ডিজিটাল বিভ্রান্তির (ডিজিটাল মিসইনফর্মেশন) তাত্ত্বিক ভিত্তি
লেখক:
ডিজিটাল মিসইনফরমেশনের তাত্ত্বিক ভিত্তি | ছবি : সংগৃহীত
কীভাবে বিভ্রান্তিকর মিডিয়া শত্রু (Enemy), নায়ক (Hero) ও নাগরিকের পরিচয় নতুনভাবে তৈরি করে? কীভাবে তাদের একটি নির্দিষ্ট ও একমুখী ভাবমূর্তির মধ্যে আটকে ফেলা হয় এবং পরে সেই ভাবমূর্তিকে নিজেদের উদ্দেশ্য পূরণে ব্যবহার করা হয়?
এই নিবন্ধে এই প্রক্রিয়াটি বোঝার জন্য ছয়টি ধাপের একটি মডেল তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখানো হয়েছে, কীভাবে বিভ্রান্তিকর সংবাদমাধ্যম মানুষের মনে শত্রু, নায়ক ও নাগরিকের একটি নির্দিষ্ট ছবি তৈরি করে। পাশাপাশি বিভিন্ন পরিস্থিতিতে এই পদ্ধতি কীভাবে কাজ করে, তাও ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
এখানে মূল বক্তব্য হলো—‘স্টিরিওটাইপ’ বা বাঁধাধরা ধারণা শুধু মানুষের মনের একটি ভুল ধারণা নয়। এটি অনেক সময় পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা হয় এবং মানুষের চিন্তা ও আচরণকে প্রভাবিত করার কাজে ব্যবহার করা হয়। এর মাধ্যমে ব্যক্তি, সমাজ ও ক্ষমতার সম্পর্কও নতুনভাবে গড়ে উঠতে পারে।
প্রথম অংশ: মিডিয়া কীভাবে বাঁধাধরা ধারণা তৈরি করে?
এই আলোচনায় শুধু ভুল তথ্য কীভাবে তৈরি ও ছড়ানো হয়, তা দেখা হচ্ছে না। বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে—বিভ্রান্তিকর মিডিয়া কীভাবে মানুষের মনে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা ঘটনা সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট ধারণা তৈরি করে।
“যখন ছবি নিজেই বাস্তবের চেয়েও বেশি বাস্তব হয়ে ওঠে এবং গ্রহীতা মূল ও নকলের মধ্যে পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়...”
ছবি মানুষের মনে খুব দ্রুত প্রভাব ফেলে। এটি শুধু কোনো বিষয় দেখানোর মাধ্যম নয়; মানুষের চিন্তা ও স্মৃতিতেও এর গভীর প্রভাব রয়েছে। প্রজ্ঞামূলক স্নায়ুবিজ্ঞানের (Cognitive Neuroscience) গবেষণা অনুযায়ী, লিখিত লেখার তুলনায় মানুষের মস্তিষ্ক ছবি বা ভিজ্যুয়াল অনেক দ্রুত বিশ্লেষণ করতে পারে। এ কারণেই মানুষের মনে কোনো ধারণা তৈরি করা এবং তা দীর্ঘদিন ধরে ধরে রাখার ক্ষেত্রে ছবি খুব কার্যকর।
এর প্রাথমিক উদাহরণ পাওয়া যায় গুহাচিত্রে। হাজার হাজার বছর আগে মানুষ ছবি এঁকে নিজেদের অভিজ্ঞতা, বিশ্বাস ও স্মৃতি প্রকাশ করত। আজকের দিনে রিলস, মিমস, ছবি ও ছোট ভিডিও একই কাজ করছে, তবে আরও আধুনিক ও দ্রুতগতির মাধ্যমে।
অর্থাৎ, মাধ্যম বদলেছে; কিন্তু উদ্দেশ্যের অনেকটাই একই রয়েছে—মানুষকে কোনো বিষয় সম্পর্কে একটি নির্দিষ্ট ধারণা দেওয়া, সেই ধারণাকে মনে গেঁথে দেওয়া এবং তার মাধ্যমে মানুষের চিন্তাকে প্রভাবিত করা।
ফরাসি চিন্তাবিদ জাঁ বোদ্রিয়ার (Jean Baudrillard) তাঁর Simulacra ধারণায় দেখিয়েছেন, কখনো কখনো মানুষের কাছে কোনো ছবিই বাস্তবতার চেয়ে বেশি সত্য বলে মনে হতে পারে। তখন মানুষ আসল ঘটনা ও তার তৈরি করা ছবির মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না।
মনোবিজ্ঞানী কার্ল জং (Carl Jung)-এর চিন্তার সঙ্গেও এর কিছু মিল রয়েছে। জং মনে করতেন, প্রতীক ও ছবি মানুষের অবচেতন মনে গভীরভাবে প্রভাব ফেলে। ফলে কোনো ছবি বা প্রতীক অনেক সময় যুক্তি দিয়ে যাচাই করার আগেই মানুষের মনে একটি ধারণা তৈরি করে দিতে পারে।
তাত্ত্বিক কাঠামো: মানসিক ছবি থেকে স্টিরিওটাইপ
মানসিক ছবি (Mental Image)
মানসিক ছবি বলতে কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী, ঘটনা বা ধারণা সম্পর্কে আমাদের মনের ভেতরে তৈরি হওয়া একটি ধারণাকে বোঝায়।
যেমন, কোনো দেশ, জাতি বা নির্দিষ্ট একটি গোষ্ঠী সম্পর্কে আমরা যা জানি বা যা শুনেছি, সেসব মিলিয়ে আমাদের মনে তাদের একটি ছবি তৈরি হয়। এই ছবি আমাদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, সামাজিক পরিবেশ এবং মিডিয়ায় দেখা বিভিন্ন বিষয়ের মাধ্যমে তৈরি হয়।
এই মানসিক ছবি স্থির নয়। নতুন তথ্য বা অভিজ্ঞতা পেলে এটি পরিবর্তিত হতে পারে।
কিন্তু বিভ্রান্তিকর মিডিয়া এই পরিবর্তনশীল মানসিক ছবিকেই একটি নির্দিষ্ট দিকে নিয়ে যেতে পারে। একই ধরনের তথ্য বারবার দেখিয়ে কোনো একটি ধারণাকে মানুষের মনে স্থায়ী করে তোলা সম্ভব।
বাঁধাধরা ধারণা বা স্টিরিওটাইপ (Stereotype)
স্টিরিওটাইপ হলো কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সম্পর্কে অতিরিক্ত সরল ও একমুখী ধারণা।
একটি পুরো গোষ্ঠীর মানুষকে কয়েকটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যের মধ্যে আটকে দেওয়াই এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য। যেমন—একজন ব্যক্তির আচরণের ভিত্তিতে পুরো একটি গোষ্ঠী সম্পর্কে একই ধারণা তৈরি করা।
স্টিরিওটাইপ শুধু তথ্যের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে না। এর সঙ্গে ভয়, ঘৃণা, রাগ, অবজ্ঞা কিংবা অতিরিক্ত প্রশংসার মতো আবেগও যুক্ত হতে পারে।
এ ধরনের ধারণার ফলে একটি জটিল বিষয়কে খুব সহজ করে দেখানো হয়। একই সঙ্গে কোনো গোষ্ঠীর প্রতি বৈষম্য বা তাদের ওপর আধিপত্যকেও যুক্তিসঙ্গত বলে মনে হতে পারে।
মানসিক ছবি ও স্টিরিওটাইপের পার্থক্য
প্রতিটি স্টিরিওটাইপই একটি মানসিক ছবি। কিন্তু প্রতিটি মানসিক ছবি স্টিরিওটাইপ নয়।
মানসিক ছবি পরিবর্তনশীল ও তুলনামূলকভাবে জটিল হতে পারে। কিন্তু স্টিরিওটাইপ হলো এমন একটি মানসিক ছবি, যা ধীরে ধীরে একমুখী ও অনমনীয় হয়ে যায়। তখন নতুন তথ্য বা বিপরীত প্রমাণও সেই ধারণা সহজে পরিবর্তন করতে পারে না।
মস্তিষ্কের সহজ পথই যখন বিভ্রান্তির হাতিয়ার
প্রতিদিন আমরা বিপুল পরিমাণ তথ্য পাই। মানুষের মস্তিষ্কের পক্ষে প্রতিটি তথ্য আলাদাভাবে যাচাই করা সম্ভব নয়। তাই দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য মস্তিষ্ক কিছু Heuristics বা জ্ঞানীয় সংক্ষিপ্ত পথ ব্যবহার করে।
সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন কেউ এই মানসিক প্রক্রিয়াকে নিজের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে।
বিভ্রান্তিকর মিডিয়া শুধু ভুল তথ্য ছড়ায় না। এটি এমন একটি কাঠামো তৈরি করে, যার মাধ্যমে মানুষ পৃথিবী, অন্য মানুষ এবং নিজের অবস্থানকে একটি নির্দিষ্টভাবে দেখতে শুরু করে।
ফলে একজন প্রতিবেশীকে শত্রু, একজন নাগরিককে দেশদ্রোহী কিংবা একটি ন্যায্য দাবিকে ষড়যন্ত্র হিসেবে দেখানো সম্ভব হয়।
ডিজিটাল মিডিয়ার কারণে এই প্রক্রিয়া আরও দ্রুত হয়েছে। বারবার একই ধরনের ছবি, ভিডিও, শিরোনাম ও বক্তব্য দেখানোর মাধ্যমে একটি পরিবর্তনশীল ধারণাকে দ্রুত একটি শক্ত ও স্থায়ী স্টিরিওটাইপে পরিণত করা যায়।
ছবির স্নায়বিক ও মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি
প্রতীক, মানসিক ছবি, স্টিরিওটাইপ ও মিডিয়ায় ব্যবহৃত ছবির মধ্যে পার্থক্য থাকলেও এগুলোর একটি সাধারণ মনস্তাত্ত্বিক ভিত্তি রয়েছে।
বিভ্রান্তিকর মিডিয়া মানুষের এই মানসিক বৈশিষ্ট্যকে কাজে লাগিয়ে নমনীয় মানসিক ছবিকে অনমনীয় স্টিরিওটাইপে পরিণত করে। বিশেষ করে মানুষের সমালোচনামূলক চিন্তার দুর্বলতা এবং একই তথ্য বারবার দেখলে সেটিকে সত্য বলে মনে করার প্রবণতা এখানে কাজে লাগানো হয়।
কীভাবে মানসিক ছবি স্টিরিওটাইপে পরিণত হয়: ছয় ধাপের মডেল
সামাজিক মনোবিজ্ঞান ও ক্রিটিক্যাল ডিসকোর্স অ্যানালাইসিসের ভিত্তিতে এই প্রক্রিয়াটিকে ছয়টি ধাপে ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
ধাপ শূন্য: স্বাভাবিক মানসিক ছবি
কোনো গোষ্ঠী সম্পর্কে মানুষের প্রাথমিক ধারণা সাধারণত অস্পষ্ট, অসম্পূর্ণ বা জটিল থাকে। এই অবস্থাটিই বিভ্রান্তিকর মিডিয়ার জন্য ‘কাঁচামাল’ হিসেবে কাজ করে।
ধাপ এক: নামকরণ (Labeling)
প্রথমে কোনো গোষ্ঠীকে একটি সহজ ও মনে রাখার মতো নাম দেওয়া হয়। যেমন—‘বিশ্বাসঘাতক’, ‘এজেন্ট’ বা ‘চরমপন্থী’।
এর ফলে একটি জটিল গোষ্ঠীকে একটি মাত্র পরিচয়ের মধ্যে আটকে ফেলা সহজ হয়।
ধাপ দুই: বৈশিষ্ট্য আরোপ (Attribution)
এরপর সেই গোষ্ঠীর ওপর একটি নেতিবাচক বৈশিষ্ট্য বারবার আরোপ করা হয়।
যেমন—‘তারা আমাদের দেশকে ঘৃণা করে’ বা ‘তারা আমাদের অর্থ চুরি করে’।
এভাবে শুধু একটি নাম দেওয়ার বদলে সেই নামের সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট নেতিবাচক ধারণাও যুক্ত হয়ে যায়।
ধাপ তিন: পুনরাবৃত্তি (Repetition)
এরপর মিডিয়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্ট, সংবাদ ও বিশ্লেষণে একই নাম ও ধারণা বারবার প্রচার করা হয়।
একই কথা বারবার শুনতে শুনতে মানুষের কাছে তা পরিচিত হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে প্রমাণ ছাড়াই সেটিকে সত্য বলে মনে হতে পারে।
ধাপ চার: অতিরিক্ত সাধারণীকরণ (Overgeneralization)
