বুরকিনা ফাসোয় সুন্দরী প্রতিযোগিতা বন্ধ করে বিজ্ঞান প্রতিযোগিতা চালু
লেখক:
বুরকিনা ফাসোর অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম ট্রাওরে ও সুন্দরী প্রতিযোগিতার অনুষ্ঠান | ছবি : সংগৃহীত
আফ্রিকার দেশ বুরকিনা ফাসোতে সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা সাময়িকভাবে স্থগিত রেখে তরুণীদের মেধা ও বৈজ্ঞানিক দক্ষতাকে গুরুত্ব দিতে চালু হয়েছে নতুন উদ্যোগ। দেশটিতে প্রচলিত সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার পরিবর্তে বিজ্ঞানভিত্তিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছে। এর লক্ষ্য, নারীদের বিজ্ঞানচর্চায় উৎসাহিত করা এবং গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের মতো বিষয়ে তাদের দক্ষতা তুলে ধরা।

দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলের ৮৪ তরুণীর অংশগ্রহণে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘হাকিলি মুসো’ নামের এই বিজ্ঞান প্রতিযোগিতা। অংশগ্রহণকারী সবাই ২০২৬ সালে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে মাধ্যমিক পর্যায়ের সমাপনী সনদ অর্জন করেছেন। প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার আগে তাদের এক সপ্তাহের প্রস্তুতি পর্বে অংশ নিতে হয়। পরে গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের ওপর পরীক্ষা নেওয়া হয়।

প্রতিটি বিষয়ে সেরা পাঁচজনকে পুরস্কৃত করা হয়। প্রথম স্থান অর্জনকারীরা পান ২০ লাখ সিএফএ ফ্রাঁ, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪ লাখ ১৭ হাজার টাকা, একটি মোটরসাইকেল, একটি বহনযোগ্য কম্পিউটারসহ বিভিন্ন পুরস্কার।
বিজ্ঞানচর্চায় নারীদের উৎসাহিত করার উদ্যোগ
আয়োজকদের মতে, বিজ্ঞান প্রতিযোগিতাটির অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বিজ্ঞান বিষয়ে প্রচলিত লিঙ্গভিত্তিক ধারণা ভেঙে দেওয়া। গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও রসায়নের মতো বিষয় শুধু পুরুষদের জন্য—এমন ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাতে চান তারা। তরুণীদের বৈজ্ঞানিক জ্ঞান ও দক্ষতা প্রদর্শনের সুযোগ করে দেওয়ার পাশাপাশি বিজ্ঞানশিক্ষা এবং সংশ্লিষ্ট পেশায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোও এই উদ্যোগের লক্ষ্য।
প্রতিযোগিতা শেষ হওয়ার কয়েক দিন পর বিজয়ীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন বুরকিনা ফাসোর প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম ট্রাওরে। দেশটির সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২১ সেপ্টেম্বর প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে অনুষ্ঠিত প্রায় এক ঘণ্টার ওই বৈঠকে বিজ্ঞান, উচ্চাকাঙ্ক্ষা ও ভবিষ্যৎ পেশা নিয়ে আলোচনা করেন তরুণীরা।
সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা স্থগিতের সিদ্ধান্ত
বিজ্ঞান প্রতিযোগিতা আয়োজনের পাশাপাশি বুরকিনা ফাসোতে সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার ভবিষ্যৎ নিয়েও নতুন করে ভাবছে দেশটির সরকার। এসব অনুষ্ঠান পরিচালনায় নতুন নিয়ন্ত্রক কাঠামো প্রণয়নের কাজ চলার মধ্যে দেশটির ভূখণ্ডে আয়োজিত সব ধরনের সৌন্দর্য প্রতিযোগিতা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে।
২০২৬ সালের ৮ জুন দেশটির যোগাযোগ, সংস্কৃতি, কলা ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জাতীয়, আঞ্চলিক ও স্থানীয় পর্যায়ের সব সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার ওপর এই স্থগিতাদেশ ঘোষণা করা হয়।
মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার আয়োজন ও পরিচালনায় আরও কঠোর এবং সমন্বিত নিয়ম প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বৃহত্তর সংস্কার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সরকার জানিয়েছে, এই উদ্যোগ জনপ্রিয় প্রগতিশীল বিপ্লবের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশটির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ, প্রচার ও উন্নয়নের অঙ্গীকারের প্রতিফলন। নতুন বিধিমালায় বুরকিনা ফাসোর সাংস্কৃতিক পরিচয়, নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধ এবং মানবিক মর্যাদার প্রতি সম্মান নিশ্চিত করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
নতুন নিয়ন্ত্রক কাঠামো গৃহীত না হওয়া পর্যন্ত দেশটিতে কোনো সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার আয়োজনের অনুমতি দেওয়া হবে না। মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সিদ্ধান্তটি অবিলম্বে কার্যকর হবে এবং জাতীয় ভূখণ্ডজুড়ে তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করা হবে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রশংসা
বিজ্ঞানভিত্তিক এই প্রতিযোগিতা আফ্রিকার বিভিন্ন দেশের মানুষের মধ্যেও আগ্রহ তৈরি করেছে। ‘টেলস অব আফ্রিকা’ নামের একটি ফেসবুক পেজে ১১ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে এ নিয়ে একটি পোস্ট প্রকাশিত হয়। সেখানে অনেকেই তরুণীদের মেধা ও শিক্ষাগত অর্জনকে গুরুত্ব দেওয়ার উদ্যোগের প্রশংসা করেন।
ওবান রেনাটা নামের একজন মন্তব্য করেন, তিনি সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে ভাবছিলেন এবং এই উদ্যোগ তাঁর সেই ভাবনাকে আরও দৃঢ় করেছে। অস্কি জিজি মন্তব্য করেন, তাঁর উদ্যোগটি খুব ভালো লেগেছে এবং অন্য নেতারাও যেন তাঁকে অনুসরণ করেন। ডার্লিংটন মওয়াজা প্রেসিডেন্টকে অভিনন্দন জানিয়ে লেখেন, তিনি সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা চিন্তাভাবনা করছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের এসব প্রতিক্রিয়ায় বোঝা যায়, তরুণীদের মেধা ও শিক্ষাগত অর্জনকে সামনে নিয়ে আসার ধারণাটি বুরকিনা ফাসোর বাইরেও আলোচনা তৈরি করেছে। অনেকে আশা করছেন, অন্য দেশগুলোও বিজ্ঞান ও শিক্ষাক্ষেত্রে নারীদের সাফল্য উদ্যাপনে এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করবে।
বুরকিনা ফাসোর এই পদক্ষেপে একদিকে সৌন্দর্য প্রতিযোগিতার আয়োজন ও পরিচালনায় নতুন নিয়ম প্রণয়নের উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে বিজ্ঞানচর্চায় তরুণীদের অংশগ্রহণ ও সাফল্যকে সামনে আনার প্রচেষ্টাও গুরুত্ব পাচ্ছে।
সূত্র : ব্রিফলি নিউজ


