প্রধানমন্ত্রী বাবা-মায়ের প্রসঙ্গ স্মরণ করেন। তিনি বলেন, এই বিশ্বমঞ্চেই তাঁর বাবা জিয়াউর রহমান এবং মা খালেদা জিয়া বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে বক্তব্য রেখেছিলেন; একইভাবে তিনিও দেশের ও জনগণের স্বার্থ এবং শান্তিময় বিশ্বসমাজের প্রত্যাশায় সেখানে দাঁড়িয়েছেন।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে জোরালো বার্তা

জাতিসংঘের ভাষণে রোহিঙ্গা সংকটকে বিশেষ গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশ নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে আশ্রয় দিয়ে আসছে। তাঁদের নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবর্তনের মধ্যেই এ সংকটের সমাধান নিহিত বলে উল্লেখ করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখা এবং সংকটের মূল কারণ সমাধানে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্যে মিয়ানমারে নিরাপদ প্রত্যাবাসনের প্রয়োজনীয়তা স্পষ্টভাবে উঠে আসে।

জলবায়ু পরিবর্তন ও বাংলাদেশের দাবি

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকির বিষয়টিও ছিল প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জলবায়ু ন্যায়বিচার, জলবায়ু অর্থায়ন এবং অভিযোজন সহায়তার ক্ষেত্রে আরও জোরালো বৈশ্বিক পদক্ষেপের আহ্বান জানান তিনি।

বাংলাদেশের পরিবেশ সুরক্ষা ও জলবায়ু মোকাবিলায় সরকারের বিভিন্ন পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। আগামী পাঁচ বছরে দেশে ২৫ কোটি গাছ লাগানোর কর্মসূচি এবং পরিচ্ছন্ন জ্বালানি ও সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগের কথা তিনি উল্লেখ করেন। বন্যা ও খরার ঝুঁকি কমাতে খাল খননের কর্মসূচির কথাও ভাষণে আসে।

সমৃদ্ধ ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের অঙ্গীকার

জাতিসংঘের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জনগণের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, সমান সুযোগ, গণতন্ত্র, মানবাধিকার, সুশাসন ও জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব দেন। তাঁর বক্তব্যে একটি সমৃদ্ধ, স্বাবলম্বী ও কল্যাণমুখী বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার উঠে আসে।

তিনি বাংলাদেশের উন্নয়ন, বিনিয়োগ পরিবেশ, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়েও বক্তব্য দেন। পাশাপাশি বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় বহুপক্ষীয় ব্যবস্থার গুরুত্ব তুলে ধরেন।

চার দিনে ৩০ কর্মসূচি, ১১ দেশের সঙ্গে বৈঠক

জাতিসংঘ অধিবেশনে অংশগ্রহণের পাশাপাশি নিউইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছিল ব্যস্ত কূটনৈতিক কর্মসূচি। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন জানান, চার দিনের সফরে প্রধানমন্ত্রী মোট ৩০টি সরকারি কর্মসূচিতে অংশ নেন। এর মধ্যে ১১টি ছিল বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক।

এ ছাড়া তিনি জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ-সংশ্লিষ্ট আটটি কর্মসূচি এবং অধিবেশনের বাইরে চারটি উচ্চপর্যায়ের অনুষ্ঠানে অংশ নেন। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থা ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গেও তাঁর একাধিক বৈঠক হয়।

সফরের বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, জনশক্তি রপ্তানি, জ্বালানি নিরাপত্তা, আঞ্চলিক সহযোগিতা, রোহিঙ্গা সংকট, স্বাস্থ্য, জলবায়ু পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক শান্তির বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়।

জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক

সফরে প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, বিশ্বব্যাংক গ্রুপের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা, মিয়ানমারবিষয়ক জাতিসংঘের বিশেষ দূত জুলি বিশপ এবং জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার হাইকমিশনার বারহাম সালেহসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন।

এসব বৈঠকে বাংলাদেশের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়। বিশেষ করে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণ, বাংলাদেশি কর্মীদের স্বার্থ সুরক্ষা, জনশক্তি রপ্তানি বাড়ানো, জ্বালানি নিরাপত্তা, খনিজ খাতে সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা সংকটের মতো বিষয় আলোচনায় আসে।

বহুপক্ষীয় কূটনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান

প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে আন্তর্জাতিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় বহুপক্ষীয়তার প্রতি বাংলাদেশের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন। জাতিসংঘের শান্তি প্রতিষ্ঠা কার্যক্রম, সংঘাত প্রতিরোধ এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শান্তির পক্ষে বাংলাদেশের ভূমিকার কথাও তুলে ধরেন।

জাতিসংঘের এবারের অধিবেশনের প্রতিপাদ্য ছিল ‘আস্থা পুনরুদ্ধার, রূপান্তর ব্যবস্থাপনা—সবার জন্য কার্যকর একটি জাতিসংঘ’। প্রধানমন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে এই প্রতিপাদ্যের প্রাসঙ্গিকতার কথা উল্লেখ করেন।

নিউইয়র্ক থেকে দেশে ফেরার যাত্রা

জাতিসংঘের কর্মসূচি শেষে স্থানীয় সময় ২৫ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১১টার দিকে এমিরেটসের নিয়মিত ফ্লাইটে নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছাড়েন প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সফরসঙ্গীরা। দুবাইয়ে প্রায় ছয় ঘণ্টার যাত্রাবিরতির পর ঢাকার উদ্দেশে আবার যাত্রা শুরু হয়।

২৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা ২০ মিনিটে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বহনকারী ফ্লাইট ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর সহধর্মিণী জুবাইদা রহমানকে ফুল দিয়ে স্বাগত জানান সরকারের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা।

বিশ্বমঞ্চ থেকে দেশের মাটিতে

প্রথমবারের মতো প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে ভাষণ, বাংলায় বাংলাদেশের বক্তব্য তুলে ধরা, বাবা ও মায়ের পর একই মঞ্চে দাঁড়িয়ে পরিবারের তৃতীয় সদস্য হিসেবে ইতিহাসের নতুন অধ্যায় যুক্ত করা এবং চার দিনের ব্যস্ত কর্মসূচিতে ১১টি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক—সব মিলিয়ে তারেক রহমানের এবারের নিউইয়র্ক সফর ছিল বহুমাত্রিক।

সরকারি হিসাবে সফরে ৩০টি কর্মসূচির পাশাপাশি জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকে বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ, অর্থনীতি, বিনিয়োগ, শ্রমবাজার, জ্বালানি, জলবায়ু, রোহিঙ্গা সংকট ও আন্তর্জাতিক শান্তির বিষয়গুলো আলোচনায় এসেছে। সফর শেষে দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী এখন এসব আন্তর্জাতিক আলোচনার বিষয়গুলো দেশের নীতি ও কর্মপরিকল্পনায় কতটা প্রতিফলিত করেন, সেটিই হবে পরবর্তী পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।


লেখক সম্পর্কে

কবি, সাংবাদিক ও গণমাধ্যমব্যক্তিত্ব

এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন