বাংলাদেশের ডেঙ্গু সংকট : মৃত্যুর মিছিলে জনআতঙ্ক ও প্রতিরোধে টিকাদানের দাবি
লেখক:


বাংলাদেশের ডেঙ্গু সংকট ও ড. শাহজাহান খান OAM
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশা নিধন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, টিকাদানের উপযোগিতা মূল্যায়ন, হাসপাতালের প্রস্তুতি জোরদার এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য নিশ্চিত করার সমন্বিত জাতীয় কৌশল এখন অত্যন্ত জরুরি।
সম্প্রতি আমাদের এক নিকটাত্মীয় ঢাকার একটি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। তার বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর। সে ছিল একজন স্কুলছাত্রী। তার বাবা চিকিৎসক, দাদাও চিকিৎসক এবং চাচাদের মধ্যেও কয়েকজন চিকিৎসক রয়েছেন। পরিবারের চিকিৎসাবিষয়ক জ্ঞান ও সর্বাত্মক চেষ্টা সত্ত্বেও তার অকালমৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হয়নি।
সে শুধু শ্রেণিকক্ষেই মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল না, খেলাধুলা ও অন্যান্য সহশিক্ষা কার্যক্রমেও ছিল চ্যাম্পিয়ন। তার দুই ছোট বোনও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। সৌভাগ্যক্রমে তারা বেঁচে গেলেও তাদের যথেষ্ট কষ্ট ও যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে। এই পরিবার, বিশেষ করে তার বাবা-মা ও বোনেরা এমন এক অপূরণীয় ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে, যা কোনো পরিবারেরই সহ্য করার কথা নয়।
এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয়, ডেঙ্গু কারও শিক্ষা, পেশা, সামাজিক অবস্থান কিংবা চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ বিবেচনা করে আক্রমণ করে না।
ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমি কোনো বিড়ম্বনা নয়, যা মানুষকে নীরবে সহ্য করে যেতে হবে। এটি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকট। এ সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন জরুরি, দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ। প্রতিটি প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু আমাদের সামনে প্রশ্ন তুলে ধরে—আর কী করা সম্ভব ছিল এবং অন্যদের জীবন রক্ষায় এখন কোন পরিবর্তনগুলো আনা জরুরি?
সংক্রমণ ও মৃত্যুর উদ্বেগজনক চিত্র
বাংলাদেশে বারবার ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর ভয়াবহতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখানে উল্লেখ করা বছরগুলোর মধ্যে ২০২৩ সাল ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। ওই বছর দেশে ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন এবং ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়।
২০২৪ ও ২০২৫ সালেও ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য। ২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, চলতি বছরে ১ লাখ ২৩ হাজার ৯৪৮ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন এবং ৩৮৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। উল্লেখ্য, এসব পরিসংখ্যান চলতি বছরের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য; এগুলো চূড়ান্ত বার্ষিক হিসাব নয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর নিবন্ধিত সংখ্যা নিচে তুলে ধরা হলো।
বছর | আক্রান্তের সংখ্যা | মৃত্যুর সংখ্যা |
|---|---|---|
২০১৬ | ৬,০৬০ | ১৪ |
২০১৭ | ২,৭৬৯ | ৮ |
২০১৮ | ১০,১৪৮ | ২৬ |
২০১৯ | ১,০১,৩৫৪ | ১৭৯ |
২০২০ | ১,১৯৩ | ৩ |
২০২১ | ২৮,৪২৯ | ১০৫ |
২০২২ | ৬১,৭৩২ | ২৮১ |
২০২৩ | ৩,২১,১৭৯ | ১,৭০৫ |
২০২৪ | ১,০১,২১৪ | ৫৭৫ |
২০২৫ | ১,০২,৮৬১ | ৪১৩ |
২০২৬* | ১,২৩,৯৪৮ | ৩৮৪ |
সূত্র: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু ড্যাশবোর্ড। ২০২৬ সালের তথ্য ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত।
এই পরিসংখ্যান মূলত হাসপাতালে ভর্তি হয়ে শনাক্ত হওয়া ও নথিভুক্ত রোগীর সংখ্যা নির্দেশ করে; সমাজে সংক্রমিত প্রত্যেক ব্যক্তির হিসাব এতে অন্তর্ভুক্ত নয়। প্রকৃত সংক্রমণের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ আক্রান্ত সবাই চিকিৎসাসেবা নেন না কিংবা তাঁদের সবার রোগ নির্ণয় নিশ্চিত হয় না। তা সত্ত্বেও, এই পরিসংখ্যান পরিবার, হাসপাতাল ও জাতীয় অর্থনীতির ওপর ডেঙ্গুর বিপুল চাপের চিত্র তুলে ধরে।
প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে একটি শোকাহত পরিবার। প্রতিটি হাসপাতালে ভর্তির পেছনে রয়েছে যন্ত্রণা, অনিশ্চয়তা এবং জীবনসংহারী জটিলতার আশঙ্কা নিয়ে লড়াই করা একজন মানুষ। এগুলো সরকারি প্রতিবেদনের নিছক কিছু সংখ্যা নয়; প্রতিটি সংখ্যা একটি মানবজীবনের গল্প এবং দেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতির প্রতিচ্ছবি।
কেন আমরা এখনো এতটা অরক্ষিত?
