বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ক জোরদারে সক্রিয় রাষ্ট্রদূত রামিস শেন, গুরুত্ব পাচ্ছে জলবায়ু-বাণিজ্য সহযোগিতা

পড়তে ১ মিনিট

ঢাকা, বাংলাদেশ

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন তুরস্কের রাষ্ট্রদূত রামিস শেন | ছবি : সংগৃহীত


বাংলাদেশ ও তুরস্কের দীর্ঘদিনের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও গভীর ও বহুমাত্রিক করতে কূটনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রেখেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত তুরস্কের রাষ্ট্রদূত রামিস শেন। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা, শিক্ষা, প্রযুক্তি, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পারস্পরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ ও আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে তুরস্কের দূতাবাস।

এরই ধারাবাহিকতায় সোমবার (১৯ অক্টোবর) পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্য শামা ওবায়েদ ইসলামের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন তুরস্কের রাষ্ট্রদূত রামিস শেন। বৈঠকে জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা, টেকসই উন্নয়ন এবং আসন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলনকে কেন্দ্র করে দুই দেশের উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ আরও জোরদার করার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

সাক্ষাৎকালে রাষ্ট্রদূত রামিস শেন ২০২৬ সালের ৯ থেকে ২০ নভেম্বর তুরস্কের আনতালিয়ায় অনুষ্ঠেয় জাতিসংঘের জলবায়ু পরিবর্তনবিষয়ক ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের ৩১তম কনফারেন্স অব দ্য পার্টিজ (কপ-৩১) আয়োজনের প্রস্তুতি সম্পর্কে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীকে অবহিত করেন। পাশাপাশি ১১ ও ১২ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় বিশ্বনেতাদের শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণের বিষয়েও জানতে চান তিনি।

পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কপ-৩১ আয়োজনের জন্য তুরস্ককে অভিনন্দন জানান এবং নিশ্চিত করেন যে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বিশ্বনেতাদের শীর্ষ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করবেন। সম্মেলনের ফাঁকে দুই দেশের নেতাদের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক আয়োজনের সম্ভাবনা নিয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি। একই সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাংলাদেশ ও তুরস্কের সহযোগিতা আরও গভীর করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্প্রসারণে গুরুত্ব

বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হচ্ছে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ। দুই দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা সম্প্রসারণ, নতুন বাজার সৃষ্টি এবং যৌথ বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগানোর যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।

২০২৬ সালের ১৫ এপ্রিল বাংলাদেশের বাণিজ্যমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকে রাষ্ট্রদূত রামিস শেন দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি, বিনিয়োগ সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়ে আলোচনা করেন। ওই বৈঠকে তৈরি পোশাক, বস্ত্র, কৃষিভিত্তিক শিল্প এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং খাতে যৌথ উদ্যোগের সম্ভাবনা উঠে আসে। বাংলাদেশের পাট ও পরিবেশবান্ধব পণ্যের প্রতিও আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।

এ ধরনের কূটনৈতিক যোগাযোগের মাধ্যমে তুরস্কের উদ্যোক্তাদের কাছে বাংলাদেশের বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরা এবং বাংলাদেশি ব্যবসায়ীদের জন্য তুরস্কের বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ানোর পথ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য, পাটপণ্য, বস্ত্রশিল্প ও হালকা প্রকৌশল খাতে সহযোগিতা দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ককে আরও গতিশীল করতে পারে।

প্রতিরক্ষা, শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে সহযোগিতার সুযোগ

বাণিজ্যের পাশাপাশি প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা সহযোগিতাও বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। দুই দেশের মধ্যে প্রতিরক্ষা শিল্প, সরঞ্জাম সংগ্রহ, প্রশিক্ষণ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধির মতো বিষয়ে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