এরপর কোনো গোষ্ঠীর একজন ব্যক্তির নেতিবাচক কাজকে পুরো গোষ্ঠীর চরিত্র হিসেবে দেখানো হয়।
অন্যদিকে, ওই গোষ্ঠীর ইতিবাচক কাজগুলো উপেক্ষা করা হয় বা ব্যতিক্রম হিসেবে দেখানো হয়।
ফলে গোষ্ঠীর ভেতরের বৈচিত্র্য হারিয়ে যায় এবং সবাইকে একই রকম মনে হতে থাকে।
ধাপ পাঁচ: আবেগের সঙ্গে যুক্ত করা (Emotional Anchoring)
এবার ওই ধারণার সঙ্গে ভয়, রাগ বা ঘৃণার মতো শক্তিশালী আবেগ যুক্ত করা হয়।
উত্তেজক ছবি, ভিডিও, সঙ্গীত কিংবা বক্তব্যের মাধ্যমে এটি করা হতে পারে।
এর ফলে মানুষ অনেক সময় যুক্তি দিয়ে বিষয়টি যাচাই করার আগেই আবেগের ভিত্তিতে প্রতিক্রিয়া দেখায়।
ধাপ ছয়: ধারণাটিকে স্থায়ী করা (Fixation)
শেষ পর্যায়ে ধারণাটি এতটাই শক্ত হয়ে যায় যে, বিপরীত প্রমাণ থাকলেও মানুষ তা সহজে পরিবর্তন করতে চায় না।
তখন ওই গোষ্ঠীকে মানুষের মনে এমন এক ‘শত্রু’ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়, যার সঙ্গে আলোচনা বা সমঝোতা করাও অসম্ভব বলে মনে হতে পারে।
এই মডেল কীভাবে কাজে লাগে?
১. শত্রু তৈরি (Enemy Making)
বিভ্রান্তিকর মিডিয়া কোনো রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা জাতিগত গোষ্ঠীকে এমনভাবে উপস্থাপন করতে পারে, যেন তারা সমাজ বা দেশের অস্তিত্বের জন্য হুমকি।
এটি শুধু একটি বক্তব্যের মাধ্যমে হয় না। ধাপে ধাপে একটি নির্দিষ্ট ধারণা মানুষের মনে তৈরি করা হয়।
এর ফলে মানুষের ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকৃত সমস্যা থেকে সরিয়ে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়। এটিকে এক ধরনের ‘সামাজিক প্রকৌশল’ (Social Engineering) বলা যেতে পারে।
এটি সাধারণত তিনভাবে দেখা যায়:
রাজনৈতিক বক্তব্য: রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে বিশ্বাসঘাতক বা বিদেশি এজেন্ট হিসেবে দেখানো হয়। এতে তাদের সঙ্গে আলোচনা না করার এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার যুক্তি তৈরি হয়।
সাম্প্রদায়িক বক্তব্য: অন্য ধর্ম বা মতের মানুষকে সাধারণ নাগরিক হিসেবে না দেখে পথভ্রষ্ট বা কাফের হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এতে সামাজিক বিরোধ আরও তীব্র হতে পারে।
জাতীয়তাবাদী বক্তব্য: দেশের কোনো জনগোষ্ঠী বা অন্য কোনো জাতিকে জাতীয় পরিচয়ের জন্য হুমকি হিসেবে তুলে ধরা হয়। এর ফলে বর্জন, বৈষম্য বা সংঘাতের পরিবেশ তৈরি হতে পারে।
২. নায়ক তৈরি (Hero Making)
বিভ্রান্তিকর মিডিয়া শুধু শত্রু তৈরি করে না; একইভাবে নায়কও তৈরি করতে পারে।
এক্ষেত্রে কোনো ব্যক্তি বা প্রতীককে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয়, যেন তার কোনো ভুল বা দুর্বলতা নেই। তার মানবিক দিক ও সীমাবদ্ধতাগুলো আড়াল করে তাকে একটি নিখুঁত প্রতীকে পরিণত করা হয়।
