তুরস্কের ৫ হাজার বছরের পুরনো বসতিতে অত্যাধুনিক নগর জীবনের দারুণ নিদর্শন আবিষ্কার
লেখক:
ছবি : আনাদোলু এজেন্সি
পশ্চিম তুরস্কে প্রত্নতাত্ত্বিকরা ৫ হাজার বছরের পুরনো একটি পাথরের তৈরি পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা খুঁজে পেয়েছেন। এই আবিষ্কার প্রাচীন উপকূলীয় জনগোষ্ঠী কীভাবে তাদের বসতি পরিকল্পনা করত, পানি ব্যবস্থাপনা পরিচালনা করত এবং এজিয়ান সাগরজুড়ে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছিল, সে সম্পর্কে নতুন তথ্য দিচ্ছে।
আনাতোলিয়ার প্রাথমিক উপকূলীয় জনগোষ্ঠীকে বোঝার ক্ষেত্রে তুরস্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান হলো ইজমির প্রদেশের উরলায় অবস্থিত লিমান তেপে। সেখানেই এই প্রাচীন পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার সন্ধান পাওয়া গেছে।
ব্যবস্থাটি বিভিন্ন স্তরে নির্মিত পাথরের নালা বা চ্যানেল দিয়ে তৈরি। খননকাজের প্রধান অধ্যাপক ভাসিফ সাহোগলুর মতে, এসব চ্যানেল সম্ভবত খাবার পানি সরবরাহের জন্য তৈরি করা হয়নি। বরং বসতি এলাকা থেকে বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন করে দূরে সরিয়ে নেওয়ার জন্য এগুলো নির্মাণ করা হয়েছিল।
এখানকার ভূমি বসতির কেন্দ্রের দিকে ঢালু হওয়ায় বৃষ্টির পানি নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এই ব্যবস্থা থেকে ধারণা করা যায়, হাজার হাজার বছর আগে এখানকার মানুষ তাদের চারপাশের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে বাস্তবসম্মত ও কার্যকর পদ্ধতি উদ্ভাবন করেছিল।
অধ্যাপক হায়াত এরকানাল ১৯৯২ সালে লিমান তেপেতে প্রথম খননকাজ শুরু করেন। ২০২০ সাল থেকে অধ্যাপক সাহোগলু আঙ্কারা বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে এই প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণার নেতৃত্ব দিচ্ছেন।
গবেষকরা এই স্থানে প্রায় ৭ হাজার বছরের পুরনো মানব বসতি নিয়ে গবেষণা করছেন। এ বছরের খননকাজে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে প্রায় ৫ হাজার বছর আগের একটি সুরক্ষিত ও প্রাচীরবেষ্টিত সুসংগঠিত বসতি এলাকার ওপর।
প্রত্নতাত্ত্বিকরা ‘লংহাউস’ নামে পরিচিত বড় বড় ভবনের মাঝ দিয়ে চলে যাওয়া কয়েকটি রাস্তার সন্ধান পেয়েছেন। এসব ভবনের কয়েকটি ২৫ মিটারেরও বেশি লম্বা এবং প্রায় ৫ মিটার চওড়া। এজিয়ান অঞ্চলে ওই সময়ের নির্মিত অবকাঠামোর মধ্যে এগুলো অন্যতম বৃহৎ স্থাপনা বলে মনে করা হচ্ছে।
প্রত্নতাত্ত্বিক দলটি বর্তমানে প্রায় ৫ হাজার বছর আগে লিমান তেপের অধিবাসীরা ব্যবহার করত এমন একটি রাস্তার ওপর দাঁড়িয়ে গবেষণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
ঘরগুলোর ভেতরে পাওয়া বিভিন্ন নিদর্শন থেকে ধারণা করা হচ্ছে, এসব ভবন শুধু বসবাসের জন্য ব্যবহৃত হতো না; বরং এগুলো ছিল কাজের জায়গা ও উৎপাদনকেন্দ্রও। একটি ভবনে ধাতু প্রক্রিয়াজাতকরণের চিহ্ন পাওয়া গেছে। অন্য একটি ভবনে পাওয়া গেছে পোশাক বা বস্ত্র তৈরির সঙ্গে সম্পর্কিত তাঁতের ওজন।
গবেষকদের মতে, এসব অবকাঠামো আবাসস্থল ও কর্মশালা—দুইভাবেই ব্যবহৃত হতে পারে। অর্থাৎ সে যুগে মানুষের গৃহস্থালি জীবন ও হস্তশিল্প উৎপাদন একই স্থানে পাশাপাশি চলত।
কিছু ঘরের প্রবেশপথের কাছে মাটিতে পোঁতা অবস্থায় বিশাল আকারের সিরামিকের জার বা পাত্রও পাওয়া গেছে। এগুলো পানি, খাদ্যশস্য কিংবা অন্যান্য পণ্য সংরক্ষণের কাজে ব্যবহৃত হতে পারে। তবে এসব পাত্রে ঠিক কী সংরক্ষণ করা হতো, তা নিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিকরা এখনো নিশ্চিত নন।
একটি প্রাচীন সামুদ্রিক বাণিজ্যিক গোষ্ঠী
এসব আবিষ্কার আরও জোরালোভাবে প্রমাণ করে যে, লিমান তেপে একটি বিস্তৃত সামুদ্রিক বাণিজ্য নেটওয়ার্কের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
প্রত্নতাত্ত্বিকরা মধ্য এজিয়ান সাগরের সাইক্ল্যাডস দ্বীপপুঞ্জ থেকে আসা কিছু মাটির পাত্র বা মৃৎশিল্পের সন্ধান পেয়েছেন। আনাতোলিয়ায় এ ধরনের মৃৎশিল্প বেশ বিরল। ফলে ধারণা করা হচ্ছে, প্রায় ৪ হাজার ৫০০ বছর আগে লিমান তেপের অধিবাসীদের সঙ্গে এজিয়ান দ্বীপপুঞ্জের মানুষের নিয়মিত যোগাযোগ ছিল।
এসব পাত্রে সম্ভবত জলপাই তেল বা মদ পরিবহন করা হতো। তবে এগুলোতে আসলে কী ধরনের পণ্য রাখা হতো, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
লিমান তেপেতে সমুদ্রযাত্রার প্রমাণ আরও প্রাচীন। প্রায় ৭ হাজার বছর পুরনো স্তরে গবেষকরা এজিয়ান সাগরের মেলোস দ্বীপ থেকে আসা অবসিডিয়ানের সন্ধান পেয়েছেন।
অবসিডিয়ান হলো প্রাকৃতিক আগ্নেয় কাচ। ধাতুর ব্যবহার ব্যাপকভাবে শুরু হওয়ার আগে ধারালো হাতিয়ার তৈরিতে এটি ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো। লিমান তেপেতে মেলোসের এই উপকরণের উপস্থিতি প্রমাণ করে, হাজার হাজার বছর আগেও মানুষ এজিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন করত।
প্রত্নতাত্ত্বিকরা একটি ছোট কর্মশালারও সন্ধান পেয়েছেন। সেখানে সমুদ্রপথে আসা অবসিডিয়ানের বড় বড় টুকরো প্রক্রিয়াজাত করে বিভিন্ন ধরনের হাতিয়ারে রূপান্তর করা হতো।
সব মিলিয়ে এসব আবিষ্কার থেকে স্পষ্ট হয়, লিমান তেপে কোনো বিচ্ছিন্ন বসতি ছিল না। এখানকার অধিবাসীদের উন্নত সামুদ্রিক দক্ষতা ছিল এবং সুদূর অতীত থেকেই তারা এজিয়ান সাগর অঞ্চলের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সঙ্গে যোগাযোগ ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখত।
সমুদ্রের নিচে এক প্রাচীন পোতাশ্রয়
লিমান তেপের গবেষণা শুধু উপকূলীয় এলাকা পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নয়; এটি সমুদ্রের তলদেশে থাকা একটি প্রাচীন পোতাশ্রয় বা বন্দরের এলাকাতেও বিস্তৃত হয়েছে।
২০০০ সালে সেখানে পানির নিচে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান শুরু হয়। অধ্যাপক সাহোগলু এটিকে একটি প্রাচীন বন্দরের ওপর পরিচালিত তুরস্কের প্রথম পানির নিচের প্রত্নতাত্ত্বিক খননকাজ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
পাথরের তৈরি একটি প্রতিরোধ বাঁধ বা ব্রেকওয়াটার কখন নির্মাণ করা হয়েছিল এবং বন্দরটি কতদিন ব্যবহারযোগ্য ছিল, তা নির্ধারণের জন্য গবেষকরা এখনো অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন।
পানির নিচের অনুসন্ধানে প্রচুর মৃৎপাত্র উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে দুটি হাতলযুক্ত জারও রয়েছে। একই সঙ্গে পাওয়া গেছে জলপাই, আঙুর ও কাঠবাদামের ধ্বংসাবশেষ। এসব আবিষ্কার প্রাচীন অধিবাসীদের খাদ্যাভ্যাস, অর্থনীতি ও বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পেতে গবেষকদের সহায়তা করছে।
পাথরের পানি নিষ্কাশন নালা, বিশাল আকারের বাড়িঘর, কর্মশালা, সংরক্ষণ জার এবং দূরবর্তী অঞ্চল থেকে আসা নানা সামগ্রী—সব মিলিয়ে লিমান তেপে ধীরে ধীরে একটি আশ্চর্যজনক ও উন্নত উপকূলীয় সম্প্রদায়ের ইতিহাস উন্মোচন করছে।
আধুনিক অর্থে লিমান তেপে হয়তো কোনো ‘স্মার্ট সিটি’ ছিল না। তবে এটি তার চেয়েও বিস্ময়কর এক বাস্তবতার প্রমাণ দেয়। হাজার হাজার বছর আগে তুরস্কের এজিয়ান উপকূলে বসবাসকারী মানুষ নগর পরিকল্পনা, পানি ব্যবস্থাপনা, পণ্য উৎপাদন এবং বিস্তৃত সামুদ্রিক বাণিজ্যিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে ইতোমধ্যেই অসাধারণ অগ্রগতি অর্জন করেছিল।
সূত্র : আনাদোলু এজেন্সি


