জলবায়ুর নতুন হুমকি 'এল নিনো' : ১০ প্রশ্নে যা জানা আবশ্যক
লেখক:
যুক্তরাষ্ট্রের কানসাসের একটি গমের মাঠ রোদে পুড়ছে
যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (এনওএএ) জানিয়েছে, উত্তর গোলার্ধের শরৎ ও শীতকালে বর্তমান ‘এল নিনো’ একটি অত্যন্ত শক্তিশালী রূপ ধারণ করার আশঙ্কা ৯০ শতাংশেরও বেশি।
এনওএএ আরও অনুমান করছে, অক্টোবর-ডিসেম্বর মেয়াদে ১৯৫০ সালের পর থেকে রেকর্ড করা প্রতিটি এল নিনোর শক্তিকে ছাপিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে ৬৯ শতাংশ।
এল নিনো, এর সম্ভাব্য বিকাশ এবং বিশ্বজুড়ে এর সম্ভাব্য প্রভাব সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ১০টি প্রশ্নের উত্তর তুলে ধরা হলো।
১. এল নিনো কী?
স্প্যানিশ ভাষায় এল নিনো শব্দের অর্থ ‘ছোট ছেলে’। এটি ‘এল নিনো-সাউদার্ন অসিলেশন’ বা এনসোর একটি উষ্ণ পর্যায়। বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরের পানির তাপমাত্রা, বাতাস এবং বায়ুমণ্ডলীয় চাপের পরিবর্তনের সঙ্গে এটি সম্পর্কিত একটি পুনরাবৃত্ত জলবায়ু প্যাটার্ন।
বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্ব অংশের সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিক মাত্রার চেয়ে বেড়ে গেলে এবং বায়ুমণ্ডল সেই উষ্ণতার প্রতিক্রিয়া জানালে এল নিনো তৈরি হয়।
২. বর্তমান এল নিনো কখন শুরু হয়েছিল এবং কতদিন স্থায়ী হবে?
গড়ে প্রতি দুই থেকে সাত বছর পরপর এল নিনো দেখা দেয় এবং সাধারণত ৯ থেকে ১২ মাস স্থায়ী হয়। তবে কোনো কোনো ক্ষেত্রে এটি দীর্ঘায়িত হতে পারে।
এনওএএ গত ১১ জুন জানিয়েছে, ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরে এল নিনো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সংস্থাটি আশা করছে, ২০২৬ সালের শেষ পর্যন্ত এই প্রক্রিয়া শক্তিশালী হতে থাকবে এবং ২০২৭ সালের উত্তর গোলার্ধের বসন্তকাল পর্যন্ত এটি বজায় থাকতে পারে।
৩. ২০২৬-২৭ সালের এল নিনোকে কেন অস্বাভাবিক বলা হচ্ছে?
যেসব ক্ষেত্রে তিন মাসের তাপমাত্রা সূচক স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস ওপরে পৌঁছায়, সেগুলোকে সাধারণত ‘অত্যন্ত শক্তিশালী’ এল নিনো হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়।
১৯৮২-৮৩, ১৯৯৭-৯৮ এবং ২০১৫-১৬ সালের ঘটনাগুলো আধুনিক রেকর্ডে সবচেয়ে শক্তিশালী এল নিনোর উদাহরণ। তবে এনওএএর ১৩ আগস্টের পূর্বাভাস অনুযায়ী, বর্তমান এল নিনো শরৎ ও শীতকালে অত্যন্ত শক্তিশালী হওয়ার আশঙ্কা ৯০ শতাংশের বেশি। এটি আগের সব রেকর্ড ভেঙে দিতে পারে।
৪. এল নিনো কীভাবে তাপমাত্রা ও চরম আবহাওয়াকে প্রভাবিত করে?
একটি শক্তিশালী এল নিনো বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা প্রায় শূন্য দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস বৃদ্ধি করতে পারে। প্রশান্ত মহাসাগর পৃথিবীর পৃষ্ঠের প্রায় এক-তৃতীয়াংশজুড়ে বিস্তৃত এবং বায়ুমণ্ডলের জন্য তাপ ও আর্দ্রতার একটি বিশাল উৎস হিসেবে কাজ করে।
পানির তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাষ্পীভবনও বাড়ে। এর ফলে কোনো কোনো অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে পারে, আবার অন্যদিকে প্রবল বৃষ্টিপাত ও ঝড়ের সৃষ্টি হতে পারে।
৫. কোন অঞ্চলগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে?
