ফিলিস্তিনি এলাকাগুলোতে ইসরাইলের সহিংসতা ও ভয়ভীতি প্রদর্শন অব্যাহত

পড়তে ১ মিনিট

ফিলিস্তিনের মধ্য গাজা উপত্যকার নুসেইরাত শরণার্থী শিবির । ছবি: এএফপি


যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন অব্যাহত রেখে মঙ্গলবার গাজায় আরও তিন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করেছে ইসরাইল। একই সময়ে উগ্রপন্থী ইহুদি গোষ্ঠীগুলো হেব্রনের ইব্রাহিমি মসজিদ এবং আল-আকসা মসজিদে অনুপ্রবেশ করেছে।

গাজার আল-শিফা হাসপাতালের একটি চিকিৎসা সূত্র তুর্কি বার্তা সংস্থা আনাদোলু এজেন্সিকে (এএ) জানিয়েছে, আল-নসর এলাকার একটি অ্যাপার্টমেন্টে ইসরাইলি বিমান হামলার পর দুই ফিলিস্তিনির মরদেহ এবং বেশ কয়েকজন আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে আনা হয়।

আনাদোলুর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আল-বাতুল ভবনের একটি অ্যাপার্টমেন্ট লক্ষ্য করে ওই হামলা চালানো হয়। এতে দুই ফিলিস্তিনি নিহত এবং শিশুসহ বেশ কয়েকজন আহত হন।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, হামলার কিছুক্ষণ আগে এলাকাটিতে একটি ইসরাইলি আত্মঘাতী ড্রোন ঘোরাফেরা করছিল। পরে সেটি ওই হামলা চালায়।

তারা জানান, হামলার ফলে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে এবং অ্যাপার্টমেন্টটিতে আগুন ধরে যায়। আগুনে ভবনটির ওই অংশ সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়ে যায়।

স্থানীয় সূত্র নিহত দুই ফিলিস্তিনিকে ইজ্জ আল-দ্বীন আল-বেক এবং মুহান্নাদ আবু ফূল হিসেবে শনাক্ত করেছে।

এক যৌথ বিবৃতিতে ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরাইল কাটজ দাবি করেছেন, আল-বেক হামাসের উত্তর গাজা ব্রিগেডের একজন কমান্ডার ছিলেন।

পরে হামাস এক বিবৃতিতে আল-বেকের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে। সংগঠনটি জানায়, তিনি ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের অভিযানের অন্যতম পরিকল্পনাকারী ছিলেন। ওই অভিযানের পরই ইসরাইল গাজায় ব্যাপক সামরিক অভিযান শুরু করে।

মধ্য গাজায় ডেইর আল-বালাহর পূর্বে সালাহ আল-দিন সড়কে ইসরাইলি সেনাদের গুলিতে আরও এক ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন বলে একটি চিকিৎসা সূত্র জানিয়েছে।

আল-আকসা মার্টার্স হাসপাতালের ওই সূত্র আনাদোলুকে জানায়, ডেইর আল-বালাহর পূর্বাঞ্চলে ইসরাইলি বাহিনীর গুলিতে আহমেদ আবু মুর নিহত হওয়ার পর তার মরদেহ হাসপাতালে আনা হয়।

এদিকে প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, ইসরাইলি সামরিক বাহিনী তাদের নিয়ন্ত্রণাধীন ডেইর আল-বালাহর পূর্বাঞ্চলীয় এলাকায় ভবনগুলো লক্ষ্য করে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়েছে।

গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতি চুক্তি লঙ্ঘন করে ইসরাইলি হামলায় এ পর্যন্ত ১,৪২১ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ৪,৯৮৩ জন আহত হয়েছেন।

২০২৩ সালের ৮ অক্টোবর থেকে গাজা উপত্যকায় ইসরাইলের সামরিক অভিযানে ৭৪ হাজারেরও বেশি ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭৫ হাজারেরও বেশি আহত হয়েছেন। একই সময়ে উপত্যকাটির প্রায় ৯০ শতাংশ অবকাঠামো ধ্বংস হয়েছে।

