হুসন-ই হাত-এর শিল্পকলা : ইসলামী ক্যালিগ্রাফির ইতিহাস
লেখক:
হুসন-ই হাত-এর শিল্পকলা : ইসলামী ক্যালিগ্রাফির ইতিহাস
আরবি ক্রিয়াপদ ‘ḥধṭṭ’ থেকে উদ্ভূত, যার অর্থ ‘লেখা’, ‘রেখা’, ‘পথ’ বা ‘পদ্ধতি’Ñএই মূল থেকে তুর্কি ভাষায় ‘হাত’ শব্দটি গঠিত হয়েছে। পরিভাষাগতভাবে এটি নান্দনিক নীতির ভিত্তিতে আরবি লিপিকে সুন্দরভাবে লেখার শিল্পকে বোঝায়, যা ‘হুসন-ই হাত’ নামে পরিচিত। ধ্রুপদী উৎসসমূহে এই শিল্পকে প্রায়ই ‘শারীরিক উপকরণের মাধ্যমে প্রকাশিত এক আধ্যাত্মিক জ্যামিতি’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। এই সংজ্ঞা সেই গভীর নান্দনিক ও আধ্যাত্মিক সংবেদনশীলতাকে যথাযথভাবে প্রকাশ করে, যার মধ্যে ক্যালিগ্রাফি শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বিকশিত ও সমৃদ্ধ হয়েছে।
পশ্চিমা বিশ্বে হুসন-ই হাত সাধারণত ‘ক্যালিগ্রাফি’ নামে পরিচিত। বিশ্বকোষসমূহে ক্যালিগ্রাফিকে সংজ্ঞায়িত করা হয় ‘সুন্দর লেখার শিল্প, যা নান্দনিক নিয়ম ও সুষম অনুপাত অনুসারে সম্পাদিত হয়।’
হিজরতের কয়েক শতাব্দীর মধ্যেই ক্যালিগ্রাফি ইসলামী বিশ্বের একটি সম্মিলিত সাংস্কৃতিক সম্পদে পরিণত হয় এবং ধীরে ধীরে ইসলামী ক্যালিগ্রাফির স্বতন্ত্র চরিত্র অর্জন করে। প্রাক-ইসলামী আরবি শিলালিপির গবেষণা থেকে জানা যায়, আরবি লিপির উৎপত্তি মূলত নাবাতীয় কার্সিভ লিপি থেকে, যা আবার ফিনিশীয় বর্ণমালার ঐতিহ্যের সঙ্গে সম্পর্কিত।
আরবি লিখন পদ্ধতি মক্কা ও মদিনায় বিস্তৃত হলে তা বিভিন্ন নামে পরিচিত হয়। প্রাথমিক পর্যায়ে এটি ‘সেজম’ নামে পরিচিত ছিল; মদিনায় এসে এটি ‘মেদেনী’ নামে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তীতে এটি দু’টি প্রধান শৈলীতে বিভক্ত হয়Ñ‘মাইল’, যেখানে ডান থেকে বামে হেলানো দীর্ঘ উল্লম্ব রেখার বৈশিষ্ট্য দেখা যায়, এবং ‘মেশক’, যেখানে অনুভূমিক রেখার বিস্তৃতি বিশেষভাবে লক্ষণীয়।
পরবর্তীতে যখন আলী ইবনে আবি তালিব (চতুর্থ রাশিদুন খলিফা) কুফাকে প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন, তখন এই লিপির উল্লেখযোগ্য বিকাশ ঘটে এবং এটি ‘কুফিক’ নামে পরিচিত হয়। এরপর থেকে ‘কুফিক’ শব্দটি একটি বিস্তৃত পরিভাষা হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে, যা ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকে আব্বাসীয় যুগ পর্যন্ত ‘মক্কি’ ও ‘মাদেনী’ ধাঁচের পূর্ববর্তী লিপিগুলোকেও অন্তর্ভুক্ত করে।