এ ছাড়া শিক্ষা, সাংস্কৃতিক বিনিময়, প্রযুক্তি এবং অবকাঠামো উন্নয়নেও পারস্পরিক সহযোগিতা সম্প্রসারণের সুযোগ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে কূটনৈতিক যোগাযোগ জোরদার হলে দুই দেশের সরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী এবং প্রযুক্তি খাতের অংশীজনদের মধ্যে কার্যকর অংশীদারত্ব গড়ে উঠতে পারে।

তুরস্কের দূতাবাসের ভূমিকা এখানে শুধু আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক যোগাযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং দুই দেশের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যোগাযোগ স্থাপন, অভিন্ন স্বার্থ চিহ্নিত করা এবং সহযোগিতার সম্ভাব্য ক্ষেত্রগুলো নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়াও এ ধরনের কূটনৈতিক কার্যক্রমের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পারস্পরিক সমর্থন

আন্তর্জাতিক ও আঞ্চলিক বিভিন্ন ইস্যুতেও বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে যোগাযোগ রয়েছে। ২০২৬ সালের ১২ মার্চ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে রাষ্ট্রদূত রামিস শেন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতিত্বের জন্য বাংলাদেশের প্রার্থিতার প্রতি তুরস্কের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন।

ওই বৈঠকে দুই দেশের বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের পাশাপাশি বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা, শিক্ষা, সাংস্কৃতিক বিনিময়, প্রযুক্তি ও অবকাঠামো উন্নয়ন নিয়ে আলোচনা হয়। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে পারস্পরিক সহযোগিতা জোরদারের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।

এ ধরনের সমর্থন ও যোগাযোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পৃক্ততা বাড়ানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিয়মিত সংলাপ দুই দেশের সম্পর্ককে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিতে পারে।

কপ-৩১ ঘিরে জলবায়ু কূটনীতির সম্ভাবনা

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, তুরস্কের আনতালিয়ায় কপ-৩১ আয়োজন দুই দেশের মধ্যে জলবায়ুবিষয়ক আলোচনা ও সহযোগিতা সম্প্রসারণের একটি আন্তর্জাতিক সুযোগ তৈরি করছে।

বিশ্বনেতাদের শীর্ষ সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর অংশগ্রহণ এবং সম্মেলনের ফাঁকে সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় বৈঠক জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন, প্রযুক্তি বিনিময় এবং টেকসই উন্নয়ন নিয়ে উচ্চপর্যায়ের আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তবে এসব ক্ষেত্রে নতুন কোনো চুক্তি, অর্থায়ন বা যৌথ কর্মসূচি গৃহীত হয়েছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট পক্ষের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা ছাড়া নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। বর্তমান আলোচনার গুরুত্ব মূলত দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বাড়ানো এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলো এগিয়ে নেওয়ার সম্ভাবনার মধ্যে নিহিত।

দীর্ঘদিনের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নেওয়ার সুযোগ

বাংলাদেশ ও তুরস্কের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৪ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি। ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে বাণিজ্য, উন্নয়ন, প্রতিরক্ষা এবং বহুপক্ষীয় কূটনীতিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিস্তৃত হয়েছে।

রাষ্ট্রদূত রামিস শেনের সাম্প্রতিক বিভিন্ন পর্যায়ের বৈঠক ও যোগাযোগে অর্থনৈতিক সহযোগিতা, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পারস্পরিক সমর্থনের বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সর্বশেষ বৈঠকে জলবায়ু পরিবর্তন ও টেকসই উন্নয়নের বিষয়টি আলোচনায় আসায় দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র সামনে এসেছে।

উল্লেখ্য, দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত কূটনৈতিক যোগাযোগ, ব্যবসায়িক অংশীদারত্ব এবং উচ্চপর্যায়ের বৈঠকের ধারাবাহিকতা বজায় থাকলে বিদ্যমান সম্পর্ককে আরও কার্যকর সহযোগিতায় রূপ দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ ক্ষেত্রে তুরস্কের দূতাবাসের কূটনৈতিক তৎপরতা এবং বাংলাদেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বিত উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

এই নিবন্ধটি শেয়ার করুন