ডেঙ্গু মূলত সংক্রমিত এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। এসব মশা মানুষের বসতবাড়ি ও আশপাশের পরিবেশে বংশবিস্তার করে। বিভিন্ন ধরনের পাত্র, পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের সামগ্রী, ফুলের টব, ছাদের নালা, নির্মাণাধীন ভবন, খোলা পানির পাত্র এবং যেখানে পানি জমে থাকে, এমন অন্যান্য স্থান মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে।
ডেঙ্গুর সমস্যা শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এবং শহর ও গ্রাম—উভয় এলাকার মানুষকে আক্রান্ত করছে। ঘনবসতি, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দুর্বল পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা, অনিয়মিত পানি সরবরাহ, দ্রুত নগরায়ণ এবং মশা নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত উদ্যোগের অভাব ডেঙ্গু প্রতিরোধকে আরও কঠিন করে তুলছে।
জলবায়ু ও পরিবেশগত পরিস্থিতিও মশার বংশবিস্তার এবং ডেঙ্গু সংক্রমণে প্রভাব ফেলে। ফলে রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করার পর কীটনাশক ছিটানো কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে না। প্রাদুর্ভাব যখন দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, ততক্ষণে সংক্রমণ অনেক এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
তাই কর্তৃপক্ষকে বিচ্ছিন্ন ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে বছরব্যাপী, গবেষণাভিত্তিক মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি গড়ে তুলতে হবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও নাগরিকদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে, যাতে প্রজননক্ষেত্রগুলো শনাক্ত করে প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার আগেই সেগুলো নির্মূল করা যায়।
কিউডেঙ্গা (Qdenga): বাংলাদেশের কি ডেঙ্গুর টিকা চালু করা উচিত?
২০২৪ সালে আমি নিজে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধের বিষয়টি আমার কাছে আরও ব্যক্তিগত গুরুত্ব পায়। সেই কষ্টকর অভিজ্ঞতা এ ধরনের রোগ সম্পর্কে আমার উদ্বেগ এবং কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়।
অস্ট্রেলিয়ায় সাম্প্রতিক এক সফরের সময় আমি ‘কিউডেঙ্গা’ (Qdenga) নামের ডেঙ্গুর একটি টিকা সম্পর্কে জানতে পারি। বিষয়টি আমাকে বিস্মিত করে যে, বাংলাদেশে আমার দেখা প্রচলিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে ডেঙ্গুর টিকাদান নিয়মিত কোনো ব্যবস্থা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
বাংলাদেশে কিউডেঙ্গা ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক টিকার প্রাপ্যতা, নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের অবস্থা, ব্যয় এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য সেগুলোর উপযোগিতা সরকারকে অবিলম্বে পর্যালোচনা করতে হবে। নিয়মিত জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে ডেঙ্গুর টিকা অন্তর্ভুক্ত না থাকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এমন এলাকাগুলোর ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশুদের কিউডেঙ্গা টিকা দেওয়ার সুপারিশ করেছে, যেখানে ডেঙ্গুর সংক্রমণ তীব্র এবং রোগটি উল্লেখযোগ্য জনস্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করেছে। টিকাটি টিএকে-০০৩ (TAK-003) নামেও পরিচিত। এর নির্ধারিত কোর্সে তিন মাসের ব্যবধানে দুটি ডোজ গ্রহণ করতে হয়। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জোর দিয়ে বলেছে, টিকাদানকে অবশ্যই সমন্বিত ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কৌশলের অংশ হতে হবে। এই টিকা সব ক্ষেত্রে সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে না।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, স্কুলগামী শিশু ও কিশোর-কিশোরীরাও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে কোনো টিকা চালু করার আগে স্থানীয়ভাবে রোগের ধরন, বয়সভিত্তিক হাসপাতালে ভর্তির হার, টিকার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত প্রমাণ, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন, সরবরাহব্যবস্থা, জনগণের ক্রয়ক্ষমতা এবং টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা ও তদারকির সক্ষমতা সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
এ লক্ষ্যে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, মহামারিবিদ, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ, টিকাদান কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি এবং স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের নিয়ে সরকারকে অবিলম্বে একটি বিশেষজ্ঞ কমিশন গঠন করা উচিত। কমিশনকে মূল্যায়ন করতে হবে, উচ্চ সংক্রমণপ্রবণ এলাকা ও উপযুক্ত বয়সের জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে টিকাদান কর্মসূচি চালু করলে তা ব্যয়, নিরাপত্তা ও বাস্তবায়নের শর্ত বিবেচনায় যথেষ্ট জনস্বাস্থ্যগত সুফল দিতে পারবে কি না।
গবেষণা ও মূল্যায়নের ফলাফল টিকাদান কর্মসূচি চালুর পক্ষে গেলে বাংলাদেশের একটি স্বচ্ছ টিকাদান নীতি প্রণয়ন করা উচিত। এতে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠী চিহ্নিত করার পাশাপাশি সাশ্রয়ী মূল্যে টিকা সংগ্রহের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও টিকা প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলা এ ক্ষেত্রে টিকার প্রাপ্যতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
তবে টিকাদানকে ডেঙ্গু প্রতিরোধের একমাত্র সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। মশা নিয়ন্ত্রণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ এবং কার্যকর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি টিকাদানকে একটি পরিপূরক ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
জাতীয় ডেঙ্গু কৌশলের পাঁচটি অগ্রাধিকার
প্রথমত, মশার প্রজননক্ষেত্র নির্মূল করা
ডেঙ্গু প্রতিরোধের কার্যক্রম শুরু করতে হবে বাসাবাড়ি, পাড়া-মহল্লা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, নির্মাণাধীন ভবন এবং জনসমাগমস্থল থেকে। প্রতিটি পরিবারকে নিয়মিত পানি জমে থাকা পাত্র খালি করতে হবে, পরিষ্কার করতে হবে অথবা ঢেকে রাখতে হবে। একই সঙ্গে বর্জ্য সংগ্রহ ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। নির্মাণাধীন ভবন ও সরকারি স্থাপনাগুলোও নিয়মিত পরিদর্শনের আওতায় আনতে হবে।
সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোর উচিত পরিদর্শনের সময়সূচি প্রকাশ করা, মশার প্রজননক্ষেত্রের অবস্থান সম্পর্কে নাগরিকদের অবহিত করা এবং নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের ফলাফল জনসমক্ষে তুলে ধরা। কীটনাশকের ব্যবহার হতে হবে কারিগরি প্রমাণের ভিত্তিতে এবং এর কার্যকারিতাও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। শুধু দৃশ্যমান রাস্তায় কীটনাশক ছিটিয়ে প্রজননক্ষেত্রগুলো অপরিবর্তিত রাখলে ডেঙ্গু সমস্যার সমাধান হবে না।
দ্বিতীয়ত, টেকসই জাতীয় জনসচেতনতামূলক প্রচারাভিযান চালু করা
দেশব্যাপী ডেঙ্গু সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যাপক প্রচারাভিযান প্রয়োজন। বড় কোনো স্বাস্থ্যসংকট মোকাবিলায় জনসচেতনতা তৈরির মতো গুরুত্ব দিয়ে এ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
টেলিভিশন, বেতার, সংবাদপত্র, ডিজিটাল মাধ্যম, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ এবং বিভিন্ন সামাজিক ও স্থানীয় সংগঠন এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রচারাভিযানে ডেঙ্গু কীভাবে ছড়ায়, মশার কামড় থেকে কীভাবে সুরক্ষিত থাকা যায়, কীভাবে প্রজননক্ষেত্র অপসারণ করতে হয় এবং কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি—এসব বিষয় স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। তথ্য সহজবোধ্য বাংলায় উপস্থাপন করতে হবে এবং স্থানীয় পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে হবে।
নাগরিকদের বুঝতে হবে, ডেঙ্গু প্রতিরোধ সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। তবে এই দায়িত্ব পালনের পুরো ভার শুধু ব্যক্তিগত পরিবারগুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, উন্নত পানি নিষ্কাশন, নিয়মিত পরিদর্শন এবং প্রয়োজনীয় জনস্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
তৃতীয়ত, টিকাদানের উপযোগিতা মূল্যায়ন করে প্রয়োজন অনুযায়ী চালু করা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বর্তমান নির্দেশনা এবং বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক ও আইনগত প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় কিউডেঙ্গা ও অন্যান্য উপযুক্ত ডেঙ্গুর টিকা মূল্যায়নের জন্য সরকারকে বিশেষজ্ঞদের নেতৃত্বে একটি প্রক্রিয়া গড়ে তুলতে হবে।
মূল্যায়নের ভিত্তিতে টিকাদানের সুপারিশ করা হলে কর্মসূচিতে স্পষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড, নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম, নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ এবং স্বচ্ছ মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জনমতের আবেগের পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক প্রমাণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে অনিশ্চয়তাকে দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে মূল্যায়ন শেষ করে এর ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
চতুর্থত, হাসপাতালের প্রস্তুতি ও প্রাথমিক পর্যায়ের চিকিৎসা জোরদার করা
ডেঙ্গুর সংক্রমণ প্রতিরোধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে আক্রান্ত ব্যক্তিরা যাতে সময়মতো উপযুক্ত চিকিৎসা পান, তা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।
হাসপাতালগুলোতে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী, পর্যাপ্ত রোগী পর্যবেক্ষণব্যবস্থা, নির্ভরযোগ্য রোগ নির্ণয়ের সুবিধা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং গুরুতর রোগী শনাক্ত করার সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকতে হবে।
ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে পারে। এমনকি জ্বর কমে যাওয়ার সময়ও গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অস্বাভাবিক তন্দ্রাচ্ছন্নতা বা অস্থিরতার মতো বিপদচিহ্ন দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা মূল্যায়ন প্রয়োজন। ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো ভাইরাসবিরোধী চিকিৎসা নেই। তাই যথাযথ সহায়ক চিকিৎসা এবং জটিলতা দ্রুত শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো পরিবারকে যেন বুঝতে বুঝতে অনেক দেরি হয়ে না যায় যে তাদের প্রিয়জনের অবস্থা সংকটাপন্ন। স্থানীয় চিকিৎসাকেন্দ্র, জেলা হাসপাতাল ও বিশেষায়িত হাসপাতালের মধ্যে কার্যকর রোগী স্থানান্তরব্যবস্থা গড়ে তুললে চিকিৎসা পেতে বিলম্ব কমানো সম্ভব।
পঞ্চমত, রোগ নজরদারি, গবেষণা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা
কার্যকর জনস্বাস্থ্য নীতি প্রণয়নের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত অপরিহার্য। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচিত আক্রান্ত রোগী, হাসপাতালে ভর্তি, মৃত্যু, বয়সভিত্তিক তথ্য, আক্রান্ত এলাকার অবস্থান এবং প্রাদুর্ভাবের সময়কাল সম্পর্কে নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য সহজে পাওয়ার ব্যবস্থা রাখা।
সংক্রমণের কতটা অংশ শনাক্তের বাইরে থেকে যাচ্ছে, ডেঙ্গু ভাইরাসের কোন ধরনের সংক্রমণ ছড়াচ্ছে, মশার সংখ্যা ও বিস্তার কেমন, কীটনাশকের বিরুদ্ধে মশার প্রতিরোধক্ষমতা কতটা, টিকা কতটা উপযোগী এবং ডেঙ্গুর অর্থনৈতিক ক্ষতি কত—এসব বিষয়ে গবেষণার মাধ্যমে নজরদারি আরও শক্তিশালী করতে হবে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যয় এবং সেই ব্যয়ের ফলাফল নিয়ে প্রতিবছর মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করা উচিত। স্বাধীন মূল্যায়নের মাধ্যমে বোঝা সম্ভব হবে, কোন পদক্ষেপ কার্যকর হচ্ছে, কোথায় সম্পদের অপচয় হচ্ছে এবং কোন জনগোষ্ঠীর জন্য আরও সহায়তা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও জনস্বাস্থ্য সংস্থাগুলোকে মহামারিসংক্রান্ত গবেষণা, রোগের পূর্বাভাস তৈরির মডেল এবং ব্যয়-কার্যকারিতা বিশ্লেষণে পারস্পরিক সহযোগিতায় উৎসাহিত করতে হবে। বাংলাদেশের শুধু কতজন আক্রান্ত হচ্ছেন, সেই তথ্য জানলেই চলবে না; কোন পদক্ষেপে ব্যয় করা অর্থের তুলনায় সবচেয়ে বেশি মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে, সেটিও জানতে হবে।
জাতীয় দায়িত্ব পালনে আর বিলম্ব নয়
এটি মেনে নেওয়া কঠিন যে, দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা জয় করতে সক্ষম একটি জাতিকে মশাবাহিত রোগের কারণে এত বড় মূল্য দিতে হচ্ছে। বাংলাদেশ বহু কঠিন পরিস্থিতিতে স্থিতিস্থাপকতা, সম্মিলিত উদ্যোগ ও দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছে। ডেঙ্গু মোকাবিলায়ও সেই একই চেতনা কাজে লাগাতে হবে।
এর সমাধান কোনো একক নাগরিককে দোষারোপ করা কিংবা মাঝেমধ্যে বিচ্ছিন্ন প্রচারাভিযান চালানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য পেশাজীবী, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক নেতৃত্ব এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে।
সরকারকে নেতৃত্ব, অর্থায়ন, সমন্বয় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে মশার প্রজননক্ষেত্র নির্মূল এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের সময়মতো প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসাসেবা দিতে হবে। গবেষকদের নির্ভরযোগ্য তথ্য ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ তৈরি করতে হবে। আর নাগরিকদের নিজেদের বাড়িঘর ও আশপাশের পরিবেশ মশার প্রজননমুক্ত রাখতে সচেষ্ট হতে হবে।
এসব উদ্যোগের সমন্বয়ে একটি জাতীয় ডেঙ্গু টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে। এই টাস্কফোর্স পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ, অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং কার্যক্রমের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশের দায়িত্ব পালন করতে পারে। মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে গেলে কেবল তখনই তৎপর হওয়ার পরিবর্তে সারা বছর ধরে এ কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে।
১৫ বছর বয়সী সেই স্কুলছাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যু যেন আরেকটি পরিসংখ্যানের আড়ালে হারিয়ে না যায়। তার মৃত্যু এবং তার বোন ও পরিবারের সীমাহীন কষ্ট আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকারকে আরও দৃঢ় করুক, যাতে ভবিষ্যতে এমন ট্র্যাজেডি প্রতিরোধ করা যায়।
বাংলাদেশ শুধু স্লোগান কিংবা জরুরি ভিত্তিতে কীটনাশক ছিটিয়ে ডেঙ্গু নির্মূল করতে পারবে না। এর জন্য প্রয়োজন টেকসই রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি, কার্যকর জনসেবা এবং জনগণের প্রকৃত অংশগ্রহণ।
প্রশ্নটি এখন আর বাংলাদেশ ডেঙ্গু মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেওয়ার সামর্থ্য রাখে কি না, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, পর্যাপ্ত সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এভাবে মানুষের জীবন হারিয়ে যেতে থাকা দেশ কত দিন মেনে নেবে?
প্রতিটি প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুই একটি অপ্রয়োজনীয় মৃত্যু। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক জাতীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এখনই।
লেখক: প্রফেসর ড. শাহজাহান খান (OAM), অস্ট্রেলিয়ার সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক, বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের প্রবাসী ফেলো এবং ঢাকার এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের সাবেক উপাচার্য।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে মশা নিধন, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, টিকাদানের উপযোগিতা মূল্যায়ন, হাসপাতালের প্রস্তুতি জোরদার এবং নির্ভরযোগ্য তথ্য নিশ্চিত করার সমন্বিত জাতীয় কৌশল এখন অত্যন্ত জরুরি।
সম্প্রতি আমাদের এক নিকটাত্মীয় ঢাকার একটি হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। তার বয়স ছিল মাত্র ১৫ বছর। সে ছিল একজন স্কুলছাত্রী। তার বাবা চিকিৎসক, দাদাও চিকিৎসক এবং চাচাদের মধ্যেও কয়েকজন চিকিৎসক রয়েছেন। পরিবারের চিকিৎসাবিষয়ক জ্ঞান ও সর্বাত্মক চেষ্টা সত্ত্বেও তার অকালমৃত্যু ঠেকানো সম্ভব হয়নি।
সে শুধু শ্রেণিকক্ষেই মেধাবী শিক্ষার্থী ছিল না, খেলাধুলা ও অন্যান্য সহশিক্ষা কার্যক্রমেও ছিল চ্যাম্পিয়ন। তার দুই ছোট বোনও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল। সৌভাগ্যক্রমে তারা বেঁচে গেলেও তাদের যথেষ্ট কষ্ট ও যন্ত্রণা সহ্য করতে হয়েছে। এই পরিবার, বিশেষ করে তার বাবা-মা ও বোনেরা এমন এক অপূরণীয় ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে, যা কোনো পরিবারেরই সহ্য করার কথা নয়।
এই মর্মান্তিক ঘটনা আমাদের আবারও মনে করিয়ে দেয়, ডেঙ্গু কারও শিক্ষা, পেশা, সামাজিক অবস্থান কিংবা চিকিৎসাসেবা পাওয়ার সুযোগ বিবেচনা করে আক্রমণ করে না।
ডেঙ্গু এখন আর মৌসুমি কোনো বিড়ম্বনা নয়, যা মানুষকে নীরবে সহ্য করে যেতে হবে। এটি একটি গুরুতর জনস্বাস্থ্য সংকট। এ সংকট মোকাবিলায় প্রয়োজন জরুরি, দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ। প্রতিটি প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যু আমাদের সামনে প্রশ্ন তুলে ধরে—আর কী করা সম্ভব ছিল এবং অন্যদের জীবন রক্ষায় এখন কোন পরিবর্তনগুলো আনা জরুরি?
সংক্রমণ ও মৃত্যুর উদ্বেগজনক চিত্র
বাংলাদেশে বারবার ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর ভয়াবহতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের (ডিজিএইচএস) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এখানে উল্লেখ করা বছরগুলোর মধ্যে ২০২৩ সাল ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। ওই বছর দেশে ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হন এবং ১ হাজার ৭০৫ জনের মৃত্যু হয়।
২০২৪ ও ২০২৫ সালেও ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ছিল উল্লেখযোগ্য। ২০২৬ সালের ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে, চলতি বছরে ১ লাখ ২৩ হাজার ৯৪৮ জন ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়েছেন এবং ৩৮৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। উল্লেখ্য, এসব পরিসংখ্যান চলতি বছরের নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্য; এগুলো চূড়ান্ত বার্ষিক হিসাব নয়।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর নিবন্ধিত সংখ্যা নিচে তুলে ধরা হলো।
বছর | আক্রান্তের সংখ্যা | মৃত্যুর সংখ্যা |
|---|---|---|
২০১৬ | ৬,০৬০ | ১৪ |
২০১৭ | ২,৭৬৯ | ৮ |
২০১৮ | ১০,১৪৮ | ২৬ |
২০১৯ | ১,০১,৩৫৪ | ১৭৯ |
২০২০ | ১,১৯৩ | ৩ |
২০২১ | ২৮,৪২৯ | ১০৫ |
২০২২ | ৬১,৭৩২ | ২৮১ |
২০২৩ | ৩,২১,১৭৯ | ১,৭০৫ |
২০২৪ | ১,০১,২১৪ | ৫৭৫ |
২০২৫ | ১,০২,৮৬১ | ৪১৩ |
২০২৬* | ১,২৩,৯৪৮ | ৩৮৪ |
সূত্র: স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গু ড্যাশবোর্ড। ২০২৬ সালের তথ্য ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত।
এই পরিসংখ্যান মূলত হাসপাতালে ভর্তি হয়ে শনাক্ত হওয়া ও নথিভুক্ত রোগীর সংখ্যা নির্দেশ করে; সমাজে সংক্রমিত প্রত্যেক ব্যক্তির হিসাব এতে অন্তর্ভুক্ত নয়। প্রকৃত সংক্রমণের সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে, কারণ আক্রান্ত সবাই চিকিৎসাসেবা নেন না কিংবা তাঁদের সবার রোগ নির্ণয় নিশ্চিত হয় না। তা সত্ত্বেও, এই পরিসংখ্যান পরিবার, হাসপাতাল ও জাতীয় অর্থনীতির ওপর ডেঙ্গুর বিপুল চাপের চিত্র তুলে ধরে।
প্রতিটি মৃত্যুর পেছনে রয়েছে একটি শোকাহত পরিবার। প্রতিটি হাসপাতালে ভর্তির পেছনে রয়েছে যন্ত্রণা, অনিশ্চয়তা এবং জীবনসংহারী জটিলতার আশঙ্কা নিয়ে লড়াই করা একজন মানুষ। এগুলো সরকারি প্রতিবেদনের নিছক কিছু সংখ্যা নয়; প্রতিটি সংখ্যা একটি মানবজীবনের গল্প এবং দেশের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতির প্রতিচ্ছবি।
কেন আমরা এখনো এতটা অরক্ষিত?
ডেঙ্গু মূলত সংক্রমিত এডিস মশার মাধ্যমে ছড়ায়। এসব মশা মানুষের বসতবাড়ি ও আশপাশের পরিবেশে বংশবিস্তার করে। বিভিন্ন ধরনের পাত্র, পরিত্যক্ত প্লাস্টিকের সামগ্রী, ফুলের টব, ছাদের নালা, নির্মাণাধীন ভবন, খোলা পানির পাত্র এবং যেখানে পানি জমে থাকে, এমন অন্যান্য স্থান মশার প্রজননক্ষেত্রে পরিণত হতে পারে।
ডেঙ্গুর সমস্যা শুধু ঢাকায় সীমাবদ্ধ নেই। এটি এখন বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে এবং শহর ও গ্রাম—উভয় এলাকার মানুষকে আক্রান্ত করছে। ঘনবসতি, অপর্যাপ্ত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দুর্বল পানি নিষ্কাশনব্যবস্থা, অনিয়মিত পানি সরবরাহ, দ্রুত নগরায়ণ এবং মশা নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত উদ্যোগের অভাব ডেঙ্গু প্রতিরোধকে আরও কঠিন করে তুলছে।
জলবায়ু ও পরিবেশগত পরিস্থিতিও মশার বংশবিস্তার এবং ডেঙ্গু সংক্রমণে প্রভাব ফেলে। ফলে রোগীর সংখ্যা বাড়তে শুরু করার পর কীটনাশক ছিটানো কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান হতে পারে না। প্রাদুর্ভাব যখন দৃশ্যমান হয়ে ওঠে, ততক্ষণে সংক্রমণ অনেক এলাকায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে।
তাই কর্তৃপক্ষকে বিচ্ছিন্ন ও তাৎক্ষণিক পদক্ষেপের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে বছরব্যাপী, গবেষণাভিত্তিক মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি গড়ে তুলতে হবে। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ ও নাগরিকদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে, যাতে প্রজননক্ষেত্রগুলো শনাক্ত করে প্রাদুর্ভাব ছড়িয়ে পড়ার আগেই সেগুলো নির্মূল করা যায়।
কিউডেঙ্গা (Qdenga): বাংলাদেশের কি ডেঙ্গুর টিকা চালু করা উচিত?
২০২৪ সালে আমি নিজে চিকুনগুনিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পর মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধের বিষয়টি আমার কাছে আরও ব্যক্তিগত গুরুত্ব পায়। সেই কষ্টকর অভিজ্ঞতা এ ধরনের রোগ সম্পর্কে আমার উদ্বেগ এবং কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তা আরও বাড়িয়ে দেয়।
অস্ট্রেলিয়ায় সাম্প্রতিক এক সফরের সময় আমি ‘কিউডেঙ্গা’ (Qdenga) নামের ডেঙ্গুর একটি টিকা সম্পর্কে জানতে পারি। বিষয়টি আমাকে বিস্মিত করে যে, বাংলাদেশে আমার দেখা প্রচলিত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থাগুলোর মধ্যে ডেঙ্গুর টিকাদান নিয়মিত কোনো ব্যবস্থা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত ছিল না।
বাংলাদেশে কিউডেঙ্গা ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক টিকার প্রাপ্যতা, নিয়ন্ত্রক অনুমোদনের অবস্থা, ব্যয় এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য সেগুলোর উপযোগিতা সরকারকে অবিলম্বে পর্যালোচনা করতে হবে। নিয়মিত জাতীয় টিকাদান কর্মসূচিতে ডেঙ্গুর টিকা অন্তর্ভুক্ত না থাকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) এমন এলাকাগুলোর ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশুদের কিউডেঙ্গা টিকা দেওয়ার সুপারিশ করেছে, যেখানে ডেঙ্গুর সংক্রমণ তীব্র এবং রোগটি উল্লেখযোগ্য জনস্বাস্থ্য সমস্যা তৈরি করেছে। টিকাটি টিএকে-০০৩ (TAK-003) নামেও পরিচিত। এর নির্ধারিত কোর্সে তিন মাসের ব্যবধানে দুটি ডোজ গ্রহণ করতে হয়। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জোর দিয়ে বলেছে, টিকাদানকে অবশ্যই সমন্বিত ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ কৌশলের অংশ হতে হবে। এই টিকা সব ক্ষেত্রে সংক্রমণ প্রতিরোধ করতে পারে না।
বাংলাদেশের জন্য বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, স্কুলগামী শিশু ও কিশোর-কিশোরীরাও ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। তবে কোনো টিকা চালু করার আগে স্থানীয়ভাবে রোগের ধরন, বয়সভিত্তিক হাসপাতালে ভর্তির হার, টিকার নিরাপত্তা-সংক্রান্ত প্রমাণ, নিয়ন্ত্রক অনুমোদন, সরবরাহব্যবস্থা, জনগণের ক্রয়ক্ষমতা এবং টিকাদান কর্মসূচি পরিচালনা ও তদারকির সক্ষমতা সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
এ লক্ষ্যে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, মহামারিবিদ, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ, সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ, টিকাদান কর্তৃপক্ষের প্রতিনিধি এবং স্বাস্থ্য অর্থনীতিবিদদের নিয়ে সরকারকে অবিলম্বে একটি বিশেষজ্ঞ কমিশন গঠন করা উচিত। কমিশনকে মূল্যায়ন করতে হবে, উচ্চ সংক্রমণপ্রবণ এলাকা ও উপযুক্ত বয়সের জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে টিকাদান কর্মসূচি চালু করলে তা ব্যয়, নিরাপত্তা ও বাস্তবায়নের শর্ত বিবেচনায় যথেষ্ট জনস্বাস্থ্যগত সুফল দিতে পারবে কি না।
গবেষণা ও মূল্যায়নের ফলাফল টিকাদান কর্মসূচি চালুর পক্ষে গেলে বাংলাদেশের একটি স্বচ্ছ টিকাদান নীতি প্রণয়ন করা উচিত। এতে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত জনগোষ্ঠী চিহ্নিত করার পাশাপাশি সাশ্রয়ী মূল্যে টিকা সংগ্রহের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক সংস্থা ও টিকা প্রস্তুতকারকদের সঙ্গে অংশীদারত্ব গড়ে তোলা এ ক্ষেত্রে টিকার প্রাপ্যতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
তবে টিকাদানকে ডেঙ্গু প্রতিরোধের একমাত্র সমাধান হিসেবে বিবেচনা করা যাবে না। মশা নিয়ন্ত্রণ, জনসচেতনতা বৃদ্ধি, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণ এবং কার্যকর চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার পাশাপাশি টিকাদানকে একটি পরিপূরক ব্যবস্থা হিসেবে গ্রহণ করতে হবে।
জাতীয় ডেঙ্গু কৌশলের পাঁচটি অগ্রাধিকার
প্রথমত, মশার প্রজননক্ষেত্র নির্মূল করা
ডেঙ্গু প্রতিরোধের কার্যক্রম শুরু করতে হবে বাসাবাড়ি, পাড়া-মহল্লা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র, নির্মাণাধীন ভবন এবং জনসমাগমস্থল থেকে। প্রতিটি পরিবারকে নিয়মিত পানি জমে থাকা পাত্র খালি করতে হবে, পরিষ্কার করতে হবে অথবা ঢেকে রাখতে হবে। একই সঙ্গে বর্জ্য সংগ্রহ ও পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার উন্নয়ন করতে হবে। নির্মাণাধীন ভবন ও সরকারি স্থাপনাগুলোও নিয়মিত পরিদর্শনের আওতায় আনতে হবে।
সিটি করপোরেশন ও পৌরসভাগুলোর উচিত পরিদর্শনের সময়সূচি প্রকাশ করা, মশার প্রজননক্ষেত্রের অবস্থান সম্পর্কে নাগরিকদের অবহিত করা এবং নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের ফলাফল জনসমক্ষে তুলে ধরা। কীটনাশকের ব্যবহার হতে হবে কারিগরি প্রমাণের ভিত্তিতে এবং এর কার্যকারিতাও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। শুধু দৃশ্যমান রাস্তায় কীটনাশক ছিটিয়ে প্রজননক্ষেত্রগুলো অপরিবর্তিত রাখলে ডেঙ্গু সমস্যার সমাধান হবে না।
দ্বিতীয়ত, টেকসই জাতীয় জনসচেতনতামূলক প্রচারাভিযান চালু করা
দেশব্যাপী ডেঙ্গু সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য বাংলাদেশে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যাপক প্রচারাভিযান প্রয়োজন। বড় কোনো স্বাস্থ্যসংকট মোকাবিলায় জনসচেতনতা তৈরির মতো গুরুত্ব দিয়ে এ কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে।
টেলিভিশন, বেতার, সংবাদপত্র, ডিজিটাল মাধ্যম, স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, মসজিদ এবং বিভিন্ন সামাজিক ও স্থানীয় সংগঠন এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রচারাভিযানে ডেঙ্গু কীভাবে ছড়ায়, মশার কামড় থেকে কীভাবে সুরক্ষিত থাকা যায়, কীভাবে প্রজননক্ষেত্র অপসারণ করতে হয় এবং কখন চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া জরুরি—এসব বিষয় স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে হবে। তথ্য সহজবোধ্য বাংলায় উপস্থাপন করতে হবে এবং স্থানীয় পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে হবে।
নাগরিকদের বুঝতে হবে, ডেঙ্গু প্রতিরোধ সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। তবে এই দায়িত্ব পালনের পুরো ভার শুধু ব্যক্তিগত পরিবারগুলোর ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, উন্নত পানি নিষ্কাশন, নিয়মিত পরিদর্শন এবং প্রয়োজনীয় জনস্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব।
তৃতীয়ত, টিকাদানের উপযোগিতা মূল্যায়ন করে প্রয়োজন অনুযায়ী চালু করা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বর্তমান নির্দেশনা এবং বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক ও আইনগত প্রয়োজনীয়তা বিবেচনায় কিউডেঙ্গা ও অন্যান্য উপযুক্ত ডেঙ্গুর টিকা মূল্যায়নের জন্য সরকারকে বিশেষজ্ঞদের নেতৃত্বে একটি প্রক্রিয়া গড়ে তুলতে হবে।
মূল্যায়নের ভিত্তিতে টিকাদানের সুপারিশ করা হলে কর্মসূচিতে স্পষ্ট যোগ্যতার মানদণ্ড, নির্ভরযোগ্য সরবরাহব্যবস্থা, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম, নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ এবং স্বচ্ছ মূল্যায়নের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে জনমতের আবেগের পরিবর্তে বৈজ্ঞানিক প্রমাণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। একই সঙ্গে অনিশ্চয়তাকে দীর্ঘদিন নিষ্ক্রিয় থাকার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা যাবে না। নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে মূল্যায়ন শেষ করে এর ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে।
চতুর্থত, হাসপাতালের প্রস্তুতি ও প্রাথমিক পর্যায়ের চিকিৎসা জোরদার করা
ডেঙ্গুর সংক্রমণ প্রতিরোধ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে আক্রান্ত ব্যক্তিরা যাতে সময়মতো উপযুক্ত চিকিৎসা পান, তা নিশ্চিত করাও সমান জরুরি।
হাসপাতালগুলোতে প্রশিক্ষিত চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মী, পর্যাপ্ত রোগী পর্যবেক্ষণব্যবস্থা, নির্ভরযোগ্য রোগ নির্ণয়ের সুবিধা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম এবং গুরুতর রোগী শনাক্ত করার সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকতে হবে।
ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটতে পারে। এমনকি জ্বর কমে যাওয়ার সময়ও গুরুতর জটিলতা দেখা দিতে পারে। তীব্র পেটব্যথা, বারবার বমি, রক্তপাত, অস্বাভাবিক তন্দ্রাচ্ছন্নতা বা অস্থিরতার মতো বিপদচিহ্ন দেখা দিলে জরুরি চিকিৎসা মূল্যায়ন প্রয়োজন। ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো ভাইরাসবিরোধী চিকিৎসা নেই। তাই যথাযথ সহায়ক চিকিৎসা এবং জটিলতা দ্রুত শনাক্ত করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কোনো পরিবারকে যেন বুঝতে বুঝতে অনেক দেরি হয়ে না যায় যে তাদের প্রিয়জনের অবস্থা সংকটাপন্ন। স্থানীয় চিকিৎসাকেন্দ্র, জেলা হাসপাতাল ও বিশেষায়িত হাসপাতালের মধ্যে কার্যকর রোগী স্থানান্তরব্যবস্থা গড়ে তুললে চিকিৎসা পেতে বিলম্ব কমানো সম্ভব।
পঞ্চমত, রোগ নজরদারি, গবেষণা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা
কার্যকর জনস্বাস্থ্য নীতি প্রণয়নের জন্য নির্ভরযোগ্য তথ্য-উপাত্ত অপরিহার্য। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের উচিত আক্রান্ত রোগী, হাসপাতালে ভর্তি, মৃত্যু, বয়সভিত্তিক তথ্য, আক্রান্ত এলাকার অবস্থান এবং প্রাদুর্ভাবের সময়কাল সম্পর্কে নিয়মিত হালনাগাদ তথ্য সহজে পাওয়ার ব্যবস্থা রাখা।
সংক্রমণের কতটা অংশ শনাক্তের বাইরে থেকে যাচ্ছে, ডেঙ্গু ভাইরাসের কোন ধরনের সংক্রমণ ছড়াচ্ছে, মশার সংখ্যা ও বিস্তার কেমন, কীটনাশকের বিরুদ্ধে মশার প্রতিরোধক্ষমতা কতটা, টিকা কতটা উপযোগী এবং ডেঙ্গুর অর্থনৈতিক ক্ষতি কত—এসব বিষয়ে গবেষণার মাধ্যমে নজরদারি আরও শক্তিশালী করতে হবে।
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সরকারের ব্যয় এবং সেই ব্যয়ের ফলাফল নিয়ে প্রতিবছর মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ করা উচিত। স্বাধীন মূল্যায়নের মাধ্যমে বোঝা সম্ভব হবে, কোন পদক্ষেপ কার্যকর হচ্ছে, কোথায় সম্পদের অপচয় হচ্ছে এবং কোন জনগোষ্ঠীর জন্য আরও সহায়তা প্রয়োজন।
বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও জনস্বাস্থ্য সংস্থাগুলোকে মহামারিসংক্রান্ত গবেষণা, রোগের পূর্বাভাস তৈরির মডেল এবং ব্যয়-কার্যকারিতা বিশ্লেষণে পারস্পরিক সহযোগিতায় উৎসাহিত করতে হবে। বাংলাদেশের শুধু কতজন আক্রান্ত হচ্ছেন, সেই তথ্য জানলেই চলবে না; কোন পদক্ষেপে ব্যয় করা অর্থের তুলনায় সবচেয়ে বেশি মানুষের জীবন রক্ষা করা সম্ভব হচ্ছে, সেটিও জানতে হবে।
জাতীয় দায়িত্ব পালনে আর বিলম্ব নয়
এটি মেনে নেওয়া কঠিন যে, দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতা জয় করতে সক্ষম একটি জাতিকে মশাবাহিত রোগের কারণে এত বড় মূল্য দিতে হচ্ছে। বাংলাদেশ বহু কঠিন পরিস্থিতিতে স্থিতিস্থাপকতা, সম্মিলিত উদ্যোগ ও দৃঢ়তার পরিচয় দিয়েছে। ডেঙ্গু মোকাবিলায়ও সেই একই চেতনা কাজে লাগাতে হবে।
এর সমাধান কোনো একক নাগরিককে দোষারোপ করা কিংবা মাঝেমধ্যে বিচ্ছিন্ন প্রচারাভিযান চালানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বরং সরকারি প্রতিষ্ঠান, স্বাস্থ্য পেশাজীবী, স্থানীয় কর্তৃপক্ষ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক নেতৃত্ব এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অংশীদারত্ব গড়ে তুলতে হবে।
সরকারকে নেতৃত্ব, অর্থায়ন, সমন্বয় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে মশার প্রজননক্ষেত্র নির্মূল এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনার উন্নয়নে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে। স্বাস্থ্য পেশাজীবীদের সময়মতো প্রমাণভিত্তিক চিকিৎসাসেবা দিতে হবে। গবেষকদের নির্ভরযোগ্য তথ্য ও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ তৈরি করতে হবে। আর নাগরিকদের নিজেদের বাড়িঘর ও আশপাশের পরিবেশ মশার প্রজননমুক্ত রাখতে সচেষ্ট হতে হবে।
এসব উদ্যোগের সমন্বয়ে একটি জাতীয় ডেঙ্গু টাস্কফোর্স গঠন করা যেতে পারে। এই টাস্কফোর্স পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ, অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং কার্যক্রমের ফলাফল জনসমক্ষে প্রকাশের দায়িত্ব পালন করতে পারে। মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে গেলে কেবল তখনই তৎপর হওয়ার পরিবর্তে সারা বছর ধরে এ কার্যক্রম চালিয়ে যেতে হবে।
১৫ বছর বয়সী সেই স্কুলছাত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যু যেন আরেকটি পরিসংখ্যানের আড়ালে হারিয়ে না যায়। তার মৃত্যু এবং তার বোন ও পরিবারের সীমাহীন কষ্ট আমাদের সম্মিলিত অঙ্গীকারকে আরও দৃঢ় করুক, যাতে ভবিষ্যতে এমন ট্র্যাজেডি প্রতিরোধ করা যায়।
বাংলাদেশ শুধু স্লোগান কিংবা জরুরি ভিত্তিতে কীটনাশক ছিটিয়ে ডেঙ্গু নির্মূল করতে পারবে না। এর জন্য প্রয়োজন টেকসই রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বিজ্ঞানভিত্তিক নীতি, কার্যকর জনসেবা এবং জনগণের প্রকৃত অংশগ্রহণ।
প্রশ্নটি এখন আর বাংলাদেশ ডেঙ্গু মোকাবিলায় পদক্ষেপ নেওয়ার সামর্থ্য রাখে কি না, তা নয়। বরং প্রশ্ন হলো, পর্যাপ্ত সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এভাবে মানুষের জীবন হারিয়ে যেতে থাকা দেশ কত দিন মেনে নেবে?
প্রতিটি প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুই একটি অপ্রয়োজনীয় মৃত্যু। ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে সর্বাত্মক জাতীয় পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এখনই।
লেখক: প্রফেসর ড. শাহজাহান খান (OAM), অস্ট্রেলিয়ার সাউদার্ন কুইন্সল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক, বাংলাদেশ একাডেমি অব সায়েন্সেসের প্রবাসী ফেলো এবং ঢাকার এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের সাবেক উপাচার্য।