পেরু ও ইকুয়েডরে ভারী বৃষ্টিপাত, বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে এল নিনো। অন্যদিকে দক্ষিণ আফ্রিকা, কলম্বিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও অস্ট্রেলিয়ায় বাড়তে পারে খরার ঝুঁকি।
এল নিনো ভারতে মৌসুমি বৃষ্টিপাত দুর্বল করতে পারে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় উষ্ণ ও শুষ্ক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে এটি দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোতে বৃষ্টিপাত এবং উত্তরাঞ্চল ও কানাডায় উষ্ণ শীতের সৃষ্টি করতে পারে।
৬. উচ্চ তাপমাত্রা ও চরম আবহাওয়ার বাইরে এর কী প্রভাব রয়েছে?
এল নিনোর কারণে যেসব অঞ্চলে শুষ্ক পরিস্থিতি তৈরি হয়, সেখানে দাবানলের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকার কিছু অংশ এবং দক্ষিণ আফ্রিকা ঝুঁকিতে থাকতে পারে।
কৃষি খাতও সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়ে। একই সঙ্গে পানিতে পুষ্টি উপাদান কমে যাওয়ায় সামুদ্রিক ইকোসিস্টেম ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, যার প্রভাব পড়তে পারে মাছের উৎপাদনে।
৭. অর্থনীতি, কৃষি ও খাদ্যের মূল্যে এল নিনো কীভাবে প্রভাব ফেলতে পারে?
আগের এল নিনো ঘটনাগুলো বছরজুড়ে অর্থনীতিতে বড় ধরনের ক্ষতি করেছে। ১৯৯৭-৯৮ সালের এল নিনোর কারণে পরবর্তী পাঁচ বছরে বিশ্বব্যাপী প্রায় ৫ দশমিক ৭ ট্রিলিয়ন ডলার আয় ক্ষতি হয়েছিল।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) অনুমান করেছে, ২০২৬-২৭ সালের এল নিনোর কারণে ২০২৭ সালের শেষ নাগাদ অতিরিক্ত ৪ কোটি ৯০ লাখ মানুষ চরম খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার দিকে ঠেলে যেতে পারে।
এতে চাল, ভুট্টা, কফি, কোকো, চিনি ও পাম তেলের মতো পণ্যের বৈশ্বিক দাম বাড়তে পারে।
৮. তুরস্ক কি এল নিনোর প্রভাবে পড়বে?
তুরস্ক এমন অঞ্চলে অবস্থিত নয় যেখানে এল নিনো সরাসরি তীব্র প্রভাব ফেলে। কোনো প্রভাব থাকলে তা সাধারণত পরোক্ষ হয়।
বায়ুমণ্ডলীয় চাপ ও ভূমধ্যসাগরীয় আবহাওয়া ব্যবস্থার ওপর ভিত্তি করে সেখানে শুষ্ক ও উষ্ণ পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। তবে এ বিষয়ে আরও বিস্তারিত পূর্বাভাস প্রয়োজন।
৯. এল নিনো ও লা নিনার মধ্যে পার্থক্য কী?
স্প্যানিশ ভাষায় লা নিনা মানে ‘ছোট মেয়ে’। এটি এনসোর শীতল পর্যায়। বিষুবীয় প্রশান্ত মহাসাগরে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে নিচে নেমে গেলে লা নিনা তৈরি হয়।
এল নিনো সাময়িকভাবে বৈশ্বিক তাপমাত্রা বৃদ্ধি করলেও লা নিনা সাধারণত সাময়িক শীতল প্রভাব তৈরি করে। এদের আঞ্চলিক প্রভাবও অনেক ক্ষেত্রে পরস্পর বিপরীত।
১০. এল নিনোর সঙ্গে কি জলবায়ু পরিবর্তনের কোনো সম্পর্ক আছে?
জলবায়ু পরিবর্তন ভবিষ্যতের এল নিনোর শক্তি বা পুনরাবৃত্তিকে কীভাবে প্রভাবিত করবে, তা নিয়ে এখনো সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক ঐকমত্য নেই।
এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ু ঘটনা। তবে বর্তমানে এটি তুলনামূলকভাবে অনেক উষ্ণ বায়ুমণ্ডল ও মহাসাগরীয় ব্যবস্থার মধ্যে ঘটছে। ফলে এল নিনো নিজে শক্তিশালী না হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে এর ক্ষতিকর প্রভাব আগের তুলনায় আরও বেশি হতে পারে।
সূত্র : আনাদোলু এজেন্সি