আব্বাসীয় যুগে প্রায় দেড় শতাব্দী ধরে কুফিক লিপির প্রাধান্য বজায় থাকে। এই সময়েই বাগদাদের প্রখ্যাত উজির ও ক্যালিগ্রাফার ইবনে মুকলা (মৃত্যু ৯৪০) জ্যামিতির ভিত্তিতে লিপির একটি সুসংগঠিত অনুপাত তত্ত্ব প্রণয়ন করেন। তিনি অক্ষর গঠনের জন্য বিন্দু, আলিফ এবং বৃত্তকে পরিমাপের মৌলিক একক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেন। এই কাঠামোর ভিত্তিতে তিনি ছয়টি লিপিরÑমুহাক্কাক, রাইহানি, থুলুথ, নাসখ, তাওকি এবং রিকাÑনিয়মিত রূপ নির্ধারণ করেন, যা সম্মিলিতভাবে ‘আকলাম-ই সিত্তে’ বা ‘ছয় কলম’ নামে পরিচিত।
এক শতাব্দী পর বাগদাদে প্রশিক্ষিত ক্যালিগ্রাফার আলী ইবনে হিলাল (মৃত্যু ১০৩২) এই লিপিগুলোকে আরও সূক্ষ্ম ও পরিশীলিত রূপে উন্নীত করেন। এই শিল্পের বিবর্তন অব্যাহত থাকে এবং আব্বাসীয় খলিফা ও প্রধান ক্যালিগ্রাফার ইয়াকুত আল-মুস্তাসিমি (মৃত্যু ১২৯৮)-এর হাতে এটি নতুন মাত্রার স্বচ্ছতা, ভারসাম্য ও নান্দনিক উৎকর্ষ লাভ করে। তিনি পূর্ববর্তী নিয়মাবলিকে আরও সুসংহত ও নির্ভুলভাবে পুনর্বিন্যাস করেন।
১২৫৮ সালে বাগদাদের পতনের পর ক্যালিগ্রাফির নেতৃত্ব ধীরে ধীরে তুর্কি ও ইরানি ওস্তাদদের হাতে চলে যায়। ইরানি ক্যালিগ্রাফাররা ইয়াকুতের শৈলীর প্রতি অনুগত থেকে নিজেদের নান্দনিক রুচি অনুযায়ী ‘আকলাম-ই সিত্তে’-কে ব্যাখ্যা করেন। অন্যদিকে উসমানীয় তুর্কিরা ক্যালিগ্রাফির এক স্বতন্ত্র ও পরিশীলিত ধারা প্রতিষ্ঠা করে।
ষোড়শ শতাব্দীতে উসমানীয় ক্যালিগ্রাফির জনক হিসেবে পরিচিত শেখ হামদুল্লাহ (মৃত্যু ১৫২০) ‘ছয় কলম’-এ এক অসাধারণ নান্দনিক পরিপক্বতা নিয়ে আসেন। তাঁর হাত ধরেই থুলুথ ও নাসখ লিপি তুর্কি নান্দনিকতার সঙ্গে গভীরভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়ে ওঠে এবং কুরআন অনুলিপির ক্ষেত্রে নাসখ লিপি প্রধান মান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
শেখ হামদুল্লাহর প্রভাব এতটাই গভীর ছিল যে পরবর্তী ক্যালিগ্রাফারদের সাফল্য প্রায়ই তাঁর মানদণ্ডের সঙ্গে তুলনা করে বিচার করা হতো। উৎকৃ’ ক্যালিগ্রাফারদের প্রশংসায় বলা হতোÑ‘তিনি শেখের মতো লেখেন’ বা ‘দ্বিতীয় শেখ’Ñযা এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে একটি মানদণ্ড হিসেবে টিকে ছিল।
সপ্তদশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে হাফিজ উসমান (মৃত্যু ১৬৯৮) শেখ হামদুল্লাহর ধারা পরিমার্জন করে একটি স্বতন্ত্র ব্যক্তিগত শৈলী গড়ে তোলেন, যা ক্যালিগ্রাফিতে নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। পরবর্তীতে অষ্টাদশ শতাব্দীতে ইসমাইল জুহদু (মৃত্যু ১৮০৬) এবং তাঁর ভাই মুস্তফা রাকিম (মৃত্যু ১৮২৬) এই ধারাকে আরও বিকশিত করেন। বিশেষত মুস্তফা রাকিম থুলুথ, নাসখ এবং চেলি থুলুথে ক্যালিগ্রাফির শীর্ষস্থানীয় দক্ষতা অর্জন করেন। তিনি রচনাগত বিন্যাসে (ইস্তিফ) অসাধারণ ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করেন এবং ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎÑসব আকারেই শৈলীর নিখুঁত প্রয়োগ ঘটান।
পরবর্তী সময়ে চেলি থুলুথের প্রখ্যাত ওস্তাদ সামি এফেন্দি (মৃত্যু ১৯১২) ইসমাইল জুহদুর শৈলীকে বৃহৎ আকারের শিলালিপিতে প্রয়োগ করে এই ঐতিহ্যকে আরও সমৃদ্ধ করেন।
উসমানীয় বিজয়ের পর ইস্তাম্বুল ক্যালিগ্রাফির অমর কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। ইসলামী বিশ্বে বহুল প্রচলিত একটি উক্তি এই বাস্তবতাকে প্রকাশ করে: ‘কুরআন হিজাজে অবতীর্ণ হয়েছে, মিশরে পঠিত হয়েছে এবং লিখিত ও পঠিত উভয়টি হয়েছে ইস্তাম্বুলে ।’
মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে শিক্ষার্থীরা এই শিল্প শেখার জন্য ইস্তাম্বুলে আগমন করতেন। উসমানীয় ক্যালিগ্রাফি বিদ্যালয়ের প্রখ্যাত ওস্তাদের মধ্যে রয়েছেনÑশেখ হামদুল্লাহ, আহমেদ কারাহিসারি, হাফিজ উসমান, মুস্তফা রাকিম, মাহমুদ সেলেলেদ্দিন এফেন্দি এবং ইয়েসারিজাদে মুস্তফা ইজ্জেত এফেন্দি।
স্ক্রিপ্ট এবং শৈলী আকলাম-আই সিত্তে
আকলাম-আই সিত্তে ঐতিহ্যগতভাবে সাজানো হয় তিনটি জোড়া লিপি: থুলুথ-নাসখ, মুহাক্কাক-রাইহানি, এবং তাওকি-রিকা দিয়ে। প্রতিটি জোড়ার প্রথম লিপিটি সাধারণত প্রায় ২ মিমি নিব-প্রস্থের নলখাগড়ার কলমে বৃহৎ ও জাঁকজমকপূর্ণভাবে লেখা হয়, আর তার প্রতিরূপটি প্রায় ১ মিমি সূক্ষ্ম কলমে অপেক্ষাকৃত ছোট ও পরিশীলিত রূপে প্রকাশ পায়। অক্ষরগত দিক থেকে মুহাক্কাকের সঙ্গে রাইহানি এবং তাওকির সঙ্গে রিকা ঘনিষ্ঠ সাদৃশ্য বহন করেÑযেন ভিন্ন বয়সের দুই সহোদর। তবে থুলুথ ও নাসখের মধ্যে পার্থক্য শুধু আকারে নয়, গঠনগত নান্দনিকতাতেও সুস্পষ্টভাবে প্রতিফলিত।
মুহাক্কাক
‘সুশৃঙ্খল’ বা ‘দৃঢ়’ অর্থবাহী এই লিপি থুলুথের তুলনায় বৃহৎ ও অধিক বিস্তৃত অক্ষর বিন্যাসে গঠিত। সিন, ফা, কাফ ও নুন-এর মতো অক্ষরগুলোর উল্লম্ব রেখা এবং বামদিকে প্রসারিত অবতল আকৃতি এখানে আরও স্প’ ও জোরালোভাবে প্রকাশ পায়। এর গঠন কৌণিক ও নিয়ন্ত্রিত; অতিরিক্ত বাঁক বা অলঙ্করণ পরিহার করে এটি সরলরেখা-নির্ভর নান্দনিকতাকে অনুসরণ করে। ফলস্বরূপ, এর স্বচ্ছতা ও ভারসাম্যপূর্ণ বিন্যাস এক ধরনের মর্যাদাপূর্ণ উন্মুক্ততা ও গাম্ভীর্য সৃষ্টি করে।
রাইহানি
রাইহানি মূলত মুহাক্কাকেরই একটি ক্ষুদ্রতর ও সূক্ষ্ম সংস্করণ, যা একই নীতিমালার অনুসরণে গঠিত হলেও আকারে অধিক সংযত ও কোমল। ষোড়শ শতাব্দী পর্যন্ত এই দুই লিপিই ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো, বিশেষত কুরআন পাণ্ডুলিপির ক্ষেত্রে। তবে পরবর্তীকালে স্থান ও ব্যবহারিক প্রয়োজনের পরিবর্তনের কারণে ধীরে ধীরে এদের ব্যবহার সীমিত হয়ে পড়ে এবং বহু অঞ্চলে প্রায় পরিত্যক্ত হয়ে যায়।
থুলুথ
মুহাক্কাকের তুলনায় সামান্য ছোট আকারে গঠিত থুলুথ লিপির বৈশিষ্ট্য এর খাটো ও গভীর বক্রতা এবং সামগ্রিকভাবে কোমল অথচ জাঁকজমকপূর্ণ চেহারা। এর নান্দনিক ভারসাম্য ও প্রবাহমানতা একে শিরোনাম, প্যানেল, স্থাপত্য অলংকরণ এবং ক্যালিগ্রাফিক রচনার জন্য বিশেষভাবে উপযোগী করে তুলেছে। আজও ইসলামি ক্যালিগ্রাফির অন্যতম সক্রিয় ও মর্যাদাপূর্ণ লিপি হিসেবে এটি ব্যবহৃত হয়।
নাসখ
‘বাতিল করা’ বা ‘স্থানচ্যুত করা’ অর্থবাহী নাসখ লিপি থুলুথেরই একটি ক্ষুদ্র ও অধিক কার্যকর রূপ। এর নামকরণের পেছনে ঐতিহাসিক কারণ হলোÑবই অনুলিপির ক্ষেত্রে এর ব্যাপক ব্যবহার ধীরে ধীরে অন্যান্য লিপিকে প্রতিস্থাপিত করেছিল। এর স্পষ্টতা, পাঠযোগ্যতা এবং ভারসাম্যপূর্ণ গঠন একে পাণ্ডুলিপি রচনার জন্য আদর্শ লিপিতে পরিণত করেছে, যা আজও থুলুথের পাশাপাশি সমানভাবে ব্যবহৃত হয়।
তাওকি
থুলুথ থেকে উদ্ভূত হলেও তাওকি অপেক্ষাকৃত ছোট আকারে বিকশিত হয়েছে এবং এতে এমন অক্ষর সংযোগের সক্ষমতা রয়েছে, যেগুলো সাধারণত অন্য লিপিতে যুক্ত হয় না। ঐতিহাসিকভাবে এটি খলিফা ও উজিরদের চিঠিপত্র এবং রাজকীয় ফরমানের সঙ্গে যুক্ত অনুমোদনপত্র (নিশান) রচনার জন্য ব্যবহৃত হতো। ওয়াকফ দলিলেও এর গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার ছিল।
রিকা
তাওকির ঘনিষ্ঠ ক্ষুদ্র রূপ হিসেবে রিকা লিপি আরও সংক্ষিপ্ত, দ্রুতলিখনযোগ্য এবং ব্যবহারিকভাবে অত্যন্ত কার্যকর। এর নামের অর্থ ‘ছোট পাতা’ বা ‘ছোট অক্ষর’, যা এর আকার ও প্রকৃতিকে যথাযথভাবে প্রতিফলিত করে। ওয়াকফ দলিলের পাশাপাশি এটি প্রায়শই কুরআন পাণ্ডুলিপির শেষ প্রার্থনা পাতায় ব্যবহৃত হতো, যেখানে ক্যালিগ্রাফার নিজের নাম, তারিখ এবং প্রার্থনা লিপিবদ্ধ করতেন।
