‘গাজা রাইজিং : ভয়েসেস ফ্রম দ্য রাবল’—ধ্বংসস্তূপের নিচে মানবতা ও প্রতিরোধের জীবন্ত দলিল
লেখক:
‘গাজা রাইজিং : ভয়েসেস ফ্রম দ্য রাবল’ | ছবি : সংগৃহীত
ফিলিস্তিনের গাজায় চলমান ইসরাইলি হামলা ও গণহত্যার প্রেক্ষাপটে প্রকাশিত হয়েছে প্রবন্ধ সংকলন ‘গাজা রাইজিং : ভয়েসেস ফ্রম দ্য রাবল’ (Gaza Rising: Voices from the Rubble)। ফিলিস্তিনি লেখক ও সাংবাদিক রামজি বারুদ, ইতিহাসবিদ ইলান পাপ্পে এবং সাংবাদিক রোমানা রুবেওর যৌথ সম্পাদনায় প্রকাশিত বইটি সম্প্রতি ক্ল্যারিটি প্রেস থেকে বাজারে এসেছে।
দৈনিক সংবাদে প্রকাশিত হতাহতের সংখ্যা ও ধ্বংসযজ্ঞের বিবরণের আড়ালে হারিয়ে যাওয়া ফিলিস্তিনিদের ব্যক্তিজীবন, স্মৃতি, স্বপ্ন ও সংগ্রামের গল্প তুলে ধরাই এ বইয়ের অন্যতম লক্ষ্য। এতে গাজার সাংবাদিক, চিকিৎসক, শিক্ষক, শিল্পী ও সমাজনেতাদের নিজস্ব অভিজ্ঞতা গুরুত্বের সঙ্গে সংকলিত হয়েছে।
বইটির অন্যতম সম্পাদক ও গাজায় জন্ম নেওয়া লেখক রামজি বারুদ বলেন, এটি শুধু গণহত্যা নিয়ে লেখা কোনো বই নয়; বরং মানবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল। তাঁর ভাষ্য, বইটিতে ইসরাইল কী করেছে, ফিলিস্তিনিরা কীভাবে তাদের মানবতা বিসর্জন দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে এবং বিশ্বের বিভিন্ন অংশ কীভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে—তার একটি গুরুত্বপূর্ণ চিত্র উঠে এসেছে।
বারুদ মনে করেন, বইটি ফিলিস্তিনিদের কেবল ‘ক্ষমতাহীন ভুক্তভোগী’ হিসেবে দেখার প্রচলিত ধারণাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।
ইতিহাসবিদ ইলান পাপ্পের মতে, গাজার মানুষের জবরদখল ও বহিষ্কারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ প্রতিরোধের ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় বইটি তাদের দৃঢ়সংকল্পকে তুলে ধরেছে।
তিনি বলেন, ২০২৩ সালের গণহত্যা কিংবা এর পরবর্তী ধারাবাহিক হামলা গাজার মানুষকে তাদের ঘরবাড়ি ও মাতৃভূমি থেকে বিতাড়িত করতে পারবে না—এই সংকল্পই বইটির বিভিন্ন লেখায় প্রতিফলিত হয়েছে। একই সঙ্গে এতে দেখানো হয়েছে, গাজার স্থিতিস্থাপকতা ও প্রতিরোধ কোনো নির্দিষ্ট দল, প্রজন্ম কিংবা লিঙ্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
সহ-সম্পাদক রোমানা রুবেও বলেন, বইটিতে বেঁচে থাকার সংগ্রামকে কোনো রোমান্টিক রূপ দেওয়া হয়নি। বরং গণহত্যার মুখে গাজার মানুষের মানবিক অভিজ্ঞতার পূর্ণ জটিলতা তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
দুঃখ, ভয়, ভালোবাসা, ক্ষোভ, হাসি ও সংকল্প—সবকিছুর মধ্য দিয়ে গাজার মানুষের জীবন ও মানবিক অস্তিত্বকে তুলে ধরা হয়েছে বলে জানান তিনি। তাঁর মতে, একটি জাতিকে মুছে ফেলার চেষ্টার মধ্যেও গাজার ফিলিস্তিনিরা নিজেদের মতো করে মানবতা প্রকাশ করে চলেছেন।
বইটিতে ইলান পাপ্পের একটি মুখবন্ধ এবং রামজি বারুদের ভূমিকা রয়েছে। নিহত এক সাংবাদিকের ডায়েরি নিয়ে রোমানা রুবেওর লেখা একটি বিশেষ অংশও এতে সংকলিত হয়েছে।
এছাড়া আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞ রিচার্ড ফকের উপসংহার এবং তুরস্কের সাবেক প্রধানমন্ত্রী আহমেত দাভুতোগ্লুর একটি উপসংহারমূলক বক্তব্য বা পরিশিষ্ট বইটিতে যুক্ত করা হয়েছে।
বইটি উৎসর্গ করা হয়েছে ডা. সোমা বারুদ এবং ফিলিস্তিনি সাংবাদিক ওয়াফা আলুদাইনিকে। চলমান ইসরাইলি হামলায় দুজনেই নিহত হয়েছেন। আরও বেদনাদায়ক বিষয় হলো, বইটি প্রকাশের আগেই এর বেশ কয়েকজন অবদানকারী ইসরাইলি হামলায় প্রাণ হারিয়েছেন। ফলে তাঁদের রেখে যাওয়া লেখাগুলো এখন ফিলিস্তিনিদের ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা মুছে ফেলার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সাক্ষ্য হয়ে উঠেছে।
ফিলিস্তিনিদের নিজেদের কণ্ঠে ইতিহাস, স্মৃতি ও দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা জানতে আগ্রহী সাধারণ পাঠক, সাংবাদিক, গবেষক, মানবাধিকারকর্মী এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের জন্য ‘গাজা রাইজিং : ভয়েসেস ফ্রম দ্য রাবল’ একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকলন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।