ইব্রাহিমি মসজিদে তাণ্ডব

অধিকৃত পশ্চিম তীরে মঙ্গলবার ইসরাইলের উগ্র ডানপন্থী জাতীয় নিরাপত্তামন্ত্রী ইতামার বেন-গভির হেব্রনের ইব্রাহিমি মসজিদে অনুপ্রবেশ করেন। অন্যদিকে, প্রায় এক হাজার ইসরাইলি দখলদার অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমের আল-আকসা মসজিদে প্রবেশ করে।

ইসরাইলের চ্যানেল ১৪-এর সম্প্রচারিত ফুটেজে দেখা যায়, ইহুদি সুকোট উৎসব উপলক্ষে ইব্রাহিমি মসজিদে অনুপ্রবেশের সময় বেন-গভির সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

“আমি যখন ইব্রাহিমি মসজিদে আসি, তখন এমন এক শক্তি অনুভব করি, যা আমাকে গান গাইতে ও আনন্দ করতে উদ্বুদ্ধ করে,” হেব্রনে দীর্ঘদিন ধরে বসবাসকারী এই ইসরাইলি মন্ত্রী সফরের সময় চ্যানেলটিকে বলেন।

সাক্ষাৎকারের সময় তার পেছনে শত শত ইহুদি বসতি স্থাপনকারীকে দেখা যায়।

ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ সোমবার ঘোষণা করেছিল, সুকোট উৎসব চলাকালে ইব্রাহিমি মসজিদ মুসলিম মুসল্লিদের জন্য বন্ধ থাকবে।

ফিলিস্তিনের ওয়াকফ ও ধর্ম বিষয়ক মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানায়, “এই বন্ধের মধ্যে মসজিদে নামাজ ও আজান দেওয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞাও রয়েছে, যাতে ইহুদি ছুটির দিনগুলোতে দখলদাররা এর নিয়ন্ত্রণ নিতে পারে এবং এর পবিত্রতা লঙ্ঘন করতে পারে।”

মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, “এই পদক্ষেপগুলো ইব্রাহিমি মসজিদের পবিত্রতার ওপর একটি নগ্ন হামলা। এগুলো মুসলমানদের ইবাদতের স্বাধীনতা ও ধর্মীয় আচার পালনের অধিকারকে ক্ষুণ্ন করে।” মন্ত্রণালয় জোর দিয়ে বলেছে, মসজিদটি “একটি একচেটিয়া ইসলামি ওয়াকফ সম্পদ।”

মন্ত্রণালয় সতর্ক করে দিয়ে বলেছে, ইসরাইলি পদক্ষেপ এবং মসজিদে সাময়িক ও স্থানিক বিভাজন আরোপের চেষ্টা গুরুতর পরিণতি ডেকে আনতে পারে।

ইব্রাহিমি মসজিদ হেব্রনের পুরোনো শহরে অবস্থিত। এলাকাটি সম্পূর্ণ ইসরাইলি নিয়ন্ত্রণাধীন। সেখানে প্রায় ১,৫০০ ইসরাইলি সেনার নিরাপত্তায় প্রায় ৪০০ ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারী বসবাস করে।

১৯৯৪ সালে এক ইহুদি দখলদারের হামলায় ইব্রাহিমি মসজিদে ২৯ জন ফিলিস্তিনি মুসল্লি নিহত হওয়ার পর ইসরাইল মসজিদটি বিভক্ত করে। এর ৬৩ শতাংশ ইহুদিদের এবং ৩৭ শতাংশ মুসলমানদের জন্য নির্ধারণ করা হয়।

ইসরাইলি কর্তৃপক্ষের একতরফা ব্যবস্থার অধীনে ইহুদি ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষে প্রতি বছর ১০ দিন মসজিদটি মুসলমানদের জন্য সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। একইভাবে ইসলামি ধর্মীয় উৎসবের সময় ১০ দিন ইহুদিদের জন্য মসজিদটি বন্ধ রাখা হয়।