সংকটের সময় মানুষ যখন নিরাপত্তা বা নেতৃত্বের জন্য উদ্বিগ্ন থাকে, তখন একজন ‘রক্ষাকর্তা’কে ঘিরে এমন ধারণা তৈরি করা সহজ হয়।
এরিক ফ্রম (Erich Fromm) তাঁর Escape from Freedom বইয়ে দেখিয়েছেন, সামাজিক ভয় এমন পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যেখানে মানুষ প্রশ্নহীন নেতৃত্বের দিকে ঝুঁকে পড়ে। তখন সেই নেতার সমালোচনাকেও দেশদ্রোহিতা হিসেবে দেখা হতে পারে।
নায়ক তৈরির কয়েকটি ক্ষেত্র হলো:
রাজনৈতিক বক্তব্য: কোনো নেতাকে জাতি বা দেশের রক্ষক হিসেবে তুলে ধরা হয়। তার সাফল্যকে বড় করে দেখানো হয় এবং ভুলগুলোকে ‘ত্যাগ’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়।
ক্রীড়া মিডিয়া: খেলোয়াড়কে শুধু খেলোয়াড় হিসেবে না দেখে জাতীয় পরিচয়ের প্রতীক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। নোয়াম চমস্কি (Noam Chomsky) খেলাধুলার এই দিককে অন্ধ দেশপ্রেম তৈরির একটি মাধ্যম হিসেবে সমালোচনা করেছেন। বেনেডিক্ট অ্যান্ডারসন (Benedict Anderson)-এর ‘কল্পিত সম্প্রদায়’ ধারণার আলোকে খেলাধুলা দূরে থাকা মানুষদের মধ্যেও এক ধরনের ঐক্যবোধ তৈরি করতে পারে। পিয়ের বোর্দিও (Pierre Bourdieu)-র ‘প্রতীকী মূলধন’ ধারণার আলোকে এটি সামাজিক মর্যাদা ও শ্রেণিবিন্যাসকেও প্রভাবিত করতে পারে।
পপ কালচার: নাটক, সিনেমা বা মিমের কোনো চরিত্রকে নৈতিক আদর্শ হিসেবে মানুষের মনে প্রতিষ্ঠা করা হয়।
মূল প্যারাডক্স: শত্রু ও নায়ক তৈরির পদ্ধতি আসলে অনেকটা একই। পার্থক্য শুধু দিকের। শত্রুর ক্ষেত্রে ঘৃণা তৈরি করা হয়, আর নায়কের ক্ষেত্রে অন্ধ আনুগত্য তৈরি করা হয়। দুটিই মানুষের চিন্তা ও আচরণকে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হতে পারে।
৩. ‘সুনাগরিক’ কারা—তার সংজ্ঞা বদলে দেওয়া
বিভ্রান্তিকর মিডিয়া শুধু শত্রু ও নায়ক তৈরি করে না। এটি ‘ভালো নাগরিক’ বলতে কাকে বোঝানো হবে, সেই ধারণাটিও বদলে দিতে পারে।
সাধারণভাবে একজন ভালো নাগরিককে সমাজে গঠনমূলক ভূমিকা রাখা, আইন মানা এবং অন্যের অধিকারকে সম্মান করার মাধ্যমে চিহ্নিত করা হয়।
কিন্তু বিভ্রান্তিকর প্রচারে ‘ভালো নাগরিক’-এর সংজ্ঞা ভিন্ন হতে পারে।
স্বৈরাচারী বক্তব্যে: ভালো নাগরিক সেই ব্যক্তি, যে সরকারের বক্তব্য প্রশ্নহীনভাবে মেনে চলে।
চরমপন্থী বা ধর্মীয় বক্তব্যে: ভালো নাগরিক হিসেবে তাকে দেখানো হয়, যে ধর্মের একটি সংকীর্ণ ব্যাখ্যা মেনে চলে এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের গ্রহণ করে না।
সংকীর্ণ আদর্শিক বক্তব্যে: যে ব্যক্তি নিজের গোষ্ঠীগত পরিচয়কে মেনে চলে এবং অন্যদের বর্জন করে, তাকেই আদর্শ নাগরিক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।
চূড়ান্ত প্যারাডক্স: শত্রু, নায়ক ও নাগরিক
এই তিন ধরনের প্রচারের মূল লক্ষ্য একই—মানুষের চিন্তা ও আচরণকে একটি নির্দিষ্ট দিকে পরিচালিত করা।
শত্রু তৈরি করা হয় ঘৃণার মাধ্যমে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে। নায়ক তৈরি করা হয় আনুগত্যের মাধ্যমে মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে। আর ‘সুনাগরিক’-এর নতুন সংজ্ঞা দিয়ে ঠিক করা হয়, সমাজে কাকে গ্রহণ করা হবে এবং কাকে বাদ দেওয়া হবে।
অর্থাৎ, নাগরিকের সচেতনতা ও দায়িত্ববোধ ধীরে ধীরে রূপ নিতে পারে শুধু মিডিয়ার বক্তব্য অনুসরণ করা এবং তার ভিত্তিতে প্রতিক্রিয়া দেখানোর মধ্যে।
‘ম্যানুফ্যাকচারিং কনসেন্ট’ ও ‘হাইপার-রিয়েলিটি’
এই প্রক্রিয়াটি বোঝার জন্য দুটি গুরুত্বপূর্ণ তাত্ত্বিক ধারণা সামনে আসে।
১. ‘Manufacturing Consent’ বা ‘সম্মতি উৎপাদন’
নোয়াম চমস্কি ও এডওয়ার্ড হারম্যানের এই মডেল অনুযায়ী, মিডিয়া সব সময় শুধু সত্য তুলে ধরার কাজ করে না; অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থও মিডিয়ার বিষয় নির্বাচন ও উপস্থাপনাকে প্রভাবিত করতে পারে।
কোন বিষয় প্রচার করা হবে, কোন বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হবে, কাকে নায়ক বা ভিলেন হিসেবে দেখানো হবে—এসব সিদ্ধান্তের মাধ্যমে মানুষের মনে থাকা মানসিক ছবিও বদলে যেতে পারে।
২. ‘Hyperreality’ বা ‘অতি-বাস্তবতা’
জাঁ বোদ্রিয়ারের ধারণা হলো, আধুনিক মিডিয়া কখনো কখনো বাস্তবতার শুধু ছবি তুলে ধরে না; বরং এমন একটি নতুন বাস্তবতা তৈরি করে, যা একপর্যায়ে মানুষের কাছে আসল বাস্তবতার চেয়েও বেশি সত্য বলে মনে হয়।
তখন মিডিয়ায় তৈরি ছবিই মানুষের কাছে বাস্তবতার প্রধান মানদণ্ড হয়ে ওঠে। এখানেই বিভ্রান্তির সবচেয়ে বড় বিপদ।
চমস্কি ও বোদ্রিয়ারের ধারণার সংযোগ
চমস্কি দেখান, কীভাবে মানুষের সম্মতি তৈরি করা হয়।
বোদ্রিয়ার দেখান, কীভাবে মিডিয়ার তৈরি ধারণা একসময় বাস্তবতার জায়গা দখল করতে পারে।
আর এই দুটির মধ্যে সংযোগ তৈরি করে এই লেখায় আলোচিত ছয় ধাপের মডেলটি।
উপসংহার
উপরিউক্ত অংশে আমরা দেখেছি, কীভাবে মানুষের মনে থাকা একটি সাধারণ বা পরিবর্তনশীল ধারণা ধীরে ধীরে একটি শক্ত ও বাঁধাধরা ধারণায় পরিণত হতে পারে।
এটি সব সময় স্বাভাবিকভাবে ঘটে না। কখনো কখনো পরিকল্পিতভাবে একই নাম, একই বৈশিষ্ট্য, একই ছবি ও একই আবেগ বারবার ব্যবহার করে একটি নির্দিষ্ট ধারণা মানুষের মনে স্থায়ী করে দেওয়া হয়।
তাই স্টিরিওটাইপকে শুধু একটি ভুল ধারণা হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যায় না। এটি কখনো কখনো সচেতনতা ও জনমত প্রভাবিত করার একটি কাঠামোগত হাতিয়ার হিসেবেও কাজ করতে পারে।
উল্লেখ্য, নিবন্ধের দ্বিতীয় অংশে ছবির নৃবিজ্ঞানের (Anthropological) শিকড় অনুসন্ধান করা হবে। সেখানে গুহাচিত্র থেকে শুরু করে পাণ্ডুলিপি, কবিতা ও অলংকরণ হয়ে ডিজিটাল যুগের অ্যালগরিদম ও মিমস পর্যন্ত ছবির দীর্ঘ যাত্রা নিয়ে আলোচনা করা হবে।
লেখক : মিডিয়ায় স্নাতক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কে ডিপ্লোমাধারী, সিরিয়া