আকলাম-ই সিত্তার এই শাস্ত্রীয় কাঠামোর পাশাপাশি তালিক, দিভানি, জালি দিভানি এবং রিকার মতো লিপিগুলো স্বতন্ত্রভাবে বিকশিত হয়ে বিশেষ ঐতিহাসিক ও প্রশাসনিক গুরুত্ব অর্জন করেছে। বিশেষত অটোমান ক্যালিগ্রাফিতে রিকার একটি রূপান্তরÑঅটোমান রিকাÑউদ্ভব ঘটে, যা দিভানি লিপির সরলীকরণের মাধ্যমে গঠিত হয়। এতে উল্লম্ব রেখা সংক্ষিপ্ত করা হয়, বক্রতা হ্রাস করা হয় এবং লিপিকে অধিক সংযত ও ব্যবহারবান্ধব রূপ দেওয়া হয়।
রাজপ্রাসাদের চিঠিপত্র ও দৈনন্দিন প্রশাসনিক যোগাযোগে ব্যবহৃত এই লিপি অষ্টাদশ শতাব্দীর শুরুতে আত্মপ্রকাশ করে এবং ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাবিয়ালি পরিবেশে পূর্ণতা লাভ করে। এই উন্নত রূপটি ‘বাবিয়ালি রিকা’ বা ‘মুমতাজ এফেন্দি রিকা’ নামে পরিচিত হয়। পরবর্তীকালে মেহমেত ইজ্জেত এফেন্দি (মৃত্যু ১৯০৩) এর সংস্কারকৃত সংস্করণ তার স্মারক ও নান্দনিক বৈশিষ্ট্যের কারণে আরব বিশ্বেও বিশেষ জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
তালিক
চতুর্দশ শতাব্দীতে ইরানে তাওকির রূপান্তর হিসেবে তালিক লিপির উদ্ভব ঘটে এবং এটি মূলত দাপ্তরিক চিঠিপত্রে ব্যবহৃত হতো। এর নামের অর্থ ‘ঝুলন্ত’, যা অক্ষরগুলোর পারস্পরিক সংযোগ ও ঝুলে থাকার ভিজ্যুয়াল গঠনকে নির্দেশ করে। তালিক লিপির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর অনুপাতিক ভারসাম্য, ছন্দময় প্রবাহ এবং সুরেলা রেখা-সংগঠন, যা একে নান্দনিকভাবে অত্যন্ত আকর্ষণীয় করে তোলে।
এর দু’টি প্রধান শৈলী বিকশিত হয়Ñইরানি ও অটোমান। যদিও প্রথমদিকে অটোমান ক্যালিগ্রাফাররা ইরানি ধারা অনুসরণ করলেও, পরবর্তীতে তারা নিজেদের স্বতন্ত্র শৈল্পিক রূপ প্রতিষ্ঠা করেন। ইয়াসারি এবং পরবর্তীতে ইয়াসারিজাদে মুস্তফা ইজ্জেতের প্রচেষ্টায় একটি পরিশীলিত অটোমান তালিক শৈলীর বিকাশ ঘটে। এটি থুলুথের জাঁকজমকের বিপরীতে অধিক সূক্ষ্ম, বক্র ও সুরেলা রূপ ধারণ করে।
এর পরিমার্জিত রূপÑহুরদে ও হাফিÑসাহিত্যিক গ্রন্থ ও কাব্য সংকলনে ব্যবহৃত হতো এবং এটি ফতোয়া সংক্রান্ত দফতরের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক লিপিতে পরিণত হয়। (রা.)
দিভানি
পঞ্চদশ শতাব্দীতে আক-কোয়ুনলু রাজ্যের মাধ্যমে অটোমান প্রশাসনে তালিক লিপি প্রবেশ করে এবং দ্রুত রূপান্তরের মাধ্যমে রাজকীয় চ্যান্সারিতে ব্যবহারের উপযোগী হয়ে ওঠে। এই প্রশাসনিক ব্যবহারের কারণেই এর নাম হয় ‘দিভানি’। এর জটিল ও অলংকৃত রূপÑজালি দিভানিÑউচ্চপর্যায়ের রাষ্ট্রীয় চিঠিপত্রে ব্যবহৃত হতো।
উভয় লিপিই অটোমান ক্যালিগ্রাফির স্বতন্ত্র উদ্ভাবনের প্রতিনিধিত্ব করে, যেখানে সৌন্দর্য, ক্ষমতা এবং প্রশাসনিক কার্যকারিতা একত্রে মিলিত হয়েছে। #