২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে ধর্মীয় উৎসবের সময়ও মসজিদটি মুসলমানদের জন্য পুরোপুরি উন্মুক্ত করা হয়নি।

আল-আকসায় অনুপ্রবেশ

জেরুজালেমের ইসলামিক ওয়াকফ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমে মঙ্গলবার সকালে ৯৬৬ জন ইসরাইলি দখলদার আল-আকসা মসজিদে অনুপ্রবেশ করে।

ইসরাইলের উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর প্রচারিত ভিডিও ও ছবিতে দেখা যায়, দখলদাররা বিশেষ করে মসজিদ প্রাঙ্গণের পূর্বাঞ্চলে তালমুদিক ধর্মীয় আচার ও প্রার্থনা পালন করছে। তাদের গান গাইতে ও নাচতেও দেখা যায়।

আনাদোলুর প্রতিনিধি জানান, জোহরের নামাজের পর দখলদাররা আবারও মসজিদে প্রবেশ করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল।

উগ্র ডানপন্থী গোষ্ঠীগুলো সুকোট উৎসবের সময় আল-আকসায় ব্যাপক অনুপ্রবেশের আহ্বান জানিয়েছে। ইসলামিক ওয়াকফ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, রবিবার ১,৫০০-এরও বেশি এবং সোমবার বেন-গভিরসহ ১,৭০০-এরও বেশি ইসরাইলি দখলদার মসজিদে অনুপ্রবেশ করে।

আল-আকসা মসজিদ মুসলমানদের জন্য বিশ্বের তৃতীয় পবিত্রতম স্থান। ইহুদিরা এই এলাকাকে ‘টেম্পল মাউন্ট’ বলে অভিহিত করে এবং তাদের দাবি, প্রাচীনকালে এখানে দুটি ইহুদি মন্দির ছিল।

ইসরাইলি পুলিশ ২০০৩ সালে ইসরাইলি দখলদারদের আল-আকসা প্রাঙ্গণে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া শুরু করে। এরপর থেকে এ ধরনের অনুপ্রবেশের সংখ্যা বেড়েছে। ইসলামিক ওয়াকফ বিভাগ বারবার এসব অনুপ্রবেশ বন্ধের দাবি জানিয়ে আসছে। তবে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষ এখনো তাতে সাড়া দেয়নি।

ইহুদি ধর্মীয় উৎসবের সময়কাল ১২-১৩ সেপ্টেম্বর রোশ হাশানাহ দিয়ে শুরু হয়। এরপর ২১-২২ সেপ্টেম্বর পালিত হয় ইয়োম কিপুর। সুকোট উৎসব চলে ২৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২ অক্টোবর পর্যন্ত। এর পর ৩ অক্টোবর পালিত হয় সিমচাত তোরাহ।

ফিলিস্তিনিরা অধিকৃত পূর্ব জেরুজালেমকে—যেখানে আল-আকসা মসজিদ অবস্থিত—ভবিষ্যৎ ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে বিবেচনা করে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ১৯৬৭ সালে ইসরাইলের জেরুজালেম দখল এবং ১৯৮০ সালে শহরটিকে নিজেদের সঙ্গে সংযুক্ত করার সিদ্ধান্তকে স্বীকৃতি দেয়নি।

ইসরাইল ১৯৪৮ সালে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডে সশস্ত্র ইহুদি-জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। ওই সময় ব্যাপক সহিংসতা ও উচ্ছেদের ফলে অন্তত ৭ লাখ ৫০ হাজার ফিলিস্তিনি বাস্তুচ্যুত হন।

পরবর্তীতে ইসরাইল অবশিষ্ট ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডেরও বিভিন্ন অংশ দখল করে এবং জাতিসংঘের প্রস্তাব অনুযায়ী দখলকৃত ভূখণ্ড থেকে প্রত্যাহার ও ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আহ্বান প্রত্যাখ্যান করে আসছে।

সূত্র : ডেইলি সাবাহ


এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন