আবারও নির্বাচিত হলেন মুসলিম ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমর ও রশিদা তালিব

পড়তে ১ মিনিট

ইলহান ওমর ও রশিদা তালিব | ছবি : সংগৃহীত

যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে আবারও জয় পেয়েছেন ফিলিস্তিনপন্থি অবস্থান ও ইসরাইলের সামরিক নীতির কঠোর সমালোচনার জন্য পরিচিত দুই মুসলিম ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য ইলহান ওমর ও রশিদা তালিব। ৩ নভেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তাঁরা নিজ নিজ অঙ্গরাজ্য থেকে প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন। এর মধ্য দিয়ে দুজনই কংগ্রেসে নতুন মেয়াদে দায়িত্ব পালনের সুযোগ পেলেন।

বুধবার (৪ নভেম্বর) ইসরাইলভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ওয়াই নেট গ্লোবাল এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে তাঁদের জয়ের তথ্য প্রকাশ করা হয়।

ইলহান ওমরের পঞ্চম মেয়াদে জয়

মিনেসোটা অঙ্গরাজ্যের পঞ্চম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে জয় পেয়েছেন ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ইলহান ওমর। তিনি রিপাবলিকান প্রার্থী জন নাগেলকে পরাজিত করেন। এর মধ্য দিয়ে টানা পঞ্চমবারের মতো প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হলেন তিনি।

ইলহান ওমর ২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে প্রথমবার কংগ্রেস সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে প্রথম দুই মুসলিম নারী সদস্যের একজন হিসেবে ইতিহাস গড়েন। সোমালিয়ায় জন্ম নেওয়া ওমর শৈশবে পরিবারের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেন। মিনিয়াপোলিসকেন্দ্রিক তাঁর নির্বাচনী এলাকাটি ডেমোক্র্যাটদের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত।

এবারের নির্বাচনে তাঁর জয় এমন এক সময়ে এলো, যখন অভিবাসনসংক্রান্ত নথি নিয়ে ফেডারেল তদন্তের মুখে রয়েছেন তিনি। নির্বাচনের প্রায় তিন সপ্তাহ আগে অক্টোবরে ওয়াশিংটন ডিসিতে তাঁর বাসায় ফেডারেল তদন্তকারী সংস্থার সদস্যরা তল্লাশি চালান। এ সময় তাঁর মুঠোফোন, কম্পিউটার ও পাসপোর্ট জব্দ করা হয় বলে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ওমর তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তাঁর দাবি, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে তাঁকে হয়রানি করছে। তদন্ত ও তল্লাশিকে তিনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের প্রচেষ্টা হিসেবেও আখ্যায়িত করেছেন। তবে তদন্তের অভিযোগ ও তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্যকে পৃথকভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

রশিদা তালিবের পঞ্চম মেয়াদে জয়

মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ১২তম কংগ্রেসনাল ডিস্ট্রিক্ট থেকে পঞ্চমবারের মতো নির্বাচিত হয়েছেন ডেমোক্র্যাট কংগ্রেস সদস্য রশিদা তালিব। তিনি রিপাবলিকান প্রার্থী জেমস ডি হুপারকে পরাজিত করেছেন। যুক্তরাষ্ট্রের সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) তাঁর বিজয় নিশ্চিত করেছে।

১৯৭৬ সালে মিশিগানের ডেট্রয়েটে জন্মগ্রহণকারী রশিদা তালিব ফিলিস্তিনি অভিবাসী পরিবারের সন্তান। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে নির্বাচিত প্রথম ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত নারী। ২০১৮ সালের নির্বাচনে প্রথমবার প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন তিনি। ২০১৯ সালের জানুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে ফিলিস্তিনিদের অধিকার, অভিবাসী জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা, শ্রমিক অধিকার ও সামাজিক ন্যায়বিচারের পক্ষে সোচ্চার ভূমিকা পালন করে আসছেন।

গাজায় ইসরাইলের সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার কঠোর সমালোচনা করে আসছেন তালিব। তিনি ইসরাইলের কাছে মার্কিন অস্ত্র সরবরাহ বন্ধ, সামরিক সহায়তা স্থগিত এবং গাজায় স্থায়ী যুদ্ধবিরতির দাবি জানিয়েছেন। তাঁর মতে, মার্কিন করদাতাদের অর্থ দিয়ে ফিলিস্তিনিদের ওপর সামরিক অভিযান চালানোর সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।

ইসরাইলের সামরিক সহায়তা বন্ধের দাবিতে সরব দুই কংগ্রেস সদস্য

ইলহান ওমর ও রশিদা তালিব দুজনই ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রগতিশীল অংশের পরিচিত মুখ। ফিলিস্তিনিদের অধিকার ও গাজার মানবিক পরিস্থিতি নিয়ে তাঁরা দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন কংগ্রেসে সরব।

২০২৪ সালের অক্টোবরে ইলহান ওমর ইসরাইলকে সামরিক সহায়তা দেওয়া বন্ধ করার জন্য তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান। ২০২৫ সালের মার্চে গাজায় নতুন করে ইসরাইলি হামলা শুরুর পর ওমর ও তালিবসহ কয়েকজন মার্কিন আইনপ্রণেতা ইসরাইলের বিরুদ্ধে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবি তোলেন।

২০২৬ সালের জুলাইয়েও তাঁরা ইসরাইলের জন্য নির্ধারিত ৩৩০ কোটি ডলারের বার্ষিক মার্কিন সামরিক সহায়তা বন্ধের পক্ষে অবস্থান নেন। তাঁদের অভিযোগ, যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্র ও সামরিক সহায়তা গাজায় ইসরাইলের অভিযান অব্যাহত রাখতে ভূমিকা রাখছে।

গাজায় ইসরাইলের কর্মকাণ্ডকে তাঁরা গণহত্যা হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। তবে এটি তাঁদের রাজনৈতিক ও আইনি অবস্থান; আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরাইলের বিরুদ্ধে চলমান গণহত্যা মামলার চূড়ান্ত রায় এখনো হয়নি।

কংগ্রেসে ডেমোক্র্যাটদের বড় অগ্রগতি

এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে শুধু ইলহান ওমর ও রশিদা তালিবের জয় নয়, প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণও ফিরে পেয়েছে ডেমোক্রেটিক পার্টি। ৩ নভেম্বরের নির্বাচনে প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে ভোট গ্রহণ করা হয়। সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেতে প্রয়োজন ২১৮টি আসন।

৪ নভেম্বর প্রকাশিত বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের নির্বাচনী ফলাফল অনুযায়ী, ভোট গণনা চলাকালে ডেমোক্র্যাটরা ২১৪টি এবং রিপাবলিকানরা ১২৬টি আসনে এগিয়ে ছিলেন বা জয় নিশ্চিত করেছিলেন। অর্থাৎ আসনভিত্তিক ফলাফল তখনো হালনাগাদ হচ্ছিল। ডেমোক্র্যাটদের প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার বিষয়টি অবশ্য নিশ্চিত হয়েছে।

নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের এই সাফল্য প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ তৈরি করবে। কারণ প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ পাওয়ায় প্রশাসনের বিভিন্ন নীতি, সরকারি ব্যয় ও কর্মকাণ্ডের ওপর নজরদারি এবং তদন্তের ক্ষেত্রে ডেমোক্র্যাটরা বাড়তি ক্ষমতা পাবেন।

নতুন নির্বাচিত কংগ্রেস সদস্যরা ২০২৭ সালের ৩ জানুয়ারি থেকে ১২০তম কংগ্রেসের কার্যক্রম শুরু করবেন।

সূত্র: ওয়াই নেট গ্লোবাল, আলজাজিরা ও রয়টার্স।

এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন