মার্কিন দাবি প্রত্যাখ্যান : হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ পুনরায় নিশ্চিত করল ইরান
লেখক:
দক্ষিণ ইরানের বন্দর আব্বাসের কাছে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল | এএফপি
ইরানের আধাসরকারি সংবাদ সংস্থা ফারস-এর তথ্য অনুযায়ী, দেশটির এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বৃহস্পতিবার দাবি করেছেন যে, হরমুজ প্রণালী "ইরানের নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনায়" রয়েছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সামাজিক মাধ্যম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এ যুক্তরাষ্ট্র এই কৌশলগত জলপথের "পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে" রয়েছে বলে পোস্ট করার একদিন পরই ইরানের বাসিজ আধাসামরিক বাহিনীর প্রধান হোসেইন তায়েবের এই মন্তব্য এলো।
তায়েব বলেন, হরমুজ প্রণালীতে নতুন করে যুদ্ধ শুরু করে অঞ্চলে ইসলামী প্রজাতন্ত্রের যে জনপ্রিয়তা রয়েছে তা নস্যাৎ করতে চেয়েছিল যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ইরানের কোনো বিমানবাহিনী বা নৌবাহিনী নেই বলে দাবি করা সত্ত্বেও তারা আবারও পরাজিত হয়েছে।
তায়েব বলেন, "আজ আপনারা দেখতে পাচ্ছেন যে হরমুজ প্রণালী ইসলামী প্রজাতন্ত্রের ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।" তিনি আরও যোগ করেন, ইরান পূর্ণ নিরাপত্তার সাথেই নিজেদের পথ বেছে নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে।
এর আগে বুধবার ট্রাম্প দাবি করেছিলেন, হরমুজ প্রণালী যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং তারা এটি "নিজেদের দখলেই রাখবে।"
ট্রাম্প তার ট্রুথ সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে লেখেন, "হরমুজ প্রণালীর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। আমার মনে হয় আমরা এটি নিজেদের দখলেই রাখব! আমাদের নৌ অবরোধকে সবাই 'ইস্পাতের প্রাচীর' (A WALL OF STEEL) বলছে এবং এতে ইরানের কিছুই করার নেই।"
মধ্যপ্রাচ্য দিয়ে জ্বালানি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় পণ্য পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই প্রণালীটি মার্কিন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে ট্রাম্প বারবার দাবি করে আসছেন।
তবে ইরান বলছে, তারাই কার্যত এই জলপথের বেশিরভাগ অংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ট্রাম্প কর্তৃক শুরু করা মার্কিন যুদ্ধের জবাবে প্রণালীতে 'টোল' বা মাশুল ব্যবস্থা চালু করার পরিকল্পনা করছে তেহরান।
মঙ্গলবার শেষের দিকে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন: "এই মুহূর্তে হরমুজ প্রণালীর ওপর আমাদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। ওদের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। আমাদেরই পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ আছে। এটি এখন আমাদের দখলে।"
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানকে তার পারমাণবিক কর্মসূচি ত্যাগ করতে বাধ্য করা এবং শাসনব্যবস্থা পরিবর্তনের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হওয়া এই প্রায় ছয় মাসের যুদ্ধে মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী ইরানের সামরিক ঘাঁটিতে ব্যাপক বোমা হামলা চালিয়েছে এবং দেশটির একঝাঁক শীর্ষ নেতৃত্বকে হত্যা করেছে।
এর জবাবে ইরানও অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটি, ইসরায়েল এবং যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র উপসাগরীয় দেশগুলোর বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে।
তবে ইরানের সবচেয়ে কার্যকর পদক্ষেপ ছিল হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে আঘাত হানা, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পথকে কার্যত স্থবির করে দিয়েছে এবং বিশ্ব অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিয়েছে।
আগামী নভেম্বরের মধ্যবর্তী কংগ্রেস নির্বাচনের আগে নিজ দেশে রাজনৈতিক জনপ্রিয়তা কমতে থাকায়, ট্রাম্প লড়াইয়ের পরিধি বাড়িয়ে চূড়ান্ত বিজয় ছিনিয়ে আনার হুমকি থেকে কিছুটা পিছু হটেছেন।
ফলে যুদ্ধটি এখন এক ধরণের অচলবস্থায় (স্ট্যালমেট) রূপ নিয়েছে।
তবে এই রিপাবলিকান প্রেসিডেন্ট বলছেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এখন ইরানের বন্দরগুলোতে অবরোধ সৃষ্টির ওপর নজর দিতে প্রস্তুত। আক্সিওসকে (Axios) দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি এই কৌশলকে "ধীরগতির নীতি" (low-keying) বলে অভিহিত করেছেন।
ট্রাম্প রবিবার আক্সিওসকে বলেন, "আমরা তাদের সাথে কেবল নামে মাত্র আলোচনা করছি। আমরা শুধু দেখছি ইরানের আকাশচুম্বী মুদ্রাস্ফীতি এবং তাদের কাছে যে কোনো অর্থ নেই, সেই পরিস্থিতি।"
পরিবেশগত ক্ষতি
এদিকে জলপথটিতে নৌ চলাচলের কারণে সৃষ্ট পরিবেশগত ক্ষতির অজুহাত দেখিয়ে বুধবার হরমুজ প্রণালী অতিক্রমকারী জাহাজগুলোর ওপর মাশুল ধার্য করার পরিকল্পনাকে যুক্তিসঙ্গত বলে দাবি করেছে ইরান।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (X)-এ ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এসমাঈল বাঘাই জানান, পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরে বহু দশকের দূষণের ফলে ইরানে ট্রিলিয়ন ডলারের ক্ষতি হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রণালীটি ব্যবহার করে পণ্য পরিবহনের মাধ্যমে যেসব দেশ ও কোম্পানি সুবিধা পাচ্ছে, পরিবেশগত ক্ষতি মোকাবেলায় সহায়তা করা তাদের আইনি ও নৈতিক দায়িত্ব। তিনি আরও যোগ করেন, এই জলপথের ভবিষ্যৎ যেকোনো ব্যবস্থাপনায় পরিবেশ সুরক্ষাকে কেন্দ্রবিন্দুতে রাখা উচিত।
তবে ইরান ঠিক কী ধরনের পরিবেশগত পদক্ষেপের প্রস্তাব করছে সে বিষয়ে তিনি কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি।
প্রণালীতে অবস্থিত ইরানের কশম (Qeshm) দ্বীপের উপকূলে সাম্প্রতিক একটি তেল ছড়িয়ে পড়ার (অয়েল স্পিল) ঘটনা উল্লেখ করে বাঘাই বলেন, প্রাথমিক তদন্তে দেখা গেছে একটি বিদেশী মালবাহী জাহাজ এর জন্য দায়ী।
ইরানের অবরোধের কারণে অচল হয়ে পড়া হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার সংঘাতের প্রধান একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। ইরান বলছে, প্রণালীর অপর উপকূলীয় দেশ ওমানের সাথে সমন্বয় করে তারা একটি ট্রানজিট ফি বা ট্রানজিট মাশুল নির্ধারণ করতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র এই ধারণাটি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেছে।
পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো সতর্ক করে দিয়েছে যে, এই সংঘাতের ফলে জাহাজ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার বা আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। বুধবার জানা গেছে, ওমান উপকূলে চড়ায় আটকে যাওয়া এবং রাশিয়ার তথাকথিত 'শ্যাডো ফ্লীট'-এর সাথে যুক্ত একটি তেল ট্যাঙ্কার থেকে ছড়িয়ে পড়া তেল ওমানের মূল ভূখণ্ডে পৌঁছে গেছে।
গ্রিনপিস জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালী ও এর চারপাশের জলসীমায় প্রবাল প্রাচীর, ম্যানগ্রোভ এবং সামুদ্রিক ঘাসের মতো সংবেদনশীল পরিবেশব্যবস্থা (ইকোসিস্টেম) রয়েছে। তাছাড়া, তেল ছড়িয়ে পড়লে তা লাখ লাখ মানুষের সুপেয় পানি সরবরাহে বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে, কারণ অনেক উপসাগরীয় দেশই পানি পাওয়ার জন্য সমুদ্রের পানি লবণমুক্তকরণ (ডি স্যালাইনেশন) প্ল্যান্টের ওপর দারুণভাবে নির্ভরশীল।
সূত্র : ডেইলি সাবাহ



